বিশ্বে মহামারী ছড়িয়ে গেছে। অতীতেও এমনটা হয়েছিল, ভবিষ্যতেও হবে। এইটাই দুনিয়ার নিয়ম। এই নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, আমি নিজেও লিখেছি। তবে ১০০% খাঁটি মুসলিমের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের রেস্পন্স কেমন হওয়া প্রয়োজন, সেইটা লেখা হয়নি। আজকে সেটাই করা যাক। কারোর দ্বিমত থাকলে আওয়াজ দিতে পারেন। কিন্তু অবশ্যই ভদ্রতা বজায় রেখে।
১. বিনীত হওয়া।
মানুষ হিসেবে আমাদের অহংকার প্রচুর। আমরাই একমাত্র প্রাণী যারা জঙ্গল থেকে উঠে এসে সভ্যতার পাহাড় গড়েছি। গোটা বিশ্বতো এখন আমাদের হাতের মুঠোয় এসেছেই, চন্দ্রজয়ের ঘটনারও এখন অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। মঙ্গলে আমাদের যান ছুটে বেড়াচ্ছে। গোটা সৌরজগৎই দ্রুত আমাদের নাগালে চলে আসবে। এই পরম শক্তিশালী, দারুন ক্ষমতার অধিকারী হবার পরেও আমরা সামান্যতম, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর এক জীবাণুর কাছে পরাজিত হয়ে যাই। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কেউই এখন পর্যন্ত কিছু করতে পারছে না। একটা সময়ে হয়তো ঠিকই ওষুধ আবিষ্কার হবে, কিন্তু ততদিনে হাজার হাজার মানুষ মারা যাবেন। অতএব, আমাদের প্রতিবারই নিজেদের মনে করিয়ে দিতে হবে, আমাদের অহংকারের কোনই অধিকার নেই। বরং বিনত হয়ে নিজের কাজ করে যাওয়াই আমাদের জন্য ভাল।
২. দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে, মৃত্যু যে আমাদের জীবনের পরম বাস্তবতা, সেটাই অনুধাবন করা।
যৌবনে, বিশেষ করে সুস্থ থাকতে, আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে একদিন আমাদের মৃত্যু বরণ করতেই হবে। আমাদের চরম অনিশ্চিত জীবনে মৃত্যুই একমাত্র নিশ্চয়তা, কিন্তু তারপরেও আমরা প্রায়ই তার কথা ভুলে যাই। এর ফলে আমরা প্রায়ই সীমালঙ্ঘন করি। ভাই হয়ে ভাইয়ের গলায় ছুরি চালাই সামান্য কিছু টাকার লোভে। আজকের পত্রিকায় পড়লাম তিরিশ লাখ টাকার বিনিময়ে পিতা নিজের কন্যা হত্যার অনুমতি দিয়েছে, যেখানে মা নিজেও ঘটনাটা জানতো। বাংলাদেশে ঘটেছে এই ঘটনা। আমেরিকায়ও প্রায়ই এমনটা ঘটে যে ইন্সুরেন্সের টাকার লোভে স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে, সন্তান বাবা মাকে খুন করে ফেলেছে। এরা ভুলে যায়, দুইদিন পরে তাদেরও মরতে হবে। পুরো পৃথিবী সমান ঐশ্বর্য্যও তখন কাজে আসবে না। কাজেই, ভালোয় ভালোয় নিজের ও অন্যের ইহকাল কাটিয়ে দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৩. দুঃখের সময়ে যেমন, তেমনই সুসময়েও মানুষের কুৎসিত