somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ যে ভালোবাসা নয়; বিপদ ডেকে আনা!

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সন্ধ্যা ৭:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(ক)

সদ্য কৈশোর পেরুনো রাসনা খান বরাবর ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মেয়ে। রোযা রাখার বয়সে পৌঁছার আগ থেকেই সে রোযা রাখতে চাইতো। সাহরির সময় জাগিয়ে দেবার জন্য মা-বাবাকে বারবার বলে রাখতো। কিন্তু বাবা-মা তাকে ডাকতেন না মেয়ের জন্য এতক্ষণ উপোস থাকা কষ্টকর বিবেচনা করে। রাসনা এখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। ছোটবেলার সেই অনভ্যাসের জের হিসেবে আজও তার পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব হয় না।



(খ)

আতিক সাহেবের (ছদ্মনাম) অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে। ওরা সবাই এখন পরিণত বয়সী। ছেলেরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে বেশ অর্থ-কড়ির মালিকও হয়েছে। পিতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় শারীরিক অসুস্থতার জন্য তারা তাকে অখণ্ড অবসরে রেখেছে। অফুরান অবকাশে বাবার সময় কাটাবার জন্য তাঁর ঘরে একটি রঙ্গিন টিভিও সেট করে দিয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি দু'এক ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়লে পড়েন নয়তো তা কাযাই হয়ে যায়। বাকি সময়গুলো বলতে গেলে তার টিভি সেটের সামনে দিয়েই বয়ে যায়।



(গ)

একহারা গড়নের ফুটফুটে শিশু মীমকে তার মা-বাবা বালিকা মাদরাসায় পড়তে দিয়েছিল তাদের আত্মীয় পরিবারের কয়েকটি মেয়েকে মাদরাসা থেকে আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে উঠতে দেখে। মীম পড়া-শোনায় বেশ ভালো। আদব-শিষ্টাচারেও মন্দ না। মাদরাসার দেয়ালঘেরা নিরাপদ ও পুণ্যময় পরিবেশে সে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতায়।

ছয়/সাত মাসের মাদরাসা জীবনে সে অনেক বদলে গেছে। চলাফেরায় যেমন শিষ্টতা মুখাবয়বেও তেমন কমনীয়তা বেড়েছে। আট বছরের ফুটফুটে মীম হয়েছে তাই মাদরাসা ও পরিবারে সবার প্রিয়। সন্তানের কচি জীবনে পরিবর্তনের রেখা ফুটে উঠলেও তার বাবা-মার জীবন-যাপন পদ্ধতিতে রূপান্তর বা পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি এতোটুকু। আগের মতো আজো তারা বেনামাযী এবং নাটক-সিনেমার অন্ধ অনুরাগী।



কী এক অপরাধে এক তরুণ শিক্ষক বাচ্চাটিকে একটু বেশিই প্রহার করে বসে। শিক্ষকের এই অপরাধে (?) ক্ষিপ্ত হয়ে মীমের বাবা-মা মাদরাসা পরিচালককে অনেক কটু-কাটব্য শুনিয়ে যায়। থানা-মামলার হুমকি পর্যন্ত দেয়। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, এখানে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আইন করা আছে, কোনো বাচ্চাকে প্রহার করা যাবে না। তাদেরকে আদরে-কৌশলে শিক্ষা দিতে হবে। তদুপরি লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেয়ার অপরাধে শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্তও করা হয়েছে।

মীমের বাবা-মা’র ক্ষোভ এতেও প্রশমিত হয় না। মীমকে মাদরাসা থেকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দেয় শিক্ষা ও সভ্যতার আলো বঞ্চিত তাদের গ্রামের এক স্কুলে। (মীমের খালার ভাষ্য, মাদরাসার অনভিপ্রেত ঘটনা উপলক্ষ মাত্র। প্রকৃত ব্যাপার হলো, মীমকে ব্রাক স্কুলে দেয়ায় সন্তানের শিক্ষাসহ আছে তাদের বাড়তি অনেক পাওনা।)



আমাদের সমাজের এ তিনটি খণ্ডচিত্রে দেখতে পাচ্ছি, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে রাসনাকে তার বাবা-মা ফরজ রোযা পালন করতে দিচ্ছেন না। রাসনার বয়স তেরো পেরিয়েছে অথচ দশ বছর বয়স থেকেই রোযা করা উচিত। রাসনার রোযা করার অভ্যাস গড়ে ওঠেনি বলে আজ কলেজে পা রেখেও ফরজ রোযা করতে পারছে না। অশীতিপর আতিক সাহেবের বয়স এখন শুধু ইবাদত-বন্দেগী করে কাটিয়ে দেবার। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তার ছেলেরা পিতার প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে তাকে সুযোগ করে দিয়েছে নাজায়েয টিভি প্রোগ্রামে দিবা-রাত্রি মেতে থাকার! মীমের বাবা-মা সন্তানের ভালোবাসার পারাকাষ্ঠা দেখাতে গিয়ে বেহেশতের কুসুমিত পথ মাদরাসার অনাবিল পরিবেশ থেকে নিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন।

