একটা জরুরি কথা অতি দ্রুত বলে শেষ করি।
একটা ভিডিও খুব ভাইরাল হচ্ছে দেখলাম। কথা এগুবার আগে একটা ঘটনা বলে ফেলি দ্রুত।
আমাদের পাড়ায় একটা নেড়ি কুকুর ছিল। কেউ আদর করতো না, এখানে ওখানে ঘাটাঘাটি করে খাবার খুঁজে বেড়াতো। এবং পাশ দিয়ে মানুষ গেলেই ঘেউ ঘেউ করে এটেনশন চাইতো। লোকে পাথর ছুড়ে মারতো। দেশে নেড়ি কুকুরদের ভাগ্যে যা জোটে আর কি। কিন্তু এতেই সে খুশিতে লেজ নাড়তো। জানেন নিশ্চই, কুকুর আনন্দিত হলে লেজ নাড়ে। আমার ছোটবেলা থেকেই কুকুর ফোবিয়া আছে। কুকুর সামনে দেখলেই আমার হাত পা শক্ত হয়ে আসে। ঘেউ ঘেউ করলেতো কথাই নাই। আমি সেই কুকুরটাকে দেখলে অতি দ্রুত রাস্তা থেকে সরে যেতাম। আমাকে দেখে কয়েকবার ঘেউ ঘেউ করেছিল - রেসপন্স পেতো না বলে একসময়ে সেটা বন্ধ করে দিয়েছিল। দেখা যেত অন্য সবাইকে দেখলে যে ঘেউ ঘেউ করে উঠে, আমাকে দেখলে সে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে। কে বলেছে কুকুর বুদ্ধিমান প্রাণী না?
এখন আসি মূল প্রসঙ্গে।
আমাদের দেশে একটা ছেলে নবীজিকে (সঃ) নিয়ে কটূক্তি করে ভিডিও আপলোড করেছে। এতে সবাই আহত হয়ে ফেসবুকে ভিডিওটা ছড়িয়ে দিয়েছে। ছেলেটা চেয়েছিল ফ্রি প্রচার, ধন্যবাদ আমার মুমিন ভাইদের, তাঁরা তার হয়ে কাজটি করে দেয়ার জন্য।
হাজার হাজারবার, লক্ষ লক্ষবার ভিডিওটি দেখা হচ্ছে। ছেলেটি এখন বাংলাদেশে একটি পরিচিত মুখ হয়ে গেছে। রাতারাতি সেলিব্রেটি। এবং বহুবার ক্লিক হবার ফলে ইউটিউব সম্ভবত তাকে টাকাও দিচ্ছে কিছু। বাহ্! প্রথমে তাকে সেলিব্রেটি বানালেন, এখন তার পকেট ভারী করার ব্যবস্থাও আপনারাই করে দিলেন।
এখন সবাই দাবি করছে তার ফাঁসির। অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানে এমন কোন আইন নেই যে নবীজিকে (সঃ) কটূক্তির জন্য কাউকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে। আপনার দাবিতে সরকার তার ফাঁসি দিবেনা। মাঝে দিয়ে কী হবে জানেন? সে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এম্বেসিতে যাবে, গিয়ে বলবে তাকে এসাইলাম ভিসা দিতে। এবং তার হয়ে প্রমান হিসেবে কারা কাজ করলো? এই যে আপনারা। ব্রাভো! সো প্রাউড অফ ইউ! একজন সেলিব্রেটিকে পকেট ভর্তি টাকা সহ বিদেশে পাচার করে দেয়ার চমৎকার ব্যবস্থা আপনারা করে দিলেন।
অথচ তার ঘেউ ঘেউ এ কেউ যদি পাত্তা না দিত, তাহলে সে গলির চিপায় উদাস মুখে ডাস্টবিন ঘেটে খাবার খোঁজায় মন দিত। এবং হ্যা, তার লেজ দুই পায়ের ফাঁকে গোটানোই থাকতো।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। পে এক্সট্রা এক্সট্রা এটেনশন।
একদল লোক তাদের চাপাতিতে ধার দিয়ে বসে আছেন এই ব্যাপারটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। যেকোন সুযোগে তার ঘাড় ফেলে দেয়া হবে। এতে লক্ষলক্ষ কোটি কোটি মুসলমান খুশি হয়ে বলবেন, "আলহামদুলিল্লাহ!" এবং উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে কাব বিন আশরাফ এবং আরও কারও কারও কথা।
সরকারও তখন বলবেন, "কেউ ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করবে কেন? কেউ ইচ্ছা করে উস্কানি দিলে আমরা কেন তার নিরাপত্তার দায়ভার নিব।"
মোটেও বানিয়ে বলছি না। অতীতের রেফারেন্স দিলাম।
প্রথমত, কাব বিন আশরাফের ঘটনা ঘটেছিল কবে জানেন? নবীজি (সঃ) যখন মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন তার পরে। এর আগে মক্কায় তাঁর উপর উটের পঁচা গলা নাড়িভুড়ি ফেলার অপরাধ ঘটে যাওয়ার পরেও তিনি কাউকে কোন শাস্তি দেননি। তাঁর সন্তানের মৃত্যুতে পুরো মক্কা জুড়ে হৈহুল্লোড় করে বেড়ানো আবু লাহাবকেও তিনি কোন কটূক্তি করেননি। সুমাইয়া-ইয়াসিরকে (রাঃ) তাঁদের সন্তানদের সামনে বীভৎসতার সাথে হত্যা করা হলো। নবীজি (সঃ) কেবল বললেন, ধৈর্য্য ধরতে।
কেন এমনটা ঘটেছিল বলে আপনার ধারণা? কারন মক্কা ইসলামী রাষ্ট্র ছিল না। মদিনা নিবাসী কা'ব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছিল - এবং তাছাড়া তার আরও অনেক রাষ্ট্রদ্রোহী কুকর্ম ছিল যা অতি আধুনিক রাষ্ট্র অ্যামেরিকাতেও প্রাণদন্ড হিসেবে শাস্তি দেয়া হয়।
তা বাংলাদেশ কী ইসলামী রাষ্ট্র? এর সংবিধান কী কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক? এর রাষ্ট্রপ্রধান কী খলিফা?
