ঢাকার রাস্তায় সারাদিন বিভিন্ন শ্রেণীর প্রচুর মানুষ থাকে।সকাল থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত মানুষের শ্রেণী পরিবর্তন হতে থাকে, ব্যাপক বৈচিত্রময়। সন্ধ্যা থেকে রাত যত গভীর হয় মানুষ তত কমতে থাকে। আমি ঘরে ফেরার তাড়না বোধ করি না। আমার জন্য কেউ অপেক্ষায় নেই সেখানে। আচ্ছা ঘরের সংজ্ঞা কি ? আমি আভিধানিক সংজ্ঞার কথা বলছি না।
রাত যত বাড়তে থাকে আমার পা গুলো আস্তে আস্তে ক্লান্ত হতে থাকে।
....................................................হ্যাঁ, প্রতিদিনের মত পুরোনো ঠিকানায় পৌছে যাই । সেটা যতই ক্লান্তিকর এবং বিষন্ন হোক না কেন।
------------------------------#---------------------------------------
ঢাকায় আসার পর এখানের অনেক কিছুই অনেক অদ্ভুত ঠেকেছিল। এখানের জীবনযাত্রা অনেক অদ্ভুত বলে মনে হত সে সময়। মনে আছে কো-এডুকেশনের অভিজ্ঞতা না থাকায় মেয়েদের সাথে কথা বলতে অনেক ইতস্তত বোধ করতাম। প্রেমীকা, সে তো বহুদুর, মেয়ে বন্ধুই ছিল হাতে গোনা কয়েকজন।
নাজনীনের সাথে যোগাযোগ ছিল অনেকদিন। মানুষ মাতাল অবস্থায় জীবন, দর্শন, সৃষ্টিকর্তা নিয়ে কি ভয়াবহ আলোচনা করতে পারে তা ওকে দেখলে বোঝা যেত। মেয়েটা একবার বলেছিল, সৃষ্টিকর্তা সম্ভবত দুইটা জিনিস পারে না। আত্মহত্যা করতে আর নিজের প্রজন্ম তৈরি করতে। একদিন সুনলাম নাজনীন আত্মহত্যা করেছে। তাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়েছিল যে, সে অন্তঃসত্তা ছিল কিনা।
যাই হোক, নাজনীন ভাদ্র মাসে মারা যায়। যতদুর মনে পড়ে, ওইদিন কাঠফাটা রৌদ্র ছিল। নাজনীনকে কবর দেয়ার সময় ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে ওর বাসা থেকে মেডেলগুলো নিয়ে এসে ওর সাথে দেই। ওগুলো ওর অনেক প্রিয় ছিল। ও হ্যাঁ, বলাই হয়নি, নাজনীন অনেক ভাল রবীন্দ্রসংগীত গাইত।
--------------------------------#---------------------------------
আবার রাস্তায় হাটছিলাম, সন্ধাবেলার কথা। মোবাইলটা শার্টের পকেটে রাখা। কোনো কল অথবা মেসেজ আসলেই যেন সাথে সাথেই টের পাই। যদিও আজ জন্মদিন, কিন্ত কারও তো কল করার কথা না। কেউ অবশ্য এখনও কল করে শুভেচ্ছা জানাইনি। হাটতে থাকি, দেখি পরিচিত কাঊকে পেলে একবার বলে দেখব, ভাই আজ কে আমার শুভ জন্মদিন, আমাকে শুভেচ্ছা জানান। ......... মনে আছে, একবার বন্যার সময়কার কথা। সেবার আমাদের ছোটো শহরটা পু্রোপুরি ডুবে ছিল বেশ অনেকদিন ধরেই। দোকান পাট , বাজার সব বন্ধ ছিল প্রায় সময়। ওই অবস্থায় ভাতের চেয়ে রুটির কথ ছিন্তা করাটা বেশ কষ্টকর ছিল। সেবার আমার জন্মদিন এ, মা সন্ধাবেলায় কিভাবে যেন কিছু চিনি আর ময়দা জোগাড় করে কিছু ছোট ছোট পিঠা বানিয়ে ফেলল, আমার জন্মদিন উদযাপন করার জন্য। কারেন্ট ছিল না দেখে টেবিলের উপর আমরা লোডশেডিং এর সময় যে মোমবাতিটা জালাতাম সেটা জ্বালানো ছিল, আর টেবিলে বসা আমি, মা আর বাবা।
সম্ভবত আমি আমার শ্রেষ্ঠ জন্মদিনটা ফেলে এসেছি
--------------------------------#----------------------------------
কলেজে পড়ার সময়কার কথা। কলেজ ছুটি হওয়ার পরও অনেক্ষন ফাঁকা ক্লাসরুমে বসে থাকতাম। ব্যাপারটা যথেষ্ট অদ্ভুত ছিল। কিছুদিন পর খেয়াল হল যে, আরেকটি ছেলেও এমনভাবে পেছনের সীটে বসে থাকত। পরিচয় হল। ................................
