somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষের লোভ ও ঘৃণার প্রতিষেধক কী?

০৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ২:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দিল্লিতে মুসলিম মরছে, এর আগে মরছিল কাশ্মীরে।
পুলিশ এবং উগ্রবাদী জনতা এক হয়ে হত্যা করছে মানুষকে।
আরও মরবে।
রাজধানী শহরেরই এই অবস্থা, গোটা ভারতে কী ঘটছে কে জানে! গরুর প্রাণের চেয়ে সেখানে মানুষের প্রাণের মূল্য কমে গেছে!
যতদিন ওদের সরকার ওদের আস্কারা দিয়ে যাবে, অবশ্যই মুসলিম মরবে। তারপরেই কোপ পরবে খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, দলিত, শিখ, সবার ওপর। সবাই মরতে থাকবে। ওদের এক সংসদ যথার্থই বলেছেন, "তোমরা ততদিন হিন্দু থাকবে যতদিন মুসলিমরা ভারতে আছে। এরপরেই তোমরা হয়ে যাবে ব্রাক্ষ্মন, ক্ষত্রিয়, কায়স্থ, শুদ্র, দলিত ইত্যাদি।"
এর প্রতিবাদে অটল হিমালয়ের মতন বুকচিতিয়ে দাঁড়িয়েছে বহু সংখ্যক ভারতীয় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সাধারণ, কিন্তু বাস্তবে অসাধারন নরনারী। নামাজের সময়ে মানব ঢাল তৈরী করে রক্ষা করছেন তাঁদের প্রতিবেশীদের। তাঁদের অধিকার রক্ষায় কেউ কেউ প্রাণও দিয়েছেন। তাঁরা জানেন, যে রক্তে রঙিন হচ্ছে তাঁদের রাজপথ, সে রক্তের মালিক "হিন্দুস্তানী।" ও হিন্দু, নাকি মুসলিম, নাকি ঈসায়ী - কিচ্ছু যায় আসেনা।
ওরা যদি না থাকতো, তাহলে গান্ধী-নেতাজির অসাম্প্রদায়িক ভারতের রাজধানীর পার্শ্ববর্তী নদী যমুনায় রক্তের বান ডাকতো।

বহু আগে থেকে মরছিল, এখনও মুসলিম মরছে মধ্যপ্রাচ্যে। এইতো সেদিন, জুম্মাবারে ইয়েমেনে মসজিদে ড্রোন দিয়ে বোমা হামলায় নিহত হলেন তিরাশিজন মুসলিম। এক আঘাতেই তিরাশি জন! কারা মারলো? ক্ষমতালোভী আরেকদল মুসলিম।
আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছিলেন, তোমাদের সম্পর্ক যেন এক দেহের মতন হয়। এর একটি অঙ্গে আঘাত এলে যেমন পুরো শরীর ব্যথা টের পায়, তেমনি পৃথিবীর অপর প্রান্তের মুসলিমের কষ্ট যেন পুরো উম্মাহ অনুভব করে।
আমরা মুসলিমরা আমাদের নবীকে (সঃ) কখনই সিরিয়াসলি নেই না। আমাদের দৌড় ঈদে মিলাদুন্নবীর নামে একটা উৎসব পালন করে বিরানি মাংস খাওয়া পর্যন্তই।
যদি তাঁকে আসলেই নবী হিসাবে মানতাম, যদি তাঁর কথা মেনে চলতাম, তাহলে আজকে আমার ভাইয়ের উপর বোমা ছোড়ার আগে নিজে শতবার মরতে রাজি হতাম। যেমনটা করেছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রাঃ)। আলী (রাঃ) নিজের দুই পুত্রকে তাঁর পাহারায় নিযুক্ত করে বলেছিলেন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি দিতে। উসমান বলেছিলেন, "আমি চাইনা কোন মুসলিমের বিরুদ্ধে প্রথম ওঠা তলোয়ার আমার হোক!"
ওদের হাতেই তাঁকে শহীদ হতে হয়।

