গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা কাবেরী যমুনা ঐ বহিয়া চলেছে আগের মতন, কই রে আগের মানুষ কই।
::::: :::::
আজকাল সরল মানুষ, সত্য কথা আর অকৃত্রিমতার বড় আকাল! সরল মানুষের কথা ভাবতেই মনে পড়ে সেই ছোট্টবেলার কথা; আমাদের ঘরে একজন বয়স্ক বিশ্বস্থ মানুষ থাকতেন। আমাদের গ্রামেরই। বুদ্ধিহীন নন্ কিন্তু যথার্থ অর্থেই সহজ-সরল ও অকৃত্রিম! এমন সহজ-সরল ভাল মানুষ অদ্যাবধি জীবনে আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও আত্মার আত্মীয় ছিলেন। নাম না নিয়ে তাঁকে আমরা ভাইবোনেরা ‘দিল্লর ভাইয়ের বাপ’ বলেই ডাকতাম। [দিল্লর আলী নামের তাঁর এক ছেলে ছিল; সেও যার পর নাই সহজ-সরল। অক্ষরজ্ঞান ছিল না কিন্তু মমতা আর সরলতায় ভরা মন ছিল; সে বয়সে আমার বড় কিন্তু ঘনিষ্টতায় মাখামাখি ছিল; একজন আরেকজনকে তুই বলেই সম্বোধন করতাম!]
.
প্রায় ৩৫ বছর আগের একটি ঘটনা মনে পড়ছে— একদিন এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আমার মা ‘দিল্লর ভাইয়ের বাপ’কে ৫০গজ দূরের পার্শ্বের বাড়ি থেকে একটি ‘‘গায়েরি’’ (তলায় ছিদ্রবিশিষ্ট বিশেষ ধরণের ডেগ বা ডেকছি যা 'ভিন্নীভাত' রান্না এবং 'ছই' পিঠা তৈরীতে ব্যবহৃত হত) নিয়ে আসতে বললেন; (ডেগটি আমাদেরই, কোন কাজে হয়ত ওরা সেটা নিয়েছিল)। কিন্তু লম্বা সময় ‘দিল্লর ভাইর বাপ’ ডেগ নিয়ে না আসায় মা বিরক্ত হচ্ছেন দেখে আমি নিজে বৃষ্টিতে ভেজার মজা নিতে নিতে ঐ বাড়ির পানে কয়েক গজ অগ্রসর হতেই দেখি ‘দিল্লর ভাইয়ের বাপ’ আরু দুজনের সহযোগিতায় বেশ কষ্ট করে এক ওজনদার ‘ঢেঁকি’ বয়ে নিয়ে ঘরে ফিরছেন! দৌড়ে যেয়ে মাকে খবরটা দিতেই ঘরে হাসির রোল পড়ে যায়। ডেগের বদলে ঢেঁকি! হা হা হা...[উল্লেখ্য, তিনি কানে কিঞ্চিৎ কম শুনতেন।]
.
আসলে ঐ সরল মানুষটার স্মৃতি একদিনের জন্যেও ভুলতে পারিনি। মার কথা মনে হলেই তার কথাও মনে হয়। (আল্লাহ উনাকে জান্নাতবাসী করুন), চোখের তারায় প্রায়শই ভেসে ওঠে সেই সরল গোবেচারার মুখখানা। দিল্লর ভাইয়ের বাবা অনেক আগেই পরলোকবাসী হয়েছেন, দিল্লর ভাইও কম বয়সে কয়েক বছর আগে পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন! দীর্ঘদিন ধরে আমি নগরবাসী; তাই দিল্লর ভাইয়ের মৃত্যর সংবাদটিও পেয়েছি অনেক দেরীতে!!! নিজের অজান্তেই চোখের কোনে মেঘ অনুভব করেছি তখন।
.
নেই সেই দিনগুলো; নেই সেই মানুষগুলো; নেই সেই আদি-অকৃত্রিমতা। কাকডাকা ভোরে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ঢেঁকির শব্দ এখন আর গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ে না। কানে আসে না উৎসবে-আয়োজনে ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ।...ঢেঁকি কিংবা সহজ-সরল ‘দিল্লর ভাইয়ের বাপ’ কিংবা আমার মমতাময়ী মা –কেউই আর নেই, আমাদের সেই বাড়িটিও সেই জায়গায় নেই! সবই এখন দগদগে স্মৃতি! বর্তমানে ইউরিয়া মেশানো চালের ভাত খেয়ে ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাতের স্বাদ যেমন অনেকেই ভুলে গেছি, ঠিক তেমনি নগরজীবনের খপ্পরে পড়ে অকৃত্রিম গ্রামীণ জীবনের সরল মানুষগুলোর মুখচ্ছবিও হয়তো অনেকের আর মনে পড়ে না!!
.
না, আমি আমি মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারিনি; ভুলতে পারিনি আমার মা, সহজ-সরল সেই দিল্লর ভাইয়ের বাপ, দিল্লর ভাই কিংবা অকৃত্রিম মমতায় জড়ানো সেই শৈশব-কৈশরের গ্রামীণ জীবনকে। শিকড় ছাড়া কেউ বাঁচে কী?
:::::::::
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৪:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



