কোকো’র জানাজায় কত লোক হয়েছিল?
না, এর সঠিক হিসাব জানা যায়নি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে যখন বিশ্বের বৃহত্তম মানব পতাকা তৈরির একটা অপ্রয়োজনীয় সরকারী উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তখন সেখানে কত মানুষ ঢুকছে, বের হচ্ছে- তার হিসাব ছিল। সেখানে ২৭ হাজার ১ শ’ ১৭ জন লোক হয়েছিল। এই হিসাবটা রাখা দরকার ছিল, কারণ বিষয়টি গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে উঠবে কি উঠবে না- সে প্রশ্নটি সেখানে জড়িত ছিল। কিন্তু জানাজার লোক সমাগমের হিসাব গিনেজ বুকে থাকার কোন সুযোগ বোধকরি নেই। আর তাই এখানে উপস্থিতির সংখ্যা গণনার সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা- কোনটাই দেখা দেয়নি।
আলোচনার সুবিধার্থে সাম্প্রতিক সময়ের আরও দু’ একটি জানাজার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। মাওলানা ফজলুল হক আমিনী মারা গেলেন ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। আর জামায়াত নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম গত বছরের অক্টোবরে। আমি এই দু’টি জানাজার কোনটিতেই অংশ নেইনি। কিন্তু টেলিভিশনের চাকরি করার সুবাদে দু’টি জানাজারই ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে নেয়া দৃশ্যাবলী, দেখার সুযোগ হয়েছে। নীতিগতভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি আমার মোটেই আগ্রহ নেই। হয়তো সে কারণেই ধর্মভিত্তিক দু’টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় এই দুই নেতার জানাজায় এত লোকের সমাগম আমাকে কিছুটা অবাকই করেছে। অনুষ্ঠান দু’টি কভার করেছেন আমার যে সাংবাদিক সহকর্মীরা, তাদেরকে আমি জিজ্ঞাসা করেছি- যারা এসেছেন জানাজায়, তারা সবাই কি দলীয় লোক? উত্তরে তারা জানিয়েছেন- না, অনেক সাধারণ মানুষও নাকি গিয়েছেন সেখানে। তবে তুলনা করলে, গোলাম আযমের জানাজায় দলীয় লোকের উপস্থিতি ছিল বেশি। আবার এমন চার পাঁচজন মানুষকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, যারা উল্লেখিত দু’টি জানাজাতেই গিয়েছেন। এবং আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, তারা কেউ-ই ধর্মীয় রাজনীতির অনুসারী নন! আমি হিসাবটা মিলাতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। একজনকে জিজ্ঞাসাও করেছি, জবাবে তিনি বলেছেন- এখানে রাজনীতিটা তো মূখ্য নয়। একজন মুসলমান মারা গেছে, জানাজায় যাবো না? তাছাড়া ভদ্রলোকের রাজনৈতিক আদর্শ যা-ই হোক না কেন, তিনি তো পরহেজগার মানুষ ছিলেন।
মোক্ষম জবাব, সন্দেহ নেই। এ নিয়ে তর্ক চলে না। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে আমি এটাও জানি যে, এর বছর তিনেক আগে, ২০০৯ সালে, তৎকালীন (বর্তমানেরও)প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া যখন মারা গেলেন, তখন কিন্তু এই ভদ্রলোক তার জানাজায় শরিক হননি। ওয়াজেদ মিয়া সম্পর্কে আমার ওই পরিচিত ভদ্রলোকের মুখে আমি ভালোই শুনেছি, তবু তিনি তার জানাজায় যেতে পারেননি।
ড. ওয়াজেদ মিয়াকে আমিও ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। পেশাগত কারণে অনেকবার তার কাছে যেতে হয়েছে। পরমাণু শক্তি কমিশনের তিনি সদস্য ছিলেন, চেয়ারম্যানও ছিলেন। অসাধারণ একজন পরমাণু বিজ্ঞানী। বাংলাদেশের অন্য অনেক সেক্টরের মত এই পরমাণু শক্তি কমিশনেও আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেন্দ্রিক বিভাজন ছিল। কিন্তু উভয় পক্ষের কেউই তার প্রতিভা আর যোগ্যতার সমালোচনা করতে পারেনি। বরং সকলে তার প্রশংসাই করতেন। তিনি নিজে তেমন একটা সক্রিয় রাজনীতি করতেন না। অনেক সমাবেশে আমি তার মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনা শুনেছি। বিশেষ কোন দলের প্রতি নতজানু মনোভাবও তেমন একটা দেখিনি। যখন যেটা সঠিক মনে করতেন, বলতেন। এমন একজন লোকের জানাজাতেও কিন্তু তেমন লোক হয়নি। অন্তত যাদের নিয়ে আলোচনা করছি, তাদের তুলনায় তেমন কিছু হয়নি।
