somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা

২৬ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আচ্ছা আসুনতো একটা খুব সাধারন প্রশ্ন করি, এদেশটাকে চালাচ্ছে কারা ? ১৬ কোটি মানুষকে দুবেলা খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে কারা ? ঢাকার রাস্তায় রং-বেরঙের প্রাডো, ল্যান্ড ক্রুজার, হ্যামার, নিশান, টয়োটা দাপিয়ে বেড়ায় কাদের কল্যাণে ? এতএত শপিংমলএ দামি দামি বিশ্ববিখ্যাত ব্রান্ড এর দোকানগুলি চলে কিভাবে ? কিভাবে এবং কারা কেনে এসব দামি প্রোডাক্ট ? এতএত দামী হোটেল রেষ্টুরেন্টএ এত অর্থ কিভাবে ব্যয় হয় ?

দেশটা আসলেই চালাচ্ছে কারা ? সহজ উত্তর আসবে - ব্যাবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ, সরকারী-বেসরকারী অফিসাররা। কিন্তু আসলেই কি তাই ?

না, উত্তরটা সম্পুর্ন ভুল। এদেশটাকে চালাচ্ছে তিনটি শ্রেনী। প্রান্তিক কৃষক, গার্মেন্টস এর পোশাকশ্রমিক এবং বিশ্বব্যাপি ৮০ লক্ষ দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক। প্রান্তিক কৃষকদের শ্রম-ঘামের ফলশ্রুতিতেই আমাদের মুল খাদ্যশস্য আমদানী করতে হয়না। যদি মুল খাদ্যশস্য আমদানী করতে হতো তাহলে আমরা টের পেতাম কত ধানে কত চাল। আর যেহেতু আমরা একটা আমদানীনির্ভর দেশ তাই বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের জন্য অক্সিজেন এর মতই দরকার। খাদ্যশস্যছাড়া আমরা প্রায় সবকিছুই বিদেশ থেকে আমদানী করি। আর পোশাকশ্রমিক ও বিশ্বব্যাপি বাকী ৮০ লক্ষ শ্রমিকের অর্জিত বৈদেশিক মু্দ্রা দিয়েই সেই আমদানী দায় মেটানো হচ্ছে। আর কারও সামান্যতম অবদানও এদেশটির জন্য নেই। এদের অনুপস্থিতিতে আমাদের অবস্থা আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশের চাইতেও করুন অনেক আগেই হয়ে যেতো। সরকারের এত এত উন্নয়ন প্রকল্প সব মুখ থুবড়ে পড়তো এই প্রান্তিক জনদের শ্রম ও ঘামে অর্জিত অর্থ ছাড়া। বর্তমানের ২৬ বিলিয়ন ডলারের বিশার রিজার্ভের পিছনের মূল কারিগর এই তিন শ্রেণীর প্রান্তিক জনেরা।

প্রথমেই আসি প্রান্তিক কৃষকদের বিষয়ে :

ভুর্তুকি না দেয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত চাপের পরও সরকারের নজর থাকায় এদেশের কৃষকরা সার-বীজ-বিদ্যুত বিষয়ে সীমিত হলেও সুবিধাজনক অবস্থায়। যদিও সঠিক দাম তাঁদের পকেটে নাগিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটেই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যায়। এদের দাপটে আসল সুবিধা প্রকৃত কৃষকরা কমই পান। এমনকি অপ্রচলিত কৃষি পণ্যে সরকারের ক্যাশ সাবসিডির পুরোটাই মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়, যার স্বাক্ষী এই অধমও। এই প্রান্তিক কৃষকদের শ্রম ও ঘামের কল্যাণেই আজ বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের দেশ, যাকে প্রধান খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না।

এরপরই আসে পোশাক শ্রমিকদের বিষয়ে :

পোষাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টা মাথায় রেখেও বলতে হচ্ছে এই হাড়-জিরজিরে শ্রমিক যার সিংহভাগই কিশোরী-তরুনী মেয়ে তারা যখন সকাল ও সন্ধ্যায় রাস্তাদিয়ে হেঁটে যায় লাইনধরে তাদের দিকে তাকালে নিজেকে চুড়ান্ত অপরাধী মনে হয়। কতইবা তাদের বেতন ? এমন বেতন তারা পায় যার সিংহভাগই চলে যায় বস্তির ভাড়া বাসার পিছনে। আর বাকী টাকা দিয়ে একজন মানুষ দুবেলা পেটপুরে খাওয়া এশহরে অসম্ভব। আর সেখানে সেই ছেলে বা সেই মেয়েটি নাখেয়ে বাড়ীতে টাকা পাঠায় সংসারে বাকী সদস্যদের বেঁচে থাকার জন্য। আর দিনদিন সেই শ্রমিকটি অপুষ্টিতে ভুগে ভুগে তিরিশ বছরে পৌছাতে পৌছাতেই বুড়ো মানুষের খাতায় নাম লেখায়। অথচ সেই বেতনের সামান্য বৃদ্ধিও সহজে আসেনা। আর সেখানে মালিকপক্ষ দিনদিন তেলচকচকে হতেই থাকে। নতুন নতুন গাড়ীর বাড়ীর মডেল পাল্টানো এবং দেশেবিদেশে ঘুরে বেড়ানো তাদের জন্য ডালভাত কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য মিনিমাম অর্থপ্রদান করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর সামান্য ৫০০০- ৭০০০ টাকার জন্য নিজের জীবনটাকে এরা উৎসর্গ করে দেয় । এই অল্প মজুরীচক্রের জন্য মানবতার ধ্বজাধারী উন্নতবিশ্বের বড় বড় বায়ারদেরও অবদানও কোনঅংশে কম নয়।

