শুরুর দিকে বাংলাদেশে Rab দারুন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীগুলোকে ধরে ধরে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলছিল। বয়স কম ছিল, বুঝতাম কম, তাই এই ধরণের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও ভাল লাগতো। চোখের সামনেইতো দেখছি যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে বেড়ায়, যাদের মৃত্যুদন্ডই প্রাপ্য, খুন জখম করে যারা দিনের পর দিন পার পেয়ে গেছে, তাদেরই হত্যা করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার করা হলে দেখা যেত মন্ত্রীর ফোন কলে মুক্তি পেয়ে যেত।
সেই সময়টাতেই দেখেছি এলাকার ছিচকা সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে বস গড ফাদারগুলোর চেহারাতেও আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর নামের আতঙ্ক।
প্রতিটা ক্রসফায়ার শেষে Rab তখন একটি অতি দুর্বল স্ক্রিপ্টের গল্প শোনাতো। মুখস্ত তোতাপাখির মতন বলে বেড়াতো, "আমরা অপরাধীকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে বেরিয়েছিলাম। আগে থেকেই ওঁৎপেতে থাকা সন্ত্রাসীরা আমাদের দেখে গুলি চালায়। আমরাও পাল্টা গুলি চালালে ক্রসফায়ারে অমুক নিহত হন।"
এমন ফাঁকা গল্প শুনে কতবার হেসেছি।
তারপর এখানে ওখানে অভিযোগ আসতে শুরু করলো Rab এর হাতে নির্দোষ ব্যক্তিও মরতে শুরু করেছে। তখনই প্রথম নড়েচড়ে বসলাম। আরে, এইটা কেমন কথা? নির্দোষ ব্যক্তি কেন মরবে?
আমার এক আত্মীয় পুলিশে ছিলেন। একবার থানায় দুইটি ছেলেকে খুনের স্বীকারোক্তিতে বাধ্য করা হচ্ছিল। বেদম প্রহারে ছেলে দুইটি স্বীকার করে নেয় তাঁরা খুন করেছিল। কোর্টে চালান করে দেয়া হয়, এবং তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল কখনও খোঁজ নেয়া হয়নি। আমার বয়স তখন পাঁচ ছয় হবে। পুলিশ কর্মকর্তা সেই আত্মীয় জানিয়েছিলেন যে আসলে খুন করেছিল কোন এক মন্ত্রীর আত্মীয়। মন্ত্রীর হুকুমেই random যুবককে খুনি সাজিয়ে মামলার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবং যুবকগুলোও পুলিশি মার সহ্য করতে না পেরে দায় স্বীকার করে নিয়েছে।
Rab এর কর্মকর্তাগণওতো বাংলাদেশী। তাঁদেরও ঐ মন্ত্রী এমপিদেরই নির্দেশ পালন করেন।
এক নিমিষেই আমার বয়স বেড়ে গেল। তখন থেকেই বুঝে গেলাম ক্রসফায়ার কোন অবস্থাতেই সমাধান নয়। যদি সন্ত্রাসী দোষীও হয়ে থাকে, তারপরেও তাকে ধরে এনে সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে, তার সাথে আর যে যে জড়িত সবাইকে কাঠ গড়ায় দাঁড় করাতে হবে। ধরে ধরে মেরে ফেললে সেই চেইনটাই নষ্ট হয়ে যায়।
বোলতার চাক ধ্বংস করতে হলে রানীকে হত্যা করতে হয়। আরও সহজ উদাহরণ দেই। বিষবৃক্ষের পাতা ছিড়ে ফেললে কিছুই হয়না। নতুন পাতা ঠিকই গজায়। শেকড়ে আঘাত করতে হয়, তো গিয়ে বৃক্ষের মূলোৎপাটন ঘটে।
গডফাদারদের আড়ালে রেখে চুনোপুঁটিদের হত্যা করে বেকুব জনসাধারণকে খুশি করা কোন সমাধান না। এই গডফাদারগুলিই আবার নতুন চুনোপুঁটি ধরে তাদের ব্যবসা ঠিকই চালু রাখবে।
এক বড় ভাই সেই শুরু থেকেই নিজের ফেসবুক ওয়ালে এই ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করে আসছিলেন। দেখা যেত পাঁচ ছয়টা লাইক ছাড়া সেই পোস্ট কেউ পড়তো না। অনেকেই ধরে নিয়েছিল প্রবাসী বাঙালির আলগা মানবতাবাদী পোস্ট। দরদ উথলায় পড়ছে। আমার ভাগ্য ভাল আমি সেই পাঁচ ছয়জনের একজন ছিলাম। এবং আমিও প্রবাসী। না ভাই, আমাদের প্রবাসীদের আলগা দরদ উথলায় পড়েনা। আমরা সত্য মিথ্যার পার্থক্য সহজে করতে পারি। পয়েন্ট অফ ভিউর পরিবর্তনের কারণেই এমনটা ঘটে।
আজকেতো দেখাই গেল ক্রসফায়ারের ক্ষতিকর দিকটা।
আমাদের বিচার ব্যবস্থা ভাল নয়? সমাধান হচ্ছে বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। একটা দুর্বলতা ঢাকতে নিজেরা কেন বেআইনি পথ বেছে নিব?
এই যে একরাম নামের লোকটা মারা গেলেন, অডিও রেকর্ড শোনার পর এখন কী হাহাকার চারদিকে! বুঝতে পারছেন এখন যাদের আপনদের বিনা অপরাধে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়, এবং আপনারা সবাই খুব ক্যাজুয়ালি বলে দেন "দুয়েকটা কোলাটেরোল ড্যামেজতো হবেই," বাস্তবে বিষয়টা কতটা নির্মম? এই যে মেয়েগুলি তাঁদের বাবা হারালো, এরা কী আর ফিরে পাবে তাঁকে? বাংলাদেশের মতন থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির থার্ডক্লাস সমাজ ব্যবস্থায় স্বামীহীন এক মহিলার দুই মেয়েকে নিয়ে একা সংসার করার যে দুর্বিষহ জীবন, এর দায়িত্ব কী মন্ত্রী নিবেন? যিনি কিছুদিন আগেই জাস্টিফাই করেছিলেন এই ক্রসফায়ার হত্যাকাণ্ডের? বিদেশ হলে বহু আগেই এমন মন্ত্রী পদত্যাগ করে ফেলতেন। আমাদের দেশের ইনাদের আবার লজ্জাশরম কম। কোন না কোন লেইম এক্সকিউজ দিয়ে গলাবাজি করবে, এবং সেটা শোনার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
এই অডিও আজকে অসুস্থ করে দিল সবাইকে। চেনা জানা যেই শুনেছে সবাই ডিপ্রেশনে চলে গেছে।
আমরা একটা গ্রেট ডিপ্রেসড সমাজে বাস করছি।
আমাদের সদ্বুদ্ধির উদয় ঘটুক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

