ঘটনা ১
আমেরিকাতে একজন বাঙালি প্রফেসরকে সাপে কেটেছে। সাপে কাটলে যেটি হয় সবার ভীষণ দৌড়াদৌড়ি অবস্থা। যে করেই হোক বিষ নামাতে হবে। বিষ নামাতে প্রফেসর সাহেবের আত্মীয় স্বজনরা ধরাধরি করে তাকে হাসপাতালে এনেছেন। আমেরিকা বলে কথা। সবার আশা, আমেরিকার ডাক্তার, নিশ্চয়ই বাংলাদেশের ডাক্তারদের থেকে দ্রুত কিছু করবেন।
দু ঘণ্টা পার হয়েছে। ডাক্তার সাহেব তাকে দেখেননি। নার্স তাকে দেখেছেন। অতি যত্ন সহকারে রোগীর কেস হিস্ট্রি নিয়েছেন। দাদা-নানা কাউকে আগে সাপে কেটেছে কিনা জানতে চেয়েছেন। এরপর ভেতরে ঢুকে গেছেন।
রোগী, রোগীর আত্মীয়স্বজন অস্থির। নার্সকে ডাকছেন। কি ভাই কিছু করলেন না। নার্স বলছেন, দাঁড়ান দেখি কি হয়। আরে ভাই আমাকে তো সাপে কেটেছে । হুম, দাঁড়ান দেখি কি হয়। ভাই আমাকে সাপে কেটেছে, সাপে। আরে বললাম তো দেখি কি হয়।
মানে ব্যপারটা অনেকটা এরকম আপনি মরেন কিনা সেইটা দেখার জন্যই অপেক্ষা করছে তারা। যাই হোক সে যাত্রা প্রফেসর সাহেব আল্লাহ্র রহমতে বেচে গেলেন।
ঘটনা ২
এক বাঙালি ভাবীর বাচ্চা হবে। বাবা-মা পাশে কেউ নেই। প্রথম সন্তান। স্বামী বেচারা পি এইচ ডি করেন। সারাদিন ল্যাবে পড়ে থাকেন। গর্ভবতী হলে যা হয়। আগের কোন অভিজ্ঞতা নেই। এসময় নানান উপসর্গ দেখা যায়। আর একটু কিছু হলেই ভয় লাগে।
ভাবীরও তাই হচ্ছে। কিছু হলেই তিনি চিন্তিত হয়ে হেলথ সেন্টারে ফোন দিচ্ছেন। আর হেলথ সেন্টার থেকে বলছে চিন্তার কিছু নেই। তবুও তার চিন্তা কমছে না। তখন পাশের বাসার ভাবী, যে আগেই মা হয়েছে তার কাছে তিনি ছুটে যাচ্ছেন। পাশের বাসার ভাবীই তখন তার কাছে বড় ডাক্তার।
পাশের বাসার ভাবীও ডাক্তারি করার সুযোগ পেয়ে হাত ছাড়া করছেন না। বুঝলে, পেটে তেল মালিশ করবা, আরাম পাবা। সবসময় আপওয়ার্ড ডিরেকশনে করবা। আর মালিশ হল সব রোগের মহা ঔষধ। ভাবীর পেইন উঠেছে। পাশের বাসার ভাবী দেখে বলে দিলেন এতো লেবার পেইন। মালিশে কাজ হবে না। তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ফোন কর। ভাবী হেলথ সেন্টারে ফোন দিলেন। আমাকে তাড়াতাড়ি ভর্তি কর। এই এই...
