বোমা আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপি এখন অপেক্ষাকৃত নরম সুরেই কথা বলছে। উস্কানিমূলক বক্তব্যের ধার অনেক কমে গেছে। গত ১৫ আগস্টে বেগম জিয়া বলতে গেলে একটু নরম-সরম উপস্থাপনায় কৃত্রিম জন্মদিনটি পালন করেছেন। অবশ্য গরম আছেন বিএনপির আসল কর্ণধার তারেক জিয়া, লন্ডনে। জনপ্রিয় কলাম লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী গত (০৬-০৯-১৫) তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে যে কলামটি লিখেছেন, তার নাম ‘মিথ্যাচার দ্বারা ইতিহাসের সত্য ঢাকা দেওয়া যায় না।’
ওই কলামে গাফ্ফার ভাই তারেক জিয়ার সাম্প্রতিক মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছেন। মিথ্যার রাজনীতি থেকে বিএনপি কখনো মুক্ত হবে কিনা সন্দেহ। বিএনপির জন্ম কৌশলের মধ্যে মিথ্যার মিশ্রণ আছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মিথ্যা দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার বাণী পাঠ করার সময় নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্র প্রধান ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা ছিল জঘন্য মিথ্যা। আওয়ামী লীগের প্রবল প্রতিবাদের তোড়ে জিয়া ওই স্বকপোল কল্পিত ঘোষণা প্রত্যাহার করেছিলেন। এরপর জিয়ার মৃত্যুর পর বেগম জিয়া বিএনপির ময়ূর সিংহাসনে বসার পর ঘোষণা দিলেন যে, ২৬ মার্চ জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেলন। বেগম জিয়াকে সমর্থন করেছিলেন জ্ঞানপাপী সৈয়দ আলী আহসান। অগণিত জ্ঞান পাপী আছে বাংলাদেশে যারা বেগম জিয়ার বরকন্দাজগিরি করছেন। অনেক ডাকসাঁইটে রাজনীতিক-সুশীল আছেন বেগম জিয়ার পক্ষে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন বেগম জিয়ার পালে হাওয়া লাগানোর। বেগম জিয়ার সুর এখন সপ্তম থেকে পঞ্চমে নেমেছে। খুব মৃদু কণ্ঠে মিথ্যা বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। আগের মতো আর বলেন না, ‘শেখ হাসিনা পালাবার পথ খুঁজে পাবেন না।’ বলছেন, ‘গণতন্ত্র অবরুদ্ধ’। কেন অবরুদ্ধ তার প্রাঞ্জল, সরল, স্বচ্ছ কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
প্রতিযোগিতা তো গণতন্ত্রেই আছে। মিলিটারি শাসনে, হিটলার-স্ট্যালিনের শাসনে প্রতিযোগিতার বালাই থাকে না। গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পথ কখনো শেখ হাসিনা বন্ধ করেননি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বেগম জিয়া চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে, চেয়েছিলেন শেখ হাসিনার পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিতে। ভেবেছিলেন বিএনপি এতবড় দল, তারা নির্বাচনে না গেলে ওই নির্বাচনের মূল্য থাকবে না, মূল্যহীন নির্বাচন দিয়ে শেখ হাসিনা কুমড়ার মতো পচে যাবেন। তারপর বেগম জিয়া ক্ষমতায় যাবেন। বেগম জিয়া তো এরশাদের মতো বিশ্ব বেহায়া, ভাঁড়কে কিছুই করতে পারেননি আর শেখ হাসিনাকে কী করবেন? শেখ হাসিনাই এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছেন আবার ক্ষমতার অংশ দিয়েছেন, জেলে ঢুকিয়েছেন আবার জেল থেকে বের করেছেন, ক্ষমতায় রেখেছেন আবার ক্ষমতার বাইরেও রেখেছেন। এরশাদ হচ্ছেন গণেশ মূর্তির মতো। উপরের অংশ হাতির মতো আর নিচের অংশ মানুষের মতো। হিন্দু পুরাণে এর গভীর তাৎপর্য আছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে কখনো এরশাদের মতো বহুরূপী মানুষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। যেমন বিএনপির জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল। বিএনপির কণ্ঠ প্রদান করেছেন এখন ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি চ্যালেঞ্জের সুরে বলেছেন যে, ‘অবাধ নির্বাচন দিয়েই দেখুক না সরকার।’ অর্থাৎ অবাধ নির্বাচন দিলে জামায়াত-বিএনপি জয়ী হবে আর সরকার পরাজিত হবে; এতই জনপ্রিয়তা তাদের। এ নিয়ে কলাম লেখক হিসেবে আমি তর্ক করতে চাই না। প্রত্যেক দলের আত্মবিশ্বাস থাকতে হয়। আমার বক্তব্য হচ্ছে বিএনপি তার ভুলগুলো অনুধাবন না করলে তাদের আস্ফালন মাঠে মারা যাবে। বিএনপির গোঁড়া সমর্থক ও ভোটাররাও এখন মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে যে, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন না করা এবং সিটি নির্বচান থেকে রণেভঙ্গ দেয়া চরম ভুল হয়েছে।
