* দেশে এ বিষয়ে কোন সচেতনতা নেই
* আগামী দশ বছরে ভয়াবহ রুপ নিবে
বাবা এখন হত্যা করছে তার নবজাতকে। পরকীয়া বা দাম্পত্য কলহের জের ধরে স্বামী হত্যা তার স্ত্রী ও সন্তানদের। মাদকাসক্ত ছেলে টাকার জন্য হত্যা করছে মা-বাবাকে। এমনকি ঝগড়ার রেশ ধরেই স্ত্রী তার স্বামীকে হত্যা করছে। সম্প্রতি সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা এগুলো। এ সময়ে ভয়াবহ মাত্রায় বেড়েছে সামাজিক অপরাধ। এখন আর দুর্বৃত্ত বা সন্ত্রাসীর হাতে নয় বরং পরিবারের আপন মানুষটির কাছেই একজন মানুষকে নিরাপদ নন। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, দেশে ভয়াবহ ব্যাধির মত দানা বাঁধছে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়। নীতিনির্ধারক মহলের অবহেলায় সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার ব্যক্তির প্রানহানির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এজন্য তারা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে- অর্থের প্রতি সকল শ্রেনীর মানুষের অসম প্রতিযোগিতা; নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়; সামাজিক,রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও সাংষ্কৃতিক অস্থিরতা; অন্যদেশের সংষ্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্ঠা; দাম্পত্য কলহ ও স্বামী-স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসহীনতা; স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার ইচ্ছা; সামাজিক উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ না নেওয়া; রাষ্ট্রের উদাসীনতা; বিষন্নতা ও মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন কারণ।
সামাজিক অবক্ষয় প্রানহানির ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে এখন পর্যন্ত তৈরী হয়নি নিদিষ্ট কোন গবেষনা কার্যক্রম। ফলে কার্যকর বিচার ব্যবস্থার অভাবে অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধ ঘটাতে দুবার ভাবছে না। সমাজ বিজ্ঞনীরা বলছেন, গত দুই বছরে দেশে সমাজিক অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চিন্তার বিষয় আগামী ১০ বছরে এটি আরও ভয়াবহ রুপ নিবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক অপরাধের পেছনে বিষন্নতা দায়ী। মনোবিজ্ঞানীরা জানান, দেশে বর্তমানে ৬৫ থেকে ৮৫ লাখ মানুষ অতিমাত্রায় বিষন্নতায় আক্রান্ত। আর এ কারণে সামাজিক অপরাধ আরও ভয়াবহ রুপ নেবে বলে তাদের ভয়। এ অবস্থায় মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন সমাজের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থ। বর্তমানে মানুষের অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ক্রমেই হারাচ্ছে। এ কারণে তারা নিজেরা আত্মহত্যা করছেন এবং পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে নিজ স্ত্রী ও সন্তানদেরও হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করছেন না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সামাজিক অপরাধ প্রতিকারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমগুলোরও এ বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রর্দশনে এগিয়ে আসতে হবে। জেলাপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, বাধ্যতামূলক না হওয়ায় তালাক সংশ্লিষ্ট কাজে শতকরা ৮০% স্বামী-স্ত্রীই ডিসিসি অফিসে আসেন না। যে ১০% স্বামী-স্ত্রী আসেন তারা নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ভাঙ্গার কারন হিসেবে পরকীয়াকে দায়ী করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ”বাংলাদেশের যুব সমাজের উপর আচরণগত বেইজ লাইন সার্ভে” শীর্ষক গবেষনাতেও বেরিয়ে এসছে চমকপ্রদ তথ্য। এ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে ষাটের দশকের তুলনায় বর্তমানে বিবাহ বহির্ভূত ও বিবাহপূর্বক অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পরিমাণ তিনগুণ বেশী। বর্তমানে প্রতি ১০ দশ জনের মধ্যে ৩ জনকেই অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে করে পারিবারিক বিশ্বাসে ফাটল ধরছে। মানুষ তার কাছের মানুষটিকেও এখন হত্যা করছেন। কয়েকটি ঘটনাই তার প্রমাণ-
১. চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার সোনাইছড়ি বড়ুয়াপাড়া এলাকার পল্লী চিকিত্সক পরেশ বড়ুয়া পারিবারিক কলহের জের ধরে গত ৫ মে রাতে প্রথমে স্ত্রী রোজী বড়ুয়া শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরদিন ভোরে পরেশ একইভাবে দুই সন্তান শ্রীমান্ত বড়ুয়া ও সোম বড়ুয়াকে হত্যা করেন। এরপর নিজে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। জানা যায়, পরেশ রোজীকে ১২ বছর ভালবাসার পর বিয়ে করেন। মৃত্যুর আগে লেখা এক চিঠিতে পরেশ উল্লেখ করেন যে, দাম্পত্য কলহের কারণেই তিনি এই কান্ড ঘটিয়েছেন।
২. এর কিছুদিন আগেই পুলিশ কনস্টেবল আবদুল আলীম তার স্ত্রী সুলতানা আক্তারকে ওড়না পেচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন এবং লাশ উত্তরা ১৬ নম্বর সেক্টরের এক ডোবায় লুকিয়ে ফেলেন। সুলতানার স্বামী আলীমের
