somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাত-বিহীন পুতুল

২৫ শে জুলাই, ২০১৯ দুপুর ২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমি আয়েশ করে নাটোরের কাঁচা গোল্লা আর পাবনার প্যারা খাচ্ছিলাম।এখন আর গলা দিয়ে নামছে না।টুপ করে একফোঁটা ঘাম পিরিচে পরে গেল।নিশ্চয়ই খাবারটা অস্বাস্থ্যকর হয়ে গেল।এমনেও আমি আর খেতে পারতাম না।অত্যন্ত বাজে ঘটনা, আমার ছেলের বিয়ে ঠিক হয়েছে পাবনা সদরে।আমাদের বাড়ি শেরপুরের নকলায়, অনেক দূর। বিয়েটাও অনেক ঝক্কিঝামেলায় ঠিক হয়েছে।ছেলে বেকার সদ্য LLB পাস করা,তার কাছে অতি সুন্দরী মেয়ে বিয়ে দেবার কোন মানে হয় না!

কিন্তু প্রেমেপিড়িতের বিয়ে মেয়ের বাবাকে মেয়েই রাজি করিয়েছে, আমি প্রস্তাব দিয়েছি তখন রাজি হয় নাই।এখন মেয়েই বলছে, সে বিয়ে করবে না।একদম বাজে অবস্তা।

পোলারে আগেই বলেছি এইটা বুংবাং মেয়ে।যারে দেখবে পিড়িতে হাবুডুবু খাবে, নইলে তোর মত কুৎসিত পোলার প্রেমে পরলো কেমনে?এখন কথা হাছাই হইলো।

আমি নকলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহ-সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাক কমান্ডারের সাথে আমার ওঠাবসা ছিল।এখন এলাকার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী আমার দিদার লোক।আর আমারে এত বড় বেজ্জতি!

মেয়ের বাবা ডাক্তার, সম্মানি লোক, একটা সমাধান নিশ্চয় করবে।তাই চুপ করে রইছি।কিন্তু আমার পোলা তারেক যা বললো তাতে আমার আত্মা খাপছাড়া হবার যোগাড়। পোলার হবু বৌ সেতারা বলছে, আমি নাকি মুক্তিযোদ্ধা না।আমি ১৯৭১'এ রাজাকার ছিলাম। আমি সিলেটের জৈন্তাপুরের কুখ্যাত টেনাই রাজাকারের ডানহাত ছিলাম।আমার মুক্তিযুদ্ধ করার প্রশ্নই আসে না।

মেয়েটারে দেখতে ইচ্ছে করছে, এই মেয়ে সত্য জানলো কেমনে?এই সত্য এদ্দিনে কেউ জানার কথা না।আমার শিক্ষিত মূর্খ পোলার কালা চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে, সে সব বিশ্বাস করে বসে আছে।আমার ঔরসে এই পুত্র কেমনে হল কে জানে?কোলিলের বাসায় কাকের ডিম পাড়ার নিয়ম নেই,কিন্তু আমি-আমার স্ত্রী দুজনেই সুশ্রী, বাকি দুই পোলা-মাইয়াও সুন্দর। তবে কি যুদ্ধের সময়ে.....?

আমি সেতারার সামনে।মেয়টা আমার সাথে কথা বলতে চায়।মেয়েটা অত্যন্ত সুন্দরী বললেও কম বলা হবে।রবীন্দ্রনাথ এমন সুন্দরীর দারুণ বর্ণনা করতেন, কন্যার দীঘল কালো চুল, চোখের কোটরে একখানা পটল চিড়িয়া বসিয়ে দেয়া, ঠোঁট দুটি কমলার কোয়া,মুখ সরস্বতী প্রতিমার, বাহু দুখানা বাড়ন্ত লাউ ডগার মত প্রসারিত। ১৯৭১'এ কোন ঊর্বশী দেখলে যেমন গায়ের প্রতিটা ইন্দ্রিয় যুদ্ধ শুরু করে দিত, ঠিক তেমনি সারা শরীরে তেমনি হল।আমার কুৎসিত পুত্র এই মেয়েকে কেমনে পটালো?ছেলে আমার বেশ কামেল সন্দেহ নেই।

সেতারা কোন ভদ্রতার ধার না ধেরে সরাসরি বললো, "এই পুতুল্টা দেখুন, চিনতে পারেন কিনা?"
এত্ত ছোট একটা হাতবিহীন পুতুল আকাশী-নীল ফ্রক।একটা পুতুলের এত শক্তি!ছবির মত সব চোখের সামনে ভেসে উঠলো!

