somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "দেবতার মর্ত্যদর্শন"

২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেবতার মর্ত্যদর্শন
মঞ্জুর চৌধুরী

মাহমুদ হাসান সাহেব চাকরির প্রথম দিন নিজের নামের ব্যাজটা উল্টো করে লাগিয়েছিলেন।
সুপারভাইজার মেয়েটি কাছে এসে বলল, “আংকেল, ব্যাজটা ঘুরিয়ে দিই?”
মেয়েটির বয়স তিরিশের বেশি হবে না। নীল ভেস্টের নিচে ফুলহাতা জামা, মাথায় হালকা বাদামি হিজাব। কোমরে ঝোলানো যন্ত্রটায় একটু পরপর শব্দ হচ্ছে। মেয়েটি কথা বলতে বলতেই স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে নিল।
মাহমুদ সাহেব ব্যাজটা খুলে তার হাতে দিলেন।
প্লাস্টিকের ছোট্ট ব্যাজ। ওপরে ওয়ালমার্টের চিহ্ন, নিচে বড় অক্ষরে লেখা "মাহমুদ।" তার নিচে "ক্যাশিয়ার।"
বাংলাদেশেও তাঁর নামের নিচে কয়েকটি লাইন লাগত। পদবি, বিভাগের নাম, অঞ্চলের দায়িত্ব। ভিজিটিং কার্ডে সেসব ধরাতে গিয়ে একবার ছাপাখানার লোক অক্ষর ছোট করে দিয়েছিল। তিনি কার্ড ফেরত পাঠিয়েছিলেন।
এখানে তাঁর নামের নিচে শুধু "ক্যাশিয়ার।"
মেয়েটি ব্যাজ লাগিয়ে বলল, “আমি নাবিলা। ফ্রন্ট এন্ডে কোনো সমস্যা হলে আমাকে ডাকবেন। প্রথম কয়েক দিন একটু নার্ভাস লাগতে পারে, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“আমি নার্ভাস না।”
উত্তরটা প্রয়োজনের চেয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
নাবিলা এক মুহূর্ত তাঁর মুখের দিকে তাকাল। তারপর আগের মতোই হাসল।
“তা হলে তো ভালো। আসেন, রেজিস্টারটা দেখাই।”
মাহমুদ তার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলেন, মেয়েটির জুতার গোড়ালি এক পাশে ক্ষয়ে গেছে। অভ্যাসবশত মনে হলো, সুপারভাইজরি পজিশনে থেকে এমন জুতা পরা ঠিক নয়।
তারপরই নিজের কালো জুতার দিকে তাকালেন। ঝকঝকে, চকচকে। আজ সকালে ছেলে বলে দিয়েছে, এগুলো পরে আট ঘণ্টা দাঁড়ানো যাবে না। আরামদায়ক জুতা কিনতে হবে।
ছেলে বলেছে আট ঘণ্টা। তাঁর শিফট আসলে পাঁচ ঘণ্টার। তবু কথাটা শুনে তিনি ছেলেকে শুধরে দেননি।
রিটায়ারমেন্টের বিদায় অনুষ্ঠানে তাঁর ছবি তোলা হয়েছিল বিরাট এক ফুলের তোড়ার পাশে দাঁড় করিয়ে।
পেছনের পর্দায় লেখা ছিল "Celebrating a Legacy of Leadership."
আটাশ বছর।
জার্মান মাল্টিন্যাশনাল ওষুধ কোম্পানিটির বাংলাদেশ অফিসে এই আটাশ বছরে কত মুখ এসেছে, কত মুখ চলে গেছে। তাঁর শেষ পদ ছিল কমার্শিয়াল ডিরেক্টর। সারা দেশে কয়েক শ কর্মী, কয়েক স্তরের ব্যবস্থাপনা, মাসিক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা, বাজারের হিসাব, বিদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং।
সকালে গাড়ি অফিসের সামনে থামলে সিকিউরিটি গার্ড ছুটে আসতো দরজা খুলতে। লিফটে কেউ তাঁকে দেখলে বাক্য শেষ না করেই চুপ হয়ে যেত। তাঁর ঘরের বাইরে অপেক্ষা করার সময় মানুষের বসার ভঙ্গি বদলে যেত। এসব তিনি লক্ষ করতেন, এবং লক্ষ করে তৃপ্তিও পেতেন।
বিদায় অনুষ্ঠানে একজন তরুণ কর্মকর্তা বলেছিল, “স্যার আমাদের শিখিয়েছেন, পারফরম্যান্সের কোনো বিকল্প নেই।”
তখন হাততালি হয়েছিল।
সেই তরুণটির নাম এখন আর মনে করতে পারেন না তিনি। কিন্তু কথাটা মনে আছে।
আমেরিকায় আসার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ খুব আনন্দে কাটল। ছেলে আরিফের বাড়ি টেক্সাসের এক শহরতলিতে। সামনে গোছানো লন, পেছনে কাঠের বেড়া দেয়া বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। তিন গাড়ির গ্যারেজ।
নাতনি মীরা তাঁর ঘরে এসে বসে ছবি আঁকত। নাতি আয়ান তাঁকে ভিডিও গেম বোঝানোর চেষ্টা করত। পুত্রবধূ তৃষা প্রায় প্রতিদিন জিজ্ঞেস করত, “আব্বা, কী খেতে ইচ্ছা করছে?”