রূপটা বেরিয়ে আসে। যেমন, আমার কোন আত্মীয় হয়তো এক সময়ে আমার মতোই গরিব ছিলেন। একদিন তিনি ধনী হয়ে গেলেন, কিন্তু আমার অবস্থা যা ছিল তাই রইলো। তিনি দামি গাড়িতে চড়েন, আমি পায়ে হাঁটি। এখন তাঁর সুসময় চলছে, এখন তিনি মনে মনে ভাবতে শুরু করছেন তিনি আমার চেয়ে উত্তম। এই ব্যাপারটাই গোটা পৃথিবীজুড়ে ঘটছে। সাদা চামড়ার লোকেরা ভাবছে তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। কালোদের মানুষই গণ্য করছে না। ধনীরা ভাবছে গরিবরা কীটপতঙ্গতুল্য। ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে মারামারি কাটাকাটিতো চলছেই। এখন করোনা, এর আগে ইবোলা, সার্স, এইচআইভি ইত্যাদি ভাইরাস এসে প্রমান করে দেয় প্রকৃতি কোন বর্ণপ্রথায় বিশ্বাসী নয়। কেউ শ্বেতাঙ্গ বিলিওনেয়ার সেলিব্রেটি হলেই এইসব রোগ থেকে বাঁচতে পারবে না। জীবাণু তারও ততটাই ক্ষতি করবে যতটা একজন অভুক্ত, হাড্ডিচর্মসার, সোমালিও কৃষ্ণবর্ণ দরিদ্রের শরীরে করবে। আল্লাহর চোখে সেই শ্রেষ্ঠ যার তাকওয়া (তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস) শ্রেষ্ঠ। এতে গাত্রবর্ণ, ঐশ্বর্য্য, জাত বা পার্থিব কোন কিছুই প্রভাব ফেলে না।
৪. পৃথিবীটা অস্থায়ী ঠিকানা। এখানে অবস্থানকালে কেউ সম্পদশালী হলেই ধরে নেয়ার উপায় নেই যে আল্লাহ তাঁর উপর তুষ্ট, তেমনি কেউ নিঃস্ব হলেও ধরার উপায় নেই আল্লাহ তাঁর উপর রুষ্ট। সবকিছুই নির্ভর করবে আপনার প্রতিক্রিয়ার উপর। যেমন, আজকে আপনাকে আল্লাহ ধনী বানিয়ে পাঠালেন, আপনি যদি অহংকারী হয়ে যান, তাহলে এই সম্পদই আপনার গজবের কারন হবে। এবং আপনি যদি বিনীত হন, তাহলে এটিই আপনার উপর রহমত হয়ে ঝরবে। তেমনই, কেউ রোগাক্রান্ত হলেই যে ধরে নিব তার উপর আল্লাহর আজাব এসেছে, এমনটা ভুল। হাদিসে আছে, এইসব মহামারী কারোর উপর গজব, কারোর উপর রহমত। ব্যাপারটি একদম তাই। আমি অসুস্থ হলে এইটা ভেবে নেয়ার কিছু নেই যে আমার উপর রুষ্ট হয়েছেন বলেই আল্লাহ এমনটা করেছেন। আমাদের ধৈর্য্যশীল হতে হবে। রোগমুক্তির যাবতীয় প্রচেষ্টা শেষে আল্লাহর ইচ্ছের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আমাদের প্রতিক্রিয়া মুসলিমের মতন হতে হবে।
৫. যেকোন দুর্যোগে যেকোন মুসলিমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিৎ এই যে তাঁকে বুঝতে হবে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন আল্লাহ, এবং আল্লাহ কখনই কারোর খারাপের জন্য কিছু করবেন না। কারোর মৃত্যুও যদি হয়, তাঁকে বুঝতে হবে, আখিরাতে নিশ্চই ভাল কিছু আছে বলেই ইহকালের সফর এখানেই শেষ হয়েছে। বুঝাতে পারছি?
