somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নোবেল ও বাংলাদেশের খবর

০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বছরের এই সময়টা নোবেল পুরস্কারের সময়।

কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই আমার গুগল নোটিফিকেশনে নোবেল-জাতীয় খবর আসতে শুরু করে। কে পেতে পারেন, কোন গবেষণার কথা আলোচনায়, গত কয়েক দশকে কোন আবিষ্কার পৃথিবীকে কীভাবে বদলে দিয়েছে—এইসব। অক্টোবর এলে একে একে নাম ঘোষণা শুরু হয়।

একই ফোনে, একই নোটিফিকেশন বারে, পাশাপাশি বাংলাদেশের খবরও আসে।

ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা চুরি হয়েছে। হাসপাতালে রোগীর স্বজন আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে মারামারি। কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও রাজনৈতিক সংঘর্ষ। ছেলে বাবাকে মেরেছে। অল্প কিছু টাকার জন্য একজন আরেকজনকে খুন করেছে। মাদকের টাকা না পেয়ে বাড়িতে হামলা করেছে। কে কাকে পেটাল, কে কার জমি দখল করল, কে কোন দলের পরিচয় ব্যবহার করে কী করল।

ফোনের স্ক্রিনে আঙুল দিয়ে একটু ওপরে-নিচে করলেই পৃথিবীটা অদ্ভুতভাবে দুই ভাগ হয়ে যায়।

একদিকে মানুষ বসে আছে আলো কীভাবে কাজ করে, কোষ কীভাবে সংকেত দেয়, মহাবিশ্ব কী দিয়ে তৈরি, একটি রোগ কেন হয়—এইসব প্রশ্ন নিয়ে। কেউ হয়তো জীবনের ত্রিশ বছর একটি সমস্যার পেছনে কাটিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কাজের ফল এখন পৃথিবীর কোটি মানুষের কাজে লাগছে। আমরা তাঁর নাম জানছি নোবেল পুরস্কারের কারণে।

আর কয়েকটি নোটিফিকেশন পরেই জানতে পারছি, আমাদের এখানে কেউ কয়েক হাজার টাকার জন্য আরেকজনকে ছুরি মেরেছে।

অবশ্যই এই তুলনাটা পুরোপুরি ন্যায্য নয়।

সুইডেনে খুন হয়। আমেরিকায় মাদক আছে। ইউরোপে দুর্নীতি আছে। জাপানে পারিবারিক সহিংসতা আছে। পৃথিবীর কোনো দেশই শুধু বিজ্ঞানী, কবি আর সাধু মানুষ দিয়ে তৈরি নয়। এবং বাংলাদেশের খবরের কাগজ খুললেই যে শুধু অপরাধ পাওয়া যায়, সেটাও সত্য নয়।

তবু মনটা খারাপ হয়।

কারণ প্রশ্নটা অপরাধ আছে কি নেই, তা নয়। প্রশ্নটা সম্ভবত একটু অন্য জায়গায়।

একটা সমাজ তার মানুষের শক্তি কোথায় খরচ করাচ্ছে?

একজন তরুণ বড় হয়ে কী হওয়ার স্বপ্ন দেখে? একজন মেধাবী মানুষকে আমরা কী ধরনের পরিবেশ দিচ্ছি? আমাদের সবচেয়ে আলোচিত মানুষ কারা? আমাদের জাতীয় আলাপের বিষয় কী? বিশ্ববিদ্যালয়ে কী নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়? গবেষণার জন্য কতটা জায়গা আছে? একজন শিক্ষক, বিজ্ঞানী, লেখক, গবেষক কিংবা উদ্ভাবক তাঁর কাজ দিয়ে কতটা সামাজিক মর্যাদা পান?

আর তার বিপরীতে ক্ষমতা, পরিচয়, দল, টাকা, দখল আর প্রভাব—এগুলো দিয়ে কত দ্রুত ওপরে ওঠা যায়?

সম্ভবত এখানেই নোবেলের খবরটার সঙ্গে আমাদের খবরগুলোর একটা অস্বস্তিকর সম্পর্ক তৈরি হয়।

নোবেল পুরস্কার নিজে কোনো দেশের সভ্যতার মাপকাঠি নয়। কোনো দেশ নোবেল না পেলেই সে ব্যর্থ দেশও নয়। বাংলাদেশ থেকেও অসাধারণ গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, লেখক, শিক্ষক, শিল্পী প্রতিদিন কাজ করছেন। তাঁদের অনেকের কাজ হয়তো কোনোদিন বড় শিরোনাম হবে না।

কিন্তু নোবেলের মৌসুম বছরে অন্তত একবার মনে করিয়ে দেয়—মানুষের পক্ষে কী করা সম্ভব।

একজন মানুষ তাঁর গোটা জীবন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যয় করতে পারেন। এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারেন যা তাঁর জন্মের বহু বছর পরেও মানুষ ব্যবহার করবে। একটি বই লিখে মানুষের চিন্তার ভাষা বদলে দিতে পারেন। যুদ্ধ থামাতে পারেন। অর্থনীতি বোঝার নতুন পথ তৈরি করতে পারেন।

মানুষের সক্ষমতার সীমা এত দূর পর্যন্ত যেতে পারে।

আর ঠিক তখনই আমার ফোনে বাংলাদেশের আরেকটি নোটিফিকেশন আসে।

কেউ কাউকে পিটিয়েছে।

এই বৈপরীত্যটাই সম্ভবত আমাকে সবচেয়ে বেশি বিষণ্ন করে।

কারণ আমরা কম মেধাবী মানুষ নই। আমাদের মানুষের সক্ষমতাও কম নয়। পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় গিয়ে বাংলাদেশিরা চিকিৎসা করছেন, গবেষণা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, প্রযুক্তি তৈরি করছেন, প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। অর্থাৎ কাঁচামালে সমস্যা নেই।

তাহলে দেশে ফিরে এত বিপুল মানবশক্তির এতটা কেন প্রতিদিন তুচ্ছ লড়াইয়ে নষ্ট হচ্ছে?

