somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাসান : ঘোরলাগা ভোরের আজান

০৩ রা জুন, ২০১৬ রাত ১০:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জীবন চলবে জীবনের মতো— এই সত্যটা বুঝতে আমাদের বছরের পর বছর লেগে যায়। যারা গল্প-উপন্যাস লেখেন, তাদের কারও কাছেই জীবনটা জীবনের মতো আর থাকে না। জীবন হয় গল্পের মতো, কিংবা গল্পের রসদ না থাকলে সে-জীবন যে ব্যর্থ—এটা বোঝাতে শিল্পীরা কত কোশেশই না করছেন নিরন্তর। এই দেখে দেখে আমাদের হয় কি, একটু ভাবালু হলেই চোখের সামনে সিনেমার দৃশ্য ভেসে ওঠে— আহ্, আমার জীবনেও কত দু:খ! নায়ক-নায়িকাদের মতো। শিশুরাও বালিশের গায়ে ঘুষি দিতে গিয়ে বলে— ইয়া ঢিশুম, ঢিশুম । যেনো ঢিশুম না বললে ঘুষিটা জমে না মোটেই ।

মাসান নিয়ে এই কথাটা বিশেষ করে বলার মতো— ভালো না লাগুক, এখানে গল্পের মতো জীবন টেনে আনার কসরত লক্ষ্য করা যায় নি । এখানে জীবন চলেছে জীবনের মতো ।


দেবী— এই ছবির প্রধান চরিত্র, এই মেয়েটা যখন তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে মিলিত হতে গিয়ে একটা স্ক্যান্ডালের মুখে পড়ে, অর্থাৎ কয়েকটা নোংরা পুলিশ মোবাইলে ভিডিও তুলে ব্ল্যাকমেলের পর্যায়ে নিয়ে যায় পরিস্থিতিটাকে এবং একই সঙ্গে টয়লেটে পীযুষ ছেলেটা হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করে, তখন দর্শক হতাশ হয়ে ভাবতে বসে, এরপর দৃশ্যে দেখা যাবে, এই ভিডিও ক্লিপ অন্তর্জালে দেয়া হবে, ইউটিউবে বদৌলতে ছড়িয়ে যাবে হাতে হাতে, তারপর মেয়েটা লড়াইয়ে নামবে— এমন নানান কিছু । অথচ ছবিতে এমন কিছুই ঘটে না । কেবল পুলিশ ঘরে এসে দাপটে যায়, অর্থের জন্যে । সেই অর্থও বাবা পরিশোধ করেন, করতে থাকেন । তিনলক্ষ রুপি পরিশোধ নিয়েও কোনো বুর্জোয়া গল্প হয় না, বাবা-মেয়ের সংসার, সেখানে হাপিত্যেশ করারও কেউ নেই । পুলিশের পীড়ন দেখে মনে ক্রোধ জাগলে মনে হয়, এই পুলিশটা শেষমেশ শ্মশানে জ্বলবে । কিন্তু জীবন যেহেতু সিনেমার মতো পরিণতি বয়ে আনে না, তাই এখানেও পুলিশ বেঁচে যায়, আমাদের সমাজের পুলিশের মতোই ।

একটা শিশু অভিনেতা আছে এই ছবিতে— নিখিল সাহনি । শিশুর জৌলুস নেই তাতে, দরিদ্র প্রকট করে তুলবারও কোনো আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় নি । শিশুটা পানিতে ডুবে ডুবে দেবীর বাবার জুয়ার পয়সা তোলে এবং একবার তলিয়েও যায়, তারপর বেঁচেও ওঠে । জলে যায় ১০ হাজার রুপি, কিন্তু উঠে আসে সোনার আংটি । না, এখানেও কোনো নাটকীয়তা নেই, তবে নাটক তো আছে অবশ্যই ।


এই আংটিটা কোত্থেকে এলো, সেই গল্পও আছে সিনেমায়। দেবীর গল্প যেমন এখানে টালমাটাল, বৈধ-অবৈধ নানা রকম প্রশ্নের মুখোমুখি। তারই পাশাপাশি একটা মিষ্টি প্রেমের সমান্তরাল কাহিনি চলতে থাকে অবিরল। যে প্রেমের ভিতরেও এক প্রকান্ড সামাজিক ব্যবধান। জাতিভেদ— এই বিষয় নিয়ে বহু ছবি হয়েছে, কিন্তু এখানে তা ‘মুখে’ বলার কোনো জোর চেষ্টাই উঠে আসে নি। তাই দেখতে দেখতে চোখ ভিজে আসে ভালো লাগায় । একটা অচেনা প্রেমের সুর বেজে ওঠে হু হু করে বৈশাখী বাতাসের মতো।

