১. দেশে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট ফিরছে, এবং আমাদের সেই সাথে নরকযাত্রাও শুরু হয়েছে। গতকয়েকদিন ইন্টারনেট না থাকায় কিছুই জানা যাচ্ছিল না, এবং এখন সেসব ভিডিও আর ছবি দেখে মনে হচ্ছে এ কি করে সম্ভব! স্বাধীন দেশে? আমার বাংলাদেশে?
মৃত লাশ রাস্তায় পড়ে আছে। রক্তের ছড়াছড়ি, পুলিশের তান্ডব তাও মানা যায়, কিন্তু পুলিশের পাশাপাশি লাঠি আর চাপাতি হাতে ওরা কারা সিভিলিয়ানদের কোপাচ্ছিল?
কেউ দাবি করবে ওরাও পুলিশ, কেবল ইউনিফর্ম ছাড়া একশনে ছিল।
তা দেশের পুলিশরা কি এতটাই ফকির মিসকিন যে স্যান্ডেল চপ্পল পরে ডিউটিতে নেমে যায়? আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে ডিউটিতে আসে? তামাশা চলছে? আমরা জোকার? যাই বুঝাবে তাই বিশ্বাস করবো?
২. এদিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন "বিএনপি-জামায়াত জোট কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে সারা দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।"
ওনার কথায় লাই দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রূপের মালিক সোবহাইন্না, প্রাণ গ্রূপের মালিক আইসাইন্না, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুইল্ল্যা সহ আরও কিছু কালপ্রিট, মিথ্যুক দালাল। আমাদের বস সালমান রহমানতো আছেনই। ওদের স্বার্থ হচ্ছে পয়সা। পয়সা দাও, ওরা বলবে "চান্দের বুড়ি আইসা গুলি করছে, আমি নিজের চৌক্ষে দেখছি। শুধু আমি একা না, আমার বৌ পোলাপানও দেখছে।"
প্রধানমন্ত্রীর কথায় একই সুরে ঘেউ ঘেউ করেছে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। ওর যুক্তিতে অবশ্যই সরকারের কঠোর হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না, এবং ঘটনা জামাত বিএনপি ঘটিয়েছে। তাই পুলিশকে ট্রেইন্ড সন্ত্রাসী দমনে গুলি চালাতে হয়েছে।
ক্লাস নাইনে পড়া যে ছেলেটা মারা গেল, এই শুয়োরের মতে সে ট্রেইন্ড সন্ত্রাসী ছিল। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি সহ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির যত ছেলেরা মারা গেল, ওরাও ট্রেইন্ড রাজনৈতিক সন্ত্রাসী ছিল।
এরা মানতেই নারাজ যে ওরা কোন অপকর্ম করেছে, ওদের থেকে দুঃখ, সিম্প্যাথি ইত্যাদি আশা করবেন কিভাবে?
সেই ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালা বাগে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার হাজার হাজার সিভিলিয়ানের উপর ব্রাশ ফায়ার করে হাত রাঙ্গিয়েছিল। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিনশোর মতো, বাস্তবে যা ছিল হাজারের উপরে।
গত কয়েকদিনে আমাদের সরকারের নৃশংসতা সেই ঘটনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। এখানে জেনারেল ডায়ার কে সেটা বুঝতে কারোরই কোন অসুবিধা হবার কথা না।
আমাদের সাকিব আল হাসান, আমাদের মাশরাফি মূর্তজা এই সরকারেরই এমপি। মুখের মধ্যে বিচি ভরে রাখায় কথা বলতে পারছেন না। মানুষ হলে উনারা এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করে বলতেন "এই হত্যাকাণ্ডে আমার কোন হাত নেই।"
১৯৭১ সালে জেনারেল নিয়াজী যখন গর্বের সাথে আমাদের উদ্দেশ্য করে বলে যে "আমি এই হারামি জাতির বংশধারা পাল্টে দেব" মানে হচ্ছে, ও আমাদের মেয়েদের দিকে ওর পোষাকুকুর পাক মিলিটারি লেলিয়ে দিবে যাতে ওদের থেকে জন্ম নেয় আধা পাকিস্তানী আধা বাঙালি জাতি - তার পরদিন মেজর মুশতাক নামের এক বাঙালি অফিসার বাথরুমে গিয়ে নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। লোকটা পারতো বাঙালি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে, কিন্তু সে আর্মি ক্যাডেট হিসেবে নিজের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে যেতে পারেনি। আমার ধারণা ও জেনুইনলি বিশ্বাস করেছিল যে সে আসলে পাকিস্তানকে রক্ষা করছে। দুষ্কৃতিকারীদের মারছে। কিন্তু তারপরেও ওর বোধদয় হয়। বিবেক এসে কড়া নাড়ে।
বিবেক অনেক বড় গুণ। সবার থাকে না।
মোহাম্মদ আলীর প্রসঙ্গ তোলা যাক। উনি তখন চ্যাম্পিয়ন বক্সার, আমেরিকা তথা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেলিব্রেটি। পেলের সাথে তাঁর নাম নেয়া হয়। আমেরিকা ভিয়েতনামে অন্যায় যুদ্ধে প্রচুর নিরীহ জনতা খুন করছিল। ড্রাফ্টে মোহাম্মদ আলীর নাম ওঠে। সরকার ওকে বলে সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়ে ভিয়েতনামে যেতে।
আলী সরকারের মুখের উপর বলেন "আমার ধর্ম আমাকে নিরীহ মানুষ হত্যার অনুমতি দেয়না।"
"তুমি কিন্তু এজন্য অনেক বিপদে পড়বে। তোমার বক্সিং লাইসেন্স কেড়ে নিব। তোমার জেল জরিমানা হবে।"
মোহাম্মদ আলীকে যারা চেনেন তাঁরা জানেন তিনি কিভাবে কাটথ্রোট কথা বলতেন। তিনি বলেন "তোমাদের যা খুশি তাই করো। আমি নিরীহ কৃষক মারবো না।"
আলীর বক্সিং লাইসেন্স কেড়ে নেয়া হয়। মিলিওনেয়ার আলী পিৎজা বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু অন্যায়ে আপোষ করেননি।
তাঁর জেদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র মাথা নত করে। তাঁর বক্সিং লাইসেন্স ফিরিয়ে দেয়। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপ্রধানরা গিয়ে বলেন "তিনি ছিলেন হিরো! অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন এক ব্যক্তিত্ব!"
আর আমাদের জাতীয় ক্রিকেটাররা? তথাকথিত তারকারা? ওয়াক থু!
আল্লাহ বিপদে ফেলে আমাদের পরীক্ষা করেন আমরা আসলেই ন্যায়ের পথে আছি কিনা। আবার এটাও দেখান যাদের হিরো মনে করি, ওরা আসলেই হিরো কিনা।
আমাদের তথাকথিত সেলিব্রেটিরা নিজেদের রূপ দেখিয়ে দিয়েছে।
আফসোস! এদের জন্য বহু রাত জেগে দোয়া করতাম!
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০২৪ রাত ৩:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