কিসের লোভ? কিসের ক্ষমতা? পুরো পৃথিবীর মালিক হয়ে গেলেও মৃত্যুর সময়ে সাড়ে তিন হাত ভূমির বেশি স্থান আমার প্রয়োজন হবেনা। পুরো পৃথিবী সমান ঐশ্বর্য্য, বা তার দশগুন একশোগুন, হাজারগুন সম্পত্তির বিনিময়েও মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবো না। তারপরেও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব, পৃথিবীর নিকৃষ্টতম আচরণ করে আসছে। বোমায় ছিন্নভিন্ন হওয়া দেহটা কারোর বাবা ছিল, ইট দিয়ে মাথা থেতলে বুকের উপর লাফিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা মানুষটিরও কোন প্রেমিকা ছিল, সে ছিল কারোর বুকের ধন।
এই সহজ বিষয়টাই আমরা কেউ বুঝতে পারিনা। দুই সন্তানের লাশ বহনকারী পিতার চেহারা দেখে কারোর কী বুক কেঁপে উঠেনা? কবে আমরা মানুষ হবো?

চীনে এতদিন উইঘুরের মুসলিমরা মারধরের শিকার হয়েছে। দাড়ি রাখার কারনে মার খেয়েছে, নামাজ পড়ার জন্য মার খেয়েছে, বোরখার জন্য, রোজার জন্যও মার খেয়েছে।
এখন করোনা ভাইরাসের কারনে চীনারাও বাইরের পৃথিবীতে মারধরের শিকার হচ্ছে।
নিউইয়র্কের চায়না টাউনে কোন ব্যবসা নেই। যেসব রেস্টুরেন্টে খেতে হলে আগে বুকিং দিতে হতো, সেখানে এখন মাছিও ঢুকে না। পুরো আমেরিকা জুড়ে চীনা রেস্তোরা ও গ্রোসারি স্টোরগুলোও ফাঁকা। ওদের অর্থনীতি একদম ধসে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে স্টক মার্কেটেও। চায়নার ইকোনমির উপর গোটা বিশ্ব নির্ভরশীল, এখন সবাই বুঝতে পারবে এর ভয়াবহ প্রভাব। শুনেছি বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি ধসে যেতে পারে বিকল্প পথ না বেরুলে। আমাদের অর্থনীতি পুরোটাই এই শিল্পের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। মানে হচ্ছে, আমাদের মেরুদন্ড ভেঙে যাওয়াটা কেবলই সময়ের ব্যাপার।
করোনার কারনে চাইনিজদের সাথে অনেকেই মেলামেশা বন্ধ করে দিয়েছেন। ছোঁয়াচে রোগ থেকে বাঁচার জন্য সাবধানতা এক বিষয়, আর অহেতুক হিংসাত্মক রেসিজম সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক দেশে চাইনিজরা রাস্তাঘাটে হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছেন। নিউ ইয়র্ক, লস এঞ্জেলেসের মতন আধুনিক শহরগুলোতে চাইনিজদের উপর মৌখিক গালাগালি থেকে শুরু করে মারধর, কোন কিছুই থেমে নেই। এক বুড়ো চাইনিজের ভিডিও দেখলাম, লোকজন পেটাচ্ছে। হয়তো এই লোকটা গত দশ বছরেও চায়না যায়নি, করোনার সাথে এর দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু যেহেতু চীন থেকেই ভাইরাসটি ছড়াতে শুরু করেছে, তাই ওকেও পেটাও! মহাবিপদে মানুষের মাথা নষ্ট হয়ে যায়, আমাদের সবার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে।
নাইন ইলেভেনের পরে এমনকি অতি সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার পরে মুসলিমদের উপর এমন গজব নেমেছিল। লোকজন বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাতো, অফিস, স্কুল, বাজার সর্বক্ষেত্রে মুসলিমরা হ্যারাস্ড হতো। হিজাবি নারীর গায়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে, মসজিদে গুলি চালানো হয়েছে, পুড়েওছে একাধিক মসজিদ; সব ঘটনাই গত চার বছরের কম সময়ে ঘটেছে।
নর্থ ক্যারোলাইনায় বাড়ির ভিতরে ঢুকে মুসলিম দম্পতিকে তাঁদের শ্যালিকাসহ গুলি করে হত্যা করেছিল এই ২০১৫ সালে। তাঁদের জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য থেকে দল বেঁধে মুসলিমরা উড়ে এসে তাঁদের জানাজায় সামিল হয়েছিলেন। ঘটনাটি কয়জনের মনে আছে জানিনা।
মুসলিমদের মতন দেখতে বলে শিখরাও মারের শিকার হয়েছে বহুবার। বাধ্য হয়ে ওরা লিখে রাখে, "প্রাউড টু বি এ শিখ!" দুই ভারতীয় হিন্দু নাগরিককে মুসলিম সন্দেহে গুলি করে হত্যার ঘটনাও ঘটে এখানে।

