বই রিভিউ
Number the Stars
by Lois Lowry
বিকেলে অভ্যাসমতো বারান্দায় বসে ঢুলে ঢুলে পড়ছিলাম! মা এসে কানের কাছে কিছুক্ষণ ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ডাকলো! আমি তো বইয়েই তন্ময়! কানে টান খেয়ে হুশ হলো যখন ততক্ষণে বা কানের লতিটা টকটকে লাল। মুঠোফোনে যে বইও পড়া যায় তা বুঝাতে লাগলো ৩মিনিট, ৪ মিনিটের মাথায় চোখ নষ্ট করছি বলে আবার মাথায় চাঁটি! মন খারাপ নিয়ে বইটা পড়তে শুরু করেছিলাম, শেষ করবার সময়ও কেমন মেদুর মেদুর ভাব! মাতাজির এসমস্ত আদর তাতে যেন গরম ভাতে ঘি!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যে কোন বই আমার কাছে পোলাওয়ের শেষ পাতে ঘরে পাতা মিষ্টি দইয়ের মতোন! পেলেই লুফে নেই! এই বইটি ভুগাচ্ছিল খুব। মানে আমিই একে ভুগাচ্ছিলাম আর কি। ইচ্ছে করে জমিয়ে রেখেছিলাম। Lois Lowry এর লেখার উপর তো চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়, তাই মনে হচ্ছিল এ বাবা! পড়লেই তো ফুরিয়ে গেল! তারচেয়ে থাক না আর কিছুদিন! তো হটাত করে হলো কি, মনটা সেদিন বিগড়ে গেল। তো বেগড়বাই ঠিক করতে ভাল মিস্তিরির কাছে তো নিতে হবে, নাকি? ডিজিটাল বুকশেলফ খুলতেই দেখি এ মস্ত ডাক্তার প্রকটমান। আর কি! শুরু করলাম পড়া!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ডেনিশ লোকদের দিনযাপনের কথাগুলো আগে সেভাবে জানা হয়নি। বেশ লাগে! যত পড়ি, তত নতুন নতুন কত কিছু শিখি! মগজে কতটুকু ধরে রাখতে পারি সে কথা জিজ্ঞেস করে কেউ লজ্জা না দিলে ভাল। কিন্তু পড়বার সময় যেন মুখে কেউ আমিত্তি পুরে দেয়। যুদ্ধের ডামাডোলেও ডেনিশ রাজা যখন দেহরক্ষীর তোয়াক্কা না করে ঘোড়ায় চড়ে রোজ ঘুরতে বের হন মনে হয় আমিও জানালা খুলে একটু দেখি, পারলে নেমে গিয়ে কথা বলে আসি। জার্মান সৈন্যর প্রশ্নের জবাবে ছোট ছেলেটা বলে আমাদের রাজার দেহরক্ষীর দরকার নেই, আমরা পুরো ডেনমার্ক তার দেহরক্ষী- ভিতরটা কেমন যেন সাহসে গরম হয়ে ওঠে! পরিবার গুলোর কষ্ট, পালিয়ে বেড়ানো, ধর্মের- নিজের অস্তিত্তের আড়াল করবার গল্পগুলো কি যে নাড়া দেয়! দুধের উপর পরা সড় ছেকে ছেকে যারা খায় তেমন যেন খুঁজে বের করে আনতে হয়! এই যে মাঝখানে সাগর, অপারে দেখা যায় সুইডেন, জার্মান শাসনমুক্ত সুইডেন, এপারে ডেনমার্ক! দুইদেশের জীবন কত আলাদা না? ধর্ম আলাদা বলে বন্ধুর পরিবারটিকে লুকিয়ে পৌছাতে হবে তাই ঐ ওপারে, যেখানে রাস্তায় হুটহাট থামিয়ে সৈন্যরা নাম জিজ্ঞেস করবেনা। মাঝরাতে ঘরে ঢুকে চুল টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে নিয়ে আসবেনা। বিপ্লবীর সিলগালা দিয়ে জনতার সামনে গুলি করে মারবেনা।
অ্যানামেরির পরিবার ও তার নিজের যে গল্পটা এই বইতে বলা হয়েছে তা যেন কোথায় গিয়ে বড্ড চেনা ঠেকে! বুঝিয়ে দেয় সব নিঃশেষিত -নিপীড়িত জাতির ইতিহাসে এক জায়গায় না এক জায়গায় মিল থাকবেই। তবে হ্যাঁ! টেক্কা দেবার গল্পগুলো কিন্তু মন ভাল করে। এই যে কুকুরের নাক কে ফাঁকি দেবার জন্য রুমাল মন্তর, বা মিটিঙের জন্য কফিনের জাদু! কে ভেবেছিল যে ভাত কাপড়ে মারার পরেও লোকগুলোর মাথা ঠেকে এত বুদ্ধি বেরোবে। প্রতিটা চরিত্র এত সৎ যে নিজেকে তাদের জায়গায় বসিয়ে ভাবতেও ভয় লাগে। দশ বছরের অ্যানা যখন নিজের সাহসের পারদটা একদম ঠিকভাবে তুলে ধরে ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি। তবে কি , বইয়ে খারাপ কিছু ঘটলে শেষে এটাই ভাবতে ভাল লাগে যে ধুর! সব বানানো গপ্প! কিন্তু দুই-তিন প্যারায় যখন দেখি সব সত্যি, এমনকি চলে যাবার আগে পিটারের চিঠিটা পর্যন্ত আবার কেমন যেন মনটা গুমগুম করে। চোখ বন্ধ করলে একটা শীর্ণ হলদে কাগজে আমি কিছু জ্বলজ্বলে শব্দ দেখতে পাই। শব্দগুলো ভীষণ সাহসী!

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