স্ত্রী রওশন প্রথম মাসেই কাছের কয়েকজন বাংলাদেশি মহিলার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেলেন। কারও বাড়িতে কোরআন পড়ার আয়োজন, কারও সঙ্গে বিকেলে হাঁটা, দেশে বোনদের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপ। রওশনের দিন ব্যস্ততায় কাটে।
মাহমুদ সাহেবের সময় কাটে না।
সকাল সাড়ে ছয়টায় ঘুম ভাঙত। সাতটায় চা শেষ। আটটার মধ্যে বাড়ি ফাঁকা।
মেয়েকে নিয়ে আরিফের গাড়ি বেরিয়ে যেত প্রথমে। তারপর তৃষা ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে নিজের কাজে। দুইজনের দুই স্কুল। সকালে বাবা মা নামিয়ে দেয়, দুপুরে স্কুল বাসে ফেরে। সবাই চলে গেলে পরে রওশন কিছুক্ষণ রান্নাঘরে থাকতেন, তারপর ফোন নিয়ে বসতেন।
মাহমুদ খবর পড়তেন। বাংলাদেশের খবর, আমেরিকার খবর, অর্থনীতির খবর। একটি সংবাদ দুবার পড়েও বেলা এগারোটা হতো না।
দুপুরের দিকে ফ্রিজের গায়ে লাগানো ক্যালেন্ডারটা দেখতেন।
ডেন্টিস্ট। স্কুল কনসার্ট। সকার প্র্যাকটিস। তৃষার মিটিং।
তাঁর নামে কোথাও কিছু লেখা নেই।
একদিন হোয়াসাপে অফিসের পুরোনো গ্রুপে ওষুধের বাজার নিয়ে একটি বিশ্লেষণ পাঠিয়েছিলেন। সাতজন থাম্বস আপ দিল। একজন লিখল, “ভেরি ইনসাইটফুল, স্যার।”
তারপর তারা নিজেদের আলোচনায় ফিরে গেল।
বিকেলে তিনি আবার গ্রুপটা খুললেন। তাঁর মন্তব্যের পরে সাতাশটি নতুন বার্তা। একটি নতুন পণ্য উদ্বোধনের পরিকল্পনা চলছে। যিনি তাঁর জায়গায় এসেছেন, সবাই এখন তাঁকে স্যার বলছে।
রওশন পাশ দিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন, “চা দেব?”
মাহমুদ ফোনের স্ক্রিন নিভিয়ে বললেন, “এইমাত্র তো খেলাম।”
“সেটা বারোটায় খেয়েছ।”
ঘড়িতে তখন চারটা দশ বাজে।
চাকরির কথাটা তিনি প্রথমে কাউকে বলেননি।
ওয়ালমার্টে বাজার করতে গেলে দরজার পাশে নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখতেন। একদিন বাড়ি ফিরে কম্পিউটারে বসে আবেদন করলেন। যেখানে গত চাকরির বিবরণ চাইছিল, সেখানে অনেকক্ষণ কার্সর জ্বলতে থাকল।
কমার্শিয়াল ডিরেক্টর।
তিনি লিখলেন।
তারপর কাজের অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে লিখতে গিয়ে প্রথমে লিখেছিলেন "বৃহৎ কর্মীবাহিনী পরিচালনা, কৌশলগত পরিকল্পনা, আয় বৃদ্ধি।"
সব মুছে লিখলেন "মানুষের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে।"
ইন্টারভিউর ডাক এলে আরিফ জানতে পারল।
“ওয়ালমার্টে?”
ছেলের মুখে এমন বিস্ময় ছিল, যেন তিনি ভুল করে কোনো অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
“হ্যাঁ।”
“কী কাজ?”
“ক্যাশিয়ার।”
আরিফ চুপ করে রইল। খাবার টেবিলে তখন তৃষা সালাদের বাটি রাখছিল। তার হাতও একটু থেমে গেল।
“আব্বা, তোমার কি টাকার দরকার?”
“না।”
“তা হলে?”
“বসে থাকতে ভালো লাগে না।”
“কোথাও ভলান্টিয়ার করো। লাইব্রেরিতে যাও। মসজিদে কত কাজ থাকে! বাগান করো।”
“সেগুলোও করতে পারি।”
“তা হলে এইটা কেন?”