কথা ছিল, মানব জাতি এক হয়ে যেকোন দুর্যোগ মোকাবিলা করবে। সবাই মিলে মিশে গেলেই কিন্তু ঝামেলা চুকে যেত। চীন, আমেরিকা এক হয়ে মিয়ানমারকে একটা ধমক দিলেই ওরা জ্বি হুজুর বলে রোহিঙ্গাদের সম্মানে নিজেদের দেশে থাকতে দিত। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন এক হয়ে ধমক দিলেই মধ্যপ্রাচ্যে সব ধরনের গন্ডগোল থেমে যেত। কাতারি আরব, সৌদি আরব, ইয়েমেনি আরব, ইরকি আরব আবার কী? সব ফাজলামি বন্ধ!
কিন্তু আমরা আমরাই বিভক্ত।
এখন যদি করোনার ভ্যাক্সিন আমেরিকা আবিষ্কার করে, তাহলে লোকে বলবে, "আগেই বলেছিলাম, মার্কিনিরাই ছড়িয়েছিল।"
এমন গুজব কিন্তু লোকে বিশ্বাসও করছে।
আবার সেদিন আমার এক কলিগ বললেন, তিনি "বিশ্বস্ত সূত্রে" খবর পেয়েছেন, ভাইরাসটি চীনের ল্যাব থেকে লিক হয়েছে। ওদের কোন দূরভিসন্ধি ছিল, সেটা নিজেদের উপরই এসে পড়েছে। লোকজন গসিপ ম্যাগাজিন এত খায় কিভাবে?

যাই হোক, প্রশ্ন হচ্ছে, এইসবের শেষ কবে?
উত্তর হচ্ছে, এইসবের শেষ নেই।

করোনা ভাইরাসে কয়জনই বা মরেছে? আমাদের লোভ ও ঘৃণার ভাইরাসে এর বহুগুন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আমরা বুঝেও না বুঝার অভিনয় করে যাই। এই যে কিছুদিন আগেই ঢাকায় অগ্নিকান্ডে শেষ হয়ে গেল একটি পরিবার, সেখানে নাকি বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে বাইং হাউজ ছিল। আবাসিক ফ্ল্যাট বাড়ির নিচে কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম ইত্যাদি কাদের কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে? পুরান ঢাকায় এত ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরেও
আমাদের বিন্দুমাত্র আক্কেল আসেনা। তবু আমাদের টাকা লাগবে। মানুষ মরলে মরুক, আমার কী?

করোনা বা যেকোন ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার হবে দ্রুত। মানুষের লোভ ও ঘৃণার প্রতিষেধক কী?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ২:১০
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঙালি মুসলমান সম্বন্ধে ChatGPT র মূল্যায়ন !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:০৯

ChatGPT কে "বাঙালি মুসলমান বনাম প্রকৃত ইসলাম" এর উপর একটা প্রবন্ধ লিখতে বলেছিলাম, কয়েক সেকেন্ডে যা লিখেছে হুবুহু তুলে দিলাম ! আপত্তি থাকলে চ্যাটজিপ্ট দায়ী !!

বাংলার মুসলমান সমাজকে দেখলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৩২



অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরাগের বুকে আমার ছোট ভাইদের লাশ ২০২৪-এর উপহার ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৩



২০২৪ আমাদের নতুন করে শত্রু মিত্র চিনতে শিখিয়েছে। আমি কোনো করুনা, সান্ত্বনা কিংবা বিচারের দাবি নিয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র পোস্ট লিখতে চাই না।শুধু সময়ের স্বাক্ষী হিসেবে একটু আচর কেটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম গেল ছালাও গেল

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩


আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×