somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কমলিনী

১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৮:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গোলাম কিবরিয়া, লোকমুখে কিবরিয়া মাস্টার নামে পরিচিত ছিলেন, লোকে তাকে একজন সৎ মানুষ হিসেবে জানতো, মান্য করতো, আজ সকালে তিনি মারা গেছেন আটাত্তর বছর বয়সে। বাড়ির আঙিনায় তার লাশ রাখা হয়েছে, নানা জায়গা থেকে আত্মীয়-স্বজন এসেছে, পাড়া-পড়শি এসেছে। অনেককাল তিনি হাইস্কুলে মাস্টারি করেছেন, তার ছাত্র-ছাত্রীরা নানা পেশায় নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, আশ-পাশের দশ-বিশ কিলোমিটারের মধ্যে যাদের পক্ষে আসা সম্ভব তারা মৃত্যু সংবাদ শোনামাত্র চলে এসেছে। সঙ্গত কারণেই বাড়িতে ভিড়, বাড়ি লাগোয়া পাকা রাস্তায় ভিড়, সর্বত্রই কিবরিয়া মাস্টারের স্মৃতিচারণ চলছে।

কিবরিয়া মাস্টারের স্ত্রী এখনো জীবিত, আত্মীয় পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি শোকাতুর হয়ে বসে আছেন নিজের ঘরে; দুই ছেলে, তিন মেয়ে, দুই পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনীরা সকলেই শোকগ্রস্ত। লাশ গোসল করানো হয়েছে, দাফনের প্রস্তুতি চলছে, বাড়ি লাগোয়া পুকুরের পশ্চিম পাড় ঘেঁষা যে পারিবারিক গোরস্তান, সেখানেই দাফন করা হবে।

হঠাৎ বাড়ির সামনের রাস্তায় একটা প্রাইভেট কার এসে দাঁড়ায়, প্রায় পাঁচ ফুট ছয়-সাত ইঞ্চি লম্বা, ফর্সা, কালো পাড়ের সাদা শাড়ী পরা পরিপাটী এক যুবতী গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করতেই ভিড়ের লোকজন তাকে পথ করে দেয় আর সকলের দৃষ্টি পড়ে তার ওপর, জোড়া জোড়া চোখ তার সর্বাঙ্গে দৃষ্টি বুলায়। যুবতী সোজা গিয়ে দাঁড়ায় খাটিয়ায় শোয়ানো কিবরিয়া মাস্টারের লাশের কাছে, খাটিয়ার পাশে বসে পড়ে, মাস্টারের নিথর ডান হাতখানি নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে চুপ করে থাকে, শীতল হাতটি নিজের গালে স্পর্শ করে, আজকের এই নিথর হাতটি-ই একদা তাকে কতো আদর করেছে, কতো চকলেট-চিপসের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়েছে তার দিকে, আব্বা-আম্মা মারতে গেলে এই হাতটি কতোবার তাকে রক্ষা করেছে, অথচ আজ সেই হাতে কোনো সাড় নেই!

যুবতীর দু-চোখ যেন বর্ষার জল থৈ থৈ পুকুর!

সারা উঠোনের মানুষ তাকিয়ে থাকে যুবতীর দিকে, ফিসফাস-কানাকানি শুরু হয়, যুবতী আসার খবর নিশ্চয় বাড়ির মানুষদের কাছেও পৌঁছে গেছে, দরজা-জানালায় গম্ভীর কৌতুহলী মুখ।

প্রায় সাত-আট মিনিট হয়ে গেছে কিবরিয়া মাস্টারের নিঃসাড় হাতখানি ধরে বসে আছে যুবতী, কিন্তু এই বাড়ির কোনো মানুষ তার কাছে ছুটে আসেনি, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেনি, পাড়া-পড়শিরাও কেউ তাকে একটু সান্ত্বনা দিতে তার কাছে এসে দাঁড়ায়নি। যতই বেশভূষার পরিবর্তন হোক, অনেকেই যে তাকে চিনেছে তা সে বুঝতে পেরেছে। আবার চারিদিকের গুঞ্জনের কিছু কিছু তার কানে আসায় বুঝতে পেরেছে যে কেউ কেউ তাকে চিনতে পারেনি। এইতো একটু আগেই পিছনদিকের কোনো এক লোক কাউকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘মাইয়াডা ক্যাডা?’