মাহমুদ গ্লাস থেকে একটু পানি খেলেন।
“নিজ যোগ্যতায় কাজটা পেয়েছি বলে।”
আরিফ চেয়ার ঠেলে সামান্য পেছাল।
“তুমি বুঝতে পারছো না। এখানে মানুষ কী বলবে? বাংলাদেশিরা দেখবে। অভাব থাকলে একটা কথা ছিল। তখন কেউ কিছু বলতো না। এখন ওরাই বলবে ছেলে এত বড় চাকরি করে, বুড়ো বাপকে দিয়ে দোকানে কাজ করায়। টাকার এতই লোভ!”
“তুই তো করাচ্ছিস না।”
“সবাই কি তোমার কাছে ব্যাখ্যা শুনতে আসবে?”
মাহমুদ এবার ছেলের দিকে তাকালেন।
আরিফের কপালে যে ভাঁজটা পড়ে, নিজের পুরোনো ছবিতেও তিনি সেটা দেখেছেন। ছেলেটি তাঁরই মতো কথা বলছে। সমস্যার সব দিক আগেই বুঝে ফেলেছে, এখন অন্য পক্ষের সম্মতিটুকু প্রয়োজন।
"আমি পুরোটা জীবন কাজ করেছি। এদেশে এসে হঠাৎ বেকার হয়ে পড়ে আছি। আমার মানসিক স্যানিটির জন্য আমাকে কিছু একটা করতে হবে। নাহলে আমার মনে হবে আমি worthless একটা মানুষ।"
“এভাবে ভাবছো কেন?”
“মনের উপর আমাদের কন্ট্রোল থাকে?”
রওশন এতক্ষণ চুপ ছিলেন। এবার বললেন, “বাইরে কাজ করতে চাইলে করুক না। বাড়িতে বসে থাকলে তার খিটখিটে মেজাজ সহ্য করবে কে?”
আরিফ বিরক্ত চোখে মায়ের দিকে তাকাল।
“তুমিও শুরু করলে?”
রওশন ভাতের বাটি এগিয়ে দিলেন।
“আগে খাও। পরে বাবাকে বেকার বানিও।”
কথাটায় তৃষার মুখে চাপা হাসি ফুটেছিল। আরিফ হাসেনি।
প্রথম সপ্তাহেই মাহমুদ বুঝলেন, দাঁড়িয়ে কাজ করাটা কত ক্লান্তিকর।
তাঁর জীবনে দীর্ঘ মিটিং হয়েছে, রাত জেগে হিসাব হয়েছে, এয়ারপোর্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা হয়েছে। কিন্তু পায়ের পাতার নিচে এমন নিস্তেজ ব্যথা কখনো হয়নি।
বারকোড খুঁজে পাচ্ছেন না। টমেটোর কোড মনে থাকছে না। কেউ নগদ দিচ্ছে, কেউ কার্ড। কেউ একটি জিনিস বাদ দিতে চায়, কেউ দাম নিয়ে আপত্তি করছে। একজন কৃষ্ণাঙ্গিনী কালো আমেরিকানদের উচ্চারনে কী যেন বলল, দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করায় বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ক্যান ইউ গেট সামওয়ান?”
কথাটা তাঁর গায়ে লাগল। তিনি তো "সামওয়ানই" ছিলেন।
নাবিলা এসে সমস্যাটা মিটিয়ে দিল। ক্রেতা চলে গেলে নিচু স্বরে বলল, “একই সঙ্গে দুইটা কাজ করবেন না। আগে লেনদেন শেষ করেন, তারপর ব্যাগ গুছাবেন।”
মাহমুদের মুখ গরম হয়ে উঠল।
“আমি আসলে....”
“জানি। শুরুতে সবারই এমন হয়।”
মেয়েটি চলে গেল।
ব্রেকরুমে তিনি টিফিন খুলে বসেছিলেন একা। রওশন দুটি রুটি আর সবজি দিয়েছেন। মাইক্রোওয়েভে হাল্কা গরম করে নিলেন।
সামনের টেবিল থেকে একজন মহিলা বললেন, “ভাই, আচার খান? তেতুঁলের আচার?”