হেলথ সেন্টার থেকে তাকে বলা হল একটা প্যাড পুরা ভিজতে হবে তা না হলে তারা ভর্তি করবে না। ভাবী এদিকে সারাদিন ব্যথায় অস্থির। তার ব্যথা দেখে তার স্বামীও বুঝতে পারছেন না কি করবেন। পাশের বাসার ভাবীও আর কোন পরামর্শ দিতে পারছেন না। আবার হেলথ সেন্টারে ফোন। আহা আপনাদের বললাম তো পুরা প্যাড না ভিজলে আসতে পারবেন না। অবশেষে সারাদিন পর ভাবীর পুরা প্যাড ভিজলে, তবেই তারা ভর্তি নিলেন। এবং তার কিছুক্ষণ পর ভাবীর এক ফুটফুটে মেয়ে হল।
ঘটনা ৩
এক নেপালি ছাত্রের জ্বর হয়েছে। অনেকদিন জ্বর ডাক্তার তাকে স্টুডেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করালেন। কিন্তু তার জ্বর তখন খুব খারাপ পর্যায়ে পৌছে গেছে। তাকে কাছাকাছি বড় শহরের হাসপাতালে রেফার করা হল। ৪ দিন ছেলেটিকে হাসপাতালে থাকতে হল। পাহাড় সমান বিল এল। একজন বলল, চিন্তা কর না। চ্যারিটিতে এপ্লাই কর। মাফ হয়ে যাবে। মাফ হয়েই তাকে ৫০০০ ডলার দিতে হল। প্রতি মাসে সেই বিলের কিস্তি শোধ দিতে ছেলেটির নাজেহাল অবস্থা। ওদিকে তার বাবা নেপাল থেকে তাকে ফোন করছে কিরে এ মাসে টাকা পাঠাবিনা? গত মাসেও পাঠাসনি!
ঘটনা ৪
এক বাঙালি ছাত্র একদিন ঠিক করল তার সব বন্ধু বান্ধবকে রান্না-বান্না করে খাওয়াবে। বেচারি অনেক আনন্দ নিয়ে রান্না করতে যেয়ে হাত কেটে ফেলল। ভীন দেশ, শেষে সেপটিক ফেপটিক হয় কিনা। ভয়ে সে হেলথ সেন্টারে গেল। হেলথ সেন্টারে থেকে তাকে যত্ন করে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হল। ব্যান্ডেজ শেষে বিল ধরিয়ে দেওয়া হল ১০০০ ডলার। পরে চ্যারিটিতে এপ্লাই করে সেটি মাফ হয়ে হল ২০০ ডলার।
ছেলেটি ভীষণ রেগে গেল আর বৃথাই রাগে গজ গজ করতে লাগল, এখনাকার ডাক্তার নার্সদের হাত সোনা দিয়ে বাধানো নাকি! সামান্য ব্যান্ডেজের জন্য ১৫ হাজার টাকা।
ঘটনা ৫
এক শ্রীলঙ্কান মেয়ে, তার ওভারিতে সিস্ট ধরা পড়েছে। সেমিস্টার মাঝ তখন মাঝ পথে। দেশে যাওয়ারও উপায় নেই। আমেরিকাতেই অপারেশন করা হল। বিল আসল ১৫ হাজার ডলার।
ঘটনা ৬
এক বাঙালী ছাত্রীর বাচ্চা হবে। ল্যাবার পেইন উঠেছে। ছাত্রী যন্ত্রণায় চিৎকার করছে আর তার স্বামীকে বলছে আমাকে শীঘ্রই হাসপাতালে নাও। কিন্তু ডাক্তার বলছে এখন না। সময় হলে তারা বলবে। ছাত্রীর আগেও এখানে বাচ্চা হয়েছে। ছাত্রীর স্বামী ভাবল, চিৎকার তো আগেও করেছে। বাচ্চা হওয়ার সময় এরকম তো একটু হয়ই। ডাক্তার নিশ্চয়ই ভুল বলবেন না।
ছাত্রী একসময় অসহ্য ব্যাথায় অস্থির হয়ে গেল। অবশেষে তার স্বামী ডাক্তারের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে তাকে যখন হাসপাতালে নিল ততক্ষণে তার পেটের বাচ্চাটি মারা গেছে। আমাদের দেশে এরকম হলে আমরা হাসপাতাল ভাংচুর করি। তারা কিছুই করলেন না। ছাত্রীর অবস্থা তখন খুব খারাপ। স্বামী বেচারার তখন একমাত্র চিন্তা যে করেই হোক তার স্ত্রীকে বাঁচাতে হবে।
.