এবার আসা যাক সদ্য প্রয়াত কোকো’র জানাজা প্রসঙ্গে। আগেরগুলোর মত এই জানাজাটিতেও আমি অংশ নিইনি। তবে লোক সমাগম কেমন হয়েছিল, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল। সাবেক এক সহকর্মী, যিনি নিজে আওয়ামী পন্থী হিসাবেই পরিচিত, তিনি জানালেন, কোনো জানাজায় যে এত মানুষ হতে পারে- তা তার চিন্তাতেই ছিল না। একজন সিনিয়র সাংবাদিক জানালেন, তিনি কোকো’র পিতা জিয়াউর রহমানের জানাজায় ছিলেন। তার দেখা মতে, সেটিই ছিল বৃহত্তম জানাজা। কোকো’র জানাজায় প্রায় সেরকম লোকই নাকি হয়েছে। আমার সহকর্মী তরুণ রিপোর্টার বললেন, গোলাম আযমের জানাজায় যত লোক হয়েছে, তার তিন থেকে চারগুণ লোক নাকি হয়েছে এবার।
আসলে এই অভিব্যক্তিগুলো খুব বেশি তথ্যনির্ভর নাও হতে পারে। এখানে কিছুটা আবেগ হয়তো কাজ করতে পারে। তবে এটা সত্যি যে, গোলাম আযম বা আমিনীর তুলনায় অনেক বেশি লোক হয়েছিল কোকো’র জানাযায়। আমার প্রশ্ন- উপস্থিত লোকের সংখ্যা নিয়ে নয়, প্রশ্ন কারণটি নিয়ে। কেন এত লোক হয়েছিল কোকো’র জানাজায়?
কোকো রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তার মা এবং ভাই রাজনীতিবিদ। বিএনপি’র শীর্ষ দু’টি পদ এই মা ও ছেলের দখলে। ছোটভাই কোকো বিএনপি’র কোন পদেই ছিলেন না। অনেকটা যেন শেখ রেহানার মত। শেখ রেহানাও আওয়ামী লীগের কোন পদে নেই। তারপরও প্রধান মন্ত্রীর বোন হিসাবে দলে কিংবা সরকারে নিশ্চয়ই তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধান মন্ত্রী ছিলেন, একবার নয় একাধিকবার ছিলেন, তখন বিএনপি’র কেউ না হওয়া সত্ত্বেও, কেবল প্রধান মন্ত্রীর পুত্র হওয়ার কারণে, তিনি নিশ্চয়ই দলে এবং সরকারে গুরুত্ব পেয়েছেন। এমনকি, ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন কোকো’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা করলো, সে মামলায় যখন তিনি দোষী প্রমাণিত হলেন, তখনও বিএনপি’র পক্ষ থেকে এমনভাবে বক্তৃতা বিবৃতি দেয়া হলো, যেন কোকো বিএনপি’রই একজন। আসলে এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিটাই এমন। আদর্শের চেয়েও অনেক সময় পরিবার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
বলছিলাম কোকো’র জানাজায় মানুষের ঢল নিয়ে। তাহলে বরং কোকো’র দিকে একবার তাকানো যাক। কেমন লোক ছিলেন তিনি? খুব দেশপ্রেমিক, প্রতিভাবান, ধর্মপ্রাণ, দুর্নীতিবাজ, ক্রীড়া সংগঠক, মাদকাসক্ত, নাকি নিতান্তই প্রচারবিমুখ সাধারণ একজন মানুষ? তার একটা বৈশিষ্ট্যকে আমি খুবই পছন্দ করতাম, তিনি প্রচারপ্রেমী ছিলেন না। আমি মিডিয়ার মানুষ, আমাদেরকে এইসব রাজনীতিকদের ছোট খাট আচার অনুষ্ঠানের খবর প্রচার করতে যেয়ে বারবারই গলদঘর্ম হতে হয়। কেবল খবরটি প্রচারিত হলেই হয় না, কেন সেটি আরও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার হলো না- তা নিয়ে তাদের দুঃখের শেষ থাকে না। এধরনের কোন আচরণ কখনো কোকো’র কাছ থেকে এসেছে- এমন কথা কেউই বলতে পারবে না।