হ্যাঁ, এভাবে আমরা অনেক কাজই করি প্রিয়জনের জন্য ভালো মনে করে। রাসনাকে তার পিতামাতা সিয়াম সাধনায় নামতে দেননি, মীমকে তার বাবা-মা মাদরাসা থেকে সরিয়ে এনে ব্রাক স্কুলে দিয়েছেন এবং আতিক সাহেবের ছেলেরা বাবার জন্য রঙ্গিন টিভির ব্যবস্থা করেছে— সন্দেহ নেই সবই করা হয়েছে তাদের সুখের জন্য। কারণ বলাবাহুল্য, পিতা-মাতার কাছে সন্তানের কিংবা সন্তানের কাছে পিতা-মাতার অকল্যাণ কখনো কাম্য হতে পারে না।

কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখা দরকার এসব কি সত্যি তাদের জন্য কল্যাণকর? ফরজ রোযা ত্যাগ করার শাস্তি তো ভয়াবহ। জান্নাতের পথ থেকে সরিয়ে জাহান্নামের পথে নেয়া কি মীমের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে? আতিক সাহেব জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে টিভি নিয়ে মশগুল। তাঁর ছেলেরা একবারও ভেবে দেখেছেন কি টিভি দেখা অবস্থায় যদি তাদের বাবার মৃত্যু এসে যায় তবে কবরে তাঁর অবস্থা কী হবে?

ভালোবাসার নামে আমরা এসব কী করছি? কোথায় নিয়ে যাচ্ছি প্রিয়জনদের? এ ভালোবাসার কী পরিণাম অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য? চিন্তা করে দেখেছি কি ভালোবাসতে গিয়ে আমরা নিজ হাতে অবচেতনমনে প্রিয়জনকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করছি!!

সমাজে অনেক বাবা-মা'ই এমন আছেন যারা সন্তানের সিয়াম সাধনা বরদাশত করতে পারেন না! তরুণ বয়সে অনাবিল চেহারায় দাড়ি রাখা সহ্য করতে পারেন না। শেষ রাতে ঘুম ভাঙ্গতে তকলিফ হবে ধারণা করে ফজর নামাজের জন্য তাদের জাগিয়ে দেন না। বাড়ির বাইরে গিয়ে কিভাবে রাত কাটাবে সে চিন্তায় সন্তানকে আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেন না। (অবশ্য বিস্ময়কর হলেও সত্য, এরাই আবার পরীক্ষার সময় সন্তানকে ভোরবেলা জাগিয়ে দেন। মর্নিং শিফটে ক্লাস থাকলে প্রত্যুষেই বিছানা থেকে আদরের সন্তানকে জোর করে তুলে দেন। বড় চাকুরির আশায় তাকে শুধু জেলার বাইরে নয় দেশের বাইরে পর্যন্ত পড়াশোনার জন্য পাঠিয়ে দেন!)

এসব অভিভাবক কি একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছেন, তাদের এমনতর ভালোবাসা আত্মজ-প্রিয়জনের জন্য কতোটা বিপদের কারণ হতে পারে? তাদের নিজেদেরই জন্যই বা কী পরিণাম বয়ে আনতে পারে? আজ যারা সন্তানের বা পিতার সাময়িক সুখের জন্য আল্লাহর অবাধ্য হওয়া মেনে নিচ্ছেন তারা কি মহাবিচার প্রাঙ্গণে তাদের থেকে আল্লাহর অসন্তোষ এড়াতে পারবেন? কিংবা আদরের এই সন্তানরা বা ভক্তির এই বাবা কি তাদের কোনো কাজে আসবে? যেই কুরআনের প্রতি ঈমান আনার কারণে আমরা মুসলমান সেই কুরআন কী বলছে শুনুন—

فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَّةُ (33) يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (34) وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ (35) وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ (36) لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ (37)

'অতঃপর যখন বিকট (কিয়ামতের) আওয়াজ আসবে, সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও তার বাবা থেকে, তার স্ত্রী ও তার সন্তান-সন্ততি থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই একটি গুরুতর অবস্থা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে।'[1]

অন্যত্র কুরআন আমাদের বিবেকের দুয়ারে কড়া নেড়ে বলছে,

وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ (87) يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ (88)

'আর যেদিন পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না।'[2]

وَاتَّقُوا يَوْمًا لَا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ (48)

'আর তোমরা সে দিনকে ভয় কর, যেদিন কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না। আর কারো পক্ষ থেকে কোনো সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না এবং কারও কাছ থেকে কোনো বিনিময় নেয়া হবে না। আর তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না।'[3]

অতএব শুধু ভালোবাসলেই হবে না; ভালোবাসার উপায়টি আখেরে কল্যাণ বয়ে আনবে কি-না তাও মাথায় রাখতে হবে। আমাদের কোনো ভালোবাসাই যেন আল্লাহর হুকুম পালনে অন্তরায় না হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন। আমীন
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কিছু খাতের চাকুরী বেতন-ভাতামুক্ত ঘোষণা করা যেতে পারে

লিখেছেন এমএলজি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

এক সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে সরকারি চাকুরেদের প্রায় ৯১ শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে। এছাড়া, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেও মনে করেন বাংলাদেশে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়; যার অর্থ দাঁড়ায়, দুর্নীতিকে আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাংসের ভুলচুক

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:০৬


বারে কুত্তার চোখ রঙিন
স্বপ্ন দেখে তাই ঘিন ঘিন
তাই দেখে হাড্ডি হাসে
পিন পিন, নাকের পুহান ঘুম
রক্ত হবে সুরেশ এই চুম;
ঐ গুরুজনে কইছে কথা
কুত্তার পেটে ঘি করে ব্যথা
স্বপ্ন তো দেখবেই ভুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×