somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রক্তপাথারে দাঁড়িয়ে আগামীর বিজয় দেখা

১১ ই অক্টোবর, ২০১৩ সকাল ৭:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোনো কোনো দিন আসে কান্নাগুলো রক্ত হয়ে ঝরে। সেই রক্তপাথারে দাঁড়িয়েও বিজয়কে দেখা যায়। জীবন বিলিয়েও অনুভব করা যায় ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার অপার্থিব আনন্দ। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই একটি দিন। কালো, রক্তাক্ত, নৃশংস। একই সাথে আত্মত্যাগের, প্রেরণার, আল্লাহর রাহে হৃদয়জমিন উর্বর করার। ক্ষমতার মোহে সেদিন আওয়ামী হায়েনাদের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে অকালে ঝরে যায় অনেক তাজাপ্রাণ, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে পুরো জাতি। মানবেতিহাসের স্বাভাবিকতায় নতুন ঘটনা ঘটে, বিস্মৃত হয় পুরাতন ইতিহাস। সবাই ভুলে গেলেও বাংলাদেশে যতদিন ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন থাকবে, ততদিন ২৮ অক্টোবর চিরজাগরুক শিখা হয়ে জ্বলবে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি নেতাকর্মীর অন্তরে। বাতিলের মোকাবেলায় দৃঢ়তা প্রদর্শন, আর আল্লাহর দ্বীনের জন্য হাসিমুখে জীবন উৎসর্গের জীবন্ত চলচ্চিত্র ২৮ অক্টোবর।

২০০৬ সালের অক্টোবর মাসের ২৫ তারিখ ছিল কোরবানির ঈদ। আর সরকারের মেয়াদ শেষে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা ছিল ২৮ অক্টোবর। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঐদিন দেশ অচল করে দেয়ার। তাই সংগঠন কর্তৃক ঘোষণা করা হলো ঈদ শেষ করে ২৭ তারিখ রাতের মধ্যে ঢাকায় উপস্থিত হওয়ার। অনেক আশঙ্কার মধ্যেও সিদ্ধান্ত নিই গ্রামের বাড়ি হাতিয়া দ্বীপে গিয়ে বাবা-মায়ের সাথে ঈদ করার। সে অনুযায়ী ২৩ অক্টোবর বাড়িতে পৌঁছাই। মোটামুটি ভালভাবেই আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঈদ উদযাপন করি। কিন্তু ২৬ তারিখ থেকেই আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন ২৮ অক্টোবর সরকারের শেষ দিন, সবাইকে লগি-বৈঠা নিয়ে রাস্তায় নামার জন্য। দেশব্যাপী চলতে থাকে নব্য হিন্দা ও আবু জাহেলদের প্রস্তুতি। সারাদেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা আতঙ্ক। তাই কোনোভাবেই বাড়ি থেকে আমাকে বের হতে দিতে রাজি নয় বাবা, মা, ভাই, বোন কেউই। ফোন করি আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সভাপতি আক্তার হোসাইন ভাইকে। ফোন ধরে তিনি সাফ জানিয়ে দেন সদস্য থাকতে হলে যেকোনো মূল্যে ২৭ অক্টোবর রাত ১০টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছতে হবে এবং ২৮ তারিখ সকালে বায়তুল মোকারম মসজিদের উত্তর গেটের সমাবেশে শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করতে হবে। তখন বাড়িতে সবাইকে জানিয়ে দিই পরিস্থিতি যাই হোক আমাকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতেই হবে।