মাহমুদ তাকালেন।
পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। নামের ব্যাজে লেখা ফরিদা। কয়েক দিন ধরে দেখছেন, দ্রুত হাঁটেন, কথা বলার সময় মুখের দিকে সোজা তাকান।
তিনি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “না, ধন্যবাদ।”
“খেয়ে দেখেন, মজা আছে। ঘরে বানানো।”
“না, ঠিক আছে। ধন্যবাদ।”
ফরিদা আর বললেন না।
কিছুক্ষণ পর রাফি নামের এক তরুণ এসে তার পাশে বসল। কমিউনিটি কলেজে পড়ে। রাতে অ্যাসাইনমেন্ট করেছে, সকালে কাজে এসেছে। টিফিনে কিছু নেই দেখে ফরিদা নিজের ভাত অর্ধেক তাকে দিয়ে দিলেন।
মাহমুদ রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে দেখলেন।
দেশে তাঁদের অফিসের সাধারণকর্মীরা নিচতলায় খাবার খেত। ডিরেক্টর বা তার উপরের ম্যানেজমেন্ট লেভেলের ক্যান্টিন ছিল আলাদা। কখনো সেটা নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন ওঠেনি।
পরদিন ফরিদা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আজকে গরুর মাংস। খাবেন?”
মাহমুদ হাসিমুখে বললেন, “একটু দেন।”
ফরিদা টিফিনের ঢাকনায় মাংস তুলে দিলেন।
“একটুতে হবে না। ভাবি রুটি দিছে কয়টা?”
খাওয়ার পর তিনি ঢাকনাটা ধুয়ে আনতে উঠলেন।
ফরিদা অবাক হয়ে বললেন, “রাখেন, আমি ধুয়ে দিব নে। আমার বাটিতো ধুতেই হবে।”
“হাত ধুতে যাচ্ছি। সঙ্গে এটাও ধুয়ে আনি।”
সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর অকারণ অস্বস্তি হচ্ছিল। যেন কেউ দেখে ফেললে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
টেবিলে ফিরে দেখলেন, কেউ তাঁকে দেখছেই না। রাফি ফোনে একটা অঙ্ক দেখাচ্ছে ফরিদাকে। ফরিদা বলছেন, “আমারে দেখাইয়া লাভ নাই। আমি তো এই বয়সে পাসওয়ার্ডই মনে রাখতে পারি না।”
মাহমুদ হঠাৎ হেসে ফেললেন।
প্রথম বেতন জমা হওয়ার দিন ব্যাংকের অ্যাপ তিনি চারবার খুলেছিলেন।
অঙ্কটা তাঁর বাংলাদেশের শেষ মাসের বেতনের তুলনায় কিছুই না। তবু সংখ্যাটার পাশে আঙুল রেখে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
রওশন বললেন, “কী দেখো?”
“বেতন দিয়েছে।”
“দেখলাম তো। একটু আগে দেখালে।”
“ট্যাক্স কেটেছে।”
“তোমার আগেও কাটত।”
তিনি হেসে ফোন নামিয়ে রাখলেন।
সন্ধ্যায় আরিফকে বললেন, “এই মাসে বাজারের খরচটা আমি দিই।”
আরিফ এমনভাবে তাকাল, যেন কথাটা তাকে কষ্ট দিয়েছে।
“প্লিজ, আব্বা।”
“আমি তো....”
“আমার সংসার চালানোর জন্য আপনাকে কাজ করতে হবে না।”
মাহমুদ আর কথা বাড়াননি।
তারপর থেকে তিনি গিফ্ট কিনতে লাগলেন।
মীরার জন্য রঙের বাক্স। আয়ানের জন্য লেগো সেট। তৃষার জন্য শীতের স্কার্ফ। রওশনের জন্য ভালো হাঁটার জুতা।
আরিফের জন্য একটা শার্ট কিনেছিলেন। ছেলে প্যাকেট খুলে বলল, “এত দাম দিয়ে কেন কিনলেন?”
তিনি হেসে বললেন, “আমার হাতে কি কখনও সস্তা জিনিস উঠেছে? পছন্দ হয়েছে কিনা বল।”
“হয়েছে। কিন্তু দরকার ছিল না।”
মাহমুদ বললেন, “পছন্দ হলে পরিস।”
পরের শুক্রবার আরিফ শার্টটা পরে অফিসে গেল। মাহমুদ সাহেব পুত্রের গায়ে শার্টটি দেখে আনন্দিত হলেন।
তাঁর কাজ ভালো লাগতে লাগলো।
তিনি কাস্টমারদের মুখ মনে রাখতে পারতেন। এক বৃদ্ধ প্রতি মঙ্গলবার এসে একই ধরনের সিরিয়াল নিতেন। এক মহিলা তাঁর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে বাজার করতে আসতেন। আরেক ভদ্রমহিলা হাত ভর্তি কুপন ও এডভার্টাইজমেন্ট নিয়ে আসতেন প্রাইস ম্যাচ করিয়ে দিতে। "A dollar saved is worth more than a dollar earned."
লাইন দীর্ঘ হলে তাঁর পুরোনো কর্মচঞ্চলতা ফিরে আসত। দ্রুত হাত চলত, মাথা পরিষ্কার থাকত। তবে এখন আর কাউকে দ্রুত কাজ করতে বললেই হতো না। নিজের হাতই চালাতে হতো।
স্টোর ম্যানেজার একদিন এসে বললেন, “তোমার রেজিস্টার খুব গোছানো থাকে। কাস্টমার ফিডব্যাকও ভালো। Good job! Keep it up!”