ক্লাসরুমের সামনের বারান্দার কোনায় একটা কদম গাছ ছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম একবার। ছেলেটা বলল, ' মেয়েটাকে কখনও বর্ষার প্রথম কদম দিস না। সম্পর্ক বিষাদময় হয়।'
এরপর থেকে রাস্তায় কোথাও কদম দেখলে আমার চোখে একটা মেয়ের ছবি ভেসে উঠতো। সাদা জামা পরা মেয়েটা ঝুম বৃষ্টিতে অঝোর ধারায় কাঁদছে, হাতে ধরা একটা কদম। আমি এই ছবিটাকে ভুলে যেতে পারছি না। কারণ আমি এই মেয়েটার পাশে থাকতে চাই। ...............................।
আমি আর ওই ছেলেটা প্রতিদিন ক্লাস থেকে বের হওয়ার আগে বোর্ডে স্বরচিত সাহিত্য লিখে রাখতাম, কিংবা কোনো অর্থহীন ছবি এঁকে রাখতাম। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা পুরো কলেজের অনেকেই জেনে গেল। বিশেষকরে ক্লাসের ছেলে-মেয়েগুলো অনেক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করত, কাল কি থাকবে ? সবাই জানতো এটা আমরা লিখছি। কিন্তু কখনোই এটা নিয়ে কথা বলত না। আমরাও এমন ভাব ধরতাম যেন কিছুই জানি না।
রাইফেলস পাবলিক
রোলঃ- ১২১৮
------------------------------------#------------------------------
বেশ আগের কথা, তা প্রায় বছর পাঁচেক হবে। একবার খেয়াল হল পত্রিকার হকার হব। সকালবেলা সাইকেল চেপে পেপার ডেলিভারি করতাম। হ্যাঁ, কষ্ট অনুযায়ী টাকা হয়ত কম ছিল, কিন্তু কাজটায় মজা পেতাম। মাসখানেক করার পর ছেড়ে দিয়েছিলাম অবশ্য।
হকারদের প্রতি একটা কৌতুহল কাজ করত সব সময়। ফার্মগেটের এক হকারকে চিনতাম। ছোট করে ছাঁটা চুল, বেশ ভাল স্বাস্থ্য, ফর্সা করে, লম্বায়, উমমম ... রফিকের সমান হবে হয়তো। লোকটাকে একবার দেখি কাগজের চাকতিমত কতগুলো বিশ্বপরিচিতি হাতে নিয়ে ঘুরছে। চাকতি ঘুরালেই বিভিন্ন দেশের অনেক তথ্য পাওয়া যাবে, বড়ই মজার জিনিস। লোকটার বাচনভঙ্গি আর উচ্চারণ শুনে মনে হয়েছিল, কোনো বেসরকারি কলেজের বাংলার শিক্ষক হওয়া উচিত ছিল। গম্ভির গলায় ছাত্রদের কবিতা পড়ে শোনাতো.....................................
বেশ অনেকদিন আর দেখা পাইনি লোকটার। সেদিন বাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম। টিকেটকাউন্টারগুলোর ওখানে হঠাৎ শুনলাম বাসের কড়া ব্রেক করার শব্দ আর একটা আত্মচি্ত্কার। গিয়ে দেখি ওই লোকটা। ততক্ষনে বেশ ভিড় জমে গেছে আশেপাশে। ঘাড়ের পেছন থেকে একটা লোক উকিঝুকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল। শীতল চাহুনী দিয়ে তাকাতে লোকটা দাগ পড়া দাঁতগুলো বের করে দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে জিজ্ঞেস করল,
"কি ওইছে ?"
