"ইসলামে উৎসব নেই" এই ধরনের কিছু পোস্ট ইদানিং ফেসবুকে উড়াউড়ি করছে।
সেই পোস্টের মূল বক্তব্য অনেকটা এমন যে আমরা খুবই ডিপ্রেসিং একটা জাত, নিজেরা আনন্দ ফূর্তি করিনা, তাই অন্যকে ফূর্তি করতে দেখলে মুখ প্যাঁচার মতন করে ফেলি।
তো এ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।
এই কথা সবাই মানেন যে বছরে আমাদের ঈদ দুইটা। যদিও ঐ লেখিকার মতে ঈদও আসলে ইবাদত, আমরাই ফুড ফেস্ট বানিয়ে ফেলি। তা এক্সট্রা যে নামাজ সেটা খুৎবা সহ আদায় করতে বড়জোর আধা ঘন্টা বেশি লাগে, সেটাও উৎসবেরই অংশ। এরপরের গোটা দিনইতো ফূর্তি। এতটাই যে ঈদের দিনে রোজার মতন ইবাদতও নিষিদ্ধ। ঈদ শব্দের মানেই হচ্ছে উৎসব বা ভোজ। মানে যে উৎসবে খাওয়া দাওয়া চলে। আপনি ঈদের দিন শুধুই খাবেন। রোজা রাখলে উল্টা গুনাহ হবে।
ইসলাম বলে, শুধু নিজে না, অন্যের পাতেও যেন ভোজ উঠে, সেই ব্যবস্থা করতে। যে কারনে ঈদুল ফিতরে যাকাতুল ফিতরা এবং কুরবানীতে সবাইকে মিলে মাংস খাওয়ার নিয়ম। অভুক্তের পাতে খাবার তুলে দিলে, বা ওদের ক্ষনিকের আনন্দের উপলক্ষ হতে পারলে এমনিতেই আনন্দ বহুগুন বেড়ে যায়। মানুষ নিজের বাড়িতে পরিবার নিয়ে ভূরিভোজ করে, তারপরে আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশীদের বাড়িতে খেতে বেরোয়। খেতে খেতে পেট নেমে যায় অনেকের। কত খাওয়া যায়?
দুই ঈদের তিনদিন তিনদিন করে মোট ছয় দিন ধরে চলে এই উৎসব।
আপনি যদি নিজের ঈদকে আনন্দময় করতে না পারেন সেটা আপনার ব্যর্থতা। আপনি মানুষের সাথে মিশছেন না, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখছেন না, আপনি নিজেই ডিপ্রেসড লাইফ কাটান। দোষটাতো আপনার।
গেল ঈদের কথা।
রমজান মাসের তিরিশটা দিনই যে উৎসব এই কথা মুসলিম মাত্রই জানেন, যারা ঐ পোস্ট লিখেন ও শেয়ার করেন, তারাই কেবল জানেন না।
রমজানে সেহরি এবং ইফতার এমনিতেই বিশেষ কিছু। লোকজন আগ্রহের সাথে নিজ বাড়িতে ইফতার বানায়, কিনে, চক বাজারেতো কোটি কোটি টাকার শুধু ইফতার ব্যবসাই চলে। চলে ইফতারের দাওয়াত পর্ব। এ ওর বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে যায়। আত্মীয়, প্রতিবেশীদের বাড়িতে ইফতার বানিয়ে পাঠায়।
এখন যুক্ত হয়েছে সহুর ফেস্ট। পুরোই হালাল একটি ব্যাপার। মানে সেহরির সময়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মেলা বসে, সেখানে শুধু খাদ্যপণ্য বিক্রি হয়। হাজার হাজার মানুষ স্বপরিবারে সেহরি খেতে আসেন।
গোটা রমজান জুড়েই খাওয়া দাওয়ার এই মহোৎসব চলে।
এর সাথে যুক্ত হয় তারাবীহর নামাজ। লোকজন নিজের পরিবার নিয়ে মসজিদে আসেন নামাজ আদায় করতে। মেয়েরা মেয়েদের অংশে, ছেলেরা ছেলেদের অংশে নামাজ পড়ে। বাচ্চারা নিজেদের অংশে ফুর্তিতেই শেষ।
বাংলাদেশের মসজিদে ইমাম তিলাওয়াতের নামে রেলগাড়ি ছুটায়, কিন্তু আমার কাছে তারাবীহর নামাজের আসল সৌন্দর্য্য এর তিলাওয়াত। কুরআন শরীফ তিলাওয়াতও যে একটা মহাশিল্প, সেটা উপলব্ধি করি তারাবীহর নামাজে। একে রমজানের পরিবেশ, মন মানসিকতা থাকে আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। মসজিদ গিজগিজ করে মুসল্লিতে। সবাই নিজের রবের করুণাপ্রত্যাশী। শুরু হয় ক্বারীর তিলাওয়াত। ধীরে ধীরে, টেনে টেনে সুর করে করে নির্দিষ্ট লয়ে তিলাওয়াত এগুতে থাকে। যারা আরবি বুঝেন তাঁদের কথাতো বাদই দিলাম, আমরা যারা আরবি বুঝিনা, কিন্তু কুরআন শরীফ অর্থ বুঝে পড়ি, হঠাৎ কিছু কিছু আরবি শব্দ কানে বাজলেই বুঝতে পারি এখন এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে....তখন নামাজে এমনিতেই মনোযোগ চলে আসে। এরপর তিলাওয়াত যত এগুতে থাকে, মুসল্লিরা নিজেদের জীবনের সাথে মিলাতে শুরু করে। এখানে কেউ সাধু সন্ত না, আমরা সবাই ছোট বড় গোপন প্রকাশ্য নানান পাপের পাপী। নিজেদের রবের দেয়া উপহার, রমজান মাসকে কাজে লাগাতে যাই নিজেকে স্রেফ আরেকটিবার সুযোগ দিতে। কেউ আসেন বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে। নানা সমস্যার একমাত্র সমাধানকারী আমাদের মালিকের কাছে সাহায্য চাইতে। আমরা টের পাই আমাদের রব তাঁর রাসূলের মাধ্যমে বহু আগেই আমাদের সাথে সরাসরি কথা বলে ফেলেছেন। আমরাই তাঁর বাণীকে মলাটবন্দি করে শেল্ফে সাজিয়ে রাখি, খুলে পড়ি না। আবেগ তখন সবাইকে স্পর্শ করে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন কেউ কেউ। আশেপাশের অনেকের চোখের পানিতে গাল ভিজে। এ এক অসাধারণ, অতুলনীয়, অভাবনীয় এবং অবেগময় অভিজ্ঞতা।
লোকে কনসার্টে যায় না? কেন যায়? গানের কথা জীবনের সাথে মিলে যায় বলে, কিংবা স্রেফ সুরের টানেতো?
এখানেও অনুভূতি এক তবে তা আরও গ্র্যান্ড স্কেলে। তিরিশটা (চাঁদ আগে দেখা গেলে ২৯) রাত ধরে চলে এই উৎসব। ঐ পোস্টের লেখক/লেখিকা কখনও এসেছেন মসজিদে? তারাবিতে? নিজের রবের কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমপর্ণের অভিজ্ঞতা তাঁর কখনও হয়েছে? বুঝবেন কিভাবে কোন নেশায় সাড়ে চৌদ্দশো বছর ধরে কোটি কোটি মুসলিম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতি রমজানে মসজিদে গিয়ে দুই/তিন ঘন্টা পড়ে থাকে?
রমজান ও ঈদ ছাড়া আছে আমাদের "সাপ্তাহিক ঈদ" শুক্রবার বা জুম্মা। নবী (সঃ) নিজে বলেছেন আমাদের জন্য প্রতি শুক্রবার ঈদ। এরপরে আর কোন যুক্তি তর্ক থাকে না। আমরা এদিন ঈদের মতই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেহ ও পোশাকে নামাজে যাই, পরিবারের সাথে ভুরিভোজ করি, এবং আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াই বা যাই। প্রতি সপ্তাহে দাওয়াত, পার্টি, উৎসব! আমাদের এখানেতো কিছু বাঙালি দাওয়াত খেতে খেতে হাপিয়ে উঠেন। কারোর কারোর একই দিনে দুই তিনটা দাওয়াত থাকে, এক পার্টি থেকে আরেক পার্টিতে ছুটে বেড়ায়। বছরে ৫২-৫৪ টা শুক্রবার পাচ্ছেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, রমজানের তিরিশ দিন, দুই ঈদের ছয়দিন এবং শুক্রবারের ৫২-৫৪ - মোট নব্বই দিনের মতন বা তিন মাস (বছরের এক চতুর্থাংশ) আপনার কেবল উৎসবেই কাটে। এরপরেও বলবেন ইসলামে উৎসব নেই? কত পার্টি লাগবে আপনার?
হ্যা, আপনারা যদি বলেন "মুসলিম উৎসবে কোন মদ্যপান চলে না তাহলে কেমন উৎসব পালন হলো?" তাহলে ভিন্ন কথা। ইসলামে শুধু মদই না, কারোর জন্য ক্ষতিকর এমন যেকোন কিছুই হারাম। মদ খেতে শুধু ইসলামই নিষেধ করে না, ডাক্তাররাও নিষেধ করেন। ধূমপান, গাঞ্জা ফোঁকা ইত্যাদি সবই ইসলামে এই কারণেই নিষেধ কারণ এগুলি সেবনকারীর শরীর স্বাস্থ্যের জন্যই খারাপ। সেসব বাদ দিয়ে মানুষের আনন্দের আর যা যা উপকরণ, খাওয়া খাদ্য, আড্ডা, হাসি, উল্লাস, সবইতো হালাল।
হ্যা, আপনি আরেকজনের বিবির সাথে রং তামাশা করতে চাইলেও ইসলাম নিষেধ করবে। সেটা নিয়ে কমপ্লেন করতে চাইলে ঐ বিবির স্বামীর কাছে করুন। ঘুষি মুষি খাইলে আমাকে দোষ দিতে পারবেন না।