আমাদের দেশের সমাজবিজ্ঞানীরা এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীরা কি একবারও ভেবে দেখেছেন এই হাড়-জিরজিরে আন্ডারহাইটএর মেয়েরাই হলো এই দেশর ভবিষ্যতের মা। তাদের কাছ থেকে কিভাবে সুস্থ্য-সবল শিশু পাওয়া সম্ভব ? দেশটার ভবিষ্যত নাগরিকদের শারিরীক অবস্থা কি হতে যাচ্ছে বলে আমাদের মনে হয় ?

সব দেখেশুনে ফাইন্যান্সিং ইন্সটিটিউটের এর একজন হিসেবে আমার কিছু অভিজ্ঞতা দিনদিন আমাকে চুড়ান্ত হতাশাতে নিমজ্জিত করেছে ও করছে।

শিল্পবিপ্লব এর সময় বিশ্বপরিস্থিতি যেখানে ছিলো আজ শত বছর পরও আমরা সেখানেই আছি । কোন কোন ক্ষেত্রে আরও নিচে চলে গেছে পরিস্থিতি । লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। অক্ষমতাজনিত দুঃখে নিজেকে কিটের চাইতেও ছোট বলে মনে হয়।

সর্বশেষে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে থাকা ৮০ লক্ষ শ্রমিকের বিষয়ে :

মধ্যপ্রাচ্যে-দুরপ্রাচ্যে এবং বাকী বিশ্বে শ্রম বিক্রয় করা ৮০ লাখ শ্রমিক কতটুকু সুবিধা পায় এদেশের কাছ থেকে ? ভুমি-বাড়ী সহ নিজের সর্বস্ব বিক্রয় করে দিয়ে জানটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে যারা শ্রম বিক্রয় করতে যায় তারা কতটুকু অসহায় অবস্থায় বৈধ-অবৈধভাবে বিদেশ যায় তা নতুন করে বলার দরকার নেই। সেখানে গিয়ে অনেকেই নিজের জীবনটা হারিয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসেন। অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে আসেন । আর যাদের ভাগ্য ভাল তারাও আসেন তবে বিমানবন্দরে কুকুর-বিড়ালের চাইতেও নিন্মস্তরের প্রানীর মত আচরনের শিকার হন।

শ্রম এক্সপোর্ট করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা এমানুষগুলি আলাদা বিশেষ কোন সুবিধা নিজস্ব সংগঠনের অভাবে পান না। যেখানে সরকারের কাছ থেকে সামান্য কৃষিজাত বা গার্মেন্টস পন্য এক্সপোর্ট করা মধ্যস্বত্বভোগীরা সর্বোচ্চ ২০ % পর্যন্ত্য ক্যাশ সাবসিডি পেয়ে লালে লাল হয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। প্রশ্ন, ক্যাশ সাবসিডি যদি দিতেই হয় তাহলে এঁরা কেন নয় ? এরা কি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন না ?

এই পোষ্টটা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা ছাড়া বেশী কিছু করার ক্ষমতা আমার মত সাধারনের যে নেই। এই বঞ্চিতদের জন্য যারা কিছু করার ক্ষমতা রাখে তাদের বিবেকবোধ জাগ্রত হোক এই কামনায়।

শ্রদ্ধেয় কবি জীবনানন্দ দাস সেই কতবছর আগে বলে গেছেন...

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১:৩২
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শাপলা বা শালুকের পরিচিতি, পুষ্টিগুন ও মানব শরীরের উপকারীতা।

লিখেছেন রবিন.হুড, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


শাপলা অতি পরিচিত একটি নাম তাই না! এটি আসলে একটি জলজ উদ্ভিদ। যাকে আমাদের দেশের জাতীয় ফুল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটি শ্রীলংকারও জাতীয় ফুল তবে নীল শাপলা সেখানকার জাতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রেন টু কক্সবাজার: টিকিট পেলাম না, পেলাম বিকল্প পথের সন্ধান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। তবে এবার লক্ষ্য ছিল একটু আলাদা—বাসে নয়, বিমানে নয়; ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে সমুদ্রের শহরের পথে যাত্রা। কিন্তু সেই সহজ পরিকল্পনার প্রথম বাধাই হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্রেফ 'জিন্নাহকে স্মরণ আর বঙ্গবন্ধুকে গালি' রাজাকারি মানসিকতারই উদাহরণ

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



ভারতীয় উপমহাদেশের জাতিসত্তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি কেউ 'যৌক্তিক' বা তাঁর 'প্রাপ্য' সম্মানটুকু জানাতেই পারেন; তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, যখন সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×