এই মহামারীর ফলে লাভটা কি হয়েছে? গোটা বিশ্বের মানুষ জাতি বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে লোকজন চীনে ছুটে যাচ্ছেন আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে। যারা যেতে পারছেন না, তাঁরা গ্লাভস, মাস্ক থেকে শুরু করে নানান সাহায্য পাঠাচ্ছেন। গোটা বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দিন রাত এক করে দিচ্ছেন মানবজাতিকে জিতিয়ে দিতে। এত ঐক্য আমাদের মাঝে কখনও থাকে? না। সুখের সময়ে আমরা একজন আরেকজনকে মারতে বোমা ছুরি। এইসব ব্যাপারই আমাদের বুঝতে হবে।
৬. ইসলামে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঈমানের অঙ্গ হচ্ছে "আল্লাহর কদরে" বিশ্বাস রাখা। মানে, আল্লাহ যার জন্য যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই হবে, এই বিশ্বাস রাখা। এইসব ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। ঈমান তাজা হয়।
যেমন, যে ডাক্তার সবার আগে এই রোগ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করেছেন, তিনিই মারা গেছেন। তিনিতো হাতে পায়ে গ্লাভস, মোজা পড়তেন, চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন, তারপরেও তাঁর কদরে লেখা ছিল তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েই মারা যাবেন। অথচ কোটি কোটি মানুষ খোলা আকাশের নিচে বাস করছে, খাওয়া খাদ্যে কোন নিয়ম শৃঙ্খলা নেই, গা ঘেষাঘেষি চলছে, চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করছে, অথচ তাঁদের কিছু হচ্ছেনা। এটিই আল্লাহর কদর, আমি যদি বিশ্বের সুরক্ষিত দুর্গেও বসে থাকি, তারপরেও সেটিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবো না। আবার এর অর্থ এও না যে আমি সব কিছু ছেড়ে গায়ে ফু দিয়ে বেড়াবো। আমাকে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে যাতে দুর্যোগ এড়ানো যায়, বাকিটা আল্লাহর হাতে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় তেড়ে আসছে, আমাকে বলা হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে। আমি গেলাম না। উল্টো বললাম, আল্লাহ বাঁচালে বাঁচাবেন। একে ঈমানদার বলেন, বরং মূর্খ বলে। উমারের (রাঃ) সময়ে সিরিয়ায় ভয়াবহতম মহামারী দেখা দিয়েছিল। পঞ্চাশ হাজারের উপরে মুসলিম সেই দুর্যোগে মারা গিয়েছিলেন। খলিফা যাচ্ছিলেন সেই অঞ্চলেই, কিন্তু মাঝপথে এই সংবাদ আসায় তাঁকে থামতে হয়। আলোচনা শেষে হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা মদিনায় ফেরত যেতে সিদ্ধান্ত নেন। এক সাহাবী বলেন, "হে উমার! আপনি কী আল্লাহর কদর থেকে পালানোর চেষ্টা করছেন?"
জবাবে আমিরুল মুমিনীন বলেন, "না। বরং আমরা আল্লাহর কদর থেকে পালিয়ে আল্লাহর কদরের দিকেই ধাবিত হচ্ছি।"
মানে হচ্ছে, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, এটা আল্লাহর কদর, এবং আমাদের যা পরিণতি হবে, সেটাও আল্লাহর কদর। সূরা তাওবাহর একান্ন নম্বর আয়াতে এটিই আল্লাহ বলেন, "আপনি বলুন, আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছবে না, কিন্তু যা আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন; তিনি আমাদের কার্যনির্বাহক। আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।"
এই আয়াতটি দোয়া হিসেবে প্রতিদিন আমাদের পাঠ করা উচিৎ। দুর্যোগের দিনেতো অবশ্যই।
সাথে নবীর (সঃ) একটি হাদিসও জুড়ে দেয়া যাক। এক সাহাবী জানতে চান, "উট থেকে নেমে নামাজ পড়ার সময়ে আগে উট বাঁধবো? নাকি উট না বেঁধেই নামাজে দাঁড়াবো?"
