somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লিখতেই হল

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ১:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার কলেজের পাঠ চুকেছে এক মিশনারি কলেজে। সেখানে আমাদের রোজ দুটো প্রার্থনা করতে হত। একটা প্রার্থনা ছিল ইংরেজিতে একটি গান। গানের পুরো কথাটা মনে নেই। সেখানকার একটা লাইন ছিল “ হলি ক্রস দীর্ঘজীবি হোক”।

সবে মফস্বলের একটা জেলা শহর থেকে ঢাকায় পা রেখেছি। ঢাকায় তখন আমার কাছে বিরাট কিছু। আড়ষ্টতা গুলো তখনও কাটেনি। এক বান্ধবী বলল এই গানের শেষ লাইনটা অনেকটা আমাদের কলেমার মত। এটা গাইলে নিজের অজান্তে খ্রিস্টান হয়ে যাবি। খ্রিস্টান হবার ইচ্ছে আমার কোনোদিনই ছিল না কিন্তু কলেজের নিয়ম তো মানতে হবে। অনেক ভেবে তখন এক বুদ্ধি বের করা হল, তাতে কলেজের নিয়মও মানা যাবে আবার মুসলমানও থাকা যাবে। বুদ্ধিটা ছিল গানটা পুরোটুকু ভালভাবে গেয়ে শেষের লাইনটাই এসে শুধু ঠোঁট নাড়তে হবে।

ছোটবেলার কথা, বাসার কাছে ছিল কালিপদ মন্দির। মন্দিরের ঢাকের আওয়াজ পৌঁছে যেত বাসা অব্দি। আমার বাবা-মা নামাজ পড়তেন, আবার পূজোর দিনে আমাদের নিয়ে ঘুরতেও বেরোতেন। তারা কিরকম মুসলিম ছিলেন জানি না, আমিও তাদের মতই রয়ে গেলাম। দাদীর অবশ্য এতে খুব আপত্তি ছিল।

২০০৮ এ প্রথম ভোটার হলাম আমি। এর আগে রাজনীতি নিয়ে এতোটা কখনও ভাবিনি। বাবা রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না, তবে একটি দলকে বিশেষ সমর্থন করতেন। সেই দলকে সমর্থন করায় দাদীর সেকি রাগ, তুই আমার ছেলে হয়ে হিন্দু হয়ে যাবি? দাদীর বয়স হয়েছে। তিনি তখন আশেপাশের সব গ্রামের মসজিদে ফ্যান আর খাটিয়া কিনে বেহেশত যাবার পথ সুগম করছেন।

বাবা ছিল দাদীর সাত মাসের ভূমিষ্ঠ প্রথম সন্তান। দাদী অনেকদিন রেগে ছিলেন তার এই প্রিয় সন্তানটির উপর। তার আর একটি কারন ছিল সংসারে তখন বেশ টানাটানি আমাদের। বাসায় ভাড়াটিয়া মিলছে না। যা মিলছে সবাই জামাতি লোকজন। কিন্তু শুধু জামাতি হওয়ার কারণে বাবা কাউকে বাসা ভাড়া দিচ্ছেন না। সংসার খরচের অনেকটা অংশই আসে বাড়ি ভাড়া থেকে। মা দাদীর কাছে অনুযোগ করলেন। সে শুনে দাদী অনেকদিন বাসায় আসতেন না। বাবাও কিছুটা রাগ করেছিল, তবে ভুল ভেঙেছিল একসময়। দাদীকে আসলে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। পুরা গ্রামের লোক তখন বিশ্বাস করত জামাতে সমর্থন না থাকলে হিন্দু হয়ে যেতে হয়। হিন্দুদের জন্য তো আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই বেহেশত বানান নি।

বুঝেছিলাম ব্রেইন ওয়াশটা একেবারে তৃণমূল থেকে হয়েছে। আমাদের শহরের এখনকার বাসাটা অনেকটা জামাত ইসলামী পাড়ায়। জামাত ইসলামী লোকরা কেমন আমি জানি না, তবে ওরা আমাদেরকে সামাজিক ভাবে খুব হেনস্থা করেছিল। প্রায় একটা চাঁদা চাইত ওরা বাড়ি বাড়ি যেয়ে। আমার মা মাঝে মাঝে দিতেন, মাঝে মাঝে না। চাঁদা কি কাজে ব্যবহার হত আমি পরে শুনেছি। জামাতি মহিলারা চাঁদা তুলে মাসিক মিটিং, মিটিং এর পর খাওয়া দাওয়া এসব করত। মা প্রতিমাসে দাওয়াত পেতেন, কোনোদিন যাননি। সত্যিকার অর্থে তার হাতে সময়ই ছিল না কোনোদিন । আমরা ভাইবোন এক হালি, সে মানুষ করতেই তাঁর হিমশিম।

