somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার

০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠে একজনের লেখা পড়েই লেখাটা লিখতে ইচ্ছে করল। এই মেয়েটিকে আমি চিনি না। ক্যাম্পাসের জুনিয়র। মেয়েটি মেধাবী, ভাল। এ কারনে তাকে এড করেছিলাম। মেয়েটি অবশ্য এরকম লেখা আগেও লিখেছে। এড়িয়ে গেছি। আজকে মনে হল কিছু লিখি। কারণ অনেককেই দেখি এরকম লিখতে।

“ সব দুমুখো সাপ, এদের থেকে সাবধান” (তুমি কি বাবা!, সাবধান কি তোমার থেকেও হওয়া উচিৎ নয়?)। “ অবেশেষে তার আসল চেহারা দেখলাম” ( তোমারটাও তো অন্যরা দেখেছে) ”। “পৃথিবীতে মানুষ চেনা দায়” (যেন সে একাই ভাল মানুষ )। “আমার চারপাশে এত ভণ্ড, মানুষরূপী শয়তান আগে জানা ছিল না” (অন্যদের ও তোমার ব্যাপারে জানা ছিল না) । “ ফিলিং বিরক্ত, কিছু সুবিধাবাদী চিনলাম, এদের ডিলিট করতে চাই” (অন্যরাও চায় )। “ স্বার্থপরদের থেকে মুক্তি চাই” (তুমি কি নিঃসার্থবান?) ...........................এরকম আরও কিছু।

এগুলো বিভিন্ন জনের ফেসবুক স্ট্যাটাস। হয়ত আক্ষরিক ভাবে ঠিক এরকম নয়। তবে মুল ভাবটা এরকম। এগুলো তারা রাস্তাঘাটের অচেনা কাউকে নিয়ে লেখেনি। নিজের বন্ধুবান্ধব পরিচিতদের নিয়ে লিখেছে।
আপনাদের মনে হতে পারে এ বিষয় নিয়ে আমি কেন হঠাৎ পড়লাম। তাহলে কি এগুলো সব আমাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা। না এর কোনটিই আমাকে নিয়ে লেখা নয়।

প্রত্যেকটি মানুষের জীবন আসলে কি? একটা গোটা এন্সাইক্লোপেডিয়া ছাড়া আর কিছুই নয় । জীবনে চলতে গেলে মানুষের নিত্যদিন নতুন নতুন শব্দের ব্যাবহারের দরকার পড়ে আর তখনি শব্দকোষের কাছ থেকে সে শব্দ ধার করে। তবে কে কোন শব্দটি আজ ধার করবে সেটি নির্ভর করে তার আজকের প্রয়োজন, অনুভূতি ও দীর্ঘদিনের নিজস্ব অভ্যাসের উপর। কারণ প্রত্যেকটি মানুষেরই স্বভাব, কর্মকাণ্ড, চলাফেরা, দীর্ঘশ্বাস সবকিছুরই যেন একটা আলাদা ধরণ আছে।

তাই বলা যায় প্রত্যেকটি মানুষের জীবনই যেন এক একটা শব্দকোষ। আর সেই শব্দকোষের শব্দ গুলো সাজিয়ে ফেললেই এক একটা আলাদা গল্প।

ধরা যাক দুজন মানুষ রাস্তায় হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে একটি ঢিল পেল। প্রথম ব্যাক্তিটি লক্ষই করল না। কারণ তার মনোজগতের পুরা জগত জুড়ে তখন অন্য কোন বিষয় স্থান দখল করে আছে। দ্বিতীয় ব্যাক্তি এক লাথিতে ঢিলটা আকাশে তুলল। ঢিলটির তো কোন দোষ ছিল না। হয়ত এটা তার গতকালের হতাশার অথবার এক সপ্তাহের বিক্ষিপ্ত মানসিক অবস্থার ফলাফল অথবা এমনও হতে পারে ঠিক ঐ সময় লোকটি নিউটনের গতিসূত্র নিয়ে ভাবছিল। কতটা ফোর্স দিলে ঢিলটি কত দুরে যাবে।

