৪.
মার্চ মাস।
সে বছর মার্চ মাসে অস্বাভাবিক গরম পড়েছিল। আকাশ থেকে রোদের বদলে আগুন ঝরছে। গাছের কোনো পাতাই নড়ছে না। আসন্ন দুর্যোগে ঝিঁঝিপোকা দিনের বেলা ডাকে। এখন তা-ই ডাকছে।
প্রচণ্ড গরমে কালো পোশাক পরা আর্টিলারির প্রধান মেজর ফারুক খুব ঘামছেন। গায়ের কালো শার্ট ভিজে উঠেছে। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশ মেঘে ঢাকা। গত কয়েক দিন ধরেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না। মেঘের কারণেই গরম বাড়ছে। গ্রিনহাউস ইফেক্ট! একসময় নাকি পৃথিবীর গরম বাড়তে বাড়তে এমন হবে যে মানুষ ও পশুপাখির বাসের অযোগ্য হবে। ফারুকের মনে হচ্ছে, সেই দিন বেশি দূর না।
মেজর ফারুক দলবল নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর জঙ্গলে। তাঁর শীতকালীন রেঞ্জ ফায়ারিংয়ের শিডিউল। মার্চ মাসে শীত নেই। চামড়া পোড়ানো গরম পড়েছে। সকালবেলা মাঝারি পাল্লার কামানে কয়েক দফা গুলি চালানো হয়েছে। জওয়ানরা তাঁর মতোই ক্লান্ত। তিনি সুবেদার মেজর ইশতিয়াককে ডেকে বললেন, আজকের মতো ফায়ারিং বন্ধ।
ইশতিয়াক বলল, স্যারের কি শরীর খারাপ করেছে?
ফারুক বললেন, আই অ্যাম ফাইন। গেট মি এ গ্লাস অব ওয়াটার।
তাঁর জন্য তৎক্ষণাৎ পানি আনা হলো। পানির গ্লাসে বরফের কুচি ভাসছে। ফারুক গ্লাস হাতে নিয়েও ফেরত পাঠালেন।
ইশতিয়াক বলল, স্যার, পানি খাবেন না?
ফারুক বললেন, না। একজন সৈনিক সর্ব অবস্থার জন্য তৈরি থাকবে। সামান্য গরমে কাতর হয়ে বরফ দেওয়া পানি খাবে না।
বরফ ছাড়া পানি নেই?
না। মুক্তিযুদ্ধের সময় একনাগাড়ে দুই দিন পানি না খেয়ে ছিলাম।
ইশতিয়াক বলল, পানি ছাড়া কেন ছিলেন, স্যার? বাংলাদেশে তো পানির অভাব নেই।
যেখানে ছিলাম, সেখানে সুপেয় পানির অভাব ছিল। সবই পাটপচা নোংরা পানি। ভাগ্যিস, পানি খাইনি। যারা খেয়েছিল, তারা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সেবার আমাদের হাতে অল্পবয়সী একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ধরা পড়েছিল। তার সঙ্গে ছিল বোতলভর্তি পানি। দাঁড়াও, তার নামটা মনে করি। এস দিয়ে নাম। ইদানীং কেন যেন পুরোনো দিনের কারোর নামই মনে পড়ে না। যাক, মনে পড়েছে। শামস। রাজপুত্রের মতো চেহারা। মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিডে খুঁত থাকলেও তার কোনো খুঁত ছিল না। খাঁড়া নাক, পাতলা ঠোঁট, মাথার চুল কোঁকড়ানো, আবু লাহাবের মতো গায়ের রং।
স্যার, আবু লাহাব কে?
আমাদের প্রফেটের চাচা। ওই সুরা নিশ্চয়ই পড়েছ—আবু লাহাবের দুই হস্ত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।
পড়েছি, স্যার। সুরা লাহাব।
লাহাব শব্দের অর্থ আগুন। ‘আবু লাহাব’-এর অর্থ আগুনের পুত্র। লাহাবের গাত্রবর্ণ ছিল আগুনের মতো। ক্যাপ্টেন শামসের গায়ের বর্ণও তা-ই। সঙ্গে ক্যামেরা থাকলে তার একটা ছবি তুলে রাখতাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে যে জিনিসটার অভাব অনুভব করেছি তা হলো, একটা ভালো ক্যামেরা। ছবি তোলার মতো অপূর্ব সব সাবজেক্ট পেয়েছি। সমস্যা হচ্ছে, সৈনিকের হাতে রাইফেল মানায়। ক্যামেরা মানায় না। এখন অবশ্য আমার সঙ্গে ক্যামেরা আছে। লাইকা নাম। জার্মানির ক্যামেরা। কিন্তু ছবি তোলার সাবজেক্ট পাচ্ছি না।
সুবেদার মেজর ইশতিয়াক বিনীত গলায় বলল, স্যার, এক গ্লাস পানি খান। বরফ ছাড়া এক গ্লাস পানি দিতে বলি?