কেন আমাদের এত বুদ্ধি ব্যয় হয় কে কোন পদ পাবে তা নিয়ে? এত সাংগঠনিক দক্ষতা ব্যয় হয় কার জায়গা কে দখল করবে তা নিয়ে? এত সাহস দেখানো হয় দুর্বল কাউকে পেটাতে? এত সৃজনশীলতা খরচ হয় নিয়মের ফাঁক খুঁজতে?

এই একই বুদ্ধি, সাহস, সংগঠন আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা অন্যদিকে গেলে কী হতে পারত?

হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর কোনো নোবেল কমিটির কাছে নেই।

আমাদের কাছেই আছে।

আমি চাই না বাংলাদেশের সংবাদপত্রে অপরাধের খবর না থাকুক। অপরাধ হলে তার খবর অবশ্যই হতে হবে। আমি এমনও ভাবি না যে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখব আমাদের সব সমস্যা শেষ হয়ে গেছে এবং দেশের সবাই গবেষণাগারে বসে গেছে।

আমি শুধু চাই, নোটিফিকেশনের ভিড়ে অন্য ধরনের বাংলাদেশের খবরও একটু বেশি আসুক।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন। কোনো স্কুলের শিক্ষক বিশ বছর ধরে এমন কিছু তৈরি করেছেন যা শিক্ষাব্যবস্থা বদলে দিতে পারে। কোনো তরুণ এমন প্রযুক্তি বানিয়েছেন যা গ্রামের মানুষের কাজে লাগছে। কোনো লেখকের বই পৃথিবীর অন্য ভাষায় পড়া হচ্ছে। কোনো বিজ্ঞানীর কাজ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে।

অর্থাৎ এমন খবর, যেগুলো পড়লে মনে হবে আমরা শুধু ঘটনাপ্রবাহের শিকার নই। আমরাও কিছু তৈরি করছি।

নোবেল পাব কি পাব না, সেটা আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।

কিন্তু যে সমাজ থেকে নোবেল পাওয়ার মতো কাজ জন্মাতে পারে, সেই সমাজটা তৈরি করার চেষ্টা করছি কি না—প্রশ্নটা সম্ভবত সেখানে।

বছরের এই সময়টায় তাই নোবেলের খবরগুলো আমার কাছে পুরস্কারের খবরের চেয়ে একটু বেশি কিছু।

এগুলো মনে করিয়ে দেয় মানুষ কোথায় যেতে পারে।

আর আমাদের খবরগুলো মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোথায় আটকে আছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুগল এ.আই. - প্রফেশনাল সার্টিফিকেট পেয়ে গেলাম

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৫


বিগত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে কোর্সেরাতে টুকটাক কোর্স করছি, মাঝে মধ্যেই সার্টিফিকেট পাচ্ছি। তবে প্রফেশনাল সার্টিফিকেট কোর্স কখনো করা হয় নি। বলে রাখা ভালো কোর্সেরা ফ্রি নয়, এখানে আপনাকে পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মদিনার মিষ্টান্ন, শ্রী ঘোষের দধি: সম্প্রীতির যে রেখা চোখে পড়ে না

লিখেছেন মুনতাসির, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৮



২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রয়াত লেখক, গবেষক ও বাম রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরকে দেশের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। ষাটের দশকে যিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামে আস্ত একটা বই... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বেগম রোকেয়া, একজন মাদাম কুরী এবং একজন আএলিটা

লিখেছেন নাজনীন১, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০



মঙ্গল গ্রহের রাণী আএলিটা।



রাশিয়ান বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর একটি চরিত্র। ১৯২৪ সালের সাদা কালো ম্যুভিটি বানানো হয়েছে,সায়েন্সফিকশন উপন্যাসটি লিখেছিলেন এলেক্সে নিকোলেভিস টলস্টয়, ১৯২৩।


বাংলাদেশে এক সময়ে বিজ্ঞানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ পর্ব-২

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৯



এবার জিন্নাহর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত বিতর্কিত বক্তব্যে আসা যাক। জিন্নাহ জন্মসূত্রে গুজরাটি ছিলেন এবং কেবল ইংরেজি ও গুজরাটি ভাষা জানতেন। তিনি উর্দু বলতে পারতেন না। সেক্যুলারিস্ট জিন্নাহ যেহেতু ব্যক্তিজীবনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামের জ্ঞানদীপ : যুক্তির আরব্য-ফারসী নবযাত্রা প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য -৩য় পর্ব

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:১৭
×