somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

“পৌষ এর কুয়াশা-মাঘের কুয়াশা”

১৩ ই জুন, ২০০৯ রাত ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পৌষ এর শেষ দিক প্রায় ।শীতের আমেজ উপভোগ করার মতই। অনেক ভোরে, যখন কুয়াশার পর্দা ভেদ করে সকাল খুঁজতে বেড়োয় গাছিরা, তখন এই শহরটাতেও গ্রামের ভেঁজা মাটির গন্ধ মেলে ! নাগরিক কোলাহল শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক আপন মনে হয় এই ভোরের শহরটাকে; ভিতরে কোথায় যেন আঁচর কেটে যায় এই ভেঁজা ভোরের শহর ।

ঠাঁয় উপরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মনির । দু’ একটা কথোপকথন চলে মাঝে মাঝে । কিন্তু দেখতেই বেশি ভালো লাগে তার । এক সময় তার মনে হত সে এরকম এক জন গাছি হবে । তর তর করে সুদক্ষ কৌশলে খেজুর গাছের চূড়ায় উঠে বসবে । তারপর ধাঁরালো দা দিয়ে খুব মোলায়েম করে গাছ থেকে একেকটা পরত খুলবে; যখন প্রথম রসের ফোঁটাটা চুঁইয়ে পরবে, সেটার গন্তব্য হবে অবশ্যই তার জিহ্বা । আহ ।
কিন্তু না । তার সেই স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না । তার গাছে উঠা নিষেধ ।তার আরও অনেক কিছুই নিষেধ। পানিতে নামা নিষেধ; আগুনের কাছে যাওয়া নিষেধ; এইটা নিষেধ; সেইটা নিষেধ ।

সেই ছোট কাল থেকেই মৃগী রোগী হওয়ায় এই বাঁধা-নিষেধগুলো তার উপর চেপে বসেছে ! এড়িয়ে যাবার উপায় নেই।

“কাকু, কাইলকা আইনযে, কতা কমু নে, অহন যাইগা । মামানি যাইবার কইছলো । দেরী অইয়া যাইব গা ।’’
গাছি কালু মিয়াকে চেঁচিয়ে বলে মনির।
-“ইট্টু রস খায়া যা......।’’
-“ কাইলকা, আইজ না ।’’
হন হন করে হাঁটা দেয় মনির ।ফজল মামার বাড়ির পথে ।

ফজল মামার বউ ভাল মহিলা । তাকে অনেক স্নেহ করেন । গত শীতে তাকে একটা লাল চাদর দিয়েছিলো । মনির কোথাও বেড়াতে গেলে সেটা পড়ে ।আর অন্য সময় ট্রাঙ্কে তুলে রাখে ; কাউকে সে এটা পরতে দেয় না ।

ফজল মামার বাড়ি বিল্ডিং ঘর । তার ছাদে ছোট্ট হারিচায় লাউ গাছ লাগানো আছে । মনিরকে দিয়েই লাগিয়েছিলেন মামি ।আর এখন লাউ পাড়ার জন্যই মামি তাকে ডেকেছেন । মনির বেছে বেছে লাউ পেরে নীচে জমা করবে । তারপর কিছু রেখে বাকীগুলো বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাবে । এমনিতেই তাকে বাজারে যেতেই হয় । এক কাজে দুই কাজ হয়ে গেল ।

প্রতিদিনের রুটিনটা ঠিক এমনটি হয় না মনিরের । ৭ টা বাজে চরপাড়ার বাজারে যায় সে । হাতে দু’তিনটে প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে সারা বাজার ঘুরে বেড়ায় । বড় বড় সবজি দোকান থেকে শুরু করে ছোট ছোট খুচরা বিক্রেতার সবজির ডালার নীচে তার নজর থাকে । টুকটাক কুড়িয়ে নেয় ডালার পাশে পড়ে থাকা একটা কাঁচা মরিচ, একটা পিঁয়াজ, একটা আলু , কিংবা একটু ধনে পাতা । দোকানীরা তাতে বাধা দেয় না । তাদের অত সময় নেই । এইভাবে চলে দুপুর পর্যন্ত । ফাঁকে কয়েক জনের বাজার করে দিয়ে আসে। আয়তন খালা, আঙ্গুরি বু’ অথবা সেলিম কাকার বাসায় । এরা সবাই তাকে অনেক স্নেহ করেন । অনেক ।

এইভাবে কুঁড়ানো সবজি, আনাজপাতিগুলো তখন সে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করে । মনির অনেক গোছানো এবং পরিচ্ছন্ন ছেলে বলে গৃহিনীরা ওগুলো নির্দ্ধিধায় কিনে নেয় । কিনে নেয়ার আরও একটা কারণ, অনেক সস্তায় পাওয়া যায় সবজিপাতিগুলো । মনিরকে এক দুই টাকা যাই দেয়া যায় সে হাসিমুখে রেখে দেয় ।

তার আর খরচ কী । দুপুরে ফজল মামার বাড়ি আর রাতে কমিশনারের বাড়িতে খায় । রাতে থাকে কমিশনারের গোয়ালঘরের পাশের ছোট্ট একটা ঘরে ; ঐ ঘরে খড়ির বোঝাই রাখা; তার একটা কোনা তার জন্য বরাদ্ধ ।সেই পাঁচ বছর বয়স থেকেই, বাপ-মা ট্রাকের চাপায় মারা যাবার পর থেকে সে এখানেই আছে ।বেশ ভালোই আছে । বাইশটি বসন্ত তো এভাবেই কাটলো । তার বাবা মা যখন মারা যায় তখন পাড়ার মুরুব্বিরা বলতো, এই অবুঝ বাচ্চাটাকে একা ফেলে না গিয়ে হতভাগারা বাচ্চাটাকে নিয়েই মরত । তারা তো মরে গিয়ে বেঁচে গেল; বাচ্চাটার কী হবে । মনির সেটা মনে করে না । সে বেঁচে থাকতে চায় ।সবার মত করে ।