উল্লেখ্য, উট অতি স্বাধীনতাপ্রিয় প্রাণী। সুযোগ পেলেই দড়ি ছিড়ে পালায়। একে না বেঁধে নামাজে দাঁড়ালে নামাজ শেষে দেখা যাবে হয়তো সে পালিয়ে গেছে। নবী (সঃ) তাই উত্তর দেন, "আগে উট বাঁধ, তারপরে নামাজে দাঁড়াও।"
এটি না বললে লোকে এখন কোন কাজ করতো না। বলতো, আজকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে ফেলেছি, তাই আল্লাহই আমার এবং আমার পরিবারের খাওয়া খাদ্যের ব্যবস্থা করবেন।
লোকে চিকিৎসা নিত না। লোকে কিছুই করতো না। ইসলাম মানুষকে এই শিক্ষা দেয় না।
খন্দকের যুদ্ধে গোটা মদিনাকে গুড়িয়ে দিতে যখন গোটা আরব এক হয়ে আক্রমন করেছিল, তখন নবী (সঃ) আল্লাহর কাছে শুধু দোয়াই করেননি, পাশাপাশি দিনরাত এক করে খাওয়া খাদ্য বন্ধ করে খন্দক খনন করেছিলেন। নবীর জীবনীর যেকোন সংকটে আমরা এটাই দেখি। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, কিন্তু নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা আপনাকে করতেই হবে। এটিই ইসলামের শিক্ষা।
৭. এবং সর্বশেষ পয়েন্ট হচ্ছে, এইসব দুর্যোগে অবশ্যই, অবশ্যই হাজারে হাজারে লোক আল্লাহর পথে ফিরে আসে। আমাদের স্বভাব এমন যে, দুর্যোগের সময়ে আমরা খোদাভীরু হয়ে যাই, প্লেন আকাশে দুলে উঠলেই জোরে আওয়াজ দেই আল্লাহু আকবার! সাগরে ঝড় উঠলে চিৎকার করি, আল্লাহ মালিক। আস্তিক নাস্তিক সবাই এক কাতারে চলে আসি। কিন্তু যেই মুহূর্তে আমাদের বিপদ কেটে যায়, সেই মুহূর্তেই আমরা আল্লাহকে ভুলে যাই। আল্লাহ এই কথাটিই কুরআনে বহুবার বলেছেন। কিন্তু একটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়, বিপদের সময়ে আমরা আল্লাহ আল্লাহ করি, এই বিষয়টাকে কিন্তু আল্লাহ সমালোচনা করছেন না। বরং আল্লাহ সমালোচনা করছেন এই ব্যাপারে যে আমরা বিপদ কাটলেই তাঁকে ভুলে যাই। বিপদের সময়ে আল্লাহ আল্লাহ করাটা অবশ্যই মুসলিমের একনম্বর কর্তব্য, কিন্তু বিপদ কাটলে আমরা যেন তাঁকে ভুলে না যাই।
আমাদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় আল্লাহ বুঝি খুবই বদমেজাজি কেউ, কিছু হলেই লোককে জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। অথচ তিনি নিজে বলছেন তিনি রহমানুর রাহিম, তিনি "আর-রাহমান" নামে আস্ত একটা সূরাই নাজিল করে দিয়েছেন। তিনি সূরা আন-নিসার ১৪৭ নম্বর আয়াতে নিজেই বলেছেন, "তোমাদের আযাব দিয়ে আল্লাহ কি করবেন যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক! আর আল্লাহ হচ্ছেন সমুচিত মূল্যদানকারী সর্বজ্ঞ।"
সর্বাবস্থায় এই বিশ্বাস রাখতে হবে আমার প্রভু আর-রাহমান। তিনি আমার অমঙ্গলের জন্য কিছুই করবেন না। যা হবে, আমার ভালোর জন্যই হবে। তাই সর্বাবস্থায় তাঁর সামনে আমাকে নত থাকতে হবে।
উপরে যে সাত পয়েন্ট বললাম, এগুলো হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এইধরনের দুর্যোগকে দেখা। আলেম উলামাদের দায়িত্ব হচ্ছে এইসব পয়েন্টের মধ্য থেকে সাধারণ জনতাকে জ্ঞান দান করা, সাহস প্রদান করা। এই ভাইরাস ঠ্যাকাতে কি করতে হবে, সেই দায়িত্ব আলেমদের নয়, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের। তাঁরা এইসব ব্যাপার ভাল জানেন। আলেমদের উচিৎ সাধারণ জনতাকে বলা যেন তাঁরা বিজ্ঞানীদের দেখানো পথ অবলম্বন করেন। হাত ঠিক মতো ধোয়া, জীবাণুনাশক ব্যবহার করা, ছোঁয়াচ এড়িয়ে চলা, শরীরে শরীর ঘেঁষে না দাঁড়ানো ইত্যাদি। এসব কাজ মোটেও শরিয়া বিরোধী কাজ নয়, বরং আমাদের শরিয়াও তাই বলছে। নিয়মিত