somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘুষনামা-আমার জীবনে একমাত্র ঘুষ দেয়ার গল্প

৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হঠাৎ ঘুষখোর সরকারী চাকরগুলি ইউনুসের আমলে কয়েকদিনের জন্য ফেরেশতা হয়ে গেল। ফেরেশতার ভং ধরেও এরা ঘুষ খাওয়ার জন্য প্রেমিকাদের এক ছলনাময়ী টেকনিক অবলম্বন করল। জনগনকে সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট দেয়া শুরু করল। মুখ বন্ধ, কাজ বন্ধ, ফিরেও তাকায় না, মুখটা কালো করে চুপটি করে বসে থাকে। মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হচ্ছে না, কারন ঘুষ বন্ধ। কোন নির্দেশনা বা তথ্যও দিবে না, আবার মুখ ফুটে কোন ঘুষও চাইবে না। জনগন অন্ধের মত এক টেবিল থেকে আরেক টেবিল, এক অফিস থেকে আরেক অফিস ঘুরছে, দিন যাচ্ছে রাত যাচ্ছে টেনশন বাড়ছে-কোন কাজ হচ্ছে না। সবাই বলছে-দেশ থমকে আছে, কিছুই চলছে না। এ অবস্থায় প্রেমিক নিজে থেকে হাজারো উপায় খুঁজতে থাকে যে কিভাবে প্রেমিকাকে ঘুষ খাওয়ানো যায়, যে করেই হোক অন্ধকার মুখে হাসি ফোটাতই হবে। না হলে কাম হবে কি করে! দেশের এমন এক দুর্দিনে, আমি আমার মায়ের কেনা একটা জমির নামজারী করতে যেয়ে ভুমি অফিস থেকে এসিল্যান্ড অফিসে দৌড়াতেই ছুটির অর্ধেক সময় শেষ করে ফেলেছিলাম। যা বুঝলাম, এসিল্যান্ড মহাশয় কখন কোথায় থাকেন কেউ জানেন না। বদলী হবে হবে এমন একটা শোরগোল শোনা যাচ্ছে। একবার নাকি বদলি হলে পরের স্যার আসলে আরও বেশি কাল ক্ষেপন হবে। এজন্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বিশাল লম্বা লাইন। এর ভেতর এক জুনিয়র অফিসার আমাকে বলল, সেই এপ্রিল এর আবেদন এখনও পড়ে আছে, অনেকের শুনানীর ডেট দিছে কিন্তু শুনানী হচ্ছে না। আপনারা হুড়োহুড়ি করবেন না। স্যার আসলে এক এক করে যাবেন। সেই স্যার তো আর আসেন না। এই এসিল্যান্ড এবং এদের চাটার দল, একজন আরেকজনের চেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ, এবং এদের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শাস্তি হল নতুন জায়গায় বদলি করে দেয়া। যেখানে আবার নতুন উদ্দ্যমে কয়েকদিনের ভেতর লোক সেটআপ দিয়ে কেয়ামতের আগের দিন পর্যন্ত এরা ঘুষ খেতে থাকবে। যাইহোক, কবে এবং কখন যে এই এসিল্যান্ড মহাদয় অফিসে আসবে এই আশায় সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্ষন্ত মানুষগুলি বসে থাকে। আমি বিদেশি রীতিতে অভ্যস্ত মফিজ, আমার ওয়েটিং পজিশনটা জানার চেষ্ট করছি। কোন টোকেন সিস্টেম আছে কি না এই তথ্যটাও কেউ দেয় না। হাজারো ধরনের জমিজমার সমস্যা নিয়ে গরীব মানুষগুলি অপেক্ষা করছে। পরনে ময়লা কাপড়, লুঙ্গি-শাড়ি পরা মানুষজন এসেছে কয়েক জেলা দুর থেকে শুনানীর জন্য, রাতের ভেতর ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। অনেক কষ্টে শুনানীর দিন পেয়েছে কিন্তু শুনানীর ক্ষন পায় নাই। কোন ক্ষণে যে এসিল্যান্ড রাজামশাই আসবেন এই আশায় দুধের বাচ্চা কোলে নিয়ে সেই সকাল সাড়ে নয়টা থেকে একমহিলা দলিল/পর্চা/খতিয়ান/নামজারী/দাখিলা