বললাম,
"একটা হকার পড়ছে। লোকটায় মানুষরে পৃথিবী চিনাইতো "
--------------------------------------#-----------------------------
ঢাকায় ইদানিং এক আতংকের জন্ম হয়েছে, ভূমিকম্প আতংক। বিষেষ্জ্ঞদের মতে মোটামুটি ৭/৮ কেজি ঝাঁকুনি দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। যাই হোক, সেদিনের একটা ঘটনা বলি। এক ছাত্রীকে পড়ানোর উদ্দেশ্য বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যাওয়া হয়। বেশ সুন্দর জায়গাটা। সুন্দর সাজানো গোছানো রাস্তা-ঘাট আর সারি সারি বাড়িঘর। সেই তুলনায় মানুষের সংখা বড্ড কম।দারোয়ান ছাড়া মানুষজন তেমন দেখাই যায়না বলা চলে। বিকেলের দিকে বসুন্ধরার পরিচিত রাস্তাটা ধরে যাচ্ছিলাম। ঘড়িতে সম্ভবত ৪;২০ হবে তখন। টের পেলাম ভূমিকম্প হচ্ছে। হুড়মুড় করে দু পাশের বাসাবাড়ি থেকে মানুষ বেরিয়ে এসে রাস্তায় নামতে থাকল। বড়ই মনোরম দৃশ্য। ভূমিকম্পকে ধন্যবাদ , সবাইকে একই সমতলে নিয়ে আসার জন্য।
-------------------------------------#-----------------------------
ঢাকা শহরে একসময় একটা কথা চালু ছিল যে, মানুষের চেয়ে কাকের সংখা বেশি। কথাটার নতুন ভার্সন হওয়া উচিত, ঢাকা শহরে কাকের চেয়ে ফটোগ্রাফারের সংখা বেশি। এরই পরিক্রমায় গত ঈদের ঠিক আগে একটা ক্যামেরা কিনে ফেললাম, বেশ দামী বস্তু। ঠিক করলাম ঈদের দিন সকালে নামায পড়ে রাস্তায় বের হব যন্ত্রটা নিয়ে। আনন্দিত মুখের ছবি তুল। পেয়েও গেলাম একটা।
বাটা সিগনালের কাছে একটা ভ্যান গাড়ি দাঁড়ানো। যাত্রী ঈদের নতুন জামা পড়া চারটা বাচ্চা, বয়স ৮-১২ বছর, দরিদ্র শ্রেণীর হবে সম্ভবত। সবার হাতে ধরা রংবেরঙের আইসক্রিম, আহা, মধুর দৃশ্য।
প্রিয় পাঠক, আমি সারাদিন আর একটাও ছবি তুলতে পারিনি, আমি আনন্দিত মুখ খুজে পাইনি। সদ্য কৈশরে পড়া ছেলেমেয়েদের দলবেধে ঘুরতে দেখিনি, রাস্তার মোড়ে গ্যাসবেলুনওয়ালাদেরকেও দেখিনি, উঠতিবয়ঃস্ক পাড়ার ছেলেদেরকে দেখিনি রাস্তার পাশে উচ্চস্বরে গান শুনতে। দু হাতে চুড়ি ভর্তি, নতুন শাড়ী পড়া কিশোরীদের উচ্ছ্বাস, না সেটাও দেখিনি কোথাও। নিজেকে বঞ্ছিত বলে মনে হচ্ছিল কেবল। যান্ত্রিকতা মানুষকে কেন স্পর্শ করবে?
তারার মত আলোকবর্ষ দূরত্বে ক্রমেই সরে যাচ্ছি হয়তো- আমি এবং আমরা অথবা সবাই।
পৃথিবীটা নাকি
-মহিনের ঘোড়াগুলি
----------------------------------#--------------------------------
গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে এক বড় ভাইয়ের মেসে উঠেছিলাম, আরামবাগে। খুপচি ঘরের মত দুটো রুমে আমরা ৮ জন থাকতাম। মাসুদ নামের একটা ছেলে এসে প্রতিদিন ঘর ঝাট দিয়ে কছু রান্না করে দিয়ে যেত আর বাকিটা নিজেরাই করতাম। খরচ অনেক কম বলে অনেকদিন ছিলাম সেখানে। একদিন দুপুরে বাসায় এসে দেখি, মেসের ৩/৪ জন মিলে মাসুদকে বেদম পেটাচ্ছে। অভিযোগ ২০০০ টাকা চুরির। তারপর থেকে মাসুদকে দেখিনি আর কখনও, টাকাটাও ফেরত পাওয়া যায়নি আর।
যাই হোক, গত মঙ্গলবার বাংলামটর দিয়ে যাচ্ছিলাম, ফুপুর বাসায়। হঠাৎ শুনি কে যেন পেছন থেকে নাম ধরে ডাকছে। মাসুদের সাথে সেটা ছিল ৩বছর পর দেখা। ছেলেটা ছুটতে ছুটতে কাছে এসেই জিজ্ঞেশ করল,
" কেমন আছেন ভাইজান"
কোনো কারণ ছাড়াই ছেলেটার চোখ আনন্দে ঝলমল করছিল তখন। সে নিজে থেকেই এমন আরও দু একটা প্রশ্ন করলেও কোনো কথা বলতে পারিনি ওর সাথে। একরকম পাশ কাটিয়েই চলে এলাম।............................
