তারামন বেগম।কুড়িগ্রাম জেলার কাচারীপাড়ায়
জন্ম।'৭১ এর সময় বয়স ১৪ কি ১৫ হবে।ছোট থাকতেই
বাবা মারা যায়।তো দেশে তখন যুদ্ধ শুরু
হয়ে গেছে অলরেডি।
নাপাকবাহিনী নির্বিচারে হত্যা করছে বাঙালীদের।
জ্বালিয়ে দিচ্ছে বাড়িঘর।নিরুপায় সবাই
যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে।তারামন পরিবারও একসময়
পালিয়ে পাশের ইউনিয়ন কোদাল্কাঠিতে আশ্রয় নেয়।
বিভিন্ন
এলাকা থেকে পালিয়ে আসা আরো অনেকে আছে এখানে।
ভীষণ গরম।ছোট ছোট বাচ্ছারা আহাজারি করছে।
খাবারেরও বড়ই সংকট।আর সহ্য
করতে না পেরে তারামনরা কয়েকজন রান্না করার
সিদ্ধান্ত নেয়।তাই জংগলের
কাছাকাছি একটা জায়গা থেকে কচুরিপানা তুলছিল
তারা।এমন সময় এক মাঝবয়সী লোক তাদের
দিকে এগিয়ে আসছে দেখে ভয়ে তারা চলে যাওয়ার জন্য
উদ্যত হলে পিছন থেকে লোকটি ডাক দেয়।
লোকটি তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্নার কাজ
করতে পারবে কিনা জিজ্ঞাসা করে।তারামন হ্যাঁ-
না কিছু না বলে মায়ের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়।
ও হ্যাঁ,লোকটির নাম মুহিব হাবিলদার।তো একদিন
মুক্তিযুদ্ধের
সংগঠক আজিজ মাস্টার আর মুহিব হাবিলদার বোঝালেন
তারামনের মাকে। বললেন,
মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তারামন কাজ করবে।
মা কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলেন না।মেয়ের
জীবন,মেয়ের বিয়ে,মেয়ের নিরাপত্তা-এসব
ভেবে মা পড়লেন মহাসংকটে।শেষে আর সাত-পাঁচ
না ভেবে বিশ্বাস করে হাবিলদার আর আজিজ মাষ্টারের
ধর্মমেয়ে করে তারামনকে যেতে দেন।তারামন চলে যাই
কোদালকাঠির দশঘরিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে।
এটি ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি যুদ্ধ ক্যাম্প।
ডেক ধোয়া হতে শুরু করে রান্না করা, অস্ত্র পরিষ্কার
করা ছোটখাটো সব ধরণের কাজই করতো তারামন।
একসময় মুহিব হাবিলদার তাকে অস্ত্র চালানো শিখায়।
হাবিলদার বলতেন,'কোন সুময় কি অইব
বুঝতে পারবি নারে মা, নে ধর রাইফেল
চালনাডা হিক্ককা রাখ। আমি না থাকলেও
দুইডারে মাইরা মরতে পারবি।' রাইফেল
চালানো কিছুটা কষ্টের হওয়ায় স্টেনগান শিখে নেয়
তারামন।
আজিজ মাস্টার একদিন তারামনকে বললেন, নদ পার
করে পাকিস্তনি ক্যাম্পের খবর আনতে হবে।বিপদের
ঝুঁকি নিয়ে মাথায় গোবর
লেপ্টিয়ে মুখে কালি মেখে বেরিয়ে পড়ে তারামন।
শত্রুদের ক্যাম্পের কাছাকাছি গিয়ে সব তথ্য
এনে মুক্তিযোদ্ধাদের দেন।তারপর প্ল্যানমাফিক
অপারেশন শুরু করে মুক্তিবাহিনীরা।।
একদিন দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় তারামন ও তার
সহযোদ্ধারা জানতে পারলেন পাকবাহিনীর
একটি গানবোট তাদের দিকে আসছে।কিসের আর ভাত
খাওয়া তখন,সাথে সাথে ডিফেন্সিভ পজিশন নিয়ে নেয়
সবাই।শুরু হল গুলিবর্ষন।কখন যে তারামন স্টেনগান
নিয়ে গুলি চালানো শুরু করল তার নিজেরই খেয়াল নেই।
এরপর
তারামন আরো অনেক যুদ্ধে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের
সাথে অংশ নেন।
কখনো পাগলের ছদ্মবেশে,কখনো লুকিয়ে গোপন তথ্য
সংগ্রহ;কখনো আবার স্যাঁতস্যাঁতে বাংকারে বিনিদ্র
রজনীযাপন;কখনো বা হাতে স্টেনগান নিয়ে কনুই,পায়ের
পাতায় ভর দিয়ে শত্রুর দিকে এগিয়ে যাওয়া তারামন
বা তারামনরা কখনো থামেনাই।তাঁদের একটাই মাত্র
স্বপ্ন ছিল যার বাস্তবায়িত রূপ আজকের স্বাধীন
বাংলাদেশ।
আচ্ছা,আমরা কি পারিনা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের
স্বপ্ন দেখতে?আমরা কি পারিনা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের
চেষ্টা করতে।যুদ্ধের চেয়ে কি এটি অনেক কঠিন কাজ?
মাত্র নয় মাস যুদ্ধে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হল
আর ৪৩বছরেও কেন একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্ম
হলনা???

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