নিয়ে প্রত্যেকদিন আসে আর শুনানীর আশায় বসে থাকে। আমি এই এসিল্যান্ড নামক রাজামশাইকে দেখার জন্য সপ্তাহ খানেক ধরে দৌড়াচ্ছি, কেউ কিছু বলে না। এমন এক মুহুর্তে, স্যার আসছে স্যার আসছে বলে সবাই অফিসের দরজায় বিশাল ভিড় জামালো। আমি তাকিয়ে দেখলাম, আগা গোড়া হিজাবি এক ভদ্র মহিলা সাইট দেন করে চেঁচাতে চেঁচাতে ঘরে ঢুকল। ২-৪ দিন দৌড়ানোর পর যা বুঝলাম, কানুনগো সাহেব হল এই এসিল্যান্ড মশাইয়ের নিচের পদ। ভদ্রলোক-কে আমার সমস্যার কথা বললাম, সব কাগজপত্র দেখালাম, বললাম ভুমি অফিস থেকে রেকর্ডের পাতা গায়েব হয়ে গেছে, মূল দলিল থেকে শুরু করে আমাদের বাকি সব কাগজপত্র আছে, এখন নামজারী করতে কি করতে হবে। উনি শুনে চট করে চেয়ার থেকে উঠে বললেন- হবে না, বলেই হন হন কারে নামাজে যাচ্ছেন আমি পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি, বলে কি হবে না, আমার কলিজা ধাক করে উঠল। আমি আর আব্বা নামাজ থেকে বের হয়ে ওনার জন্য বসে আছি, উনি কেন যেন উধাও হয়ে গেলেন। ভদ্রলোককে বাকি বেলা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলে না। আমার জানা দরকার ছিল যে, ভুমি অফিস থেকে যে রেকর্ডবুকের পাতা গায়েব হল, কোন ছাগলে পাতাটা খেলো? এ অবস্থায় আমরা কি করতে পারি? যাইহোক, উনি কোথায় উধাও হলেন, কেউ সেই বিকেলে আর বলতে পারলেন না। এভাবেই দিন যাচ্ছে, মানুষগুলির হয়রানী বাড়ছে, কোন কাজ হচ্ছে না। কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলাম কাল কখন আসব, আমার পরবর্তীতে কি করনীয়, কেউ কিছু জানেন না, কেউ কিছু বলবেন না। আবার পরদিন সেই সকাল থেকে আমি আর আব্বা কানুনগো সাহেবের জন্য বসে আছি। সেই বেলা ১১ টায় জনাব আসলেন, আমাদের মত আরও ১০-১৫ জন ওনার সাথে দেখা করার জন্য হুড়মুড় করে ওনার রুমে ঢুকতে যাচ্ছে। আমি বাহিরে বসে অপেক্ষা করছি যে একটু ফাঁকা হলেই ঢুকব। এর ভেতর উনি একবার চা খেতে যায়, আরেকবার নামেজে যায়, তারপর ভাত খেতে যায় আর প্রত্যেকবার আমার বুকটা ধুকধুক মোচড় দিয়ে ওঠে, ঠিক যেন প্রেমিকাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেললাম। আমি আর আব্বা অপেক্ষা করতে থাকি শুধু শোনার জন্য যে আমাদের এখন কি করতে হবে। এই যে আপনার কি করতে হবে, এটাই আর কেউ বলে না। ফেরেশতার ভং ধরার কারনে ঘুষটাও কেউ চায় না। যাইহোক আমি আর আব্বা সিংগাড়া খাওয়ার জন্য নিচে গেলাম। কাচারীবাজার এর প্রিন্টিং মেশিন এর অপারেটর কথায় কথায় আমাদের সমস্যাটা জানলেন, এরপর আমাকে একজন ছেলের সাথে দেখা করিয়ে দিলেন। উনি আমার কাছে ৩০ হাজার টাকা চাইলেন আর বললেন, এসিল্যন্ড স্যারের সাথে তার বিশাল কানেকশন এবং আমাকে একটা এপ্লিকেশন এর লিস্ট দেখালেন, সন্ধ্যার পর উনি ৩ লক্ষ্য টাকা নিয়ে সরাসরি ওনার বাসায় যাবেন এই লিস্টের সব খারিজ করে নিয়ে আসবেন। এখন আমি বুঝলাম, এসিল্যান্ড সাহেব কেন অফিসে থাকেন না। বাসায় সব কাজ করেন উনি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, ভাবলাম এভাবে আবার হয় নাকি!! নিশ্চই ধাপ্পাবাজি। ছেলেটাকে মোবাইল নম্বর দিলাম