somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ধান্ধে মে দোস্ত দুশমান হোতা হ্যায়।"

১৫ ই জুন, ২০২৩ রাত ১০:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের দেশের চায়ের দোকানের আড্ডাবাজরা কি করে? যে লোকটা নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খায়, নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সে বিশ্ব অর্থনীতির উপর বিশাল লেকচার দিয়ে বসে। বাইডেন প্রশাসন কতটা ব্যর্থ, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রণালয় কতটা নিষ্কর্মা ইত্যাদি সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত। আশেপাশের লোকজনও মনোযোগ দিয়ে শোনে, অতি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করে, এবং নিজনিজ সার্কেলে সেও বিশেষজ্ঞ হয়ে যায়। ঠিক না?
তা ফেসবুকের কল্যানে এখন সেই চায়ের দোকানের আড্ডাবাজরা বুদ্ধিজীবীর মর্যাদা পাচ্ছে। মনে যা আসে, তাই লিখে ফেলে। ক্রসচেকিং করবে, সেই বিদ্যাই নাই। পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, কারোর পোস্ট লাইক, শেয়ার, এবং নিজের জীবনে এপ্লাই করার আগে ভাল করে যাচাই বাছাই করে নিবেন।
যেমন আজকে একজনের পোস্ট দেখলাম লিখেছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস রপ্তানি বন্ধ করলে আমেরিকানদের ন্যাংটা হয়ে ঘুরতে হবে। কারন ইউরোপ-আমেরিকায় প্রোডাকশন কস্ট অনেক হাই। মিনিমাম লেবার ওয়েজ অনেক বেশি। ভিয়েতনামেও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। কাজেই বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করে মূলত আমেরিকার প্রতি করুণা করে। পোশাক রপ্তানি বন্ধ করলে আমেরিকা এসে বাংলাদেশের পায়ে ধরবে। ইত্যাদি ইত্যাদি আরও যা তা প্রলাপ!
পোস্টদাতা যে ডিলিউশনের মধ্যে আছে সন্দেহ নেই। কি আবোল তাবোল বকছে ওর কোন ধারনাই নাই।
পরিচিত গার্মেন্টস মালিকদের জিজ্ঞেস করেন আমেরিকা গার্মেন্টস না কিনলে উনাদের অবস্থা কি হয়। নিজের আত্মীয়দের মাঝে বেশ কিছু ব্যবসায়ী আছে বলেই বললাম। তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লেগেছিল, এ কারনে আমেরিকা কয়েকদিন গার্মেন্টস কেনা বন্ধ করেছিল, এর ফলে কি হয়েছিল এইটা একটু খোঁজ নেন।
এইটা সত্যি যে ইউরোপ আমেরিকার মিনিমাম ওয়েজ অনেক বেশি। এবং এই কারণেই এইসব শিল্প বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে। এই কারণেই আমাদের দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই মার্কেট কিভাবে কাজ করে সেটার ব্যাপারে লোকটার ধারণা শূন্য। আপনাদের একটু বলি।
আমেরিকা প্রথমেই হিসাব করে বছরে ওর কত পরিমান পোশাক লাগবে। সেটা বানাতে কত খরচ হবে। এখন সেটা যদি ভিন্ন দেশে বানাতে দেয়া হয়, তাহলে উৎপাদন এবং শিপিং খরচ কত পড়বে। যোগ বিয়োগের হিসাবে যেটা লাভজনক, সেটাই আউটসোর্স করতে হয়।
শুধু পোশাকই না, যেকোন ফিল্ডে এমনটাই করছে। একাউন্টিংয়ের কথাই বলি। আমেরিকায় একজন সাধারণ বুককিপারকে ঘন্টায় পঁচিশ-তিরিশ ডলার বেতন দিতে হয়। বাংলাদেশে ঘন্টায় দশ-১২ ডলারেই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে হায়ার করে ফেললেই হবেনা। কাজের কোয়ালিটি কেমন হবে, বিদ্যা কতটুকু আছে, সময় মতন ডেলিভারি দিতে পারবে কিনা, আরও হাজারো হিসাব নিকাশ করতে হয়। টাইমজোনেরও একটা ব্যাপার আছে। আমার ইন্ডিয়ার অফিস ওদের নাইট শিফটে কাজ করে, কারন আমাদের যখন তখন ওদেরকে ফোন দিতে হয়। নাইট শিফটে কাজ করার যথেষ্ট লোক আছে কিনা। নিরাপত্তা কতটুকু। হরতাল, ইলেক্ট্রিসিটি ইত্যাদি ঝামেলা যা বিঘ্ন ঘটায় এসব আছে কিনা। সবকিছু নিয়ে কাটাছেড়া শেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এরউপর দেশ হিসেবে আমেরিকার কত পয়সা আছে এই ভদ্রলোকের হয়তো ধারনাই নাই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জিডিপির দেশ। প্রায় একুশ ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি! অনেক ক্যালকুলেটরেই সংখ্যাটা ধরে না। ঐ ভদ্রলোকেরও মাথায় ধরে নাই।
ভিয়েৎনামের লেবার বাংলাদেশের চেয়ে "অনেক বেশি" এই তথ্য ভাইজান কোত্থেকে পেলেন সেটাও জানতে চাই। দশ ডলারে যে গেঞ্জি কিনতে হয়, সেই গেঞ্জি খুব বেশি হলে ১২ ডলারে কিনতে হবে। ২০ ডলারে কিনতে হলেও আমেরিকানদের ন্যাংটা থাকতে হবে না। "পোশাকের জন্য একটি দেশের পা ধরতে হবে" - টাইপ কথাবার্তা তাই ওর বুদ্ধির লেভেল নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
