somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মসজিদের দান বাক্স

১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মসজিদে নববী যখন নির্মিত হয় তখন কী তাঁর অবস্থা ছিল জানেন? ইট, পাথরের গাঁথুনি, এবং মাথার উপর তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে খেজুর পাতার ছাউনি। বৃষ্টি হলে মেঝে কাদায় মাখামাখি হয়ে যেত। আমাদের নবী(সঃ) সেই ভেজা মাটিতেই সিজদা দিতেন। উঠলে পরে তাঁর কপালে কাদামাটি লেগে থাকতো। তারপরেও তিনি পূর্ণ আবেগের সাথেই বলতেন, সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা! Glory be to Allah My Lord, the Most High.
তিনি জীবিতাবস্থাতেই পুরো আরব অঞ্চল ইসলামের ছত্রছায়ায় চলে আসে। চারদিক থেকে টাকা আসতে শুরু করে। তবু তিনি নিজে অর্ধপেট আহার করে খেজুর পাতার বিছানায় শুয়ে পৃথিবীতে তাঁর শেষ দিনটি পর্যন্ত কাটিয়ে গেছেন। তাঁর নিজের পরিবারের প্রতিটা সদস্যের একই অবস্থা ছিল। তাঁর কলিজার টুকরা, হৃদয়ের স্পন্দন, একমাত্র জীবিত কন্যা ফাতিমার (রাঃ) বাড়িতে দিনের পর দিন এমন বহুবার গিয়েছে যখন চুলা জ্বলেনি। সবার প্রিয় হাসান, হোসেন (রাঃ) অনাহারে বিছানায় ঘুমাতে গিয়েছেন - এমন দিনের সংখ্যা বহু।
একবার এক যুদ্ধ শেষে বিশাল অংকের একদল দাস নবীজির (সঃ) হস্তগত হলে হজরত ফাতিমা (রাঃ) পিতার কাছে নিজের জন্য একটি দাস চেয়ে বসেন। তাঁর একার পক্ষে ঘরের সব কাজ সামাল দেয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
সাধারণ পিতা হলে কী করতেন? একটার জায়গায় দশটা দিয়ে দিতেন। এবং অন্যায়ও কিছু হতো না তাতে। কিন্তু সেটা যদি করতেন, তাহলে কী কোটি কোটি মানুষের মধ্য থেকে কেবল তাঁকেই আসমান জমিনের মালিক নিজের দূত হিসেবে নির্বাচন করতেন?
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজের সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আদরের কন্যাটিকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন। কারন, সুফ্ফার লোকেরা (আহলে সুফ্ফা) তখনও ক্ষুধার জন্য খাবারতো দূরের কথা, পরিধানের জন্য পোশাকের সংকটে ভুগছে। আগে ওদের সমস্যার সমাধান, তারপরে অন্য দিকে মন দেয়া যাবে।
কথাটি বলার কারন হচ্ছে, আজকাল মসজিদে মসজিদে এসি, মোজাইক ফ্লোর, দামি টাইলস, ক্রিস্টাল শ্যান্ডেলেয়ার, বোসের সাউন্ড সিস্টেম দেখতে পাওয়া যায়। আমরা পারলে প্রতিটা মসজিদ সোনা দিয়ে মুড়ে দেই। আল্লাহর ইবাদতখানা বলে কথা!
