তখন আমরা সবে পৃথিবীর প্রেমিক প্রেমিকার খাতায় নাম লিখিয়েছি। বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে । তবে কেউ কাউকে সরাসরি দেখিনি। সম্পর্কের বয়স ১ মাস সাতদিন।
ভ্যালেন্টাইনসের দিন আসল। যেদিন প্রেমিক প্রেমিকাদের অবশ্যই কিছু করতে হয়। নিজেকে বড় প্রেমিক প্রমাণ করার মোক্ষম সুযোগ নাকি এইদিনই থাকে। সেও সুযোগ হাত ছাড়া করল না। আমাকে সারমাটি সহ ফুল পাঠালো। চকোলেট পাঠালো সাথে ডায়মন্ডের আংটি, সেফায়ারের নেকলেস।
বিয়ের পর আমরা দুজন দুজনার সাথে সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করছি। সে তার গভীর দুঃখের কথা জানালো। এতগুলো গিফট কিনতে তার কতটা কষ্ট হয়েছে। বন্ধুদের কাছে কতটা ধার করতে হয়েছে। কিছু কিছু ধার তো এখনও শোধ করতেই পারেনি।
ফুল কিনতে কত লেগেছে জিগ্যেস করে জানলাম ৮৫ ডলার। আহারে ধার করে এত কিছু দিয়েছে! কৃতজ্ঞতায় আর ভালবাসায় চোখে জল চলে আসলো। মনে হল ভুবন খ্যাত প্রেমিক, এক জীবন্ত ফরহাদের সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে।
বিয়ের পর প্রথম ভ্যালেন্টাইনস ডে।
আমরা দোকান পাটে ঘুরছি। ভ্যালেন্টাইনস গিফট দিয়ে দোকানপাট ভরা। আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখছি। সে যে জিনিষই দেখছে আমাকে বারবারই বলছে তুমি কি চাও? তুমি কি সত্যিই চাও এটা? তুমি না চাইলে, আমি কিন্তু দেব না । শুধু শুধু বাজে খরচ করার তো কোন মানে হয় না।
আমি মুখে বলছি চাই না কিন্তু মনে মনে ঠিকই একটা সারপ্রাইজের জন্য অপেক্ষা করছি। বিয়ের পর সারপ্রাইজ অবশ্য আমাকে আগে সে একবার দিয়েছে।
বিয়ের পরে প্রথম ঈদ ছিল সেটা । একটা পার্সেল এসেছে । আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পার্সেল খুলছি। সে বলেছে আমার ঈদের সারপ্রাইজ গিফট এটা। মুখে বলছি এসবের কি দরকার তবে মনে মনে বেজায় খুশি। স্বামীর প্রথম ঈদ উপহার। কি আছে ওতে? উত্তেজনায়ও ভীষণ অস্থির আমি।
আমি পার্সেল খুললাম। পার্সেল খুলে আমার সব উত্তেজনা একেবারে ঊবে গেল। এ কি দেখছি আমি! বড় সাইজের বারোটি কাঁচের বয়াম। এরকম গিফট কি কেউ কাউকে কখনও দিতে পারে! তাহলে নিশ্চয়ই ভুলে কারো জিনিশ চলে এসেছে।
কিন্তু নিশ্চিত হলাম যখন সে বলল কি খুশি হওনি? রোল ব্যাকে পেয়েছি। কেমন বুদ্ধি করে দিয়েছি বল? শাড়ি – চুড়ি তো তোমার অনেক আছেই। আর এসবের পিছনে বাজে খরচ করে কি লাভ? বড়জোর ফেসবুকে একটা ছবিই তো আপলোড দেবে। তাই ভাবলাম কাজের জিনিষ দেই। এগুলোতে তুমি হলুদ, মরিচ, কিসমিস, বাদাম সবই রাখতে পারবে।
তার এরকম কর্মকাণ্ডে মাঝেই মাঝেই আমার খুব রাগ হয়। একদিন খুব রেগে গিয়েছি আমি। রেগে গিয়েছি অবশ্য চা বানানো শুরুর পর । দু কাপ চা বানিয়েছি । আমি খাচ্ছি না। সে বলল তুমি খাবে না? যেহেতু আমি রেগে গিয়েছি । রাগটা বোঝাতে হবে, তাই আমি বললাম, খাব না। তুমিই খাও।
ওমা! সে দু কাপ চা ই খেয়ে ফেলল!
