somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মার্চের চেতনা, চেতনার মার্চ

০২ রা মার্চ, ২০১৭ সকাল ১০:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মার্চ বাঙালির জীবনে এক অনন্য চেতনাদীপ্ত মাস। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি জান্তার সার্চলাইট অপারেশন চালিয়ে নির্বিচারে বাঙালি নিধন, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা—সর্বোপরি মুক্তিকামী জনতা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য আনুষ্ঠানিক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এই মার্চ থেকেই। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাঙালি যে তার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগোচ্ছিল তা স্পষ্ট হয়ে যায় এই মার্চের শুরুতেই।
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। ইয়াহিয়া খানের ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকরা খেলা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে হাজারো মানুষ পল্টন-গুলিস্তানে বিক্ষোভ শুরু করে দিয়েছে। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।
১ মার্চ মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ক্ষুব্ধ ছাত্ররা সেখানে গিয়ে প্রথমবারের মতো স্লোগান দেয়, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কর্মসূচি ঘোষণার দাবি জানায়। বিক্ষোভ-স্লোগানে উত্তাল ঢাকাসহ সারা দেশ। আর কোনো আলোচনা নয়, এবার পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার দাবি ক্রমেই বেগবান হতে থাকে।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর বজ্রনিনাদ কণ্ঠে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণার পর বাঙালির মধ্যে দেখা গেল এক নতুন উজ্জীবন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেই বঙ্গবন্ধু ‘যার যা আছে’ তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন। ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ বলে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। এই দুর্গ গড়ে তোলার অর্থ যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা তা বুঝতে কারো বাকি রইল না। শত্রুর মোকাবিলা করার দৃপ্ত আহ্বানও ভেসে উঠল তাঁর বজ্রকণ্ঠে। সেনাবাহিনীর প্রতিও তিনি উচ্চারণ করলেন সতর্কবাণী। প্রয়োজনে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বললেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যে ম্যান্ডেট তিনি পেয়েছিলেন বস্তুত সেই ম্যান্ডেটই তাঁকে প্রচণ্ডরূপে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।
এরই মধ্যে নানা কূটকৌশল চালাতে থাকে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে চলতে থাকে টালবাহানা। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে চতুরতার সঙ্গে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এভাবেই ঘনিয়ে আসে ২৫ মার্চের কালরাত। পাকিস্তানি জান্তারা ভারী অস্ত্র, কামান নিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের নামে এ দেশের ছাত্র, শিক্ষক, জনতাসহ নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও হামলা চালায়। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে গোটা জাতি। যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এ দেশের মুক্তিপাগল মানুষ। শুরু হয় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম।
এবারের মার্চ এসেছে এমন একসময়, যখন নানা ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে উন্নয়নের রোল মডেল। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হচ্ছে—যার অনেকটাই এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির যে কলঙ্কতিলক এঁকে দিয়েছিল, কানাডার আদালতে এসংক্রান্ত রায়ে সেগুলোকে ‘গালগল্প’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে। যুদ্ধাপরাধের বিচারেও অনেক অগ্রগতি হয়েছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়েছে তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দোসরদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে।
স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কথা এত দিন নানাভাবে শোনা যেত। এই বিভক্তি এখন এতটাই স্পষ্ট যে তাদের চিনতে আর অসুবিধা হচ্ছে না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ হয়েছে তাতে সব কিছু স্পষ্ট হয়ে গেছে। একদিকে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি, অন্যদিকে স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি। এখন বাংলাদেশের মানুষকে সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ পেতে হলে কোন পক্ষে অবস্থান নিতে হবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধ স্রোতের রাজনীতি চলতে পারে না। এখানে অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সার্বিকভাবে দেশের এগিয়ে চলা বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।
সমাজে একটি আদর্শিক বিরোধ বজায় রেখে সমঝোতা আশা করা বাতুলতা মাত্র। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক যে সংকট তারও মূলে কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির রাজনীতিতে সক্রিয়তা। একদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রীদের ফাঁসি হচ্ছে, আবার সেই রাজনৈতিক শক্তিই ‘গণতন্ত্র গণতন্ত্র’ বলে চিৎকার করছে। এই বৈপরীত্য মেনে নেওয়া যায় না। যারা দেশের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না, একাত্তরে দেশের জন্মেরই যারা বিরোধিতা করে গণহত্যা ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়ে তাদের অবস্থান আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে তথাকথিত গণতন্ত্রের নিক্তিতে মাপার সুযোগ নেই। এখানে একটি স্পষ্ট ভেদরেখা টানতে হবে।
চেতনাদীপ্ত মার্চে নতুন করে শপথ নিতে হবে। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং তা করতে হবে দেশপ্রেমের জাগরণ ঘটিয়ে।

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০১৭ সকাল ১০:০১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছ- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×