উত্তর শোনা গেছে, ‘কী জানি। আগে তো দেহি নাই।’

আরেকজন বলেছে, ‘হ্যাগো আত্মীয় হইবার পারে।’

যুবতী কিবরিয়া মাস্টারের বড় ছেলে মাসুদুর রহমানের তৃতীয় সন্তান, এই বাড়িতেই তার জন্ম, এই বাড়িতেই ধুলিখেলা করে বড় হয়েছে। সে ভাবে এখন তার কি করা উচিত? দাদার দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত তার অপেক্ষা করা উচিত, নাকি এখনই চলে যাওয়া উচিত? বাড়ির ভেতর থেকে এক নারীকণ্ঠের আর্তনাদ ভেসে আসে কানে, যুবতীর বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে। এই কণ্ঠ তার চেনা, এই কণ্ঠের মানুষটিকে দেখার জন্য, তার বুকের ঝাপিয়ে পড়বার জন্য তার হৃদয় উথাল-পাথাল করে। দাদার হাতখানা খাটিয়ায় নামিয়ে রেখে সে কয়েক মুহূর্ত বসে থাকে, তারপর উঠে দাঁড়ায়, রাস্তার দিকে নয়, পা দুটি ঘরের দিকে চলতে শুরু করে।

প্রথমে দাদীর ঘরে যায়, দাদীকে ঘিরে বসে আছে আত্মীয়-স্বজনেরা। কাছে গিয়ে দাদীর পায়ে সালাম করে হাতটি ধরে, দাদী মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিনতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় কাছে বসা আত্মীয়ার দিকে। আত্মীয়া দাদীর কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচুস্বরে কিছু বললে দাদী অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে যুবতীর দিকে, তারপর হু হু করে কেঁদে ওঠেন। যুবতী দাদীর মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে নেয়।

যুবতী এবার মায়ের ঘরে যায়, চোখাচোখি হতেই মা শব্দ করে কেঁদে ওঠেন, সে বুঝতে পারে যে মায়ের এই কান্না শ্বশুর বিয়োগের নয়, মাকে সালাম করে মায়ের পাশে বসে যুবতী, ক্রন্দনরত মাকে টেনে নেয় নিজের বুকে।

কিবরিয়া মাস্টারের মৃতদেহবাহী খাঁটিয়া কাঁধে তোলে তার আপনজনেরা, বয়ে নিয়ে যায় পারিবারিক গোরস্তানের দিকে, বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে, মায়ের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে শবদেহ বয়ে নিয়ে যাওয়া দ্যাখে অশ্রুসিক্ত যুবতী।

দুই
কিবরিয়া মাস্টারের দাফন শেষ, বাড়ি এখন অনেকটা ফাঁকা, লোকজন সব এখনো পুকুর চালা আর রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যুবতী মায়ের ঘরের খাটে বসে শুনতে পায় যে অন্য ঘরে তার ভাই আব্বাকে বলছে, ‘আব্বা আমার মাথায় কিন্তু খুন চইড়া গ্যাছে, ওরে চইলা যাইতে কন। একবার মান সম্মান ডুবাইছে, আইজ আবার আইচে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে। আব্বা ভলোয় ভালোয় কইতাছি ওরে চইলা যাইতে কন, নইলে ওরে আমি কোপামু! অয় একটা কলঙ্গ, বংশের কুলাঙ্গার।’

কেউ একজন বলে, ‘ইমরুল তুই শান্ত হ।’

‘শান্ত হমু আমি, আমারে শান্ত অইতে কও? সারা গিরামে ওর আওনের কথা ছড়াইয়া পড়ছে, সঙ দ্যাখার মতোন মানুষ ওরে দ্যাখতাছে আর ওরে নিয়া গাল-গল্প করতাছে! চোখের আড়ালে দূরে আছিল, বালা আছিল, অহন সবার সামনে আইয়া আমাগো মাথাডা হেট কইরা দিছে!’

যুবতী ভাবে যে এই বাড়িতে তার আর বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না, এদের এক ধরনের ছন্দময় জীবনে সে বেতাল সুরের মতো ঢুকে পড়েছে! এদের জীবনে, সমাজে তার কোনো স্থান নেই। এখান থেকে এখন ভেগে যাওয়াই উচিত। সে মা আর দাদীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আব্বার মুখোমুখি হয়, আব্বার শরীরটা ভেঙে গেছে, কেমন বুড়ো বুড়ো দ্যাখাচ্ছে। আব্বার কাছে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আব্বা, আপনার বুকে একবার মাথা রাখবো?’