পরে রাগ কমলে বললাম, তুমি কি করে দু কাপ চা ই খেয়ে ফেললে? তোমার কি উচিৎ ছিল না অন্তত একবার আমার রাগ ভাঙ্গানোর চেষ্টা করা। উত্তরে সে বলল, ও তুমি রেগে গিয়েছিলে। আমাকে আগে বলবে তো।
আর একটি ঘটনা শেয়ার করি।
আমাদের প্রেম হয়েছে একজন আর একজনের ছাইপাশ লেখা পড়ে। আমরা দুজন দুজনের লেখা বিনিময় করছি। সে আমাকে তার সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটা পড়তে দিল। তখন একটা ২০১২ এর কিস্তি লিখছিল সে। চমৎকার বর্ণনা শৈলী। সে লেখা পড়ে আমি রীতিমত মুগ্ধ। তার একটি পরিচয় পেলাম সে একজন ব্লগার । ব্লগিং জিনিষটা আমি তখনও শুরু করিনি। ব্লগার মানে তখন আমার কাছে অন্য কাতারের কিছু । প্রকৌশলী তো অনেকেই হয় কিন্তু ব্লগার তো হাতে গোনা।
তার লেখা পড়ে আমি তাকে বললাম তুমি এত ভাল লেখ। আমার মন্তব্যে তাকে খুব খুশী মনে হল। খুব গর্বিত ভঙ্গিতে বলল তুমি আমার ফেসবুক নোটস এ যেতে পারো। আমার আরও লেখা আছে সেখানে।
আমি গেলাম। দেখি অসংখ্য নোটস লেখা। মনে হল আমি তো এ জীবনে কিছুই লিখতে পারিনি। এত বড় বিরাট সাহিত্যিক আমাকে ভালবাসে যার জীবনের অধিকাংশ সময় যে কিনা ফেসবুকে নোটস লিখে কাটিয়েছে! আর দুটি লেখা তো পড়েছিই। নিশ্চয়ই বাকিগুলোও অসাধারণ। কিন্তু ডিফেন্স নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাকিগুলো আর পড়ে দেখা হল না।
বিয়ের পর হাতে তখন বেশ সময়। আমি আমার সাহিত্যিক স্বামীর নোটস খুলে বসলাম । মুগ্ধের মত পড়ছি । পড়া শেষে দেখি নিচে লেখা সংগৃহীত।
আমি আরেকটি খুললাম । সেটিও সংগৃহীত।
আরে যেটি পড়ছি সেটিই সংগৃহীত।
আমি হতাশ হলাম। ভীষণ হতাশ।
আজকে কোন সারপ্রাইজ না পেয়ে তাকে সারপ্রাইজ দিতে আমি কিছু রান্না করেছিলাম। সুস্বাদুগুলো সে খেল আর যেগুলো খারাপ ছুঁয়েও দেখল না। বাড়ির গিন্নী আমি। সংসারের অন্ন ফেলি কি করে সে যত বিস্বাদই হোক।
যাই হোক সামারি অফ দ্যা ডে আমার ভ্যালেন্টাইন ডে কাটছে সব বিস্বাদ খাবার খেয়ে। ৮৫ ডলার তো দুরের কথা ৮৫ সেন্টের ফুলও কারো কাছ থেকে পেলাম না ।
ফিলিং বিয়ের পরে প্রেম বলে কিছু নেই কিছু নেই কিছু নেই............
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১১:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