বাড়ি ফিরে তিনি কথাটা রওশনকে দুবার বললেন।
দ্বিতীয়বার রওশন বললেন, “লোকটার নাম কী?”
“ড্যানিয়েল।”
“ড্যানিয়েলকে একদিন দাওয়াত দিয়ে খাওয়াও।”
কয়েক মাস পর বেতনের সঙ্গে ছোট একটি বোনাসের অঙ্কও এলো। মাহমুদ হিসাবটা মিলিয়ে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলেন না। নাবিলাকে জিজ্ঞেস করলেন।
নাবিলা বলল, “হ্যাঁ, ঠিকই আছে।”
“বোনাস?”
“জি, আংকেল। ভালো লাগছে?”
তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, “অবশ্যই ভালো লাগছে।”
পরে পার্কিং লটে এসে রওশনকে ফোন করলেন।
“আজকে ফেরার পথে মিষ্টি নিয়া আসব।”
“কী হয়েছে?”
“একটা ব্যাপার আছে।”
স্ত্রী হেসে বললেন, “তোমার গলা শুনে মনে হচ্ছে আবার প্রমোশন হইছে।”
তিনি গাড়ির দরজায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন।
প্রথম চাকরিতে বেতন বাড়ার পর মাকে ফোন করেছিলেন। মা তখন বেঁচে। বাড়িতে টেলিফোন ছিল না; পাশের ফার্মেসিতে খবর পাঠিয়ে ডেকে আনতে হয়েছিল।
মা শুনে কিই যে খুশি হয়েছিলেন! তাঁর দোয়া যেন থামতেই চাইছিল না।
"আল্লাহ তোরে আরও বরকত দিক। আরও রহমত দিক। তোর জীবনের সব বালামুসিব্বত দূর করুক। দুষ্টু মানুষের নজর থেইকা রক্ষা করুক। ......"
এত বছর পর পার্কিং লটের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই ঘটনা মনে পড়ায় তাঁর চোখ জ্বালা করতে লাগল।
সুপারভাইজার নাবিলা মেয়েটিকেও তিনি ধীরে ধীরে সহ্য করে নেয়া শিখে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার নির্দেশ মেনে নেওয়া সব সময় সহজ হতো না।
“আংকেল, আপনার ব্রেক এখন।”
“আরও দশটা মিনিট পরে নেই?”
“অন্যজন আসছে। আপনাকে এখনই ছাড়তে হবে।”
“দশ মিনিটে কীই বা হবে?”
নাবিলা এবার একটু শক্ত স্বরে বলল, “স্কেজ্যুলটা আমাকে মিলাতে হয়।”
তিনি চুপ করে রেজিস্টার ছাড়লেন।
ব্রেকরুমে গিয়ে মনে মনে বললেন, এই মেয়ে তাঁর ডিপার্টমেন্টে থাকলে আগে কথা বলার ভঙ্গি শিখাতেন।
তারপরই আরেকটি চিন্তা এলো, তাঁর ডিপার্টমেন্টে থাকলে মেয়েটি তাঁকে সুপারভাইজ করার কাজই পেত না।
চিন্তাটা ভালো লাগল না।
রাতে রওশনকে বললেন, “আজকালকার ছেলেমেয়েরা খুব সরাসরি কথা বলে।”
রওশন কাপড় ভাঁজ করছিলেন।
“তুমিও তো বলতে।”
“আমারটা আলাদা।”
“হ্যাঁ। তোমারটা আমরা সবাই চুপ করে শুনতাম।”
তিনি স্ত্রীর দিকে তাকালেন। রওশন আর কিছু বললেন না। একটি শার্ট ভাঁজ করে তাঁর দিকে এগিয়ে দিলেন।
বাংলাদেশি পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার আশঙ্কা যে তাঁর ছিল না, তা নয়। দোকানে ঢুকেই তাই দূর থেকে বাংলা কথা শুনলে একসময় মাথা নিচু করে ফেলতেন। পরে নিজের ওপর বিরক্ত হতেন। সৎ কাজ করতে লজ্জা নেই, এ কথাটা তিনি ছেলেকে বলেছেন। এখন তাহলে তিনি কেন লজ্জা পাচ্ছেন?
এক শনিবার দুপুরে পরিচিত গলা শুনলেন।
“আরে, মাহমুদ ভাই?”