উত্তর হচ্ছে না। কাজেই ছেলেটার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক।
বাক স্বাধীনতায় আমার কোন আপত্তি নেই। আমরা নিজেরা বাক স্বাধীনতার পক্ষে। আপত্তি হচ্ছে, বাক স্বাধীনতার নামে ফাজলামির। এই ছেলের যদি সমস্যা থাকে নবীর ফিলোসফি নিয়ে - তা থাকতেই পারে - কোটি কোটি অমুসলিম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সবাই যদি নবীজির (সঃ) সাথে সহমত হতো - তাহলেতো সবাই মুসলিমই হতো। সমস্যা হচ্ছে সেই আপত্তি প্রকাশের ভাষা নিয়ে। আপনার ভাষায় কোন অবস্থাতেই কাউকে মনে আঘাত দিয়ে বাক স্বাধীনতার দোহাই আপনি দিতে পারেননা। সভ্য সমাজই একটা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই ছেলেটি নিঃসন্দেহে সীমাতিক্রম করেছে। ওকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই শাস্তি দিতে হবে।
সেটা কী হতে পারে?
শুনেছি "বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি বা অনলাইনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড" এমন একটা প্রস্তাব মন্ত্রী পরিষদে গৃহীত হয়েছিল। গুজবও হতে পারে। তবে বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারকে নিয়ে কটূক্তির শাস্তি কী হতে পারে এমন উদাহরণতো আমরা হরহামেষাই দেখছি। এই কিছুদিন আগেই আমি শেখ কামালের জামার দাম নিয়ে কথা তোলায় ক্যানভাসে যা তুলকালাম হয়েছিল - সেকথা বাদই যাক।
এখন নবী রাসূল ঈশ্বর ভগবানদের নিয়ে কটূক্তি করার শাস্তিও বাংলাদেশ সংবিধানে সমানভাবে রাখা উচিৎ। কারন দেশের এখনও নব্বই শতাংশ মানুষ কোন না কোন ধর্মের অনুসারী। কেউ অমুক নবীকে নিয়ে কটূক্তি করলে, মানুষ নিরীহ মানুষের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এদিকে নিজেদের গুরুরাই বিভিন্ন জনসমাবেশে অন্য ধর্মাবলম্বীদের নামে কটূক্তি করে বেড়াচ্ছে। তখন কোন সমস্যা নাই।
নতুন আইনে এইসব ফাজলামি বন্ধ করতে হবে। কেউ কারোর কোন রকম বিশ্বাস নিয়ে ফাত্রামি করতে পারবেনা। অ্যামেরিকানদের বাক স্বাধীনতার উদাহরণ টেনে লাভ নাই। আমরা অ্যামেরিকানদের মতন সভ্য জাতি নই - স্যাড বাট এটাই রিয়েলিটি। আমাদের মুক্তমনা, সংকীর্ণমনা, মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী সবাই একইভাবে চিন্তা করে, একইভাবে কথা বলে। আমাদের সুশিক্ষিত হওয়া এখনও হয়ে উঠা হয়নি।
মুসলিমদের উচিৎ অযথা অমুকের ফাঁসি চাই, তমুকের গর্দান চাই, দাবি না তুলে সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি করা যে কঠিন কোন শাস্তি (যা দীর্ঘমেয়াদি কারাদন্ড ও বিপুল অংকের অর্থদন্ড হতে হবে) দিয়ে যেন রাষ্ট্র নিশ্চিত করে এমন ফাজলামি করে কেউ পার পাবেনা। গণদাবির মুখে সরকার আইন প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়। রিসেন্ট নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা একটি প্রাইম উদাহরণ। গণজাগরণ মঞ্চ ছিল আরেকটি সাকসেস। একটা দুইটা এক্সাম্পেল সেট করে দিলেই দেখবেন কেউ আর ফালতু ফাজলামি করছে না।
মুসলিমদের আসল পরীক্ষা তাঁদের ডিসিপ্লিনে, অযথা মাথা গরম করে ফালাফালিতে নয়। আমরা নিয়মিত হারে সেই পরীক্ষায় ফেল করছি। এইবার অন্তত আল্লাহর ওয়াস্তে ফেল করবেন না। আপনারতো কিছু যায় আসেনা, মাঝে দিয়ে রেপুটেশন নষ্ট হয় নবীজির(সঃ)।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জানুয়ারি, ২০১৭ ভোর ৫:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