কিছুদিন আগে আমি আমেরিকার সিরিয়াল কিলারদের জবানবন্দী দেখছিলাম টিভিতে। খুনোখুনি আমার বরাবর অসহ্য। শুধু দেখছিলাম তাদের সাইকোলজি বোঝার জন্য। আমি দেখলাম এসব খুনিদের কেউই তাদের কাজের জন্য অনুতপ্ত নয়। বরং সম্পূর্ণ বিনা কারনেই তারা হত্যা করত আর এক একটা হত্যার পর অদ্ভুত আনন্দ পেত।

কিন্তু প্রশ্ন হল তারা এই খুনটা কেন করত। একজন লোককে দেখলাম সে তার জবানবন্দীতে বলেছে সে এমন একটা পরিবেশে বড় হয়েছে সেখানে সোশ্যাল ইন্টারেকশনের কোন সুযোগ ছিল না। তাদের বাসাটা ছিল অসংখ্য বন্দুক আর ধারালো অস্ত্রে ভরা। বাড়িতে তার মা ছিল না। একেবারে ছোটবেলা থেকে বাবার সাথে শিকারে যেত সে। তার বাবা কোন কারণ ও প্রয়োজন ছাড়াই পশু-পাখি হত্যা করত। হত্যা করে অদ্ভুত আনন্দ পেত। একসময় সেই ছেলেটিও আনন্দ পেতে শুরু করে। বড় আনন্দের আশায় বড় হয়ে সে মানুষ হত্যা শুরু করে।

ভিডিওতে একজন সাইকলজিস্ট দেখা যাচ্ছিল, তিনি এদের কেস স্টাডি সম্পর্কে বলছিলেন। তিনি বলছিলেন যদিও বিষয়টা বেশ জটিল। তবে এসব অপরাধীদের অপরাধ প্রবনতার সাধারণ কারণ হল এব্রুপ্ট চাইল্ডহুড, ফ্যান্টাসি এবং ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজম। ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজমকে সাইকোলজির ভাষায় বলা হয় নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার । অর্থাৎ ব্যাপারটি এরকম এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তি নিজের প্রেমে এতটাই তুষ্ট থাকে যে অন্য সবকিছুই তার কাছে তুচ্ছ মনে হয় আর তুচ্ছ যেকোনো কিছুই তার কাছে ধ্বংসের দাবী রাখে।

আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে এরকম সিরিয়াল কিলারদের সাথে খুব একটা পরিচিতির সুযোগ ঘটে না। আর ঘটলে হয়ত এই মুহূর্তের বিশুদ্ধ অক্সিজেনের স্বাদটুকু থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম।

কিন্তু সিরিয়াল কিলার যে নেই তা আমি বলব না। আমাদের আশেপাশে অসংখ্য সিরিয়াল সম্পর্ক কিলার আছে। এরা নিজেদের ভুল কখনও খুঁজে পায় না। পেলেও অন্যকে দোষ দিয়ে নিজের দোষটাকে এরা ঢেকে ফেলে। এরা খুঁজে খুঁজে কারণ বের করে এবং অবশেষে নিশ্চিত হয় এদের আসলেই কোন দোষ নেই। এভাবে এরা অন্যকে দোষারোপ করে, অপমান করে। তার উপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে এবং অদ্ভুত আনন্দ পায়। তার এই অদ্ভুত আনন্দের কারনে যেটি হয়, তার দীর্ঘদিনের বন্ধুটি অভিমান করে তাকে ছেড়ে দুরে চলে যায় আর সেও এরকম আচরণ করে যেন তার বন্ধুটির মত নিকৃষ্ট কীট আর এ পৃথিবীতে নেই ।

অবশেষে তাদের সম্পর্কের মৃত্যু ঘটে এবং এই সম্পর্ক হত্যার জন্য তার মনে কোন অনুশোচনা পর্যন্ত হয় না । এর পিছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথম কারণ ভেতরে ভেতরে ব্যাক্তিটি ভীষণ দুর্বল আর রুঢ়তাই দুর্বলতার লক্ষণ। দ্বিতীয় ও প্রধান কারণ সেই ব্যাক্তি নিঃসন্দেহে নার্সিসিস্ট। নার্সিসিস্টদের কোন অনুশোচনা হয় না কারণ সে মনে করে সে নিজেই শ্রেষ্ঠ, তার ভুল হতে পারে না। আর ভুলটা জানলেও স্বীকার করার মত মাথা অবনত করার কাজ সে করতে পারে না।

