somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষ হয়ে জন্মালে মানুষের প্রতি অনুরাগ জন্মাবেই। কিন্তু সেটা যেন মানুষটার প্রতিই থাকে।

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১২:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রেম বিষয়টা অনেক মিষ্টি। একে বুঝেশুনে ব্যবহার করলে মুখে মধু লেগেই থাকে। অপব্যবহারে ডায়েবেটিস হতে বাধ্য।
ওয়েস্টার্ন দেশে থাকি। ওয়েস্টার্ন প্রেমের একটি উদাহরণ দিয়েই না হয় কিছু কথা বলি।
অ্যামেরিকার কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের বেশিরভাগ সুন্দরী মেয়ের (বেশিরভাগ বললাম যাতে কেউ "সব" মেয়ে বলে মনে না করে, ব্যতিক্রমও পাওয়া যায়) সাথে প্রেম করার প্রথম শর্ত হচ্ছে দামি উপহার প্রদান। লুই ভিটনের পার্স, টিফানির রিং, প্রাডার জুতা না হলে আশা করাও ঠিক না এই মেয়ে নিজের মনে কাউকে স্থান দিবে।
স্বাভাবিকভাবেই ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে ওদের শর্ত হচ্ছে তাঁর অফিসে যেন ফুল পাঠানো হয়। তাও ক্রোগার/টম থাম্ব জাতীয় রিটেইল থেকে পাঠালে হবেনা। ব্র্যান্ড নেম এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ালমার্ট বা টার্গেট থেকে পাঠালেতো ব্রেকাপই হয়ে যাবে। অফিসের লোকজন কী মনে করবে? এত ফকিরা বয়ফ্রেন্ডের সাথে প্রেম করছে!
দামি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ অথবা ডিনারে নিয়ে যেতে হবে। মেয়ে ফিগার কশাস, সালাডের বেশি বলতে গেলে কিছুই খায়না। ছেলেও নিজের শরীর ফিট রাখার জন্য বেছে বেছে খায়। তবুও ডাউনটাউনের কোন ফ্যান্সি রেস্টুরেন্টে খেতে হবে। যেখানে বেশি টাকায় কম খাবার পাওয়া যায়। ফেসবুকে ছবি তুলবে, চেকইন দিবে। সবাই দেখুক তাঁদের মধ্যে কত প্রেম!
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে হেলিকপ্টার রাইড, লাস ভেগাসে হুলুস্থুল উইকেন্ড যাপন, ফ্লোরিডায় ফাইভস্টার ক্রুজ ভ্যাকেশন ইত্যাদি নিশ্চয়তা না দিলে বিয়ের প্রশ্নই উঠেনা।
তারপর সব ঠিকঠাক হলে বিয়ে হলে হবে। কিন্তু ধরিত্রী মাতা সূর্যদেবের চারদিকে এক চক্কর দেবার আগেই দেখা যায় সব প্রেম খতম হো গায়া। নতুন বছরে নতুন মানুষের কাছ থেকে নতুন নতুন দামি উপহার প্রাপ্তি দিয়ে পালিত হয় ভালবাসা দিবস।
এমনিতে এইসব ব্যাপার নিয়ে লিখতে ভাল লাগেনা। যার যার দেশের যার যার কালচার। আমার কী? তবে ট্রেন্ডটা বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলেই রীতিমত আতংকিত হয়ে লিখতে বসলাম।
এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা কী জানেন? আপনার মনে তখন দামি উপহারটাই টপ প্রায়োরিটি পাবে। সঙ্গী/সঙ্গিনীর মন জয়ের স্থান সে তালিকার অনেক নিচের দিকে থাকে। যে ছেলে তাঁর সঙ্গিনীকে এত দামি উপহার দিচ্ছে, তাঁরতো কিছু বাড়তি চাহিদা থাকবেই। সেখানেও মেয়েটির "মন থেকে ভালবাসা" অনেক নিচের প্রায়োরিটি।
এরাও অতি সহজভাবেই মেনে নেয়। আঠারো বছর বিবাহিত জীবন যাপনের পরেও এক মহিলাকে চিনি যে কেবল একটি আপেল এবং এক কাপ পিনাট বাটার দিয়ে লাঞ্চ করে। কারন এর বেশি খেলে তাঁর শরীরে মেদ জমবে, তাঁর স্বামী তাহলে তাঁকে আর ভালবাসবে না।
আমাদের মা খালাদের দেখেন। জীবনেও এইসব নিয়ে তাঁদের ভাবতে হয়নি। কারন আমাদের বাপ খালুদের ভালবাসার লিস্টে টপ প্রায়োরিটিতে তাঁরাই আছেন। তাঁরা তাঁদের এই হুমকি দিয়ে সংসার করেননি যে বছরের একটি বিশেষ দিনে লুই ভিটনের ব্যাগ না হলে তিনি অন্য ব্যাটার হাত ধরে চলে যাবেন।
ভাবতেই পারেন, আমি দামি উপহার দিচ্ছি, ও যাতে খুশি হয়।
খুবই ভুল স্ট্র্যাটেজি। ওর খুশি হবার কথা আপনার সাহচর্যে। থাইল্যান্ড থেকে ইম্পোর্ট করা দামি গোলাপ উপহার দিলেন, নাকি চলতে চলতে ঘাস থেকে ছিড়ে একটি ফুল তুলে দিয়ে রোমান্টিক কোন কবিতার দুইটি চরণ বললেন, সেটা ম্যাটার করার কথা পরে। চিরকাল কারোর সমান যায় না। দেখা যাবে আপনার দুঃসময়ে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা অর্থ সংকটে, আপনাকে ছেড়ে যাওয়া মানুষদের মধ্যে সবার আগে থাকবে আপনার সঙ্গিনীর নাম।