.
.
এরকম আরও অসংখ্য উদহারন দেওয়া যাবে। এবার নিজের ঘটনা বলি।
অবিবাহিত মেয়েদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হয়। অনেক সময় সেটি কোন সমস্যাই নয়, নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্ত মেয়েরা যেহেতু এগুলো কাউকে খুব একটা বলে না এবং তাদের নিজেরও কোন ধারনা নেই। তাই অহেতুক দুশ্চিন্তা করে। ডাক্তার কালে ভদ্রে দেখায়। ভাবে কিভাবে বলবে, কিছুটা ইম্বেরেসিং। আর দেখালে ডাক্তাররাও হাসাহাসি করে। বলে, বিয়ে হলে ঠিক হয়ে যাবে।
একবার ভাবির সাথে গল্পে গল্পে এ ব্যাপারে বলছিলাম। উনি আমাকে বললেন, তুমি স্টুডেন্ট হেলথ সেন্টারে দেখাও না কেন। এরকম সাধারন সব ‘মা ও শিশু সঙ্ক্রান্ত’ সমস্যা এখানে সব ফ্রি। ফ্রি পেলে বাঙালি আলকাতরাও খায়। আর আমি মাসে মাসে হেলথ ইনস্যুরেন্সের এত টাকা গুনছি। আমি আলকাতরা খেতে হেলথ সেন্টারে গেলাম।
এক নার্স আসলেন। অনেকক্ষণ ধরে আমার উচ্চতা ও ওজন নিলেন। যেন উচ্চতা ও ওজন থেকেই রোগ নির্ণয় করা যাবে। এবার দু ঘণ্টা ধরে কেস হিস্ট্রি নিলেন। তার কথা বার্তা শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম উনিই ডাক্তার। পরে বুঝলাম নয়। যাই হোক সামান্য কাজে আমার বাবা-মা দাদা-নানার কেস হিস্ট্রি নেওয়া হল। অধিকাংশই ভীষণ অশালীন আর অদ্ভুত প্রশ্ন। অবলীলায় জিগ্যেস করছিলেন। আর আমি লজ্জায় লাল হচ্ছিলাম। যেমন তোমার ক জন সেক্স পার্টনার .........তোমার বাবা – মায়ের কজন ...
যাই হোক টেস্ট ফেস্ট করিয়ে আমি নাচতে নাচতে বাড়ি আসলাম। আর আমাকে জানানো হল আমার কিছুই হয়নি।
এতক্ষণ খুব নেগেটিভ কথা বলেছি এবার পজিটিভ কিছু বলি
পজিটিভ ঘটনা
আমেরিকাতে এক বাঙালী স্টুডেন্ট দম্পতি কোথাও যাচ্ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তারা এক্সিডেন্ট করলেন। মেয়েটি ৫ মাসের গর্ভবতী ছিল। মেয়েটির অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় তাকে ৫ মাসের ডেলিভারি করানো হল। মেয়েটির শরীরে করানো হল আরও কিছু মেজর অপারেশন। ৫ মাসের বাচ্চাটিই ইনকিউবেটরে বড় হতে লাগল। বাচ্চাটি এখন সুস্থ। তবে হাসপাতাল থেকে পাহাড় সমান বিল আসল। এই পাহাড় সমান বিল আর গাড়ি বাবদ তারা ইনস্যুরেন্স থেকে ভাল ক্ষতিপূরণ পেল। আর্থিক ঝামেলায় পড়তে হল না।
আমরা সবসময় আমাদের দেশের ডাক্তারদের গালিগালাজ করি। এরা বড়ই চামার, ডাকাত শ্রেণীর। মায়া দয়া নেই। ৫০০ টাকা ভিজিট রাখে। এসি নইলে ফ্যানের তলায় বসে সামান্য দুটো ওষুধের নাম লিখতে এত টাকা! আর সামান্য জ্বর হয়েছে। দুদিন পরে এমনিতেই সেরে গিয়েছে। আর ডাক্তার দিয়েছে কিনা ব্লাড টেস্ট, ইউরিন টেস্ট। মাঝখান থেকে শুধু শুধু ২০০০/৩০০০ টাকার নিরর্থক অপচয়।