আমি জানি, তুমিও হয়ত একজন নার্সিসিস্ট। একবার ভেবে দেখোতো তুমি কি কখনও জানতে চেয়েছ, তোমার বন্ধুটির আসলে সেদিন কি হয়েছিল, কি ঝামেলার মধ্যে তার বসবাস ছিল, তার জীবন কতটা জটিল ছিল। যেদিন ও তোমার উপর খুব রেগে গিয়েছিল তুমি কি জান, সকালে ওর মা ওকে খুব বকেছিল, ও পরীক্ষাতে খুব খারাপ গ্রেড পেয়েছিল। অথবা এর কিছুই ওর হয়নি। হয়ত ওর হাই টেম্পার প্রব্লেম আছে ও নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। তাই সেদিন রেগে গিয়েছিল অথবা তোমার দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের চোখ সেদিন ওকে খেপিয়ে দিয়েছিল। তুমি কি পারতে না ওকে ক্ষমা করতে? আর কি হয় ক্ষমা করলে? ভুলগুলো উপেক্ষা করলে?

নিঃসন্দেহে বিশৃঙ্খলা কমে। জীবনটা অনেক প্রশান্তির হয়। কি দরকার আরও বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে? তুমি কি জানো এরপর ও কত অনুতপ্ত হয়ে কেঁদেছে। অথবা কাঁদেইনি। ওও তোমার মত নার্সিসিস্ট। কিন্তু তুমি কি জান তুমি যদি সরি বলে ওকে একটা টেক্সট করতে অথবা লিখতে চল ছাদে যাই। দারুন চাঁদ উঠেছে। আজকের জোৎস্নাটা একসাথে দেখি। এরপর থেকে কি হত জানো ? ওর আচরণ গুলো শুধরে যেত। তোমার বন্ধুটা তোমাকে ভালবাসত। কারণ তুমিই তো ওকে ভালবাসতে শিখিয়েছ। আর সেই ভালোবাসায় তুমি যে তৃপ্তি পেতে তোমার আত্ন অহঙ্কারের কাছে সেটা নিতান্তই তুচ্ছ হত।

হুমায়ুন আহমেদ এর বইয়ের লেখার একটা দিক আমাকে খুব টানত। উনি ওনার লেখাতে চরিত্রগুলো এমনভাবে তৈরি করতেন যেন পৃথিবীর কোন মানুষই খারাপ নয়। একজন পেশাদার ভয়ংকর খুনিও দিনশেষে একজন ভাল বাবা। একজন দায়িত্বশীল স্বামী। হয়ত এই দায়িত্ব পালন করতে যেয়েই সে খুনের পথ বেছে নিয়েছে। “পাপকে ঘৃনা কর। পাপীকে নয়”। পোপ আসলে যথার্থই বলেছেন।

এরপরও যারা মনে কর নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু নেই, গ্রীক দেবতা নার্সিসাস এর গল্পটা জানো তো । নার্সিজমের জন্য যাকে প্রান দিতে হয়েছিল। তাই সাবধান থেকো। তোমার এই শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই ই তোমাকে হয়ত কোনোদিন এমন পরিনতিতে নিয়ে যাবে।

সম্পর্কগুলো আসলে এক একটা চারাগাছ। সেটাকে সার মাটি দিয়ে লালন করতে হয়। ফল দিতে দেরি করছে বলে রেগে সেটাকে উপড়ে ক্ষতবিক্ষত করার মানে নেই। আর একটু সবুর কর। আর একটু যত্ন কর। ফুল-ফল ছায়া সবই পাবে। সেই ছায়াই তুমি জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত হলে ঠাই ও পাবে। আর ভরসা রাখ মানুষের প্রতি। তুমি কাউকে ছেড়ে যেও না। কেউ ও তোমাকে ছেড়ে যাবে না। সৃষ্টিকর্তা নিখুত বিচারক। সবাইকেই সমান মায়ামমতা দিয়েই তিনি পাঠিয়েছেন।

*** আমার সাইকোলজি জ্ঞান খুব কম। কিছুটা অভিজ্ঞতা ও ইন্টারনেট ঘেঁটে লিখেছি।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ৮:৪১
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×