আমরা বাংলাদেশিরা পৃথিবীর অতি বিচিত্র এক জাতি, সেটা জানেন? ডাবল স্ট্যান্ডার্ডকে আমরা একেবারে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছি। অন্যের মতামতের থোড়াই পরোয়া করি, অন্যের অবস্থানে নিজেকে ফেলে পরিস্থিতি বিবেচনা করাতো বহু দূরের ব্যাপার।
যেমন বাংলা ব্লগিং জগতে "মুক্তমনা" বেশ আলোচিত একটি টার্ম। আভিধানিক অর্থে মুক্তমনা মানে হচ্ছে যে মুক্ত মনে চিন্তাভাবনা করে। কোন ধর্ম, জাতি, বর্ণ ইত্যাদির উর্দ্ধে উঠে মুক্ত স্বাধীনভাবে যে চিন্তা করতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, দেশের বেশিরভাগ মুক্তমনার দাবিদার আসলে ভন্ড। নিজেকে মুক্তমনা ভাবলেও সেও কট্টর মৌলবাদী। ধর্মীয় মৌলবাদী যদি প্লাস ১০ হয়ে থাকে, তাহলে এইসব হিপোক্রেটরা মাইনাস ১০। জিরোর আশেপাশেও কেউ নাই। আমি জোর গলায় এই কথা বলতে পারছি কারন আমি এই জীবনে অসংখ্য জেনুইন মুক্তমনা দেখেছি, এবং আফসোস, সবগুলিই (৯৯% এরও বেশি) হয় প্রবাসী বাঙালি, নাহয় বিদেশী। দেশে যাদের জেনুইন মুক্তমনা হবার ক্ষমতা আছে, তাঁরা হতে পারেনা কেবলমাত্র নিজের ইয়ার দোস্তদের জন্য। তাঁদের মন দূষিত করতে কয়েক সেকেন্ডও সময় নেয় না।
ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারটাকেই ধরা যাক।
সুস্থ স্বাভাবিক জেনুইন মুক্তমনা হবার কথা মানবতাবাদী। ফিলিস্তিনে যখন গণহত্যা চলছে, তখন জেনুইন মুক্তমনা এই চিন্তা করবেনা যে এরা আরব, নাকি আফ্রিকান, নাকি বাঙ্গাল - এদের চোখে এরা শুধুই মানুষ। এদেরও সংসার আছে, পরিবার আছে, মরলে তাঁদের সন্তানেরাই কষ্ট পাবে বেশি। সেই স্বজনদের কথা চিন্তা করে এই সমস্ত মুক্তমনাদের বুক কেঁপে উঠবে। তখন দোষী ইজরায়েল, অ্যামেরিকা, সৌদি আরব কারোর পরোয়া না করে সে প্রতিবাদ জানাবে।
যেমন সুইডিশ নাগরিক বেঞ্জামিন লাডরা। পেশায় তিনি একজন মিউজিশিয়ান। বয়স মাত্র পঁচিশ। পথের খরচ জোগাতে নিজের স্থাবর অস্থাবর সব সম্পত্তি বিক্রি করে সুইডেন থেকে পায়ে হেঁটে ফিলিস্তিন পর্যন্ত যাচ্ছেন তিনি। চিন্তা করতে পারেন, ৩০০০ মাইল রাস্তা তিনি পায়ে হাঁটছেন! তাও আবার ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে। পথে যার সাথেই দেখা হয়েছে, তিনি তাঁদেরকে ফিলিস্তিনিদের কষ্টের কথা জানাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই তিনি লেবাননের বৈরুতের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তিনি আশাও করেননা ইজরাইলিরা তাঁকে ফিলিস্তিনি বর্ডারে প্রবেশ করতে দিবে। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা, তিনি যাবেনই।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ফিলিস্তিনে কী হচ্ছে তা নিয়ে এই সুইডিশের সমস্যা কী? মাথায় গন্ডগোল? ফেম সিকিং?