শ্মশান— হ্যাঁ, মাসান মানেই শ্মশান । এই শ্মশান ডোমে যারা মড়া পোড়ায়, সেই নিম্নবিত্ত থেকে উঠে আসা একটা চিত্র হলো দীপক। প্রেমটাও হয় স্বাভাবিক, সবার যেমন হয় আজকাল, তেমন করেই । ফেসবুকে যোগাযোগ গাঢ় হয়, বন্ধুর বাইকে ঘুরতে যাওয়া হয়, হয় মনোমলিনতা, তারপর বিরহ। এখানেও নাটকীয়তা ছাড়া একটা নাটক জমে ওঠে । নিজ হাতে নিজের প্রেয়সীকে শ্মশানে পোড়ানোর নাটক । ‘মানুষকে কখনো জ্বলতে দেখেছো? কিভাবে জ্বলে অঙ্গার হয় জানো?’ জানে না প্রেয়সী, অভিমান... কিংবা সেটা জানতেই মড়ক হয়ে ফিরে আসে শ্মশানে । এ এক অসম্ভব চিত্র ! শ্মশানের ছাই থেকে তুলে আনা প্রেয়সীর আংটিটাও বিরহে অস্থির হয়ে যখন ছুঁড়ে ফেলে প্রেম, তখনও কে জানতো, এটাই নিখিলের জুয়ার পয়সা তুলতে গিয়ে তলিয়ে যাবার আসল কারণ।


মাসানে কিচ্ছু নেই, কোনো কাহিনীর আরাধ্য পরিণীতি নেই, কোনো প্রত্যাশিত তর্ক নেই, কোনো এপিক, এথিক, ফিলোসফি নেই । তবু কেনো ফ্রান্সের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শনের পর উপস্থিত দর্শকরা দীর্ঘ পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছিলো, সেটা বুঝতে বোদ্ধাদের একটুও কষ্ট হয় না। তসলিমা এই ছবি দেখে বাক হারিয়ে ফেলুক, পরিণীতি দেখতে দেখতে অঝোর ধারায় কাঁদুক, কিংবা আমিরেরা সস্ত্রীক সিনেপ্লেক্সে গিয়ে প্রমোদ লাভ করুক, তাতে বেনিফিশিয়ারি গোষ্ঠী ছাড়া কার কি স্বার্থ আছে, বলুন! কিন্তু আমরা বলি, মাসান জীবনকে জীবনের মতো চলতে দেয়ার যে আজান দিয়েছে, সেই শিক্ষাটা অন্তত আমাদের কুশলীরা হাসিল করুক— এইটুকু যেনো আমরা আগামি দিনে স্বচক্ষে দেখি, তাহলেই মাসান স্বার্থক হবে।

Film : Masaan
Rating : 8.2/10 (5,419 votes)
Director : Neeraj Ghaywan
Writer : Varun Grover
Stars : Richa Chadda, Sanjay Mishra, Vicky Kaushal, Pankaj Tripathy
Runtime : 109 min
Rated : N/A
Genre : Drama, Romance
Released : 24 Jun 2015
Plot : Four lives intersect along the Ganges: a low caste boy hopelessly in love, a daughter ridden with guilt of a sexual encounter ending in a tragedy, a hapless father with fading morality, and...

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুন, ২০১৬ রাত ১০:৪০
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝর্ণা জল

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২১


আমি ব্যস্তবতা দেখি
পানকৌড়ির সাঁতার-
কল্পনায় শুধু স্বপ্ন আঁকি,
মধ্যবিকাল ঢেউ তোলা সাগর
হতাশা ডিঙিয়ে যায়- নিরিবিলি
রাত দুপুরের বাসর।

উড়ে ধোয়া, নিঃশ্বাসে সাদা বক,
খেলা করে যে, প্রণয়ের চক-
নীল মেঘ ভীর জমায়, বর্ষা কাঁদাময়,
ভোরের ক্লান্তি দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কো রুবিও ভারতে কী করছেন?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২


আওয়ামী দোসর নবনীতা আপার মতে, মার্কো রুবিও ভারতে গেছেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে। ডিসেম্বর মাসে যাতে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন, সেই আলোচনা করতেই নাকি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×