সেদিন ছিল ২৭ অক্টোবর, শুক্রবার। সবার কাছ থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নিয়ে আমার সেজো ভাই আব্দুল হক জোবায়েরের সাথে রওনা দিয়ে সি-ট্রাকে উঠে মেঘনা নদী পার হয়ে চরবাটা চার নম্বর ঘাটে আসি। কিন্তু ঘাটে এসে শুনতে পাই নোয়াখালীর বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীরা রাস্তা অবরোধ করে গাড়ি ভাঙচুর করছে এবং স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের সাথে বিভিন্ন জায়গায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হচ্ছে। রাস্তায় কোনো গাড়ি চলছে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর অবশেষে সৌভাগ্যক্রমে একটি খালি অ্যাম্বুলেন্স পেয়ে যাই এবং দুই ভাই রোগী হিসেবে মাইজদি শহরে পৌঁছাই। তখন প্রায় বিকেল ৫টা। জেলা জামে মসজিদে নামাজ আদায় করে বাসের টিকেট কিনতে যাই। বাস স্টেশনে গিয়ে দেখি বাস তেমন নেই। ২-১টা যদিও চলাচল করছে কিন্তু সেগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ইতোমধ্যে হাতিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ড গণ্ডগোলের খবর পেয়ে আমার মা ও বড়ভাই মিজানুল হক মামুন, জোবায়ের ভাইকে ফোন দিয়ে বলে দেয় যাতে কোনোভাবেই আমাকে ঢাকায় আসতে না দেয়া হয়, এবং মাইজদীতে আমাকে বাসায় আটকে রাখে। ভাইয়াদের নিষেধ উপেক্ষা করেও আমি চেষ্টা করতে থাকি গাড়িতে একটি সিট ম্যানেজ করতে। অবশেষে মাগরিবের নামাজের পর ‘বিলাস’ গাড়িতে ড্রাইভারের পেছনের সিট পাই। সেই টিকেট নিয়ে আমি যখন গাড়িতে উঠতে যাই, তখন মিজান ভাই আমাকে ফোন করে বারণ করেন এই অনিশ্চিত পরিবেশে ঢাকায় না যেতে। জোবায়ের ভাই আমাকে জোর করে বাস থেকে নামিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। সবার বাধা উপেক্ষা করে দায়িত্বশীলের আনুগত্যই প্রধান দায়িত্ব মনে করে গাড়িতে উঠে মোবাইল বন্ধ করে দেই। গাড়িটি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। কিন্তু কুমিল্লায় আসার পর বাধার মুখে পড়ে। আমাদের সামনের কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের শিকার হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের গাড়িটি রক্ষা পায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে সামনের ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটির কিছু যাত্রী নিয়ে আমাদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। সারা পথ গাড়িটির সামনের গ্লাসের সাথে হাত রেখে দাঁড়িয়ে যখন ঢাকায় পৌঁছাই তখন রাত আনুমানিক ১টা। বাস থেকে নেমে দীর্ঘক্ষণ যাত্রাবাড়ী বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকে ৮ নম্বর গাড়িতে উঠি শাহবাগ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মতিঝিলে এসে শুনি শাহবাগে প্রচণ্ড গণ্ডগোল হচ্ছে। অগত্যা গাড়িটি মগবাজার হয়ে কারওয়ান বাজারে আমাকে নামিয়ে দেয়। রিকসা নিয়ে যখন হলে পৌঁছাই তখন রাত সাড়ে ৩টা। হলে তখন খাবার নেই। উপোস থেকেই ঘুমিয়ে পড়ি।

২৮ অক্টোবর সকাল ৭টায় ফার্মগেটে সদস্য বৈঠক ছিল। সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখি প্রায় ১৩০-১৪০ জন সদস্যের মধ্যে আমরা মাত্র ১৪-১৫ জন আসতে পেরেছি। সদস্য বৈঠক শেষে চলে যাই পল্টনে, সেখানে তখন সমাবেশের মঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছিল। দায়িত্বশীলদের সাথে সাক্ষাৎ করে শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হই। আমাদের জন্য নির্ধারিত স্থান ছিল পল্টন মোড়। তিন সারির মধ্যে আমাদের দায়িত্ব পড়ে প্রথম সারির মাঝ বরাবর। আমরা প্রত্যেক সারিতে ৫০ জন করে ৩টি সারিতে মোট ১৫০ জন ছিলাম। আমাদের প্রস্তুতি বলতে কিছুই ছিল না। ছিল শুধু প্রত্যেকের হাতে একটি করে প্ল্যাকার্ড।

সকাল তখন প্রায় সাড়ে ১০টা। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুলবুল ভাই, মজিবুর রহমান মন্জু ভাই ও মাসুদ ভাইয়ের দিকনির্দেশনা শুনছিলাম। তাঁরা আমাদের বললেন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ওহুদের যুদ্ধে গিরিপথে হযরত জুবায়ের (রা)-এর নেতৃত্বে যে ৫০ জন সাহাবী ছিল তাঁদের মতো পল্টন মোড়ের এই প্রবেশপথটি সুরক্ষা করার। আমাদের ওপর যদি থুথু, জুতা এমনকি গুলিও করা হয়, তারপরও যেন আমরা শান্ত থাকি এবং অবস্থান ত্যাগ না করি। এর প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর কাকরাইল থেকে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের নেতৃত্বে একটি মিছিল আসে, মিছিলটি পল্টন মোড় পার হওয়ার সময় আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা করে। তারা আমাদের ওপর জুতা ও বোতল নিক্ষেপ করে। কিন্তু দায়িত্বশীলদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমাদের সামনে দণ্ডায়মান মহানগর জামায়াত ও শিবির নেতৃবৃন্দ তাদেরকে ম্যানেজ করে মুক্তাঙ্গনের দিকে তথা আওয়ামী লীগের সমাবেশস্থলের দিকে পার করে দেন।

চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু হয় সকাল ১১টার দিকে, তখন মঞ্চ নির্মাণসহ শৃঙ্খলা ও বিভিন্ন বিভাগের কাজে নিয়োজিত আমরা প্রায় ৩০০-৪০০ লোক উপস্থিত ছিলাম। এ সময় হাজী সেলিম ও ডা: ইকবালের নেতৃত্বে শাহবাগের দিক থেকে ৪০০০ থেকে ৫০০০ লোকের একটি সশস্ত্র মিছিল পল্টনের দিকে এগিয়ে আসছিল কিন্তু মিছিলটি পল্টন মোড়ে পৌঁছা মাত্রই আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু করে। তারা পল্টন মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে তাদের সমাবেশস্থলের দিকে না গিয়ে বায়তুল মোকারম মসজিদের উত্তর গেটের উল্টো দিকে অবস্থিত আমাদের সমাবেশস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে আমরা বাধা দিই। শুরু হয় হায়নাদের বর্বর আক্রমণ। এ যেন আফ্রিকার জঙ্গলের হিং¯্র নেকড়ের নৃশংসতা। তারা ট্রাকভর্তি ইট পাটকেল, লগি, বৈঠা আর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অথচ আমাদের কাছে দেড় থেকে দুই হাত লম্বা একটি করে ফেস্টুন সংযুক্ত লাঠি ছাড়া আর কিছুই নেই। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। এতে আওয়ামী হায়নাদের ক্রোধ আরো বেড়ে যায়। তারা সমস্ত শক্তি নিয়ে আমাদের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করে। তাদের আক্রমণের তীব্রতায় আমাদের পল্টন মোড়ের প্রতিরক্ষার ব্যূহ সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। আমাদের ১৫০ জনের মধ্যে অনেকে আহত হয়। এ অবস্থায় আমার মনে দুর্বলতা তৈরি হয়। কিন্তু তখন আবার চিন্তা করি আমরাও যদি অন্যদের মতো অবস্থান ত্যাগ করি তাহলে শত্রুপক্ষ আমাদের স্টেজ উড়িয়ে দেবে এবং পাশে শিবির ও জামায়াতের অফিস পুড়িয়ে দেবে। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা করে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। চলতে থাকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। তারা একবার আমাদেরকে তাড়িয়ে বায়তুল মোকারমের উত্তর-পশ্চিম পাশে অবস্থিত ওভারব্রিজের নিকট নিয়ে আসে আবার আমরা পেছন থেকে ধাওয়া দিয়ে তাদেরকে পল্টন মোড় পর্যন্ত নিয়ে যাই। এ যেন এক বদর প্রান্তর। শত্রুদের সংখ্যা ও অস্ত্র অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ভাইদের ঈমান ও শাহাদাতের তামান্নার কারণে তারা কোনোভাবেই আমাদের মঞ্চের নিকট আসতে সক্ষম হয়নি। তাদের ছোড়া গুলি ও ককটেল আমাদের পাশে এসে পড়ে অথচ আমাদের ভাইয়েরা অক্ষত থাকে। এ যেন বাতিলের মোকাবেলায় ঈমানদারদের সহযোগিতা করার আল্লাহর ওয়াদারই বাস্তব প্রতিফলন।

ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় আমাদের কিছু ভাই প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের হাতে ধরা পড়ে। আমাদের হাতে ওদের প্রায় ২৫-৩০ জন আটকা পড়ে। ইসলামে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচরণের যে নীতি রয়েছে, সে অনুযায়ী আমাদের নেতৃবৃন্দ আটক লোকগুলোকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার লেবাজধারী আওয়ামী হায়েনারা তাদের হাতে ধৃত আমাদের ভাইদেরকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে লগি-বৈঠা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শহীদ, আহত ও পঙ্গু করে দেয়। যার বাস্তব সাক্ষী শহীদ মুজাহিদ, শহীদ শিপন, শহীদ জসীম, শহীদ মাসুম ভাই। সেই নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী আমি নিজেই। আক্রমণ শুরুর প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট পর ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে নিচ থেকে ইট কুড়িয়ে নেয়ার সময় আমার মাথায় একটি ইট পড়ে, আমি আহত হই। আমি বায়তুল মোকারমের সামনে অবস্থিত ওভারব্রিজের উত্তর-পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি দোকানের নিচে দাঁড়ালে পেছন থেকে এসে আওয়ামী হায়েনারা আমাকে ধরে ফেলে এবং সাপ পেটানোর মতো আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পেটাতে থাকে। এ সময় আমার মাথা ফেটে যায় এবং সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়। তাদের নির্মমতা দেখে আমার মনে হয়েছিল হয়তো আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করবেন। সে জন্য মনে মনে কালিমা পড়ে প্রস্তুতি নিতে থাকি, যাতে সে অবস্থায় আল্লাহর নিকট শহীদ হিসেবে হাজির হতে পারি। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেননি। ইতোমধ্যে আমাদের ভাইয়েরা সংগঠিত হয়ে পেছন থেকে ধাওয়া দিলে আওয়ামী হায়েনারা আমাকে ফেলে রেখে চলে যায় এবং আসাদুল্লাহ ভাইসহ আমাদের ভাইয়েরা আমাকে মহানগর জামায়াত অফিসের ৫ম তলায় নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই আমার মতো শত শত ভাইকে সারিবদ্ধভাবে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গা ক্ষত-বিক্ষত। তাদের রক্তে জামায়াত অফিসের ৫ম তলা ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন মেডিক্যালে অধ্যয়নরত আমাদের ভাইয়েরা আহত ভাইদেরকে আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সেখানে আমি দেখতে পেলাম ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ‘অপর ভাইকে অগ্রাধিকার’ দেয়ার নজরানা। মুতার যুদ্ধের সেই পানি পানি করে চিৎকার দেয়ার পর পানি নিয়ে আসা হলে পাশের ভাইকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে একে একে সকল ভাইয়ের শাহাদাত বরণের নতুন দৃষ্টান্ত। দেখা গেল একজন ভাই যন্ত্রণায় তীব্রভাবে কাতরাচ্ছেন। তাকে যখন চিকিৎসা দেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন তিনি বলছিলেন আগে অমুক ভাইকে পাঠান তাকে চিকিৎসা দিন, তিনি আমার চেয়ে অনেক বেশি অসুস্থ। এ ছাড়া ঐ মুহূর্তের আরো একটি স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়Ñ যখন একজন আহত ভাইকে জামায়াত অফিসের ৫ম তলায় নিয়ে আসা হয় তখন দেখা যায় যে, উনার সাথে আরো কয়েকজন ভাই চলে আসেন তার সেবা শুশ্রƒষা করার জন্য। কিন্তু আমরা তখন চিৎকার দিয়ে দিয়ে সুস্থ ভাইদের বলছিলাম যে, আপনারা আমাদেরকে রেখে ময়দানে গিয়ে ভূমিকা রাখেন কেননা ময়দানে আমাদের লোকসংখ্যা এত কম যে, শত্রুবাহিনী যেকোনো মুহূর্তে আমাদের মঞ্চ গুঁড়িয়ে দিতে পারে, আমাদের অফিসে চলে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে আহত ভাইদের বেশি ক্ষতি হবে। হয়তো বা আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারে সবাইকে এবং আমি লক্ষ করলাম আমাদের অনেক ভাই আঘাতের স্থানে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে অথবা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আবার চলে যাচ্ছেন ময়দানে এবং ফিরে আসছেন আরো বেশি আহত হয়ে, এ যেন ওহুদ যুদ্ধেরই এক বাস্তব নমুনা। আমার আঘাত যেহেতু অনেক গুরুতর ছিল, মাথা ও সারা শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, তাই আমাকে দ্রুততম সময়ে সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। হাসপাতালে যাওয়ার পথে নিজ চোখে দেখলাম আমাদের জোটের প্রধান শরিক দল বিএনপি’র স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার বাস্তব নজির। পাঁচ বছর এক সাথে সরকারে থেকে সরকারের সকল সুযোগ সুবিধা এরা ভোগ করলেও ক্ষমতার শেষদিন জামায়াত-শিবির নিজেদের জীবন বাজি রেখে আওয়ামী হায়েনাদের বর্বর হামলা মোকাবেলা করলেও বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে দেখা গেল দর্শকের ভূমিকায় তাদের অফিসের সামনে সমাবেশ করতে। অথচ তারা যদি সেদিন জামায়াত-শিবিরের সাথে একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতো তাহলে আওয়ামী লীগ সেদিন রাস্তা ছেড়ে ঘরে ঢুকে যেতে বাধ্য হতো। বাধ্য হতো কে এম হাসানের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিতে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো! কিন্তু বিএনপি সে দায়িত্ব পালন করা তো দূরের কথা, এমনকি রোগীদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যখন হাসপাতালে যেতে চাইল সেই সুযোগটুকু তারা আমাদেরকে দেয়নি। তাই আমাদের রোগীদেরকে শাহজাহানপুর হয়ে মালিবাগ ঘুরে কাকরাইল আসতে হয়েছে! এতে ২-১ জন ভাই তাৎক্ষণিক চিকিৎসার অভাবে শাহাদাত বরণ করেছেন। আমাদের হতে হয়েছে অনেক ভোগান্তির শিকার। ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে গিয়ে দেখি আরেক কারবালা। ইমারজেন্সিতে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ভাইদের দীর্ঘ সারি, চারদিকে শুধু আর্তনাদ। আত্মীয়স্বজনদের কান্নার রোনাজারি। ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আমার সামনের ভাইটিকে যখন ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে এবং সাদা কাপড় পরানো অবস্থায় বের করে নিয়ে আসে তখন আমার মনটি ছোট হয়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই শাহাদাতের অমিয় সুযোগ পাওয়ার আশায় আবার মনে মনে কালিমা পড়তে থাকি এবং তওবা করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আশঙ্কামুক্ত বলে ঘোষণা দেন, নির্দেশ দেন অপারেশন বিভাগে নিয়ে যাওয়ার। আমার সবচেয়ে গুরুতর আঘাত ছিল মাথায় এবং ডান হাতে। ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে তিনবার আমার বাম হাতটি ভাঙার কারণে সেই হাত আমি এখনো স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারি না। সেহেতু আমার বেশি টেনশন ছিল ডান হাতটি নিয়ে। কারণ আমাকে তবে চিরদিনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে। কিন্তু এক্সরে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর যখন দেখলাম হাতে আমার তেমন কোনো অসুবিধা নেই, তবে মাংসপেশিতে বেশি আঘাত পাওয়ার কারণে হাত থেঁতলে গেছে এবং প্রচণ্ড ব্যথা করছে। আঘাতের দৈর্ঘ্য বেশি হলেও ভেতরের দিকে গভীরতা কম হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তখন আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করলাম।

অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তার আমাকে সম্পূর্ণ অচেতন করে মাথায় ৮টি সেলাই এবং শরীরের বিভিন্ন ক্ষতস্থানে প্রয়োজনীয় ব্যান্ডেজ এবং চিকিৎসা দিয়ে শুরুতে ১২২৫ নম্বর বেডে এবং পরবর্তীতে ৮১৫/৭১৫ নাম্বার কেবিনে পাঠিয়ে দেন। হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে শুয়ে যখন টিভিতে মুজাহিদ ভাইকে নৃশংসভাবে শহীদ করার দৃশ্য দেখছিলাম তখন নিজেকে অনেক বেশি হতভাগা মনে হয়েছে এই ভেবে যে, মুজাহিদ ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে নরঘাতকেরা যেভাবে সাপের মতো পিটিয়েছে, সেইভাবে আমকেও তারা পিটিয়ে আহত করেছে অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুজাহিদ ভাইকে শহীদ হিসেবে কবুল করলেন অথচ আমাকে কবুল করলেন না।

শুধু ২৮ অক্টোবর নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কালেমা পড়ার পরও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন শহীদ হিসেবে কবুল না করায় নিজের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। যতটুকু আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হলে আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেন, আমি বোধ হয় এখনও সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারিনি। দীর্ঘ ২৪ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রিয় নেতৃবৃন্দ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা ভাই আমাদেরকে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে আল্লাহর নিকট যেভাবে দোয়া করেছিলেন তা চিরকাল ইসলামী আন্দোলনের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।

২৮-২৯ অক্টোবরের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে মুজাহিদ, শিপন, ফয়সাল, জসীমউদ্দিন, মাসুমসহ ১৩ জন ভাই শহীদ হয়, নাম না জানা অসংখ্য ভাই পঙ্গুত্ববরণ করে। আমাদের প্রিয় সংগঠন ও নেতৃবৃন্দকে রক্ষার মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিজয়কে ত্বরান্বিত করার যে আপ্রাণ চেষ্টা তাঁরা চালিয়েছে, তাঁদের উত্তরসূরি হিসেবে আমরাও যেন ২৮ অক্টোবরের এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনের আন্দোলন ও সংগ্রামে যথাযথ ভূমিকা রাখার মাধ্যমে আমাদের প্রিয় নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনকে আওয়ামী ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করে বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের বিজয়কে সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে সেই তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সকল ত্যাগ ও কোরবানি কবুল করুন। আমিন

Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১৩ সকাল ৭:০৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×