উত্তরে তিনি বলেন, "ক্ষুধার্তের কষ্ট বুঝতে তোমাকে যেমন ক্ষুধার্ত হতে হবেনা, তেমনি ফিলিস্তিনিদের কষ্ট বুঝতেও আপনাকে ফিলিস্তিনি হতে হবেনা।"
জ্বি, তিনি সাধারণ মুক্তমনা। দেশে বিরল প্রজাতি হলেও বিদেশে এমন মুক্তমনার ছড়াছড়ি। মানুষের কষ্টে তাঁদের মন কাঁদে। দেখবেন অ্যামেরিকান কোটিপতি হঠাৎ করেই হাইতির গরিব শিশুদের জন্য এতিমখানা খুলে বসে আছেন। আলবেনিয়ান নান কলকাতায় টিবি, এইডস, কুষ্ঠরোগীদের জন্য আশ্রম খুলে বসেন। কোন বঙ্গসন্তানকে দেখেছেন সোমালিয়ায় গিয়ে দুস্থদের জন্য আশ্রম খুলতে? আমরা কয়জন (প্রবাসী বাদে) নিজের দেশের সীমারেখার বাইরের মানুষদের জন্য একটা পয়সা খরচ করি?
হ্যা, অনেকেই বলবেন আমাদের নিজেদের দেশেই এত গরিব, কেন বিদেশিদের সাহায্য করবো? তাহলে ভাই নিজের দেশেই ঠিকমতন করো। সেটা করলে অন্তত এত গরিব থাকতো না এইটা গ্যারান্টি।
কথাপ্রসঙ্গে বলে ফেলি, জাকাত দেয়ার ক্যাটাগরিগুলোর একটাতে কিন্তু নব্য মুসলিম বা অমুসলিমরাও পড়েন। তাঁরা যেন মুসলিম হবার, কিংবা মুসলিমদের সাথে পরিচিত থাকার সুবিধা নিতে পারেন, সেইজন্যই এই ক্যাটাগরি। আমরা কী করি? "মুসলমানদের" মধ্যে সস্তা শাড়ি লুঙ্গি বিতরণ করে পদদলিত করে মানুষ মেরে ধর্মোদ্ধার করি।
যাই হোক, এইসব মানবশ্রেষ্ঠদের অন্তরে যারা দাগ খোঁজার চেষ্টা করেন, তাদের আসলে নিজেদেরই অন্তর কালো বলেই এমনটা করেন।
প্রাগে ইজরায়েলি এম্বেসির পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে ওরা বেঞ্জামিনকে বম্ব স্কোয়াড দিয়ে আটক করিয়ে সন্ত্রাসী অভিযোগ এনে চেকাপ টেকাপ করেছে। এতে তাঁর দুই ঘন্টা সময় নষ্ট ছাড়া ইজ্রায়েলীরা আর কিছুই করতে পারেনি। লাভের লাভ হলো এই যে তিনি তখন বিখ্যাত হয়ে গেলেন। ক্রোয়েশিয়ার সাংসদ তাঁকে নিমন্ত্রণ করে তাঁর কথা শুনেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এখন বিখ্যাত ব্যক্তি। তাঁর সাথে কথা বলতে, দেখা করতে মানুষ এখন লাইনে দাঁড়ায়।
এই হচ্ছে বিদেশী মুক্তমনা।
বাংলাদেশী (সাথে ভারতীয় বাংলারও অনেকে আছেন) কিছু মুক্তমনাকে দেখলাম এই ঘটনায় ফিলিস্তিনিদেরই দোষ দিচ্ছে। সব দোষ হামাসের। ইজরায়েল নিজের দেশ রক্ষার জন্য এমন করেছে। ইত্যাদি ইত্যাদি সব হাস্যকর কথাবার্তা।
এদের পোস্টগুলো থেকে দুইটা ব্যাপার স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে, পড়াশোনা না করেই এরা লিখতে বসে যায়। আহাম্মকের আহাম্মকীপনা। নতুন কিছু না।
দুই, ইসলামবিদ্বেষে এরা কট্টরভাবে মৌবাদী। যেহেতু মুসলিম মরছে, কাজেই ঠিকাছে।
এই যে সেদিন বলেছিলাম না ক্যানাডায় এক পার্ভার্টের গাড়ি হামলায় একদল মূর্খ "মুসলিমরা হামলা করেছে, ট্রুডোরের উচিৎ শিক্ষা হয়েছে" বলতে বলতে মুখে ফ্যান তুলেছিল, এবং যখন হামলাকারীর নাম ও কারন প্রকাশ হলো, তারপর নিজেদের থুথু গিলে খেয়েছিল? এখানেও তাই হচ্ছে। ইজরায়েলে একটা ঢিল পড়লেও ফলাও করে প্রচার করা হয়, এদিকে ফিলিস্তিনকে মোরব্বা বানিয়ে ফেলছে, কোন বিকার নেই।
ট্রাম্পের মেয়ের জামাই যেমন বলে, "ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ কেবল সমস্যাই বাড়ায়, কমায় না।"
কিংবা সৌদি প্রিন্স ফাঁকা বুলি আউড়ে, "আলোচনা না করলে চুপ থাকুন।"
তখন প্রশ্ন উঠে, কী নিয়ে আলোচনা করবে সেটাও আপনারাই বলে দেন? বাঙালি মুক্তমনারা হয়তো জানেনা যে ফিলিস্তিনিরা সেই ১৯৮৮ সাল থেকেই বলে আসছে ইজরায়েলের পাশে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে তাঁরা রাজি। ইজরায়েলই নিজেদের সীমান্তরেখা মেনে চলছে না। কেউ কেন ইজরায়েলকে প্রশ্ন করছে না যে "তোদের সমস্যাটা কী? এত ভূমি খাই খাই স্বভাব কেন তোদের?"
