মোঃ মাইদুল সরকার ভাই একটি পোস্ট দিয়েছেন, পোস্টের শিরোনাম হচ্ছে,ব্লগ নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন- ব্লগিং: বাংলাদেশে একসময়কার জনপ্রিয় ব্লগিং যেভাবে হারিয়ে গেল এই পোস্টটি মুলত বিবিসিতে প্রচারিত খবরের উপর ভিত্তি করে লেখা। পোস্টে ব্লগ সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে যেমন, কেন ব্লগার কমে গেলো, সামাজিকভাবে ব্লগারদের কি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো ইত্যাদি। বিবিসির প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ব্লগাররা নাকি দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কথাটা যদি বলা হতো, নিরাপত্তাহীনতার কারনে অনেক ব্লগার বিশেষ করে যারা প্রচলিত ধারার বিপরীতে লিখেন, তাঁরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তাহলে কথাটা যৌক্তিক হতো। আমি ব্লগারদের জেনারালাইসড করার বিপক্ষে। কারন ব্লগারদের জেনারালাইসড করার কারনেই ব্লগারদের প্রতি বিরুপ মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিলো, স্বাধীন মত প্রকাশ ও লেখালেখির সৃজনশীল ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো। আমি চিরকাল তথাকথিত সুশীল মিডিয়ার বিপক্ষে চিরকাল অবস্থান করেছি, এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত অবস্থান। ফলে বিভিন্ন চ্যানেলে এখন আর আগের মত ডাকে না (ভাত নাই) । যদি একটা সময় প্রচুর আমন্ত্রন পেতাম।
যাইহোক, বিবিসি নিয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। ফেসবুকে অনেক বন্ধুই বিষয়টা সম্পর্কে জানেন। ব্লগে হয়ত তেমন কেউ জানেন না। ২০১৫ সালে ইসটেল ডোয়েল নামের বিবিসির একজন সিনিয়র সাংবাদিক বাংলাদেশের ব্লগ, ব্লগার এবং বাকস্বাধীনতার বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করতে বাংলাদেশে আসলেন। তিনি বাংলাদেশে আসার বেশ কয়েকদিন আগে আমার সাথে স্কাইপে যোগাযোগ করে একটি নির্দিষ্ট দিন তারিখ ঠিক করলেন। নির্দিষ্ট দিনে তিনি বিবিসি নিউজের স্থানীয় প্রতিনিধি সহ একটি শুটিং টিম নিয়ে আমার অফিসে হাজির। স্বাভাবিক কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি বাংলাদেশের ব্লগ, ব্লগার এবং মত প্রকাশের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
আলোচনায় একটা পর্যায়ে তিনি আমার একটি বক্তব্যকে কোট করে এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। আমার বক্তব্যটি ছিলো - নানা প্রতিবন্ধকতা স্বত্তেও বাংলাদেশে ব্লগ চর্চা অব্যহত আছে। শুধুমাত্র ব্লগিং করার জন্য কেউ কোন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে আমার জানা নেই এমন কি যারা রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করেন তারাও কোন সরাসরি হুমকির মুখে আছেন বলে মনে হয় না। তবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে যারা চুড়ান্ত উগ্রপন্থী, যারা প্রচলিত জীবন ব্যবস্থা, দেশের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ইত্যাদিকে তোয়াক্কা না করে বাকস্বাধীনতার নামে হেট স্পীচ দিয়েছেন তারাই মুলত আরেক শ্রেনী উগ্রপন্থী দ্বারা হুমকির শিকার হয়েছেন। এই দুই শ্রেনীয় উগ্রপন্থীদের কারনে সাধারন ব্লগাররা ক্ষতিগ্রস্থ এবং স্বাভাবিক আলোচনার জায়গাটিও স্থিমিত।
ইসটেল ডোয়েল আমার উপরের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বললেন - আপনি কি এই বক্তব্যটি দ্বারা 'ব্লগারদের' উপর হামলাকে যৌক্তিক করে তুলছেন না? ইসলামিস্টরা কি এটার সুযোগ নিবে না?