ওযু করা, পরিচ্ছন্ন থাকা, গোসল করা ইত্যাদি আমাদের শরিয়ারই অংশ। আমরা অবিবেচক ধর্ম নই। আমাদের শরিয়াই বলছে মানুষের জীবনের মূল্য দিতে। কাজেই, অসুস্থ হলে, মুসলিম হিসেবে আমার দায়িত্ব অন্য কারোর শরীরে যেন এই রোগ না ছড়ায় তা নিশ্চিত করা। কাজেই ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে জুম্মার নামাজ, ঈদের নামাজ ইত্যাদিতে যাওয়া থেকে বিরত থাকবো। আল্লাহ এর জন্য আমাকে গুনাহ দিবেন না। কারন তিনি নিয়্যত দেখেন। কোথাও যদি শোনেন কোন মহামারী প্রবন শহরে কোন মসজিদ জুম্মার জামাত স্থগিত ঘোষণা করেছে, ধরে নিবেন না তাঁরা ইসলামের বিরুদ্ধে চলে গেছে। ইসলামই এই অনুমতি আমাদের দিয়েছে। মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে জামাত আদায়ের কথা ইসলাম বলেনা। মক্কায় যখন কুরাইশরা মুসলিমদের মারধর করতো, তখন জুম্মার নামাজ কাবার সামনে প্রকাশ্যে জামাতে আদায় হতো না। জুম্মার হুকুম আসে মদিনায়, ইতিহাসের প্রথম জুম্মায় আমাদের রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত থাকতে পারেননি। কারন তিনি তখন মক্কায়, কুরাইশরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি আমাদের পরীক্ষা নিবেন। কখনও ক্ষুধা, কখনও সম্পদ, কখনও ভয়, কখনও সন্তান দ্বারা। দোয়া করুন, এমন পরীক্ষায় আমরা যেন পাশ করি। তারও আগে দোয়া করুন, আমাদের যেন পরীক্ষাই না নেয়া হয়। সূরা বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াতটি সর্বদা মনে রাখবেন, আল্লাহ বলছেন, "সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, অকৃতজ্ঞ হয়ো না।"
স্বপ্নে প্রাপ্ত করোনা ভাইরাসের ইন্টারভিউ, এবং তা থেকে বাঁচার ফর্মুলা, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর আল্লাহর গজব, চীনা প্রধানমন্ত্রী, অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রীর মসজিদে গিয়ে কান্নাকাটি, কেয়ামত সন্নিকট, ইহুদি নানসারা ষড়যন্ত্র, ইলুমিনাতি, দাজ্জাল চলে এসেছে ইত্যাদি যাবতীয় মিথ্যা, গাঁজাখুরি ও বিভ্রান্তিমূলক ওয়াজ থেকে উপরের বক্তব্যগুলো সুন্দর না? একজন মুসলিম "আলেম" কখনও মিথ্যা বাকওয়াজ করতে পারে? বিপদের সময়ে ধর্মীয় নেতাদের এমনই বক্তব্য দেয়া উচিৎ, তাই নয় কি?
খুৎবার পয়েন্টগুলো পাঠ করেছেন ইয়াসির ক্বাদী। যে লোকটি আমাদের মসজিদের ঈমাম, বিশ্বখ্যাত একজন স্কলার, এবং আমার সরাসরি গুরু। ব্যাখ্যাগুলো তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি আমার নিজেরও করা।
এই হচ্ছে জেনুইন আলেম এবং অন্যান্যদের মাঝে পার্থক্য।
আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত দিন।
আরেকটা বিষয়, আমরা বাঙালি খুবই আমোদ প্রিয় জাতি। ফাজিল বলবো না, কারন সেন্স অফ হিউমার থাকা ভাল। কিন্তু সবকিছু নিয়ে ফাজলামি করা ভাল না। বিশেষ করে মহামারী, যাতে একটি হলেও মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে, সেসব বিষয় নিয়ে ট্রল করা অসুস্থ মানসিকতা বলে আমি মনে করি। যার পরিবারের সদস্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, সে যখন আপনার ট্রল পোস্ট দেখবে, সে মনে মনে কেমন বোধ করবে? তাঁর কথা চিন্তা করে ফেসবুক ট্রলিং না করলে কি হয়না? ফাজলামি করতে হয় কত কিছুইতো আছে দুনিয়ায়। একটু বিবেচনা করবেন। ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০২০ রাত ১০:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