মাসুদকে বলতে ইচ্ছা করছিল, 'তোর কাছে আমি অনেক ঋণী। সেদিন টাকাটা চুরি না করলে আমি আজকের অবস্থায় থাকতে পারতাম না।'
আমি দুঃখিত।
আমি কথাগুলো বলতে পারিনি।
----------------------------------#--------------------------------
আমরা যে বাসাটায় এখন থাকি সেটা বেশ পুরোনো। আমার জন্ম এখানেই। ধানমন্ডির এ দিকটায় তখন প্রচুর গাছপালা ছিল। মনে আছে, ছোটোবেলায় আমাদের বাসার পেছনের বারান্দায় প্রচুর পাখি আস্তো ভোরবেলা। আমার মা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সেগুলোকে খাবার দিতেন। একবার দেখি বারান্দার ভেতর দিকে ভেন্টিলেটর দিয়ে দুটো চড়ুই বের হচ্ছে আবার মুখে কিছু খড়-কুটো নিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। বুঝলাম বাসা তৈ্রি করে ডিম পাড়বে। ডিম ফোটার পর বাচ্চাগুলোর কিচিরমিচির শুনতে পেতাম। লোভ সামলাতে না পেরে একদিন উঁকি দিয়ে দেখলাম ৩টা বাচ্চা সেখানে। মা-বাবা সম্ভবত তখন খাবার খুজতে বাইরে। পাখির বাচ্চাগুলো যে কি ভয়ানক সুন্দর ছিল তা বলে বোঝানো সম্ভব না।
একদিন দেখি একটা বাচ্চার কিছু ছিন্নভিন্ন অংশ বাসার নিছে পড়ে আছে। বুঝলাম বিড়াল হামলা করেছিল সেখানে। কোনো কারণ ছাড়াই সারাদিন কান্না করলাম পাখির শোকে। ওইবারই শেষ, এরপর আর কখনও সেখানে কোনো চড়ুই দম্পতি বাসা করেনি। আস্তে আস্তে পাখিদের আনাগোনাও একসময় বন্ধ হয়ে গেল। ...........................................
এখন কোনো ছোট ছেলে এভাবে পাখির বাসায় উঁকি দিতে পারে কিনা অথবা অনর্থক পাখির ছানার জন্য কান্না করতে পারে কিনা ঠিক বলতে পারব না।
না হয়তো।
---------------------------------#---------------------------------
পরিশিষ্টঃ - চলুন, আরেকটা প্রায় অবাস্তব স্বপ্ন দেখি,
............ কাওরান বাজারের পেছনে রেললাইনের পাশে যে বস্তিঘরগুলো আছে, ওইগুলোর কোন একটার ঘরের দরজায় রাখা একটা কুপারসের বাসি পরিত্যাক্ত কেক। কেক আর তার পাশে রাখা কুপি বাতিটা ঘিরে বসা বাবা, মা , ভাই দুটো আর আজ জন্মদিন, ওই মেয়েটা। দূর থেকে একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছিল অনেক্ষন ধরে। মেয়েটা ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নেভাতে যাচ্ছে...... পাশে দিয়ে প্রচন্ড গর্জনে ট্রেনটা চলে গেল.................। অন্ধকার। নাহ, বাতিটা ট্রেনের ঝাপ্টায় নিভে গিয়েছিল............। সবাই মন খুলে হাসছে...... মা হাসতে হাসতেই কুপিটা আবার জ্বালিয়ে দিচ্ছে আর অন্য দিকে ভাই দুটো ততক্ষনে হই চই জুড়ে একাকার ............ মেয়েটা কুপিটার দিকে তাকিয়ে আছে, ভাবলেশহীন শূণ্য দৃষ্টি। । .....................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