আমি ভদ্রমহিলার উদ্দেশ্য নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত ছিলাম। এই প্রশ্নের পর আমি তার মোটিভ স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারলাম। আমি বললাম, দুঃখিত ডোয়েল, আপনি আমি ব্লগারদের জেনারালাইসড করতে পারি না। ফলে আমরা যে কোন ইস্যুতেই বলতে পারি না ব্লগারস'। আমরা যেটা বলতে পারি তা হচ্ছে - কিছু ব্লগার তাদের স্বাধীন মত প্রকাশে কিছু উগ্রপন্থীদের দ্বারা হুমকি বা বাঁধা প্রাপ্ত হয়েছেন। আমরা যে কোন ধরনের উগ্রবাদিতাকে সমর্থন করি না। উগ্রবাদে ভালো কিছু নেই। উগ্রবাদ শুধু মাত্র ধ্বংস করে। তাই আমরা সামগ্রিক ঘটনার নিন্দা জানাই। একই কথা তথাকথিত 'ইসলামিস্ট' অর্থাৎ যারা কট্টরপন্থি বা জঙ্গীবাদ সমর্থনকারী তাদের জন্যও প্রযোজ্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোন যুক্তিতেই জঙ্গিবাদ বৈধতা লাভ করতে পারে না, মানুষ হত্যা জায়েজ হয়ে পারে না, হোক সেটা ধর্ম বা রাজনৈতিক কারনে। যিনি ধর্মের নামে, কট্টরপন্থার অনুসরনকারী হিসাবে যে কোন প্রেক্ষাপট থেকে মানুষ হত্যাকে জায়েজ ভাবেন, তিনিও একজন জঙ্গি অর্থাৎ সন্ত্রাসী। তিনি কোন ধর্মের বরপুত্র কিংবা আদর্শ নন। শ্রেফ একজন অপরাধী। তবে, ইসলামিস্ট বলতে যদি আপনি সাধারন মুসলিমদের বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে ধরে নিবো আপনার ইংরেজীতে দুর্বলতা আছে।
আমার কথা শুনে ব্রিটিশ ভদ্রমহিলার চেহারা লাল হয়ে উঠল। ঠিক সেই মুহুর্তেই আমার অফিসের সহকারীরা স্ন্যাক্স আর কফি পরিবেশন করা শুরু করলেন। আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য উচ্চস্বরে হেসে বললাম, জোকস এপার্ট ডোয়েল ! লেটস হ্যাভ সাম টি।
বিবিসির পুরো টিম হতাশ। ডোয়েল তারচেয়েও বেশি হতাশ। প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন আর একবার ইসটেলের দিকে তাকাচ্ছেন। ভদ্রমহিলা ফিসফিস করে টিমকে বললেন, নাহ! আমি একে দিয়ে আশানুরূপ বক্তব্য পাচ্ছি না। ও কিছুই বলতে চাইছে না।
বিবিসির যে বাংলাদেশী প্রতিনিধি ছিলো, (খুব সম্ভবত সালমান নাম ছিলো) তিনি বললেন আপনার কথা শুনে তো বাকস্বাধীনতার কোন সমস্যা টের পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি তো খুব সেফ খেলছেন। উনি একটু স্ট্রং বক্তব্য চাচ্ছে।
আমি বললাম, নতুন জিনিস শেখা হলো। জানলাম যে, বাকস্বাধীনতা মানেই ধর্মের সাথে সহবাস! সেটা জোর হোক কিংবা আপোষে।
বাংলাদেশী প্রতিনিধি বিব্রত হয়ে বললেন, আরে নারে ভাই! উনি জানতে চাচ্ছেন বাংলাদেশে মত প্রকাশ নিরাপদ কি না?