৭০ বছর আগে সাড়ে সাত লাখ মানুষকে ওরা বাস্তুচ্যুত করেছে। সেই অঞ্চল থেকে যেখানে কয়েক শতাব্দী ধরে তাঁদের আবাস। এখন যদি রোহিঙ্গারা আমাদের চিটাগংবাসীকে অঞ্চলছাড়া করে, তখন এরা কী বলবে? তাহলে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে এই হিপোক্রেসি কেন?
আর কথা উঠে হামাসের। সব দোষ হামাসের। আরে, হামাসতো জন্মেছে সেই ১৯৮৭ সালে, তাহলে এর আগে চল্লিশটা বছর ধরে ওরা কোন যুক্তিতে ফিলিস্তিনি হত্যা করেছে? হামাসকেতো খোদ ফিলিস্তিনিরাও পছন্দ করেনা। এই যে ট্রাম্পের তোতাপাখি রাজ শাহ বলছে হামাসকে এই ষাট মৃত্যুর দায়িত্ব নিতে হবে, সেই কার্টুনকে কেউ জানায়নি যে এইটা হামাসের সম্মেলন ছিল না? নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে এইভাবে সশস্ত্র হামলা কোন যুগের সভ্যতা? সাথে মিডিয়া কর্মীদের উপরও? ড্রোন থেকে মিডিয়াকর্মীদের উপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ভিডিওতো সব জায়গায় ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ইহা এডিটিং নয় ভাইয়া, সত্য ঘটনা।
এ যেন পাঞ্জাবের সেই জালিয়ানওয়ালাবাগ ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। সেই ঘটনাই ভগৎ সিংয়ের মতন বিপ্লবীর জন্ম দিয়েছিল। ফিলিস্তিনেতো প্রতিদিনই জালিয়ানওয়ালাবাগ হচ্ছে। আল্লাহ মালুম এইসব ঘটনা কার কার জন্ম দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি যারা ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন, তাঁদের সবাই সন্ত্রাসী! বুলেট দিয়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে, সব দেশরক্ষী। সাড়ে সাত লাখ মানুষ ঘর ছেড়ে দিল। সহজ লজিক কী বলে? ইজরায়েল চুমাচাটি দিয়ে বিদায় বলেছে, ওরাও বিদায় নিয়েছে? The Irgun লিখে ইন্টারনেট একটু ঘাঁটাঘাঁটি করুন। সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী কারা জন্ম দিয়েছে তাহলে কিছুটা জানতে পারবেন।
পশ্চিমা বিশ্বই ছিঃছিঃ করছে ইজরায়েলের কর্মকান্ডের। সাথে অ্যামেরিকার নির্লজ্জতার। সাথে সৌদি আরব ও অন্যান্য আরবদেশগুলোর ফাজলামির। অ্যামেরিকার মিত্র দেশগুলোর কূটনীতিকরাই বর্জন করেছেন এই অনুষ্ঠান। এমনকি অ্যামেরিকান নাগরিক, ইহুদি গোষ্ঠীগুলোই ইজরায়েলের বিরুদ্ধাচরণ করছেন। সেখানে আমাদের দেশেরই কিছু মহামানব জ্ঞানসাগরগণ মুক্তমনের পরিচয় দিতে ইজরায়েলের সমর্থন করছেন।
তিন হাজারের অধিক নিরস্ত্র মানুষ আহত, এবং আটষট্টির অধিক, যেখানে অনেক শিশু ও পঙ্গুর নামও আছে, নিহতের ঘটনা যদি আপনার মনকে নাড়া দিতে না পারে, তাহলে আপনার মানব হিসেবে জন্ম নেয়াটা একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরে নিতে পারেন। এই "মানবতাবাদী" মুখোশ পরে হিপোক্রেসি দেখিয়ে বিরক্তির কারন হবেন না প্লিজ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