১৯৭১ এর জুলাই মাস।শেখ সাব আগেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।আমি তখন সিলেটে কামলা দিতে গেছি।যুদ্ধ শুরু হইছে, বাড়ি ফেরার বাস ট্রেন নেই।থাকার জায়গা নেই, খাবার নেই।খিদার কষ্ট বড় কষ্ট! রাজাকারে লোক নেয়, দিন ৩০ টাকা বেতন থাকা-খাওয়া ফিরি।

প্রথম দিনেই আমারে কাজ দেয়া হইলো তিনজন সুন্দরী যোগাড় করা লাগবে। আমি ধরে আনলাম, একটা খুবই ছোট।বয়স ১২'র বেশি না।পাকিস্তানি মেজরের কাছে নিয়ে গেলাম।মেজর বলল, আমার জন্য না।তোমাদের জন্য, খালি যুদ্ধ করলেই হবে না শরীরের আনন্দও দরকার।তিনি অত্যন্ত পরহেজগার লোক ছিলেন, মেয়েছেলের দিকে তাকাতেন না।কিন্তু মুক্তি জবাই করার সময় তার হাত কাঁপতো না।তিনি বলতেন, এটা মুক্তিযুদ্ধ না!জিহাদ, বিপথে যাওয়া মুসলিমের বিপক্ষে মুমিন মুসলিমের জিহাদ।

ছোট মেয়েটারে ৮দিন আটকে রাখার পর মরে যাবার জন্য নদীতে ফেলে দিয়েছিলাম।একটা পালিয়ে গিয়েছে, আরেকটা আমাদের প্রতিরাতের অত্যাচারে মারা গিয়েছিল। ছোটমেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিল,তাই আমার কাছেই রাখতাম।আমি টেনাই রাজাকারের আপনা লোক তাই কেউ কিছু বলেনি।

আমি মেয়েটার কাছে শরীরের আনন্দ পেতাম।কিন্তু ফাজিল মেয়ে আমার সাথে কোন কথা বলতো না।৮ দিনে একটু পানিও মুখেতুলে নাই।যতবার খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি, সে বলেছে,"যাতাযাতি, বুনি ছানাছানি করবি কর, আলগা পিড়িত দেখাইতে আহিস না।"মুখে থুতু ছিটিয়ে দিত।আমি ঐ থুতু দিয়েই......!তবে মেয়েটা একটা আকাশী-নীল ফ্রক পরা হাত বিহীন পুতুলের সাথে সারাদিন কথা বলতো।কত কথা, শুনতেও ভালো লাগতো!

৮ দিন কিছু খায়নি, আমি নদীতে ফেলে দিয়েছিলাম।ঐমেয়ে বেচে থাকার সুযোগ আছে?দিনে রাইতে কতবার অত্যাচার করছি, হিসাব নাই।আর বেঁচে থাকলেও বুড়ি হয়ে যাইতো না!পঞ্চাশ বছর আগের কথা। ভেবে কোন কূলকিনারা পেলাম না।

যুদ্ধ শেষ হলে ঢাকায় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের নাম রেজিস্ট্রি করছি, রোদে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকা কম কষ্ট ছিল না।কত মুক্তিযোদ্ধা দেখছি ধৈর্য্য হারিয়ে চলে গেছে।বলতো,"দ্যাশ স্বাধীন করছি, আমরা স্বাধীন হইছি। মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দিয়া কি করমু?" তারা যদি জানতো, মুক্তিযোদ্ধা মানেই এত সম্মান, টাকা!
এলাকায় বানিয়ে বানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী বলতাম।আমি কামলা ছিলাম, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি হয়ে গেলাম।আমি কথা বললে, মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনে!

বিয়ে হয়ে গেল।এই শর্ত যে, আমি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখবো না।নাতি-নাতনি হলেও দেখতে যাবো না।আমার বেজন্মা পোলা সে শর্তেও রাজি।আমি নিশ্চিত হলাম,এই পোলা আমার না।কোকিলের বাসায় কাক ডিম পেড়ে গেছে!

আজ বৃহস্পতিবার, মাসটাও জুলাই। রাতে আমরা পাবনা থেকে ফিরে এসেছি, তারেক-সেতারার বাসর হয়েছে।
সকাল থেকেই আমার বেজন্মাপোলা কাঁদছে, সেতারার মুখে রক্ত এসে মারা গেছে।

টেনাই দাদা বলতেন, কাজ করতে হবে প্রমাণ ছাড়া।এতবড় সত্য প্রমাণতো বাঁচিয়ে রাখা যায় না।নকলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহ-সভাপতি হিসেবে এঘটনা চাপা দেয়া আমার জন্য অসুবিধা হবার কথা না।আর সরকারও মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে আছে!
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১৯ দুপুর ২:১৩
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২২



ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে
==================================
পিঠ ছুঁয়ে নামা মেঘবরণ তার লম্বা কালো চুল,
তারই মাঝে লুকিয়ে হাসে একটি সাদা ফুল।
চোখ দুটো তার ডাগর ডাগর, অবাক করা আলো,
দুষ্টুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

দরজায় কড়া নাড়ছে সংকট: ডেঙ্গু কি তবে শুধুই দূরের পরিসংখ্যান?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:০০


অনেক দিন আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখায় এমন একটি ভাবনা পড়েছিলাম—যুদ্ধ যখন দূরে থাকে, তখন তাকে নিয়ে আমরা উত্তেজিত হই, আলোচনা করি, পক্ষ-বিপক্ষ নিই। কিন্তু সেই যুদ্ধ যখন নিজের উঠোনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Somewhereinblog.net বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ থেকে ডিজিটাল পাবলিশিংএ পরিনিত করে আর্থিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বির লক্ষ্যে Substack-inspired Membership/Subscription Model প্রস্তাবনা

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯


একজন সাধারণ নিয়মিত ব্লগার হিসেবে প্রতিদিন আমি লক্ষ্য করি, আমাদের এই Somewhereinblog.net ( সামু) প্ল্যাটফর্মটি কত চমৎকারভাবে বাংলা সাহিত্যের এবং তথ্যভিত্তিক লেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×