তবে, হয়েছে কী, ইসলাম বলছে, মসজিদে ইবাদত করলে ঘরের চাইতে সাতাশগুন বেশি পুরষ্কার পাওয়া যাবে। বলা হয়নি, সেটা সাধারণ মাটির ফ্লোরের মসজিদ হলে চৌদ্দ, টাইলস ফ্লোরের মসজিদ হলে একুশ এবং শুধুমাত্র পূর্ণ লাক্সারিয়াস মসজিদ হলেই কেবল সাতাশগুন সোয়াব হবে।আল্লাহ ধনী গরিব পরোয়া করেন না। তাঁর মাটির ঘরের মসজিদে দেশের রাষ্ট্রপতির সামনে দাঁড়িয়ে পথের ভিখারিও নামাজ পড়ার অধিকার রাখে। আমাদের ইসলামের মূল বিষয়টা বুঝতে হবে - তারপরে অ্যাকশন।
আমি কোটি টাকা ব্যয় করে মসজিদ বানিয়ে ফেললাম, যেখানে চোর, বাটপার নেতারা, ব্যবসায়ীরা, ঘুষখোর আমলারা, যাদের আমরা সমাজের সম্মানিত স্থান দিয়ে থাকি - এবং যারা লোকেদের সামনে ভাল মানুষ সাজতে কেবল মসজিদে আসে - তাদের উপস্থিতি দেখে বিরাট পুণ্যের কাজ করে ফেলেছি ভেবে মনে মনে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। অথচ যে রিক্সাওয়ালা নামাজের সময়ে তাঁর কাজে বিরতি নিয়ে আল্লাহু আকবার বলে নিজের প্রভুর সামনে দাঁড়ায় - তাঁকে পাত্তাই দেইনা - এইটা ইসলামের শিক্ষা হতে বহুদূর অবস্থান করে।
যে মসজিদের আশেপাশের এলাকার মানুষ অনাহারে থাকে, সেই মসজিদ সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে ফেললেও কোন স্বার্থকতা নেই। বরং মসজিদের টাকা পয়সা তোলা উচিৎ কেবল মাত্র মসজিদ চালাবার যাবতীয় খরচ বহন করা, বিপদের জন্য সাবধানতা হিসেবে সঞ্চয় খাতায় কিছু টাকা রাখা এবং বাকিটা মানব কল্যানে ব্যয় করার জন্য।
আমার মসজিদের বাইরে শক্ত সমর্থ লোককে ভিক্ষা করতে দেখছি। আমার উচিৎ মসজিদের টাকায় তাঁকে রিক্সা কিনে দিয়ে তাঁর পরিবারকে দাঁড় করিয়ে দেয়া।
আমার মসজিদের বাইরে মানুষ অনাহারে থাকছে। আমার উচিৎ মসজিদের টাকায় তাঁদের খাওয়া খাদ্যের ব্যবস্থা করা।
আমাদের পাড়ার দিনমজুর বাবু মিয়া বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। চৌদ্দ সদস্যের বিশাল পরিবারে উপার্জনক্ষম লোক নেই। আমার উচিৎ মসজিদের টাকায় সেই পরিবারে গরু বাছুর হাঁস মুরগি কিনে দিয়ে পরিবারটিকে পথে বসে যাওয়া থেকে উদ্ধার করা।
আমার এলাকার যুবকরা বিপথে চালিত হচ্ছে। বয়ষ্করা বাড়িতে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স ঘটাচ্ছে। আরও নানান আকাম কুকাম ঘটছে। আমার উচিৎ মসজিদের টাকায় বিখ্যাত বিখ্যাত স্কলার আনিয়ে তাঁদের শিক্ষা এলাকার প্রতিটা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া।
মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়। আমি কেবল বলি আমাদের এখানকার এলাকার মসজিদের কিছু কর্মকান্ড, যদি রেফারেন্স হিসেবে দেশে কেউ ফলো করতে চান।
পুরুষ নারী উভয়ের ইবাদতের জন্য সুব্যবস্থা আছে। প্রতি ফজরের জামাতের পর কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিদিন। রমজান মাসের প্রতিটা দিন ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। ট্যাক্স সিজনে গরিব মানুষদের জন্য ফ্রি ট্যাক্স ফাইল করে দেয়া হয়। উইকেন্ড ক্লিনিকের ব্যবস্থা আছে। ডাক্তাররা স্বেচ্ছায় বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। ছেলে মেয়েদের জন্য সানডে স্কুলের ব্যবস্থা আছে। আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামিক পড়াশোনা করার চমৎকার আয়োজন। সপ্তাহিক হালাকার আয়োজন করা হয়, যেখানে জীবন কিভাবে সুন্দর করে পরিচালনা করা যায় তাঁর চমৎকার নির্দেশনা দেয়া হয়। মহিলাদের জন্য আলাদা কাউন্সেলিংয়েরও ব্যবস্থা করা হয়। যদি এমন কিছু বিষয় থাকে, যা তাঁরা কারোর সাথে শেয়ার করতে পারছেন না - সেটা তাঁরা নির্দ্বধায় আলোচনা করতে পারেন। এবং কাউন্সিলররা সবাই প্রফেশনাল, এবং অভিজ্ঞ। ইন্টারফেইথ আলোচনারও আয়োজন করা হয়। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরা মসজিদে এসে তাঁদের পয়েন্ট অফ ভিউ আলোচনা করেন। মুসলিম স্কলাররা চার্চে গিয়ে আলোচনা করেন। এর ফলে পারস্পরিক বহু ভুল বুঝাবুঝি দূর হয়ে যায়। এবং আরও অনেক কিছু চলে। মোট কথা, সামাজিকভাবে মসজিদ একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
আমাদের দেশে এর কয়টা পালিত হয়?
