somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মোমশ্রুতি
আমি .... আমি জানি কেমন! চুপচাপ থাকতে ভাল লাগে। মনে হয় মুখে বলে যতটা বুঝাতে পারবো তার থেকে বেশি পারবো লেখায় নিজেকে তুলে ধরতে। আবোল-তাবোল লিখতে বলতে খুব ভাল লাগে। মেঘ আর বরফ ভীষণ ভালবাসি। আর ভালবাসি লিখতে পারার স্বাধীনতাটাকে! এইতো , এই সব টুকুরটাকুর মিলেই

বই পোকার কথা (পর্ব ২)

১৬ ই নভেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বুক রিভিউ

Totto-Chan: The Little Girl at the Window
Tetsuko Kuroyanagi


প্রায় সাত বছর আগে স্কুলের পাট চুকিয়ে ফেলেছি। কঠিন কঠিন নিয়মে বাঁধা ,শক্ত শক্ত পড়াশোনার সোনা ঝরানো দিনগুলোর জন্য আবেগ থাকা উচিত না তারপরও নিজের স্কুলের কথাটা মনে পরলে মনটা আর্দ্র হয়ে উঠে। ফাঁকিবাজ 'আমি' কিভাবে স্কুলকে এত ভালবেসেছিলাম তা স্কুলটা ছেড়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত কখনো বুঝতেই পারিনি। আবার অনেক অনেক অনেকদিন পরে জাপানী লেখিকা এবং টিভি ব্যাক্তিত্ত Tetsuko Kuroyanagi এর লেখা Totto-Chan: The Little Girl at the Window বইটা পড়ে মনের লুকানো বাক্সটা থেকে স্কুলের জন্য ভালবাসাটা বের হয়ে আসলো টুকটুক পায়ে।



তোত্তো চান নামের সাত বছরের দুষ্টু-মিষ্টি মেয়েটার পরিচয় করিয়ে দেই আগে তার স্কুলের গল্প বলার আগে।মনে তার কতশত প্রশ্ন, মুখে তার ছুটে চলে অবিরাম কথার তুবড়ি। বাবা, মা আর রকি নামের একটা জার্মান শেপারড-এই হলো তোত্তো চানের পরিবার। সেই চঞ্চল তোত্তো চানকে কিনা তার স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হলো অমনোযোগী বলে। এখন তাকে নিয়ে তার মা কি করে? তার মুক্তমনা মেয়েটার মনের বিকাশ ঘটানোর জন্য মা তাকে নিয়ে এলেন মিস্টার কোবাইশির 'তোমিও' স্কুলে। অন্যরকম স্কুল, একটা স্বপ্নের স্কুল। যেখানে ক্লাস হয় মাঠে রাখা রেলগাড়ির ভাঙ্গা কামরায়।তাইতো প্রথম পরিচয়ে তোত্তো চান তার হেডমাস্টার কে জিজ্ঞেস করে,'তুমি কে বলতো? স্কুলের মাস্টারমশাই,নাকি স্টেশনমাস্টার?'।

ধরাবাঁধা সিলেবাসের বাইরে দিদিমণিরা যার যা পড়তে ভাল লাগে তাই তাকে পড়ান। স্কুলের হেডমাস্টার এর সাথে বসে ছাত্র ছাত্রীরা ঘন্টার পর ঘন্টা এলোমেলো গল্প করতে পারে, তিনিও হাসি হাসি মুখে ধৈর্য ধরে সব শুনেন।কখনো বিরক্ত হননা,কাউকে বকা দেননা। সেই যে একবার তোত্তো চান ময়লার গর্তে পরে যাওয়া তার থলেটা খুঁজে বের করতে গিয়ে সব ময়লা বের করে জায়গাটা নোংরা করে ফেললো, তিমি দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেলেন। শুধু তাঁকে অলে গেলেন,' কাজ শেষ হলে তুমি তো আবার সব গর্তে ঢুকিয়ে রাখবে তাই না?' সেই মজার স্কুলে মজার মজার সব নিয়ম বের করেন এই হেডমাস্টার নামক অসাধারণ মানুষটি। অভিভাবকদের বলে দেন সবচেয়ে নোংরা- খারাপ জামাটা পরিয়ে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে যাতে তারা জামা কাপড়ের চিন্তা বাদ দিয়ে মনের আঁশ মিটিয়ে খেলতে পারে। আঁকাআঁকির জন্য চক হাতে খয়েরি মেঝেকে স্লেট বানিয়ে ছেড়ে দেন তাদের হাতে। স্কুলের প্রতিবন্ধী ছেলেটা যাতে খেলা অংশ নিয়ে জিততে পারে তার জন্য আবিস্কার করেন অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা, সেইসব খেলায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য আবার পুরষ্কার দেন নানারকম শাকসবজি। এখানেই কি শেষ? আছে গানের ক্লাস, নাচের ক্লাস,পিকনিক, কাম্পিং, একটা রেললাইনের বগিতে বিশাল লাইব্রেরি,লাঞ্চের সময়ে সবাই মিলে গাওয়া খাবার গান,
"ভালো করে চিবোও তুমি
চিবিয়ে চিবিয়ে খাও,
ভাত, মাছ, মাংস, ডিম
সবটা চিবিয়ে নাও!"