আমি বললাম, এক কথায় এটার জবাব দিতে গেলে বলতে হবে না! অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করার সংস্কৃতি বাংলাদেশে এখনও তেমনভাবে গড়ে উঠে নি। এর পেছনে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক মুল্যবোধ, রাজনৈতিক প্রভাবের দায় আছে। কোনটা হেইট স্পীচ আর ফ্রিডম অব স্পীচ সেটার পার্থক্য আমরা এখনও শিখিনি ফলে শিক্ষিত অশিক্ষিত দুই শ্রেনীর মানুষই অনেক সময় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হেইটস্পীচকে তাদের ফ্রিডম অব স্পীচ বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করে। অবশ্য যেখানে উন্নত বিশ্বের মানবতা এবং বাকস্বাধীনতার বাটখারা হিসাবে পরিচিত জাতির কিছু নাগরিক আমার মতকে স্বতস্ফূর্ত ভাবে মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করছে, ভাবছে আমি 'সেফ' খেলছি
সেখানে বাংলাদেশ তো শ্রেফ তৃতীয় বিশ্বের একটি সামান্য দেশ মাত্র।
চারিদিকে শুনশান নিরবতা। রুমের ভেতর সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বিবিসির বাংলাদেশী প্রতিনিধির দিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে বললাম, একটু সহজভাবে বলি। ব্রিটিশরা এই দেশে যে অত্যাচার করেছে, এই মর্মে আমি যদি এই সব ব্রিটিশদের চৌদগুষ্টি তুলে গালমন্দ করি, সেটা কি হেট স্পীচ না ফ্রিডম অব স্পীচ? যদি হেট স্পীচ হয় আমি দিবো না। আর যদি ফ্রিডম অব স্পীচ হয়, আমি এক্ষুনি দিবো।
বাংলাদেশী প্রতিনিধি আর কিছু বললেন না। ডোয়েলের দিকে তাকালেন। বেচারীর চোখে মুখে কেমন একটা হতাশার ভাব। তাড়াহুড়া করে আমাকে বললেন, লাস্ট প্রশ্ন। যে সকল ব্লগাররা ধর্ম বিশ্বাস করেন না, যারা নাস্তিক ব্লগার তাদের ব্যাপারে আপনার কি ধারনা?
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমার কি ধারনা মানে?
পাশ থেকে প্রোগ্রাম সহকারী কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, তাদের অধিকার সম্পর্কে, তারা যে হুমকিতে আছে, সেই সম্পর্কে আপনি কি ভাবছেন?
আমি বললাম, দেখুন, কে আস্তিক বা না নাস্তিক হবে এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারন ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয়। আমাদের দেশে নানা ধর্মের লোক যুগযুগ ধরে মিলে মিশে বাস করে আসছে। এই দেশে হাজারো মানুষ আছে যারা ধর্মে বিশ্বাস করে না। এদের নিয়ে সমাজের মাথা ব্যাথা শুধু মাত্র ঘৃণা প্রকাশ করা পর্যন্ত। ব্যস আর কিছু না। শুধু ধর্ম বিশ্বাস না করার কারনে মেরে ফেলা হবে - এই ভয়ংকর চর্চা থেকে আমরা এখনও কিছুটা দুরে আছি। তবে ধর্মকে যারা হাতিয়ার বানাতে চায়, তাদের যদি নিয়ন্ত্রন না করা যায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়বে। পাশাপাশি, যারা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে সংখ্যাগুরুর কারনে অশ্লীল ভাষায় আক্রমন করেছে, কারো বিশ্বাসের স্থানকে বাকস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে অযৌক্তিকভাবে অশ্লীল আক্রমন করেছে তারা আরেক শ্রেনীর উগ্রপন্থি দ্বারা হুমকির মুখে আছে এটা শতভাগ নিশ্চিত। এই দুই ধরনের উগ্রবাদিদের সাথে সাধারন মানুষের কোন সম্পৃক্ততা নেই।
হ্যাঁ এটাও সত্য যে, মাঝে মাঝে সাময়িক উত্তেজনায় এবং কিছু উগ্রবাদীদের প্ররোচনায় সংখ্যাগুরু দ্বারা সংখ্যালুঘুদের উপর হামলা হয়। কিন্তু এটা যতটা না ধর্মীয় প্রয়োজনে হয়, তারচেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রয়োজনে। এই হাতিয়ারের অন্যায় বলি হচ্ছে তথা কথিত নাস্তিকরা।
যাইহোক, আরো কিছুক্ষন প্রাণবন্ত আড্ডা ও আলাপের পর আমার ইন্টারভিউ শেষ হয়। বলাবাহুল্য, আমার ইন্টারভিউটি প্রকাশিত হয় নি। ইউটিউবে এই ডকুমেন্টারীর একটা ভিডিও আছে। মৃদ্যু হেসে সেদিন বুহলাম, ব্লগ কর্তৃপক্ষকে চুড়ান্ত অশ্লীল গালি, হেট স্পীচ এইগুলো আসলে বাকস্বাধীনতার জন্য আন্দোলন নয় বরং নিজের ভবিষ্যতের জন্য একটি ইনভেস্টমেন্ট।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


