উপক্রমনিকায় এই গ্রাম দু'টোর কথা টানলাম কেন, মনে হতে পারে। আমি এই ছোট্ট গ্রাম দু'টো ধরে ধরেই পৃথিবীতে এগিয়ে আসতে চাইছি। আমার দেখা পৃথিবী ধীরে ধীরে আমার ফুপুর গ্রামটির মতোই শিক্ষাকে একপাশে ছুড়ে ফেলে অর্থকেই আকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে চাইছে। জানিনা সবার ভেতরে এমন একটি অনুভব তৈরী হয়েছে কি না, তবে আমি এমন কিছুই একটা অনুভব করছি। এখন পৃথিবীর দিকে তাকালে একে এক বিশাল সুপারমার্কেটের মতো মনে হয়। আগেও হয়তো তেমনি ছিল। কিন্তু তখন প্রতিপত্তি ছিল ক্রেতাদের আর এখন বিক্রেতাদের। আমরা সাধারণ মানুষরা ক্রেতা হিসেবে পুরোপুরি ওদের ক্ষমতার কক্ষুগিত। আমাদেন সাধ, আহল্লাদ, আনন্দ, বেদনা ওদেরকে ঘিরেই। ওরা ওদের আলমারীতে কি সাজাবে, তা দেখার জন্যে আমরা তির্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকি আমরা। ওদের দেয়া ডিসকাউন্টের সুযোগ পাবার আশায় আমরা ঝাপিয়ে পড়ি শকুনের মতো। ওরা আমাদের সুখের মেশিন তৈরী করে রেখেছে। সেখানে টাকা ফেললেই যে সুখ বেরিয়ে আসে, আমরা তা আকড়ে ধরে সুখসাগরে নিমজ্জিত হই। আগে এ সহজ সুখের কবলে ফেলার ও পড়ার আগে সামান্য হলেও ভাবনা বা লজ্জাও হতো। আর আজকালের ক্রেতা বা বিক্রেতা, দুজনেই এই লজ্জাটুকু ছুড়ে ফেলে একেবারেই উলঙ্গ। চারিদিকে টাকার খেলা। লটারীর পর লটারী। টিভি তে লটারী, পত্রিকায় লটারী, টেলিফেনেও আসছে লটারীর লোভনীয় প্রস্তাব। এটা বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে নয়, জার্মানীর মতো উন্নত দেশে বসেও একই আলামত দেখতে পাচ্ছি চারিদিকে। টিভি তে এমন সহজ প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর প্রায় প্রতিটি লোকেরই জানা। ফোনে উত্তর দিতে হয়। একেকটা কলের চার্জ এক থেকে দুই ইউরো যেখানে সাধারন কলের চার্জ এক সেন্ট। লাখ লাখ লোক ঝাপিয়ে পড়ে ফোনের উপর। প্রায় সবার উত্তর ঠিক হলেও লটারীতে একজনকে বেছে পুরস্কার দেযা হয়। লাভ যা থাকলো তার একটা সিংহভাগ যায় আধা সরকারী সংস্থা টেলিকমের পকেটে। যে কোন সংস্থা, সরকারী বা বেসরকারী, সবখানেই মানুষ এখন নাগরিক হিসেবে যায় না, যায় ক্রেতা হিসেবে। ক্রেতার জন্যে রয়েছে টেলিফোনে অতি ভদ্র যান্ত্রিক পরামর্শ। 99 সেন্ট প্রতি মিনিটে। দু'মিনিট ধরে শুনতে হবে প্রথম যন্ত্রের কথা। তারপর অপেক্ষা বাজনার সুরে সুরে। কপাল ভাল থাকলে তারপর পাওয়া যাবে কাউকে, নইলে আবার প্রথম থেকে। আবার যন্ত্রের কথা আর অপেক্ষার পালা। সেইসাথে ভরছে টেলিকম ও বিক্রেতাদের কোষাগার।
পুজিবাদী চিন্তা ও তার প্রয়োগের এতটা নগ্নতা কবে থেকে? কবে থেকে তার এই শক্তিশালী প্রকাশ। কবে থেকে আমরা এর এত বেশী কুক্ষিগত ? আমার মনে হয় সমাজতন্ত্রের পতনের পর থেকেই এর শুরু। তখন থেকেই তো ধনতান্ত্রিক চিন্তা প্রতিপক্ষহীন। সুতরাং চলছে পুজিবাদীদের একচ্ছত্র রাজত্ব। এখন আর ঘোমটার দরকার নেই। মানবিকতা, নীতিবোধ ? চুলোয় যাক সব!
সোভিয়েট আমলের কথা। জামানর্ী যদি কোন একটি প্রজেক্ট নিয়ে আমেরিকা যেতো, বলা হতো এটা একটি ব্যবসায়িক পদক্ষেপ। একই প্রজেক্ট নিয়ে সোভিয়েট ইউনিয়ন গেলে বলা হতো, এটি একটি উত্তেজনা প্রশমণের পদক্ষেপ। একই প্রজেক্টে ভারত গেলে বলা হতো, এটি দারিদ্রতার বিরুদ্ধে সাহায্য। আজ আর উত্তেজনা প্রশমণের কোন কারন নেই। আজ আর তাই চোখে চামড়া থাকার দরকার পড়ে না। আজ সবকিছুই ব্যাবসা। আর সাহায্যের নামে কিছু লোকের ক্রয়ক্ষমতাকে কোনক্রমে টিকিয়ে রাখা, যাতে শোসনের পথটি আরো বেশী প্রশস্ত হয়। আমরা কনজ্যুমাররা আমাদের আনন্দের সংজ্ঞা পাল্টে তাদেরকে তাদের পথে খুব ভালো করেই সাহায্য করে যাচ্ছি। আমাদের আতি্বক শান্তির প্রতি কোন চাওয়া নেই, মানবিক উৎকর্ষতার প্রতি সামান্যতম মোহও নেই। আমরা তাই তাদের সাথেই গলা মিলিয়ে বলি, ফেলো কড়ি, মাখো তেল, তুমি কি আমার পর ?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