চিশতী সাহেব। কমিউনিটির নানা অনুষ্ঠানে দেখা হয়। দেশে ব্যাংকে কাজ করতেন। এখন মেয়ের কাছে থাকেন। মানুষের খবর রাখার প্রবল আগ্রহ। দেশের কিছু মিডিয়া আছে না যেকোন খবরকেই চটকদার মশলাদার বানিয়ে ভাইরাল হওয়ার চেষ্টা করে? এই লোকটাও তেমনই।
মাহমুদ সাহেব হাসলেন।
“কেমন আছেন?”
চিশতী সাহেব তাঁর নীল ভেস্টের দিকে তাকালেন, তারপর রেজিস্টারের দিকে।
“এখানে চাকরি করেন ভাই?”
“হ্যাঁ ভাই। আপনি এখানেই কেনাকাটা করেন নাকি?”
চিশতী সাহেব জিনিস তুলতে তুলতে বললেন, “আরিফ তো বড় চাকরি করে শুনলাম। আপনাকে কেন কাজ করতে হয়?”
"বাসায় বেকার বসে থাকতে ভাল লাগেনা, তাই এখানে কাজ শুরু করেছি।”
“এই বয়সে আপনার আবার কষ্ট করার কী দরকার?”
পেছনে লম্বা লাইন। একটি শিশু কাঁদছে। স্ক্যানারের আলো জ্বলছে।
মাহমুদ সাহেব বললেন, “দুধটা একটু এগিয়ে দেন ভাই।”
চিশতী সাহেব ফেরার সময় মুখ কাছে এনে বললেন, “কোনো অসুবিধা হলে বলবেন কিন্তু। আমরা আছি।”
মাহমুদ রসিদ এগিয়ে দিলেন।
“ধন্যবাদ।”
সেদিন রাতে আরিফের ফোনে একটি ছবি এলো।
ছবিতে মাহমুদ সাহেব রেজিস্টারে দাঁড়িয়ে। মুখটা সামান্য ঝাপসা। নিচে লেখা "মাহমুদ ভাইকে আজ ওয়ালমার্টে দেখলাম। ছেলে বড় চাকরি করার পরেও এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে খেটে নিজের জীবন চালাতে হচ্ছে। সবাই তাঁর জন্য দোয়া করবেন।"
আরিফ ফোনটা টেবিলে রাখল।
“এইটাই বলছিলাম।”
তিনি ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁকে না জানিয়ে ছবি তোলা হয়েছে, এই রাগটা আগে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই অন্য কিছু এসে বসল বুকের ভেতর। ছবিতে তাঁকে বয়স্ক দেখাচ্ছে। ভেস্টটা একটু ঢোলা। কাঁধ আগের চেয়ে নুয়ে গেছে।
“দোয়া করতে বলছে কেন?” রওশন জিজ্ঞেস করলেন।
আরিফ উত্তর দিল না।
“তুমি কাল থেকে যাবে না,” সে বলল।
মাহমুদ মাথা তুললেন।
“কে বলল?”
“আব্বা, প্লিজ। তোমার কষ্ট করা দেখতে আমার ভালো লাগে না।”
“তুই জানলি কিভাবে যে আমার কাজ করতে কষ্ট হয়?”
“ছবিতেই তো দেখছি!”
এই প্রথম মাহমুদ ছেলের গলায় শুধু লজ্জা নয়, ভয়ও শুনলেন।
আরিফ একটু পরে নিচু স্বরে বলল, “তোমার বয়স হয়েছে। এতক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকো। যদি কিছু হয়?”
মাহমুদ সাহেবের রাগ কিছুটা নরম হলো। কিন্তু সেই নরম জায়গায় কথা বেরোল না। বেরোল পুরোনো গলার স্বর।
“আমার কী করা উচিত, সেই সিদ্ধান্ত আমি এখনও নিতে পারি।”
আরিফ চুপ করে গেল।
মাহমুদ সাহেব ওই গম্ভীর স্বর বহু বছর অফিসে কাজে লাগিয়েছেন। এবার নিজের বাড়িতে সেটা ব্যবহার করলেন।
এর দুই সপ্তাহ পর ফরিদা একটি খাম নিয়ে তাঁর কাছে এলেন।
“ভাই, একটু দেখবেন?”
বিরতির সময় প্রায় শেষ। মাহমুদ খাম থেকে কাগজ বের করলেন। স্কুল ডিস্ট্রিক্টের একটি বিজ্ঞপ্তি। মেয়ের জন্য অভিভাবকের সম্মতি লাগবে।
ফরিদার মেয়ে নার্সিং পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্কুলে থাকতে বিজ্ঞান বিভাগে ভালো করেছে, কলেজে ভর্তি হওয়ার খরচ নিয়ে এখন নানা হিসাব।
“মেয়েটা বুঝিয়েছে,” ফরিদা বললেন, “তাও আপনাকে দিয়া দেখালাম। সইটই ভুল জায়গায় দিলে আবার কী হয়।”
মাহমুদ কাগজ বুঝিয়ে দিলেন।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “দেশে কোথায় ছিলেন?”