এখানে স্বামীর চাকরি চলে গেলে দেখা যায় কর্মজীবী স্ত্রীটিও একদিন ছেড়ে চলে যায়। কয়দিন একটি বেকার অকর্মা লোককে বসে বসে খাওয়ানো যায়?
আবার মেয়ের বাবার অর্থ সম্পদের বিশাল পাহাড় দেখে কোন ছেলে বিয়ে করলো। মেয়েটি ভাল করেই জানে কেন তাঁর জীবনে এই ছেলেটি এসেছে। একদিন সে যখন বিপদে পড়বে - মেয়েটি যদি জুতাপেটা করে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয় - আপনি কী দোষ দিতে পারবেন?
কিন্তু তাঁর জীবনে যদি আপনার উপস্থিতিই প্রধান হয়ে থাকে, তাহলে দেখবেন, পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াইয়ের সময়ে আপনার পাশে আপনার সঙ্গীটিই থেকে যাচ্ছে।
উদাহরণ আমি নিজে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময়ে প্রেম করেছি। টিউশনির অল্প টাকায় ফুটানি দেখানো সম্ভব ছিল না। পিতার কলিজা কাটিয়া প্রেমিকার সন্তুষ্টি অর্জনের আরাধনা আমার জীবনেও ছিল না। আমরা গল্প করতে করতে অনেকটা পথ হেঁটেছি। লোকাল বাসে বাদুড় ঝুলা হয়ে শহর ঘুরেছি। সারাটাক্ষন আমার লক্ষ্য কেবল এটাই ছিল যে ও যেন উপলব্ধি করতে পারে, আমি ছাড়া সে পূর্ণতা পাবেনা। আমার সাথে কাটানোর জন্য একটি জীবনও বড্ড কম সময়।
ফল পেয়েছি যখন আমাদের বিয়ে নিয়ে জটিলতা দেখা দিল। ও একাই লড়ে ওর পরিবারকে রাজি করালো।
বিয়ের পরেও ঝামেলা কম হয়নি। অর্থ সঙ্কট ছিল প্রধান সমস্যা। আমার নতুন চাকরি। বেতন খুবই কম। ওকেও কাজ করতে হয়েছে - যাকে আমরা বলি অড জব। গাড়ি ছিল একটাই। সেটা আমি নিয়ে যেতাম অফিসে। তিনঘন্টা সময় লাগিয়ে একটার পর একটা বাসে চেপে ওকে কাজে যেতে হয়েছে। গাড়িতে যেটা ছিল সামান্য কুড়ি মিনিটের পথ। কাজ শেষে আরও ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করেছে যাতে আমি কাজ শেষে তাঁকে গাড়িতে করে নিয়ে আসতে পারি। এখন প্রায় সব বাঙালি নারীদের মতন প্রায়ই তাঁকে বলতে শোনা যায় - তোমার সাথে বিয়ে করেই আমার জীবন বরবাদ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি কোন বিপদে পড়লে, কিংবা অসুস্থ হলে সবার আগে এগিয়ে আসে সেই।
প্রেম করুন, এটি অতি স্বাভাবিক মানবীয় গুন। মানুষ হয়ে জন্মালে মানুষের প্রতি অনুরাগ জন্মাবেই। কিন্তু সেটা যেন মানুষটার প্রতিই থাকে। তাঁর ওয়ালেটের ওজন মেপে যখন প্রেম করতে নামবেন, সেটা নিজেকে অতি সস্তায় বিক্রি করা ছাড়া আর কিছুই না। নিজের মূল্য নিজের কাছেই বৃদ্ধি করুন। এমন কাউকেই ভালবাসতে শিখুন, যে টাকা দিয়ে আপনাকে কিনতে চায়না, বরং প্রাণ উজাড় করে ভালবাসে। তাহলেই দেখবেন প্রিয়জনের সাথে ফুটপাথের পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়ার আনন্দটাও আপনি কোন ফাইভস্টার ডিনারের বিনিময়ে লেনদেন করতে চাইবেন না।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১২:০১
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতটা নির্লজ্জ বেহায়া ভিসি সারা দুনিয়াতে নেই-- ছি:

লিখেছেন অপলক , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০১

একটা মানুষ কতটা নির্লজ্জ হতে পারে, সেই সাথে ক্ষমতার+ টাকার+ সরকারী সুবিধাদী পাবার কাঙ্গাল হতে পারে, চুয়েটের ভিসি (Vice-Chancellor) কে না দেখলে জানতেই পারতাম না। এতদিন শুধু লোভী বলে বুবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিতে আতঙ্ক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫০


দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়, গ্রাফিতিতে চুনকালি ও পলিটিক্যাল ইসলাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৪


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×