প্রথমেই প্রশ্ন, চৌদ্দশো বছর আগে মহিলা সাহাবীরা উটের পিঠে চড়ে মরুভূমিতে যাতায়াত করতেন। এখন এই দুই হাজার সতেরো সনে একটি মহিলা সাইকেল চালালে সেটা হয়ে যায় বিগ নিউজ! আমরা কী তাহলে পেছালাম না আগালাম?
আমাদের দেশে মেয়েরা সাইকেল চালালে লোকে হায় হায় রব তুলে। ব্যাপারটা কী কেবলই ইসলামিক? তাহলে সব হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান মেয়েদের আমি সাইকেলে দেখিনা কেন? তার মানে ব্যাপারটা সামাজিক। আমাদের সমাজ, সেই অনাদিকাল থেকেই মেয়েদের ঘরে বন্দি করে রাখতে বিশ্বাসী।
কোন ধর্মই আমাদের সমাজকে বদলাতে পারেনি, আমাদের সমাজই বরং সব ধর্মকে বদলে দিয়েছে।
কেউ কেউ বলেন, ইসলাম মহিলাদের বাইরে একা চলাফেরা নিষিদ্ধ করে। সঙ্গে অবশ্যই, বাপ, ভাই বা স্বামী থাকতেই হবে। উদাহরণ, সৌদিআরব। এবং আরও কিছু হাদিস।
কথা এগুবার আগে আমি তাহলে একটি যুক্তি দেই। পছন্দ হলে নিবেন, নাহলে ফেলে দিন।
ধরুন, নবীজির (সঃ) জন্ম যদি বাংলাদেশে হতো। এদেশে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এবং তিনি যদি বলতেন, "বর্ষাকালে মাথার উপর ছাতা ধরে যাতায়াত করো।"
তাঁর কন্টেক্স্ট হতো, বৃষ্টি হলে মাথায় ছাতা ধরো - নাহলে তুমি ছাতা নামিয়েও চলাফেরা করতে পারো।
কিন্তু একদলকে ঠিকই পাওয়া যেত, যারা পুরো বর্ষাকালই মাথার উপর ছাতা ধরে রাখতো। বৃষ্টি হলেও, না হলেও।
এখানেও এই হাদিসের কন্টেক্স্ট নিয়ে কেউ কিছু ভাবেনা।
কন্টেক্স্ট হচ্ছে, নিরাপত্তা। তখনকার আইন-শৃঙ্খলাহীন আরব সমাজে প্রোটেকশন ছাড়া এক মহিলার বাইরে চলাফেরা কতটুকু বুদ্ধিমানের কাজ ছিল? আমাদের দেশেইতো বখাটে ছেলেদের দৌরাত্মে আমাদের মা বোন চাচী মামী খালা এমনকি দাদি নানীরা পর্যন্ত একা বেরুতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। এবং সেটা মুসলিম হিন্দু খ্রিষ্টান সব পরিবারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের দেশের পহেলা বৈশাখে ঢাবিতে, নিউমার্কেট-গাউসিয়া মার্কেট এলাকায় প্রতিদিন কিংবা কিছুদিন আগে নিউ ইয়ারে বেঙ্গালুরুতে যা ঘটে গেল এক্ষেত্রে নবীজির (সঃ) হাদিসে ভুল কোথায় খুঁজে পাই?
আপনি যদি ধর্মকর্ম নাও করেন, আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, আপনি নিজের মেয়েকে ওসব এলাকায় একা পাঠাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন না। আপনার ইচ্ছা করবে প্রটেক্টর হিসেবে তাঁর পাশে থাকতে। এবং প্রতিবার যখন সে বেচারি ওদের কুস্পর্শের শিকার হবে, আপনার ইচ্ছা করবে প্রতিটা কুলাঙ্গারকে ধরে ধরে শিরোচ্ছেদ করতে।
তবে হ্যা, সমাজ যদি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, কোন বখাটে ছেলে কোন মেয়েকে দেখে শীষ বাজালে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বেত্রাঘাত করবে, এবং অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীর শাস্তি হবে প্রাণ দন্ড - এবং ধর্ষণ হলেতো কথাই নাই - তাহলেই বলা যাবে মেয়েদের একা বাইরে বেরুনো নিয়ে কারোরই কোন আপত্তি থাকবে না। ওয়েস্টার্ন দেশগুলো এমন নিশ্ছিদ্র নিরপত্তা নিশ্চিত না করতে পারলেও, যা করে তাও আলহামদুলিল্লাহ। সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট এদেশে সিরিয়াস ক্রাইম। যে করে, তার খবর হয়ে যায়।
শেষ করি বুখারী ও আবু দাউদে বর্ণিত নবীজির (সঃ) একটি হাদিস দিয়ে, "A day will come when a woman will travel alone by herself from San’a to Hadramawt fearing nothing but wild beasts."
মানে হচ্ছে, এমন এক দিন আসবে, যখন এক নারী "একা" এক দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করবে, অথচ তাঁর মনে কেবল একটিই দুশ্চিন্তা থাকবে - সেটি জংলী জানোয়ারের।
অন্য কথায় - মানব সমাজ এতটাই নিরাপদ থাকবে।
কথা হচ্ছে, মেয়েদের যদি একা বাইরে বেরুনো নিষিদ্ধই হতো - তাহলে নবীজির (সঃ) এই হাদিসে কেন একটি নিরাপদ সমাজে একটি মহিলার একা বেরুনোর কথা বলা হয়েছে? দুটি কী সম্পর্কযুক্ত? আমারতো তাই মনে হয়।
আমি জানি, কনসারভেটিভ ঘরানার অনেকেরই আমার কথা পছন্দ হবেনা। তাঁদের বিশ্বাস তাঁদের কাছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি ছাড়াও মাথার উপর কেউ ছাতা ধরে রাখলে কারোরই কোন সমস্যা হয়না। কারোর মা-বোন ঘরে থাকছে না বাইরে বেরুচ্ছে - এটি সম্পূর্ণ তাঁদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত। আমাদের কারোরই নাক গলানোর কিছু নেই।
আমি আমার মনোভাব ব্যক্ত করলাম। কেউ একে আবার ফতোয়া হিসেবে নিবেন না প্লিজ। এবং আল্লাহর ওয়াস্তে একে ইস্যু বানিয়ে একে ওকে আস্তিক নাস্তিক ট্যাগ মারা শুরু করবেন না।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ১১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