“নারায়ণগঞ্জ। পরে ঢাকা।”
“চাকরি করতেন?”
“না। সংসার করতাম।”
কথাটা বলার মধ্যে কোনো সংকোচ ছিল না।
“আপনার স্বামী?”
“এখন ড্রাইভিং করে। দেশে ওষুধ কোম্পানিতে ছিল।”
মাহমুদের হাত থেমে গেল।
“কোন কোম্পানি?”
ফরিদা নাম বললেন। তাঁরই কোম্পানি।
“কী নাম?”
“শওকত আলী। সেলসে ছিল। আপনি হয়তো চিনবেন না। আপনারা তো অনেক ওপরের মানুষ ছিলেন।”
শেষ বাক্যটা ফরিদা সহজভাবেই বলেছিলেন। তবু মাহমুদের মনে হলো, কেউ তাঁর চেয়ারটা হঠাৎ পেছন থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
শওকত আলী।
নামটা সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল না। কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে মনে পড়ল।
একটি মিটিং রুম। টেবিলে সেলস রিপোর্ট। পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি এলাকার ফল খারাপ। শওকত নামের একজন টেরিটরি ম্যানেজার পরপর দুই প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেনি। তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এলাকায় বন্যা, পণ্য সরবরাহের সমস্যা, লোকটির স্ত্রী অসুস্থ।
মাহমুদ রিপোর্টের পাতায় কলম ঠুকে বলেছিলেন, “সবারই ব্যক্তিগত সমস্যা আছে। কোম্পানি তো চ্যারিটি না।”
এরপর কী হয়েছিল? তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন।
শওকত একদিন তাঁর ঘরের বাইরে এসেছিল। এইটুকু মনে আছে। ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে চেয়েছিল। সেদিন ফ্রেঞ্চ প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিটিং ছিল।
তিনি বলেছিলেন, “এইচআরের সঙ্গে কথা বলেন।”
তারপর?
মাহমুদ পাশ ফিরলেন। রওশন ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
পরদিন ফরিদাকে এড়িয়ে চললেন। তৃতীয় দিন সেটা আর সম্ভব হলো না। ফরিদা এসে বললেন, “শুক্রবার আসবেন কিন্তু। মেয়ের জন্মদিন। ভাবিকেও নিয়া আসবেন।”
মাহমুদ বললেন, “আপনার স্বামী কি আমাকে চেনেন?”
ফরিদা একটু অবাক হলেন।
“আপনার নাম বলছি। বলছে, চিনে। খুব করে আসতে বলছে।”
মাহমুদের মনে হলো, না যাওয়ার একটি কারণ খুঁজে পাওয়া খুব জরুরি।
শুক্রবার তাঁর কোনো কাজ ছিল না।
অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতেই রান্নার গন্ধ পেলেন।
ছোট বসার ঘর। এক পাশে মেয়ের পড়ার টেবিল। দেয়ালে স্কুলের সার্টিফিকেট। সোফার পেছনে শুকাতে দেওয়া কাপড় তাড়াতাড়ি গুটিয়ে রাখা হয়েছে। রওশন হাতে কেকের বাক্স নিয়ে ভেতরে গেলেন।
শওকত দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।
বয়সের তুলনায় চুল বেশি পেকেছে। পেট সামান্য বেড়েছে। কিন্তু চোখ দেখে মাহমুদের মনে পড়ল। সেই অপেক্ষা করে থাকা মানুষটি।
“আসেন, স্যার।”
সম্বোধনটা শুনে মাহমুদের বুক শক্ত হয়ে গেল।
“এখন আবার স্যার কেন?”
শওকত অমায়িক হাসল।
“কি যে বলেন স্যার! আপনি আমার বাড়িতে এসেছেন এ যে আমার কী সৌভাগ্য!”