আব্বার চোখে জল টলমল করে, তিনি মুখে কিছু না বললেও তার মুখের ভাষা পড়তে পারে যুবতী, সে আব্বার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে। আব্বা ফুফিয়ে কেঁদে ওঠেন, সন্তানের মাথায় হাত রাখেন। বেশ কিছুক্ষণ পর আব্বার বুক থেকে মাথা তুলে যুবতী বলে, ‘আপনি শরীরের প্রতি যত্ন নেবেন আব্বা, আমি আসি।’

আর দাঁড়ায় না যুবতী, ঘর থেকে বেরিয়ে আঙিনায় নামে। কী আশ্চর্য তার যেতে ইচ্ছে করছে না, এই বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে তার থাকতে ইচ্ছে করছে, তার পা দুটি এগোতে চাইছে না, যেন-বা হাজার মনের পাথর বাঁধা পা দু-টিতে, এতোটুকু আঙিনা, অথচ মনে হচ্ছে কতো পথ, ফুরোতে চাইছে!

লোকজন তার দিকে তাকিয়ে থাকে, সে আঙিনা পেরিয়ে গাড়ির কাছে গিয়ে দরজা খোলে, পিছন থেকে এক প্রৌঢ় বলেন, ‘কামরুল না?’

যুবতী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, তার বাবার দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই হালিম চাচাকে চিনতে কষ্ট হয় না।

প্রৌঢ় আবার বলেন, ‘কামরুলই তো?’

যুবতী দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেয়, ‘না….. কমলিনী।’

ঢাকা,
জুন, ২০২১।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৮:০১
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রবাসে একদিনের ঘটনাপন্জী

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৩ শে জুলাই, ২০২১ বিকাল ৫:৩১



২০১৭ সাল, ট্টাম্প ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর থেকে আমি বেশ লম্বা সময় চোখের সমস্যায় ভুগেছি; সেই শীতে আমি বারবার জ্বরেও ভুগছিলাম; সেই সময়ের একদিনের একটি ছোট ঘটনা:

কয়েকদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবিব্লগঃ কমদামী মোবাইল ক্যামেরাতে তোলা ছবি ও ছবির পেছনের গল্প ৩

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৩ শে জুলাই, ২০২১ রাত ৯:১৪

ঈদে বাসায় এসেছি । ফিরবো একেবারে লকডাউনের পর । এখানে সব কিছুই ঠিক আছে । কেবল সামুতে ঢুকতে গেলে বিরাট ঝামেলা করতে হয় । প্রোক্সি কিংবা টর দিয়ে ঢুকতে ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি শোক সংবাদ - কিংবদন্তি গণসংগীত শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর আমাদের মাঝে আর নেই।

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে জুলাই, ২০২১ ভোর ৬:০৬



-:একটি শোক সংবাদ:-

কিংবদন্তি গণসংগীত শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর গতকাল শুক্রবার ২৩শে জুলাই ২০২১ইং রাত ১০ টা ৫৬ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। পরম করুণাময় আল্লাহপাকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুভ জন্মদিন -শেরজা তপন

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ২৪ শে জুলাই, ২০২১ সকাল ১০:০৮

দিনতো সবই দিন -তবুও এদিন বিশেষ রঙিন
মহাকালে এসেছিলে তুমি নতুন
প্রিয় ব্লগার শেরজা তপন
শুভ হোক তোমার জন্মদিন ।

এসেছিলে তুমি যেদিন
হেসেছিল ভুবন -কর কর্ম এমন
যাবার সময় হাসবে তুমি
কাঁদবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্নে দেখি দূর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার আহবান...........

লিখেছেন নীল আকাশ, ২৪ শে জুলাই, ২০২১ দুপুর ১২:২২



দূর্নীতির দায়ে হুট করেই চাকরিচ্যুত মনসুর আলীর বর্তমান আর্থিক অবস্থা বেশ শোচনীয়।
দূদক মনসুর আলী সাহেবের নিজের এবং পরিবারের সব ব্যাংক একাউন্ট ফ্রীজ করে রেখেছে।
গোপণে শালীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×