নির্বাচন উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগকে মুচড়ে ফেলার রাজনীতিতে সফল হতে পারেননি বেগম জিয়া। এই ব্যর্থতা ঢাকার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন মিথ্যার মোলায়েম বচন। বলেছেন যে, বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করেছিল পুলিশ। রাজনীতিতে মিথ্যার প্রচলন আছে, এ কথা স্বীকার করেছেন পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু। তাই বলে গোয়েবলসীয় মিথ্যা রাজনীতিতে হজম হয় না। বিএনপির মিথ্যা বলার কৌশলটা দিন দিন ভোঁতা হয়ে আসছে। অত্যন্ত ধারালো মিথ্যা চালু হয়ে গিয়েছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। আগুনের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল ওই মিথ্যাটি যে জেলখানায় ৪ জাতীয় নেতাকে ভারত চক্রান্ত করে ক্ষমতায় বসাবে। খালেদ মোশারফ ভারতের দালাল। ওই মিথ্যার জোয়ার জেল হত্যা ঘটায়, জিয়াকে ক্ষমতায় আনে। প্রাণ কেড়ে নেয় খালেদ-হায়দারের। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও ওই ভারত জুজুর মিথ্যাটি চালু করে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেছিলেন। ভারত জুজুটি এখন মৃত। তাই নতুন জুৎসই মিথ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না বেগম জিয়া। তাই খুব নিম্নমানের মিথ্যা বলে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। বলছেন যে, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বিএনপি করেনি। এসব করে সরকার আর পুলিশ। তাহলে জামায়াত, জেএমবি, আনসারুল্লা বাংলাটিম কী করে? সে সম্পর্কে উচ্চবাচ্য করেননি বেগম জিয়া।
আওয়ামী লীগ রাজনীতি শুরু করেছিল ইতিবাচকভাবে। পাকিস্তান আমলে তাদের দাবি ছিল, ‘বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।’ বিএনপি শুরু করেছিল নেতিবাচকভাবে, তাহলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার করা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মোটা ভাত, মোটা কাপড় দিয়ে বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে চাই।’ রবীন্দ্রনাথ তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘এই নকলের যুগ আসিবার পূর্বে আমাদের মধ্যে এমন একটা স্বাভাবিক মর্যাদা ছিল যে, দারিদ্র্যেও আমাদিগকে মানাইত, মোটা ভাত, মোটা কাপড়ে আমাদের গৌরব নষ্ট করিতে পারিত না।’ (ধর্ম-ততঃ কিম)
জিয়াউর রহমান ক্ষমতা হাতে নিয়ে কী বলেছেন? প্রথমে বললেন, ‘আওয়ামী বাকশালীদের খতম করুম।’ তারপর বললেন, ‘ও ংযধষষ সধশব ঢ়ধযরঃরপং ভড়ৎ ঃযব ঢ়ধযরঃরপরধহ’ তারপর বললেন, ‘গড়হবু রং হড় ঢ়ৎড়নষবস’ এ সব বক্তব্য রাষ্ট্রের সিংহাসনে বসে যারা বলেন, তারা জাতির নৈতিক চরিত্র ধ্বংস ছাড়া কিছু করতে পারেন না। জিয়াউর রহমান জাতীয় চরিত্র, মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র সবই দুই হাতে কুঠার দিয়ে ছেদন করেছেন। বিএনপি এখনো সেই ধাঁচে রয়ে গেছে। বেগম জিয়া বিএনপির কোনো উত্তরণ ঘটাননি। আমরা লক্ষ্য করেছি কংগ্রেসের মধ্যে ডান-বাম ও নরম-চরমের একটা প্রতিযোগিতা ছিল বরাবর। কংগ্রেস পরিসরে মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু, দেশবন্ধু, নেতাজির মতো মহামানবরা জন্ম নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের মধ্যেও ডান-বামের একটা প্রতিযোগিতা ছিল, দ্ব›দ্ব ছিল নবীন-প্রবীণের। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবী ও মধ্যবিত্তরা আওয়ামী লীগ করেছেন। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি প্রবন্ধে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তার মধ্যে আছে সেকুলার চিন্তা, সামাজিক চিন্তা, রাষ্ট্রনৈতিক দর্শন, ওয়েল ফেয়ার স্টেট গঠনের সূত্রাবলি।
আর বিএনপির মধ্যে কী আছে? সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ, রাষ্ট্রকে ধর্মের জোয়ালে বেঁধে ফেলার মন্ত্র। বিশিষ্ট রাজনীতিক-লেখক, কামরুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘ফলত জিয়াউর রহমান ক্রমশ রাজাকার এবং জামায়াত পন্থীদের কাছে আত্মসমর্পণের দিকে অগ্রসর হলেন। ইসলামপন্থীরা চেষ্টা করলেন জাতীয় সঙ্গীত এবং জাতীয় পতাকার পরিবর্তন করতে। জাতীয় সঙ্গীত সম্বন্ধে জিয়া সাহেবও একটা গান পছন্দ করেছিলেন, সেটি হচ্ছে, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ,’ এমনিভাবে ইসলামপন্থীরা তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার জন্যই হোক বা বুদ্ধিমত্তার জন্যই হোক দলের এবং সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা সুযোগ পেলেই ব্যক্তিগতভাবে জিয়ার কান ভারী করতেন। শেষ পর্যন্ত ইসলামপন্থীরা জামায়াতে ইসলামীকে ব্যবহার করতে আরম্ভ করল। সম্পূর্ণভাবে সরকার ইসলামপন্থীদের করায়ত্ত হলো। কারণ জামায়াতে ইসলামীর পেছনে ছিল আমেরিকার আশ্রিত আবর রাষ্ট্রসমূহ বিশেষ করে সৌদি আরব, যেখান থেকে জিয়া সাহেব আর্থিক সাহায্য পেতেন।’ (স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয় এবং অতঃপর-নিহত হলেন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়া, নসাস-২০০৯)।
বিএনপি এই কাঠামোর বাইরে আসতে পারেনি কখনো। খালেদা জিয়া এখনো রাজনৈতিক সংকটে ডুবন্ত নেত্রী হয়েও তার মতাদর্শ আধুনিক করার কথা ভাবেন না। জামায়াতের গাইড লাইন তিনি পরিহার করতে পারেননি। আর জামায়াত হলো ১৯৭১-এর প্রমাণিত শত্রু।
মাহমুদুল বাসার
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