আরেক নারী পুলিশের সাথে সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় সুলতানাকে তিনি হত্যা করেছেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন।
৩. গত ২৮ এপ্রিল ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পূর্ব ইমামবাড়ি এলাকায় ৪০দিনের শিশু সোহাগীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন শিশুটির বাবা রিকশাচালক মো. টিপু (৩৭)। হত্যার দিন রাতে টিপু নেশাগ্রস্থ ছিলেন এবং স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করেন। রাতে কোন এক সময়ে তিনি শিশুটিকে হত্যা করেন।
৪. এদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চান্দরা উত্তরপাড়া এলাকায় আসাদুল ইমলাম (৩৫) নামের এক ব্যক্তিকে তার স্ত্রী ফাতেমা আক্তার শ্বাসরোধে হত্যা করে। গত ৩মে রাতে ঝগড়ার জের ধরে ঘুমন্ত অবস্থায় ফাতেমা তার স্বামী আসাদুলকে হত্যা করেন।
সমাজের এ অপরাধগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মনোচিকিত্সক ডা. মোহিত কামাল বলেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ’পরিকল্পিত আত্মহত্যা’। এটি একটি বিপজ্জনক রোগের লক্ষণ। এ অবস্থায় যে ব্যক্তি আত্মহত্যার করার কথা ভাবছেন বা অতিরিক্ত বিষন্ন হয়ে পড়ছেন বলে ধারনা করা হয় সে ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের উচিত তার চিকিত্সার ব্যবস্থা করানো। মোহিত কামাল বলেন, কিছুক্ষেত্রে রোগী তাত্ক্ষণিক তাড়না থেকেও তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করতে পারেন। সাধারণত ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা এধরনের কান্ড ঘটান। এ মনোচিকিত্সক জানান, বিষন্নতা বিষয়ে দেশে কোন সচেতনতা নেই। এ বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে। বর্তমানে উচ্চতর জীবণের হাতছানির অসম প্রতিযোগিতায় মানুষের মধ্যে হতাশা ও বিষন্নতা দানা বাধছে। ফলে তারা সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এছাড়া পরকীয়ায় জড়িয়ে একজন মানুষ সামাজিক অপরাধ ঘটাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে তারা প্রিয়জনকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানউল্লাহ এ সম্পর্কে বলেন, সমাজে বর্তমানে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার সাথে পরিবারগুলো তাল মেলাতে পারছে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজ করছে অসম প্রতিযোগিতা। ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর একটি শ্রেণী তাদের মূল্যবোধ হারাচ্ছে। আর এ অবস্থার জন্য রাষ্ট্রের উদাসীনতা দায়ী। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খোলামেলা অনুষ্ঠান আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে শিথিল করে দিচ্ছে। এতে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরী হচ্ছে। মানুষ তার লক্ষ্য স্থির রাখতে পারছে না। সব মিলিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও সাংষ্কৃতিক অস্থিরতায় মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক সম্পর্কে ভাঙ্গন দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু তারা কেউই সে দায়িত্ব পালন করছে না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অধ্যাপক আমান বলেন, দেশে সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা উন্নতিতে কোন পূর্ব-পরিকল্পনা নেই। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোচনা না করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজকে জাতীয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নিজ নিজ জায়গা থেকে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য দেশের গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচমিনিট সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে। অধ্যাপক বলেন, সামাজিক অপরাধ ধীরে ধীরে সমাজকে কাবু করে ফেলছে। এখনই যদি এ বিষয়ে ঐক্যমত্য তৈরী করা না যায় তবে আগামী দশ বছরে তা ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস এসোসিয়েশনের নির্বাহী ও মানবাধিকারকর্মী এ্যাডভোকেট এলিনা খান এ বিষয়ে বলেন, সামাজিক অস্থিরতা মানুষের অস্থিরতারই বর্হিঃপ্রকাশ। যে মানুষরা অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী নন তারাই সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। যখন একজন মানুষের অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ে তখনই সে নিজে আত্মহত্যা করে এবং তার পরিবারের ক্ষতি করতে চায়। তিনি বলেন, সমাজে পরকীয়ার ঘটনাগুলোর পেছনেও অর্থনৈতিক কারণ জড়িত। অর্থ্যাত্ সামাজিক অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে অর্থনীতি। এলিনা খান বলেন, সামাজিক অপরাধ প্রতিকারে দেশের ডিসি ও ইউএনওদের ভাল ভূমিকা রয়েছে। গ্রামের সভা বা মিটিং এ কাউন্সিলর (মেম্বার) যেকোন পরিবারের সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে পারেন। এছাড়া প্রতিটি জেলায় ডিসি’র কল্যাণ ফান্ড থেকেও প্রয়োজনে সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। সাধারণত মানুষ বিপদে পড়ে তার দুঃখের কথা কারও কাছে বলতে পারে না। এক্ষেত্রে কাউন্সিলররা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



