somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কর্মোদ্দীপনা প্রশমিত করার কাহিনী, মূল: হাইনরিখ ব্যোল, জার্মান থেকে অনুবাদ: তীরন্দাজ

০৭ ই জানুয়ারি, ২০০৭ বিকাল ৪:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইউরোপের পশ্চিম উপকূলের কোন এক বন্দরে এক দরিদ্র পোষাক পড়া লোক তার জেলেনৌকায় বসে ঝিমোচ্ছিল। এক ফিটফাট পোষাকের ট্যুরিস্ট তার ক্যামেরায় একটি রঙ্গিন ফিল্ম ঢুকিয়ে নৈস্বর্গিক ছবি তোলার জন্যে তৈরী হচ্ছিল। ছবির দৃশ্যগুলো: নীল আকাশ, সবুজ সাগর আর তার ফেনিল ঢেউ, কালো নৌকা, জেলেদের লাল টুপি, ক্লিক! তারপর আবার ক্লিক! যেহেতু ভাল জিনিস তিনবার হওয়া দরকার, তাই আরেকবার ক্লিক! কর্কশ, প্রায় শত্রুর মতো বিরক্তিকর আওয়াজে ঝিমুনি বন্ধ হয়ে গেল জেলের, ঝিমোনোর মাঝেই সোজা হলো, ঝিমোতে ঝিমোতেই তার সিগারেটের প্যাকেট খোঁজায় এদিক সেদিক হাতড়ালো। কিন্তু যা খুঁজছে, তা পাওয়ার আগেই অতি উৎসাহী ট্যুরিস্ট জেলের মুখে সিগারেট না ঢুকালেও তার নাকের ডগার সামনে একটি প্যাকেট তুলে ধরলো। চার নম্বর ক্লিক! তাতেই পূর্ন হলো ভদ্রতার চুড়ান্ত পর্ব। এই চকিত ভদ্রতার সীমাহীন প্রাচুর্যে যে দায়বোধ জন্ম নিল, তাকে হজম করার জন্যেই এক কথোপকথনের আবহ সৃষ্টি করায় প্রয়াসী হলো ট্যুরিস্ট।

'আজ নিশ্চয়ই অনেক মাছ ধরবেন আপনি'?
জেলে না সূচক উত্তরে মাথা নাড়লো।
'শুনেছি, আজকের আবহাওয়া বেশ অনুকুল'।
জেলে হ্যা সূচক উত্তরে মাথা নাড়লো।