না। ক্যাপ্টেন শামসের গল্পটা শোনো। আমি তার পানির বোতলের সবটা পানি ঢকঢক করে খেয়ে ফেললাম। তাকে বললাম, থ্যাংক য়্যু। ইউ সেভড মাই লাইফ। পানির বদলে তুমি কিছু চাও?
সে বলল, ইয়েস! আই অলসো ওয়ান্ট টু সেইভ মাই লাইফ।
আমি বললাম, এটা সম্ভব না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাকে হত্যা করা হবে।
সে কিছুক্ষণ শিশুর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। ‘শিশুর দৃষ্টি’র অর্থ হচ্ছে, তুমি কী বলছ, আমি বুঝতে পারছি না। আমাকে বুঝিয়ে বলো।
সে বলল, আমার হাতে কতক্ষণ সময় আছে?
আমি বললাম, আধ ঘণ্টা ম্যাক্সিমাম।
সে বলল, এক কাপ কফির সঙ্গে একটা সিগারেট খেতে চাই।
চা-কফি নেই। তোমাকে সিগারেট দিতে পারব।
আমি কে-টু সিগারেটের প্যাকেট তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। তাকে বললাম, মৃত্যুর জন্য তৈরি হওয়ামাত্র আমাকে বলবে।
শামস বলল, একজন সৈনিক সব সময় মৃত্যুর জন্য তৈরি।
পাকিস্তানি ওই ক্যাপ্টেনের কথা আমার মনে ধরেছিল। এখনো সুযোগ পেলেই আমি বলি, একজন খাঁটি সৈনিক সব সময় মৃত্যুর জন্য তৈরি। একজন খাঁটি সৈনিক যুদ্ধ ছাড়াও সারা জীবন রণক্ষেত্রে কাটায়।
পাকিস্তানি ওই ক্যাপ্টেনের মৃত্যুর জন্য কি আপনার কোনো অনুশোচনা আছে?
ফারুক বললেন, অনুশোচনা নেই। তাকে আমি নিজের হাতে গুলি করি। ওই ক্যাপ্টেন আমাদের অনেক মেয়েকে রেপ করেছে। তার অভ্যাস ছিল রেপ করার পরপর সে কামড়ে মেয়েদের স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নিত। এটা ছিল তার ফান পার্ট।
ইশতিয়াক বলল, কী বলেন, স্যার!
যুদ্ধ ভয়াবহ জিনিস ইশতিয়াক। যুদ্ধে ফান পার্ট লাগে। যা-ই হোক, এখন এক গ্লাস পানি খাব। বরফ দিয়েই খাব। একটা জিপ রেডি করতে বলো। আমি হালিশহর যাব। একজনের সঙ্গে দেখা করব। তবে রাতেই ফিরব।
স্যার, আমি কি সঙ্গে যাব?
যেতে পারো।
হালিশহরে কার কাছে যাবেন?
একজন পীর সাহেবের কাছে যাব। তিনি জন্মান্ধ। বিহারি। কোরআনে হাফেজ বলে অনেকেই তাকে ‘আন্ধা হাফেজ’ও ডাকে। তুমি কি তাঁর বিষয়ে কিছু জানো?
জি না, স্যার।
আমার জানামতে, তিনিই একমাত্র মানুষ, যিনি চোখের সামনে ভবিষ্যৎ দেখেন। আল্লাহপাক অল্প কিছু মানুষকে অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে পাঠান। তিনি তাঁদের একজন।
বলেন কী স্যার!
আমি তোমাকে সত্যি কথা বলছি। ভালো কথা, আমিও যে পীর বংশের সন্তান, তা কি জানো?
জি না, স্যার।
আমি পীর বংশের। বংশের ধারা অনুযায়ী আমি এখন গদিনশীন পীর। অথচ আমার কোনোই ক্ষমতা নেই। এটা একটা আফসোস। তবে আফসোস থাকা ভালো। মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে পুরোপুরি সফল জীবন পার করার পরও আফসোস নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।
ইশতিয়াক বলল, স্যার, আপনি মাঝে মাঝে ফিলোসফারদের মতো কথা বলেন।
মেজর ফারুক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সরি ফর দ্যাট! একজন সৈনিক সব সময় সৈনিকের মতো কথা বলবে। ফিলোসফারদের মতো বা রাজনীতিবিদদের মতো কথা বলবে না। আই হেইট বোথ দ্য ক্লাসেস।
চলবে.....
আলোচিত ব্লগ
গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়না, যুদ্ধ বন্ধ হলে মানবতার জয় হয়।
যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছে?
আমার উত্তর খুব সহজ- কেউ না।
যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী বলে কেউ থাকে না। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন শুধু সৈনিক নয়; মায়ের বুক খালি হয়, শিশুর ভবিষ্যৎ ভেঙে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।
দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।
ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন
কটা দুলাল

বাল্য বন্ধু শফির ফোন পাইলেই টেনশনে থাকি। কোন একটা দুঃসংবাদ নিশ্চিত। আর সেটা যদি হয় সকাল বেলা তবে তো কথাই নেই। যদিও আমাদের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই মোটেও তবুও... ...বাকিটুকু পড়ুন
জীবন পর্ব -১

(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।