মাঝে মাঝে স্কুল থেকে সবাই মিলে হাঁটতে যাওয়া, ভূতের ভয় তাড়ানো, বক্তৃতা দেওা,কত্ত কত্ত মজা। হেডমাস্টার সাহেবের মাথায় কত বুদ্ধি। বাচ্চাদেরকে ভালবাসতে, ভালভাবে বুঝতে বোধয় তার চেয়ে বেশি আর কেউ পারেনা এই পৃথিবীতে। তাইতো বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে স্কুলের দারোওয়ানের যখন যুদ্ধে যাবার নির্দেশ আসে তখন তিনি বিদায়সভা না করে 'টিপার্টির' আয়োজন করেন যাতে বাচ্চাদের খারাপ না লাগে। দিদিমণির ভুলের জন্য তাঁকে সবার সামনে না বকে নিজের বাড়িতে নিয়ে বকেন। অন্যদের মন খারাপ হবে দেখে তোত্তো চানকে আড়ালে ডেকে অনুরোধ করেন সে যাতে তার দামী ফিতাটা স্কুলে আর পরে না আসে।এত ভাল হেডমাস্টার আর এত সুন্দর স্কুল্টাকে কি ভাল না বেসে থাকা যায়? তাইতো একদিন তোত্তো চান হেডমাস্টারমশাইকে ডেকে বলে সে বড় হয়ে একদিন 'তোমিও' এর দিদিমণি হবে, বখাটেদের টিটকারির উত্তরে সবাই মিলে গান গেয়ে মন ভাল করে ফেলে-
"তোমাই স্কুল, চমৎকার স্কুল;
ভিতরে আর বাইরে, খুবই চমৎকার স্কুল।"

আমার মনে হয় কি , যখন আমি একটা বই পড়া শুরু করি তখন আমার মনের ভিতরের রান্নাঘরে কেউ একজন আইসক্রিম বানানো শুরু করে। কিছু কিছু বই আছে পড়লে মনের আবহাওয়াটা বৈরি হয়ে উঠে। উত্তরে হাওয়া চলে হাড়কাপানো।মনের জানালা দরজা বন্ধ করে দিতে হয়। আইসক্রিমটা জমে ভাল। আবার কিছু বই পড়লে ঐ শীতের দেশে হটাত করে যেন সূর্যের তাপ এসে পড়ে। সবাই রোদ পোয়াতে মনের বারান্দায় চলে আসে, আইসক্রিমটা জমতেই চায় না। গলে গলে মালাই হয়ে যায়, কিন্তু খুব উপভোগ্য মালাই। এই ব্যাপারটাকেই heartwarming বলে কিনা কে জানে! এই বইটা যখন পড়ছি আমার মনের রাঁধুনি খুব আয়েশ করে মালাই খাচ্ছিল। আইসক্রিম জমেনি দেখে তার কোন খেদ নেই আর আমিও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উষ্ণতাটুকু উপভোগ করছিলাম।

কি চমৎকার একটা গল্প,কি চমৎকার একটা লেখা। বইটা পড়তে গিয়ে খানিক্টা দ্বিধায় ছিলাম এটা আসলে ছোটদের বই নাকি বড়দের বই। কারণ মাঝে মাঝে কিছু বিষয়ের আলোচনা বা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলো যেভাবে উঠে এসেছে তাতে একেবারে ছোটদের বই বলা যায় না। কিন্তু একসময় পড়তে পড়তে মনে হবে ছোট বড় সব বয়সের মানুষের বইটা পড়া উচিত। এমন একটা স্বপ্নের স্কুল যে থাকতে পারে তা ভেবে অবাক হওয়া উচিত। এবং আশ্চর্যের কথা হলো বই শেষ করে যখন পাঠকরা লেখিকার নিজের কথা পড়বেন তখন অবাক হয়ে আবিস্কার করবেন এই অলীক ধরনের 'তোমিও' নামের স্কুলটার অস্তিত্ব আসলেই ছিল। গল্পের তোত্তো চান লেখিকা নিজেই,অন্য কেউ নয় এবং বইয়ের কোন ঘটনা বানানো বা রঙ চড়ানো না। অনেকে অনেকবার তোত্তো চানের স্কুলকে সিনেমার পর্দায় নিয়ে আস্তে চাইলেও লেখিকা অনুমতি দেননি শুধুমাত্র বই পড়ে পাঠকদের মনে যে কল্পনার রাজ্য গড়ে উঠেছে তা কোন সিনেমানির্মাতা অতিক্রম করতে পারবেন না বলে বিশ্বাস করেন দেখে এবং আমার মতে এটা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একটা সিদ্ধান্ত।

নিজের হেডস্যারের সাথে সালাম দেওয়া বাদে কখনো সেভাবে কথা বলেছি বলে মনে পরেনা। কিন্তু বইটা পড়ার পর খুব ইচ্ছা হচ্ছে একটা স্কুল দিবো, ঠিক 'তোমিও' এর মত নিয়ম ছাড়া স্কুল। যেখানে আনন্দ থাকবে, হাসি থাকবে, কান্নাও থাকবে,গতানুগতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে শিক্ষাও থাকবে। আমি মিস্টার কোবাইশি হবো। তোত্তো চানের মতো অমনোযোগী ছাত্রছাত্রীরাও এই স্কুলে আসবার জন্য অস্থির হয়ে থাকবে আর একদিন সবাইকে গেয়ে শুনাবে,
"তোমাই স্কুল, চমৎকার স্কুল;
ভিতরে আর বাইরে, খুবই চমৎকার স্কুল।"
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৪৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছ- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×