অথচ ইসলাম কিন্তু এই শিক্ষাটাই দেয়। একটা ক্রিস্টাল শ্যান্ডেলেয়ার বা দামি টাইলস ফ্লোরিং, বা এসির বিনিময়ে কয়েকশো পরিবারকে দাঁড় করিয়ে দেয়া সম্ভব। আমরা যদি সেটা বুঝতে পারতাম!
"অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলো চাকচাক্যময়। কোথাও কোথাও স্বর্ণের তৈরি ইমারত দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের গুলো সাধারণ হলে ইজ্জত থাকে?"
আমাদের ইজ্জত কিন্তু অর্থ বিত্তে নয় - আখলাক (স্বভাব-চরিত্রের) মধ্যে। কাজেই আমাদেরও অপব্যয় বন্ধের দিকে বিশেষ নজর দেয়াটা জরুরি। মসজিদে দান করাটা মহা পুণ্যের, এবং সেই টাকাটার সঠিক ব্যবহার করাটা মসজিদ কমিটির দায়িত্ব। তাঁরা সেটা কতখানি পালন করেন?
আমাদের দেশে গরিব রোজাদারদের ইফতারের ব্যবস্থা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের করতে হয় - ব্যাপারটা যে আমাদের কতটা লজ্জায় ফেলে দেয় - সেটা কী আমরা বুঝতে পারি? সিচ্যুয়েশনটা ঠিক যেন আমার পাঁচ বেডরুমের বাড়ি আছে, যার চারটা রুম খালি পড়ে থাকে। এবং আমার মা বাবা বৃদ্ধাশ্রমে পড়ে আছেন।
মসজিদকে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিতে চান? অবশ্যই দেয়া যাবে। কোন বিষয়ই না। তবে তাঁর আগে, নিজের সমাজের লোকেদের অন্ন বস্ত্রের ব্যবস্থাতো হোক। মসজিদের দেয়ালে রোলেক্স ওমেগা ঘড়ি ঝুলিয়ে আল্লাহকে খুশি করতে চান? ভাই, একটা এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিন, আল্লাহ বরং তারচেয়ে অনেক বেশি খুশি হবেন। হাদিসের কথা, আমার না।
ক্ষুধার্ত সন্তানের হাহাকার ধ্বনি মাথায় থাকলে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কয়জনই বা পূর্ণ মনোসংযোগ করতে পারে?
বরং কেউ যখন বুঝবে তাঁর মুসলিম ভাইয়েরা তাঁদের আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে - সেই কৃতজ্ঞতাতেই সে কাদাওয়ালা মাটিতে সিজদা দিবে, কপালে মাটি লেগে যাবে, তবু বুক নিঃসৃত পূর্ণ কৃতজ্ঞতার সাথে বলবে, সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা! Glory be to Allah My Lord, the Most High.
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১:৪৩
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×