আবার অন্য দিক থেকে দেখতে গেলে বলতে হয়, কোকোই সম্ভবত একমাত্র বাংলাদেশী যার বিরুদ্ধে খোদ মার্কিন সরকারের একটি সংস্থা মামলা করেছে। দুর্নীতির মামলা এই দেশে হওয়াটা কোন নতুন বিষয় নয়। কিন্তু এ মামলা তো দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যেয়ে করেনি, করেছে অন্য দেশের একটা সরকার। মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোকো জার্মানি ও চীনের দু’টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৩০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। জার্মানির সিমেন্স এজি ও চীনের চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং নামের প্রতিষ্ঠান দু’টি মার্কিন বিচার বিভাগের কাছে স্বীকার করেছে যে ২০০১ সালের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত তারা মোট ৫৩ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৯ মার্কিন ডলার ঘুষ দিয়েছে। এই ঘুষের টাকা প্রথমে জমা পড়ে একটি মার্কিন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। পরে সেখান থেকে তা পাচার হয়ে যায় সিঙ্গাপুরে কোকোর অ্যাকাউন্টে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুসারে ঘুষ দিয়ে দেশে বা বিদেশে কাজ আদায়ের চেষ্টা অবৈধ। টাকাটা যেহেতু মার্কিন ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হয়েছে, তাই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এই টাকা পাচারের ঘটনাটি তদন্ত করে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে অস্বীকার করা হয়েছে, তারা বিবৃতি দিয়েছে, জনসভায় নেতারা প্রতিবাদ করেছেন। তবে সেসব প্রতিবাদকে খুব বেশি যৌক্তিক বলে মনে হয়নি কখনোই, অনেকটা দায়সারাই যেন ছিল। সবমিলিয়ে খুব একটা প্রচারের আলোতে না থাকলেও কোকোর ইমেজে কিছুটা হলেও কালো দাগ কিন্তু ছিলই। তেমন একটা ক্লিন ছিলো না তার ইমেজ।
আর সে কারণেই বিভ্রান্তিটা থেকেই যায়। কোকো রাজনীতিবিদ নন, খুব পরহেজগার হিসাবে তার তেমন কোন পরিচিতিও নেই, বরং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম। তারপরও এমন একজন লোকের জানাজায় এত লোক কেন হলো?
এই প্রশ্নটি আমি অনেককেই করেছি। একজন খুব সহজ ভঙ্গিতে বললেন, যে কারণে এখন একটা অবাধ নির্বাচন হলে বিএনপি জিতবে, ঠিক সেই কারণেই কোকোর জানাজায় এত লোক হয়েছে। প্রশ্নটিকে আমি কঠিন মনে করেছিলাম। কিন্তু এর যে এত সহজ একটি উত্তর থাকতে পারে, সেটি আমার বিবেচনায় ছিল না। আবার ঠিক তখনই যে প্রশ্নটি মাথায় এলো, তা হচ্ছে- আচ্ছা বিএনপি জিতবেই কেন? এর আগের মেয়াদে বিএনপি কি খুব ভালো কিছু কাজকর্ম করেছে? চুরি চামারি আর লুঠপাট কি কম করেছে? হাওয়া ভবনকে কি জনগণ আবার কামনা করে? তাহলে কেন এত সহজেই সবাই বলে ফেলে যে, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি জিতবে?
আসলে বিএনপি যতবার জেতে, সেটা তো যতটা না নিজের কারণে, তার চেয়েও বেশি প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের কারণে। ক্ষমতায় যেয়েই আওয়ামী লীগ এমন কিছু আচরণ করে, যাতে বিরক্ত হয় মানুষ। আওয়ামী লীগ উন্নয়ন করে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এদের শাসনামলে অনেক হয়। কিন্তু সেই সঙ্গে আত্মম্ভরি বক্তব্য এতটাই বেড়ে যায় যে, মানুষ বিরক্ত হয়। মন্ত্রীরা, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও বক্তৃতা করতে এসে, তারা কত কি করেছেন তার ফিরিস্তি দিতে শুরু করেন। আরে ভাই, আপনি যদি জনগণের জন্য কিছু করেই থাকেন, সেটা তো জনগণের নিজে থেকেই টের পাওয়ার কথা। আর যদি তারা টের না পায়, আপনি বারবার বললেই কি তা তারা বিশ্বাস করবে?
আমার ধারণা, জনগণ নেতা-নেত্রীর মুখ থেকে মিথ্যা বলা পছন্দ করে না। আর পছন্দ করে না ঔদ্ধত্য। এবছরের শুরু থেকে, ৫ জানুয়ারি ইস্যুকে কেন্দ্র করে, প্রধান বিরোধীদল ও এর শীর্ষ নেত্রী সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রী বা নেতারা যত কথা বলেছেন, তার মধ্যে মিথ্যা আর ঔদ্ধত্যের পরিমাণ ছিল অনেকটাই বেশি। মানুষ এটা পছন্দ করেনি। পছন্দ যে করেনি, সেটা তারা প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছিলো না। কোকো’র জানাজা তাদেরকে কেবল সেই সুযোগটা করে দিয়েছিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





