
পুরাতন এক বন্ধুর সাথে সেদিন হঠাৎ করে লম্বা এক ফোনাড্ডা হয়ে গেলো। এক ঘণ্টা বিশ মিনিটের। অনেক ব্যক্তিগত তথ্য হালনাগাদ হলো। অনেক কথা অনেক হাসাহাসি। এখনকার সময়ের তুলনায় কত আরাম-আয়েশ এবং কত নিশ্চিন্ত শৈশব আমরা অতিক্রম করে এসেছি। এই এক ঘণ্টা বিশ মিনিটের আড্ডায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার উপলব্ধিতে এসেছে। তা হলো, মানুষ বদলায় না। চরিত্রের মৌলিক দিকগুগলো অপরিবর্তিত অবস্থায়ই বেড়ে ওঠে।
অনেক দৃশ্যমান উত্তম এবং প্রমাণসাপেক্ষ কৃতী মানুষের দৃষ্টান্তের মধ্যে আমাদের বেড়ে ওঠা। মহাত্মা গান্ধী আর মাও জেদং এর আদর্শ, আব্রাহাম লিংকন অথবা ম্যান্ডেলার আদর্শ, মার্র্টিন লুথার অথবা মাদার তেরিজা অথবা ফ্লুরেন্স নাইটিঙ্গেলের আদর্শ। তারা সকলেই নিজস্বতায় পরিপূর্ণ মানব। বই পুস্তক পত্রিকা পরীক্ষায় তাদেরই চরিত্র বিশ্লেষণ। যত আদর্শ, তত স্বপ্ন। তার সঙ্গে আছে সমাজ রাষ্ট্র রাজনীতির প্রভাব। এসবের মধ্যে কোন কোন বন্ধুর হঠাৎ ধনী হয়ে ওঠা। বিদেশী শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে সৌভাগ্যের হেঁচকা টান। কেউবা নবমশ্রেণী না পেরোতেই শাদিবিয়ের নিম্নমুখী টান। কেউবা বাজারে মুদি দোকানদার। এমন বৈচিত্রময় একটি মাইক্রো ইউনিভার্সে থেকে নিজেকে যেন ছোট ও তুচ্ছ মনে হয়। নিজের সবটুকুতে আপত্তি, নিজের অস্তিত্বে আড়ষ্টতা, নিজের ব্যক্তিত্বে সন্দেহ - নিজের সবকিছুকে মনে হয় মেডিওকার। অতৃপ্তি আর অসম্পূর্ণতাগুলো বড় হয়ে দেখা দিত শৈশবের দিনগুলোতে...
সক্রেটিস যথার্থ বলেছিলেন, নিজেকে জানো। ওস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, ‘আপনি’ হয়ে ওঠুন - বাকি সব হওয়া শেষ। জুডি গারল্যান্ড বলেছিলেন, সবসময় নিজের প্রধান সংস্করণ হয়ে ওঠুন, অন্য আরেকজনের দ্বিতীয় সংস্করণ হবার দরকার নেই। কথাগুলো একসময় ‘তাত্ত্বিক’ ও সুপারফিশিয়াল মনে হতো, বেশি তলিয়ে দেখতে চাইতাম না। যাপিত জীবনের পৌনে-এক অংশে এসে মনে হয়, নিজেকে আরেকটু যত্ন করলে, আরেকটু মূল্যায়ন করলে হয়তো অধিকতর সুফল পেতাম। নিঃস্বার্থ হবার শিক্ষা সবখানে পাওয়া যায়, একটু স্বার্থপর হবার নসিহত ভুলেও কেউ দেয় না। স্বার্থপর যে একদম হতে চাই নি, তা কিন্তু নয় - শুধু যথাযথভাবে হতে পারি নি। এ যেন ঘুমের ঘোরে দৌড়ানো - দৌড়াবেন কিন্তু রাস্তা কমবে না। মানুষ অনেক চেষ্টা করেও নিজের জন্য সত্যিকারভাবে কিছু করতে পারে না। জীবনের রহস্যের মতো এটিও যেন আরেক রহস্য।
মাঝে মাঝে ভাবি, যারা সমাজের মহৎ ও পুজনীয় ব্যক্তিতে উন্নীত হয়েছেন, তারা কি নিজের মতো করে নিজেকে সাজাতে পেরেছিলেন? অন্যদিকে যারা সমাজের খারাপ বা হীন শ্রেণীর মানুষ, যাদেরকে মানুষ ঘৃণা করে এবং যাদেরকে পুলিশ খুঁজে পেলেই নিশ্চিত জেল অথবা ফাঁসি, তারাও কি নিজের মতই বড় হয়েছেন? যারা নিজেকে ‘নিজের করে’ পেয়েছেন, তারা কি মহৎ, নাকি নিকৃষ্ট মানব? নিজেকে খুঁজা কি খুব স্বার্থপর?
সন্তান, ভাই, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী, পিতা ইত্যাদি পর্ব শেষ। আরও অনেক কিছু হয়তো হওয়া যাবে। কিন্তু অনেক কিছুর মাঝে আজ পর্যন্ত ‘আমি’ হবার জন্য পর্যাপ্ত প্রচেষ্টা দিতে পারি নি। যখনই নিজের মতো করে, নিজের পছন্দমতো কিছু করতে চেয়েছি, তখনই প্রকৃতি ও পরিবেশ বাধ সেধেছে। আপন হতে চেয়েছে পর। বন্ধু হতে চেয়েছে প্রতিপক্ষ। অবচেতনে ফিরে এসেছি ‘আমি’ হবার পথ থেকে। মনে হচ্ছে এ পৃথিবীতে অনেক কিছুই হওয়া সহজ, শুধু ‘নিজের সত্ত্বায় গড়ে ওঠা’ ছাড়া।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ ভোর ৬:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