তবে আমেরিকাতে আপনার একই রকম সমস্যার জন্য ২০০০/৩০০০ টাকা নয় ২০০০/৩০০০ ডলার গুনতে হবে। আপনি ভাবতে পারেন কারেন্সিরও তো বড় পার্থক্য। তুমি বেতন পাও ডলারে আর শুধু ডাক্তার বিল ডলারে দিতেই তোমার যত আপত্তি। একজন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট এই দেশে খুব ভাল ফাণ্ড থাকলে প্রতিমাসে সাধারণত ১৫০০-২০০০ ডলার পায়। সেটার সবটাই যদি তাকে ডাক্তার বাড়ির পিছনে ব্যয় করতে হয়। তাহলে বাকি বাড়ি ভাড়া ...হেন তেন ...।
এজন্য সবাই যেটি করে। অসুখ বিসুখ করলে দেশে চলে যায়। যেমন আমার পরিচিত একজন এখন দেশে গেছেন কারন তার একটি ছোট অপারেশন করতে হবে। এই খানে যেটা ৩০০০-৮০০০ ডলারের ব্যাপার। এর থেকে অনেক কম খরচে তিনি ১৫-২০ হাজার টাকায় বাংলাদেশ থেকে সেটি করে আসতে পারেন। আর দাতের সমস্যা হলে তো কথায় নেই। দেশে যাওয়া অনেকটা অনিবার্য। কারণ এখানকার ইনস্যুরেন্স ডেন্টাল কভার করে না।
কিন্তু সবসময় তো দেশে যাওয়ার পরিস্থিতি থাকে না। আক্কেল দাত নিয়ে ঝামেলায় পড়েছি আমি। ডাক্তার বলেছে আমার দাত নাকি কান দিয়ে উঠছে মানে কানের দিকে চলে গেছে। দাত তোলা প্রয়োজন। সেমিস্টার শুরু হয়ে গেছে। দেশেও যেতে পারছি না। তাই আমি আর আমার স্বামী এখন চিপেস্ট ডেন্টাল ইনস্যুরেন্সের খোঁজে দৌড়াচ্ছি।
স্বামী বেচারার কথা একটু বলি। এখানে দাতের মত চোখ নিয়েও ঝামেলা। ইনস্যুরেন্স কভার করে না। যেটা মোটামুটি সাধ্যের বাইরে। বেচারার আবার চশমা হারানো রোগ। দেশ থেকে আসার সময় পাঁচটা চশমা বানিয়ে এনেছে। চশমার বিল দেওয়ার সময় শ্বশুর রেগে জিগ্যেস করলেন তুই চশমা কি চোখে দিস না খাস?
ও উত্তরে মুচকি হাসল। আমিও হাসলাম আর মনে মনে ভাবলাম। বাইরে থেকে এই আমেরিকার জীবন যাদের কাছে এত সুখের মনে হয়, সেই তারাই যদি জানত আমেরিকার চিকিৎসা ব্যাবস্থার কাছেই কি পরিমান অসহায় এখানকার সবাই!
আসল কথা হল কোন কিছুই নয়, দেশের মত নয়।
অনেকে হয়ত ভাবছেন, ঢং। কি যে সুখে আছো, জানি তো। পুড়ে মরার ভয় তো অন্তত নেই। তাদের জন্য সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ থেকে কটি লাইন তুলে দিচ্ছি
“দেখিলাম পোড়া মাঠ। যতদূর দিগন্তের পানে
দৃষ্টি যায়, দগ্ধ – ক্ষুদ্ধ ব্যাকুলতা শান্তি নাহি প্রাণে
ধরিত্রীর কোনখানে” ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