কে বা কারা যেন মায়ের উপর রাগ করে মায়ের শিম গাছটা একদিন কেটে ফেলল। সবে লকলকিয়ে পোর্চের ছাঁদে উঠেছিল ও। ফুলও এসেছিলো। বাড়ি ফিরলেই এক থোকা বেগুনী ফুলের দেখা মিলত। শিম গাছটা ওরাই কেটেছিল কিনা জানি না। বাবাকে নালিশ করা হল। বাবা বললেন, বাদ দাও তো। আমার লাজুক মা বাদ দিলেন না। একাই মসজিদে গিয়ে নালিশ দিলেন। কোন লাভ হল না। মতের মিল হওয়াতে আমার বাবা-মাকে অগ্রাহ্য করা হল। তবে বাবা খুব হুঙ্কারি মানুষ ছিলেন। এই ভয়ে তার সামনে কেউ কিছু বলল না। মা এক সপ্তাহ খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলেন। এক সপ্তাহ পর বিচার না পেয়ে নিজে থেকেই খেলেন। মায়ের এই অনশন একটু বাড়াবাড়িই মনে হল। কাঁদতে কাঁদতে মা অবশ্য সেদিন বলেছিল, গাছ নাকি সন্তানের মত, লাগিয়ে রোজ অপেক্ষা করতে হয়, কবে বড় হবে।

আমাদের পাড়ায় এখনও জামাতিরা আছে। এর একজন বাবার চাচাতো ভাই। চাচা আমাকে খুব আদর করেন। চাচা একাত্তরে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। বয়স হয়েছে, স্বাভাবিক ভাবে পরকালের ব্যাপারটা এখন মাথায় চলে আসে। তাই সেই একাত্তর ভুলে এখন তিনি জামাত করেন।

চাচা আল্লাহ্‌কে ভালবেসে তাকে কতটুকু ডাকেন জানি না, তবে নিজের জন্যই হয়তো ডাকেন। আমিও এরকম ডাকি, খুব বিপদে পড়লেই জায়নামাজ নিয়ে বসে যায়। নাস্তিকদের নিয়ে কখনও খুব বেশি ভাবা হয়নি। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে বিপদে পড়লে ওরা কি করে? ডাকার মত কেউ যখন থাকে না, নিশ্চয়ই খুব অসহায় হয়ে যায়।

আমার এক আমেরিকান সহকর্মী ছিল জ্যাকব ব্রিকম্যান। তার কাছে শুনেছিলাম তাদের ধর্মের কথা। ধর্ম না বলে বিশ্বাস বলায় বোধ হয় ভাল। তাদের গোত্রের লোক ধর্ম আছে এরকম বিশ্বাসও করে না , আবার নেই এরকম কোন বিশ্বাসও তাদের নেই। প্রথম শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। তবে এখন মনে হয় ধর্ম নিয়ে এত না ভেবে মানুষ নিয়ে ভাবলেই বোধ হয় ভাল। এরকম ভাবনায় জগত সংসারের খুব একটা ক্ষতি হয় না।

সব ধর্মেই আছে ঈশ্বরের কাছে পৌছাবার সহজ উপায়, সেটি মানবসেবা। কিন্তু সে যে বড় কঠিন। ঈশ্বর তো শুনেছি স্বর্গেই থাকেন। তাহলে তো জিহাদই ভালো। শহীদ হলে একেবারে সরাসরি বেহেশত।

বেহেশত যাওয়া নিয়ে আসলে খুব তাড়া আমাদের। জিহাদের সংজ্ঞাটা ভালভাবে জানবার সময় সেখানে কই! বরং সে জিহাদে এ ধরণীতল নরকময় হলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। আজ যখন অভিজিৎ রায় আর তার স্ত্রীর খবরটা পড়ছিলাম মায়ের কাঁটা শিম গাছটার কথা মনে পড়ছিল আমার। মতের মিল না হওয়ার কারনে দু’ ক্ষেত্রেই মৃত্যু।

কলেজে আরেকটা প্রার্থনাও হত রোজ। “অন্তর মম বিকশিত কর অন্তর তর হে ,নির্মল কর উজ্জ্বল কর সুন্দর কর হে.........” । এটি আমি খুব মন দিয়ে করতাম। এই অন্তর বিকশিত করার শিক্ষার বড্ড দরকার এখন আমাদের। তরবারির শিক্ষার আর দরকার নেই, ও শিক্ষা পাড়ার ছিঁচঁকে মাস্তানদের আরও ভাল জানা আছে।
১৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদির আকাশে সংঘাতের কালো মেঘ আর প্রবাসীদের পুরনো বন্দিদশা: আমাদের শ্রমবাজারের নতুন সংকট

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৮

বাইরে যুদ্ধাবস্থা, রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে হুতিদের লাগাতার ড্রাফট-মিসাইল হামলা, আর অন্যদিকে সৌদি আরবগামী ফ্লাইটগুলো একে একে বাতিল বা স্থগিত—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে আবারও এক মারাত্মক অন্ধকারের ছায়া নেমে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়, গ্রাফিতিতে চুনকালি ও পলিটিক্যাল ইসলাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৪


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাটায় - পুটায় ঘষাঘষি, মাঝখানে মরিচদের জীবন শেষ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩১

আওয়ামী তথা ভারতীয়দের নমস্য রবী বাবুর চিত্রে কালিমা লেপন।
দুই দিন পরে, আওয়ামী বিরোধীদের 'রবী' ইউনুস সাহেবকে গালাগালি!!!
এ যেন পাটাপুটায় ঘষাঘষি করে অভাগা মরিচদের জীবন শেষ করার চেষ্টা?
কিন্তু, রবী বাবু কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×