এবং বললাম, পরে জানাবো। পরেরদিন, সে আমার বিশ্বাস অর্জনের জন্য সাবেক এক অবসরপ্রাপ্ত ভুমি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। উনি জানালেন, আসলে আপনার যে কেস, রেকর্ডের পাতা ছেড়া, টাকা ছাড়া এরা করবে না। আমি বলে কিছুটা কমিয়ে দেব, ছেলেটা ভাল, কাজ করে নেন। উনি জানালেন, জমির মূল রেকর্ড বুক বা খতিয়ান প্রধানত কয়েকটা কপি তৈরি করা হয় এবং এগুলো সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অফিসে (জেলা, উপজেলা পর্যায়ে) সংরক্ষিত থাকে। একটা খোয়া গেলেও আরেকটা থেকে ভেরিফাইড করা যায়। এই কথাটাই কেউ বলল না, অথচ আমি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এদের পেছেনে ঘুরছি। যাইহোক দিন চলে যাচ্ছে, আম্মা বলছে, কাজটা তুই থাকতেই করে দিয়ে যা। এর ভেতর প্রিন্টিং মেশিন এর ছেলেটা জানালো, সেই হিজাবি এসিল্যান্ড নাকি তার দুর্নীতির পুরস্কার হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে সামনের সপ্তাহে কোন এক জেলায় TNO-হয়ে বদলি হয়ে যাবেন। এর ভেতর কাজ যদি না করাতে পারি তাহলে, আমাদেরটা আর হবে না। নতুন এসিল্যান্ড কেমন হবে কে জানে, কাজ ঝুলে যাবে, এটাই তার কথা। এদিকে আমার অষ্ট্রেলিয়া ফিরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল, শেষমেশ ঘুষ দিব না, দিব না করেও, ঘুষ দিলাম। ৩ দিনের ভেতর নামজারী রেডি করে আমাকে প্রায় বাসায় দিয়ে আসল। এই হল ঘুষের কেরামতি। এই সরকারী ঘুষখোররা এমন এক সিস্টেম বানিয়ে রেখেছে। এদেরকে আপনারা ঘুষ না দিয়ে কিভাবে এড়িয়ে চলবেন??? আপনি নিজেই সরকারী চাকুরে হওয়ার পরও যেদিন পেনসনের টাকা তুলতে যাবেন, সেদিন নিজেই নিজেদের কেরামতির চক্করে পড়বেন। এদের মুখে টাটকা কুসুম-গরম ভাপ-ওড়ানো কাঁচা-গু ছুড়ে মারতে পারলে মনটা কিছুটা শান্তি পেত। এই জানোয়াররাই দেশটাকে ধর্ষন করছে প্রতি মুহুর্তে।

বি।দ্র: ধন্যবাদ সেই ছেলেকে যে মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে ঘুষের প্রতিবাদে ‘ঘুষ ডট সাইট’ এর সূচনা করল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:০৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্ত-গায়েব-গুম এবং পিওর ও শিওর লাভ

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:১৬


৭ মাসে বাংলাদেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ !!!
এমন রোমহর্ষক, চমকে যাওয়া এবং অন্তরে কাপুনি ধরানোর মতো তথ্য বা কথা বার্তার কোনও মানে হয় ??!!
গরীব পরিবারের শিশুদের কথা বাদ দেই-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারী অফিসারদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০০

দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সরকারী অফিসারদের হাত ধরেই হয়। সেজন্যে, এই পদগুলো যোগ্য মানুষদের হাতে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, গত কয়েক দশকে দেশের টপ ট্যালেন্টদের বেশির ভাগই কোনক্রমেই সরেকারী অফিসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×