খাবার টেবিলে ফরিদা এত কথা বলছিলেন যে মাহমুদ কৃতজ্ঞ বোধ করলেন। মেয়ে সাবা কেক কাটল। রাফি এসেছে। নাবিলা এসেছে তার ছোট ছেলেকে নিয়ে। ঘরের একমাত্র ভালো চেয়ারটিতে তাঁকে বসানো হয়েছে দেখে মাহমুদ সাহেবের অস্বস্তি হলো। তিনি রাফিকে ডাকলেন।
“এইখানে বসো। আমি ওদিকে বসি।”
রাফি বলল, “না না, আংকেল, আমি ঠিক আছি।”
তিনি আর জোর করলেন না। ভালো চেয়ারটি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছার মধ্যেও নিজের কর্তৃত্ব ঢুকে আছে কি না, হঠাৎ তা নিয়ে সন্দেহ হলো।
খাওয়ার পর বারান্দায় শওকতের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
নিচে পার্কিং লট। একটি গাড়ির হেডলাইট জ্বলল, নিভল।
অনেকক্ষণ পর মাহমুদ সাহেব বললেন, “আপনার চাকরির বিষয়টা আমার মনে আছে।”
শওকত নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
“অনেক দিন আগের কথা, স্যার।”
“আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।”
“জি।”
“দেখা করা উচিত ছিল।”
শওকত এবার তাঁর দিকে তাকাল। মুখে কোনো প্রস্তুত হাসি নেই।
তিনি বললেন, “আমি কেবল রিপোর্টটাই দেখেছিলাম।”
বাকিটুকু তিনি শেষ করতে পারলেন না।
ভেতর থেকে সাবার হাসির শব্দ এলো।
শওকত ধীরে বলল, “আমি সেদিন চাকরিটা বাঁচাইতে আসিনি স্যার।”
মাহমুদ তাকালেন।
শওকত বলতে থাকলো, “তখন বুঝে গিয়েছিলাম যে চাকরি থাকবে না। পাওনাটা একটু তাড়াতাড়ি দেওয়ার জন্য আসছিলাম। ফরিদার জরুরি অপারেশন ছিল। খুব বিপদে পড়েছিলাম।”
মাহমুদের মুখ শুকিয়ে গেল।
কী বলা যায়, তিনি ভেবে পেলেন না। তাঁর বহু বছরের পরিশীলিত ভাষা, মিটিংয়ে কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা কিছুই কাজে লাগল না।
“আমি জানতাম না। আমরা আসলে বুঝতে পারিনা যে রিপোর্টের সংখ্যার আড়ালে একেকটি রক্তমাংসের মানুষ থাকেন, যাদের সংসার থাকে, সত্যিকারের জীবন থাকে।”
শওকত আবার পার্কিং লটের দিকে তাকাল।
“আমি বলার সুযোগ পাই নাই স্যার।”
কথাটা খুব নিচু স্বরে বলা। তাতে অভিযোগের জোর নেই। সেই কারণেই মাহমুদ সাহেবের সহ্য করতে বেশি কষ্ট হলো।
তিনি বললেন, “আমাকে মাফ করবেন। I am sorry.”
শওকত সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলল না। তারপর বলল, “সাবা তখন ছোট ছিল। এখন বড় হয়ে গেছে।”
মাহমুদ মাথা নাড়লেন। তিনি বুঝলেন, এই কথোপকথনের একটি সুন্দর শেষ তিনি চাইলেই পাওয়া যাবে না।
ভেতর থেকে ফরিদা ডাকলেন, “চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!”
ফেরার আগে শওকত দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল।
“আসবেন আবার স্যার।”
শওকত অভ্যাস বশতঃ হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারপরে কি মনে করে গুটিয়ে নিল। হয়তো মনে পড়ে গেছে যে দেশে থাকতে এই লোকটা তাঁর অফিসের বিরাট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। প্রায় ঈশ্বরতুল্য। তাঁর একেকটি সিদ্ধান্তে শওকতের মতন অসংখ্য কর্মচারীদের পরিবারের ভাগ্য পাল্টে যেত। তাঁদের এইভাবে ধরাছোঁয়ার অধিকার তাঁদের ছিল না।
মাহমুদ সাহেব তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরলেন। তারপরে জড়িয়ে ধরে বললেন, "আমাকে নিমন্ত্রণ করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আবার দেখা হবে।""
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৫৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার মনের ঘোর গেলো না (উৎসর্গঃ প্রিয় ব্লগার ইমন জুবায়ের)

লিখেছেন চারাগাছ, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩১




আমার মনের ঘোর গেলো না


উৎসর্গ

প্রিয় ব্লগার ইমন জুবায়েরের স্মৃতির প্রতি।

তিনি নেই। অনেক বছর হলো।

তবু তাঁর ব্লগে ঢুকলে মনে হয়, কোথাও যেন কিছুই থেমে নেই। লেখাগুলো আছে, শব্দগুলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

জঙ্গল পরিষ্কার করে সাপ তাড়ানাে...

লিখেছেন অপলক , ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪১

নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে: পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে বসবাসকারী স্থায়ী হিন্দু অধিবাসীরা চাইলে খুব সহজে তাদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত। যদি এই খবরটা সত্য হয়, তবে বাংলাদেশের জন্য সেটা মারাত্মক ভয়ঙ্কর ঘটনা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাড়ে হাজার বিজ্ঞানী এবং একটি স্ক্যামের গল্প

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘নলেজ করিডোর’-এর আওতায় আল্লামা ইকবাল বৃত্তি চালু করে। ২০২৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৮


হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×