পোশাক শিল্পে ভিয়েৎনাম মুখ হা করে আছে বাংলাদেশের মার্কেট নিয়ে নিতে, বাংলাদেশে গার্মেন্টস বন্ধ হলেই ভিয়েতনাম মার্কেটের দখল নিয়ে নিবে। পেছনে আছে আরও বহু দেশ। আমাদের "মিত্র" ইন্ডিয়া নিজেই দখল নিয়ে নিবে। বাংলাদেশ যখন বলবে, "ভাই, তুমিও?" ভারত তখন ফিল্মি কায়দায় বলবে, "ধান্ধে মে দোস্ত দুশমান হোতা হ্যায়।" (ব্যবসায় বন্ধু শত্রু হয়ে থাকে)
বাংলাদেশের তখন হাত কামড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
চায়না যে এত এত কামরা কামড়ি করছে আমেরিকার সাথে, তা কোন পণ্যটা রপ্তানি বন্ধ করেছে সে?
ওরা সবাই জাতে মাতাল, তালে ঠিক। মাঝে দিয়ে বেশি লাফালাফির কারনে আমাদের ক্ষতি হলে আমাদের কিন্তু ফাইটব্যাক করার শক্তি নাই। রিজার্ভে কত আছে? মার্কেট হারালে নতুন মার্কেট কত দ্রুত পাব? যে বেয়াক্কেল বলে দিলেন আমেরিকাকে আমরা পোশাক দিয়ে করুণা করি, আমেরিকা না নিলে আমাদের এই বিপুল পরিমান গার্মেন্টস কে নিবে? চায়না নিজেই উৎপাদন করে। ইন্ডিয়ার ঠ্যাকা নাই এত দাম দিয়ে কেনার। রাশিয়া চায়না থেকেই সস্তায় পাচ্ছে। সৌদি কিনবে? ব্রাজিল? কত পরিমান কিনবে?
যেকোন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করলে জানতে পারবেন প্রতিটা ডিল নিতে কিভাবে কামরা কামড়ি করতে হয়। ব্যবসা এত সহজ না। কোন বুদ্ধিমান ব্যবসায়ীই বান্ধা কাস্টমার হারাতে চায় না। চায়ের দোকানের আড্ডাবাজ বিশেষজ্ঞের এইসব মাথাতেই ঢুকে না।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদদের মতামত কি? যাদের কাজই অর্থনীতি নিয়ে, তাঁদের মতামতের ব্যাপারে খোঁজ নিন। ফেসবুকে যে যা বলে, তাই বিশ্বাস করলে বিপদে পড়বেন।
আমি নিজে এই ব্যাপারে এক্সপার্ট? অবশ্যই না। তবে কাজের কারণেই ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট এবং আউটসোর্সিং নিয়ে খানিকটা জানাশোনা আছে। এবং আশেপাশে এই ফিল্ডে কাজ করে এমন কিছু মানুষের সাথে কথাবার্তা বলে, একটু খোঁজ খবর নিয়ে এইসব লিখেছি। ডিটেইল জানতে হলে অবশ্যই এক্সপার্টের কাছে যাওয়া ছাড়া কোন উপায়ই নাই।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুন, ২০২৩ রাত ১০:৩০
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আল্লাহর সুন্নাতের পরিবর্তে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন মতের অনুমোদন সংক্রান্ত হাদিস বাতিল হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।
ইউনূস ক্ষমতা দখল ছিল লুটের উদ্দেশ্যে। কেন শিশুদের টিকা দেয়া হয় নাই? তাদের দায়িত্ব ছিল টিকা পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গার্মেন্টসের ভিতরে লুকানো বাস্তবতা—যা আমরা কখনো দেখি না

লিখেছেন Sujon Mahmud, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৫২



সকাল ৬টা। ঘুম ভাঙার আগেই যেন জীবন তাকে টেনে তোলে। রহিমা চোখ খুলেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়—
আরেকটা দিন, আবার সেই একই লড়াই।

রহিমা একজন গার্মেন্টস কর্মী। বয়স মাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

দায়বদ্ধতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত: ২০০৬ থেকে বর্তমানের শিক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:২৫

Photo - আপলোড না হওয়ায় ইমেজ লিংক:

“দায়বদ্ধতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত: ২০০৬ থেকে বর্তমানের শিক্ষা”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সে সময় রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইস্টার ফ্রাইডে এবং যিসাসের শেষ যাত্রা: জেরুজালেমের স্মৃতিবিজড়িত পথে

লিখেছেন সৈয়দ নাসের, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৪




দিলু নাসের
আমার এই তিনটি ছবির সঙ্গে পৃথিবীর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বেদনাবিধুর ইস্টার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতিটি ছবিই যেন এক একটি অধ্যায়, একটি যাত্রার, যা শুরু হয়েছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×