শুধু যখন মৃগী রোগটা শুরু হয়; তখন ভীষণ খারাপ লাগে তাঁর । হুটহাট রাস্তায় পড়ে খিচুনী শুরু হয়ে যায় ।তার গলায় তাবিজের মত করে চামড়ার এক টুকরা বাঁধা ।যখন তার খিচুনী চলতে থাকে তখন কেউ একজন এসে সেটা তার নাকে ধরলে আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসে শরীর । বিধ্বস্ত অবস্থায় উঠে আসে একসময় । কষ্ট ।ভীষণ কষ্ট হয় সে সময় ।

পশ্চিম পাড়ায়; বাজারের উত্তর দিকটায়, ফজল মামার বিশাল পুকুরে মাছের চাষ আছে । কার্প মাছের চাষ করেন তিনি ।মাছের চাষ করে কম সময়ে আর্থিক সচ্ছ্বলতার মুখ দেখেছেন তিনি । এ জন্য এলাকায় যেমন তার সুনাম আছে, তেমনি রয়েছে অযাচিত শত্রু ; সুযোগ পেলেই তারা তার ক্ষতি করতে ছাড়ে না । এই যেমন গত মৌসুমে তার ভরা পুকুরটায় কে যেন বিষ ছেড়ে দিল ।পরদিন সকালে পুকুরে ভেসে উঠলো হাজার হাজার মরা মাছ । চিৎকার করে কেঁদেছিল সেদিন ফজল মিয়া ।পরে যখন জানতে পারল কাজটা কে করেছে , বিচার নিয়ে গিয়েছিল কমিশনারের বাড়ি ।বিচার হয় নি। হওয়ার কথাও না ।দায়ী ব্যাক্তি যে স্বয়ং কমিশনারের চাচাত ভাই । কমিশনার ভাল লোক ; কিন্তু সমাজ সংসার এর বাইরে কেউ তো না ।ফজল মিয়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল । তাই সবাই যখন তাকে পুলিশে নালিশ করতে বলেছিল সে যায়নি ।উপর ওয়ালা সব দেখুক; ঊনিই যা করার করবেন ।

তাই বলে এই মৌসুমে তিনি হাত পা গুটিয়ে বসে নেই । দিনে রাতে টহলের ব্যবস্থা করেছেন ।তার পরও বাড়তি নিরাপত্তার জন্য রাতে পুকুর পাহারার জন্য তিনি মনিরকে বেছে নিয়েছেন ।তার মত বিশ্বস্ত সাহসী ছেলে পাওয়া ভার। তবে তিনি মনিরকে বলে দিয়েছেন সে যেন পুকুরের পানির কাছাকাছি না যায় । মনির কখনও যায় না। দূর থেকে সারা রাত পাহারা দেয় ।

ব্যপারটা প্রথম চোখে পড়ে গাছি কালু মিয়ার । দেখে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যায় ফজল মামার বাড়ি। ধীরে ধীরে পুরো এলাকায় খবরটা ছড়িয়ে পড়ে ।

কালু মিয়া কান্নার দমক থামিয়ে থামিয়ে মাঝে মাঝে বর্ণনা করতে থাকে কীভাবে সে পুকুরপাড়ের খেঁজুর গাছে ওঠার সময় লাশটা প্রথম দেখতে পায় । পাড়ের দিকের পানিতে উপুর হয়ে ফুলে থাকা মনিরের লাশটা দেখে যেন মনে হচ্ছিল সে ঘুমিয়ে আছে- সে এটাও বলে । খেজুরের রসের প্রতি মনিরের যে প্রবল আগ্রহ ছিল-কাঁদতে কাঁদতে সেটাও সে বার বার সবাইকে জানিয়ে দেয় । সবার চোখের কোনায় অশ্রু চিক চিক করে ।
লাশ নিয়ে প্রথমে একটু কলরব উঠে । কেউ বলে, যারা আগেরবার পুকুরে বিষ দিয়েছিলো তারাই এবার পথের কাঁটা দূর করেছে ।অনেকেই কথায় সায় দেয়; হুল্লোড় ওঠে । আবার এক সময় শান্ত হয়ে যায় সব ।কেউ বলে হঠাৎ মৃগী রোগ ওঠায় পানিতে পড়ে মরেছে মনির । ‘আহারে’ ধ্বনিতে মুখরিত হয় চারিদিক । এক সময় সেটাও থেমে যায় ।

মাঘ মাসে যেই রকম শীত পড়ার কথা, সেই রকম শীত পড়েনি । কিন্তু ভেঁজা শহরটা ঠিকই গ্রামের চাদর গাঁয়ে দিয়ে একটা একটা করে ভোর উপহার দিয়ে যায় । কালু মিয়া খেঁজুর গাছে উঠে; রস নামিয়ে নতুন হাঁড়ি বসায় । মাঝে মাঝে তার হঠাৎ মনে হয় নীচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ।আচমকা পিছন ফিরে তাকায় সে । না কেউ নেই । একটা কুয়াশাসিক্ত ভোর কেবল পেছনে । কুয়াশায় অনেক সময় কাছের জিনিস দেখা যায় না ।
আবার অনেক সময় দূরের, অনেক দূরের কাউকে দেখা যায়..।।

- মিশা ।
মে,২০০৯....



১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×