'তার মানে, আজ আপনি মাছ ধরতে বেরুচ্ছেন না'!
উত্তরে জেলে আবার মাথা নাড়লো। ট্যুরিষ্টের উত্তেজনা বাড়লো আরো। জানা কথা, এই হতশ্রী পোষাক পড়া জেলের মঙ্গলই তার একান্ত কাম্য। এই প্রাপ্ত সুযোগের সদব্যাবহার না করা তার বুকে যেন পেরেক ঠুকলো।
'ও, আপনার শরীর খারাপ'?
অবশেষে জেলে ইশারাতেই কাজ না সেরে মুখ খুললো তার। 'আমি খুব ভাল আছি'। বললো সে। 'এর চেয়ে ভাল বোধ এর আগে কখনও করিনি'। বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। হয়তো দেখাতে চাইল, কতোটা সুঠাম তার শরীরের গড়ন। 'আমি অবিশ্বাস্যরকম ভাল বোধ করছি'।
ট্যুরিস্টের চেহারা আরো বেশী গোমড়া হলো প্রতিবারই এবং যে প্রশ্নটি কলজে ছিদ্র করে বেরিয়ে আসতে চাইছে, সেটি সামলাতে পারলো না।
'তাহলে আজ নৌকো নিয়ে বেরুচ্ছেন না কেন'?
উত্তটি খুব তড়িৎ ও সংক্ষিপ্ত। 'কারণ আজ সকালে ধরেছি একবার'।
'অনেক মাছ পেয়েছিলেন'?
'এতোটা ভাল যে, আজ আবার ধরতে যাবার কোন দরকার দেখছি না। চারটে গলদা চিংড়ি ও গোটা বারো ম্যাক্রেল ধরেছি আজ'।
জেলে এবার সত্যি সত্যিই ঘুম থেকে জেগেছে বলে মনে হলো। ট্যুরিস্টের অযাচিত চিন্তিত চেহারা যে তাকে ঘিরেই, তা টের পেলো। কাঁধে হালকা চাপড় দিয়ে বললো,
'আগামীকাল ও পরশুর জন্যেও যথেষ্ট মাছ ধরেছি'। তারপরও ট্যুরিষ্টকে আরেকটু শান্ত করার জন্যে বললো,
'আমার কাছ থেকে একটি সিগারেট নেবেন'?
'হ্যা, ধন্যবাদ'!
পাঁচ নম্বর ক্লিক! দুজনের মুখেই সিগারেট জললো। ট্যুরিস্ট মাথা নাড়তে নাড়তে বন্দরের বেদীতে বসলো। ক্যামেরাটা রেখে দিল পাশে, মনে হলো তার কথায় গুরুত্ব বাড়ানোর জন্যে তার দু'টো হাতই দরকার।
'আপনার ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না আমি। তারপরও, ধরুন আজ যদি আপনি দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার, এমনকি চতুর্থবারের জন্যে বেরুতেন, তাহলে দুই ডজন, তিন, চার বা পাঁচ, এমনকি দশ ডজনও ম্যাক্রেল ধরতে পারতেন। চিন্তা করে দেখুন তো একবার'!
মাথা নাড়লো জেলে।
ট্যুরিস্ট থামলো না। 'আপনি যদি, শুধুমাত্র আজই নয়, বরং আগামীকাল, আগামীপরশু, প্রতিটি সুবিধাজনক দিনেই দু'বার, তিনবার, এমনকি তারচেয়ে আরো বেশীবার বেরতেন, তাহলে কি হতো ভাবতে পারেন'?
জেলে আবারো ঝাঁকি দিলো মাথা।
'এক বছরের মাঝে একটি ইন্জিন কিনতে পারতেন। দুই বছরের মাঝে আরেকটি নৌকা। দুই অথবা চার বছরে একটি ছোটখাট ট্রলারও হয়ে যেতো আপনার। দুই নৌকা ও ট্রলারে আরো অনেক বেশী মাছ ধরতে পারতেন। একসময় দুটো ট্রলারের মালিক হয়ে যেতে পারতেন। তারপর আপনি ... '।
উত্তেজনায় কথাই বন্ধ হয়ে রইল কয়েকটি মূহুর্তের জন্যে।
'তারপর একটি হিমাগার তৈরী করাতে পারতেন, হয়তোবা ধোঁয়াতে মাছ শুকোনোর এক ফ্যাক্টরী, পরে আরেকটি মশলা সহ মাছ সংরক্ষনের বড় কারখানা। আপনার নিজস্ব একটি হেলিকপ্টার থাকতো, ওখান থেকে ওয়ারলেসে আপনার ট্রলারের কর্মীদের মাঝের ঝাঁকের গতিবিধি জানিয়ে দিতে পারতেন। আপনি সালমন মাছ ধরার লাইসেন্স করে নিতে পারতেন, একটি মাছের রেস্তেরা খুলতে পারতেন। গলদা চিংড়ি কোন দালাল ছাড়া সরাসরি প্যরিসে রপ্তানী করতে পারতেন। এবং তারপর ... '।
আবারো কথা আটকে গেল ট্যুরিস্টের। মাথা নাড়তে নাড়তে নিজের ভেতরের উত্তেজনায় অবশপ্রায়, তার ভ্রমনের আনন্দ পুরো নষ্ট হবার পথে। শান্ত গড়িয়ে পড়া ঢেউ এর দিকে তাকাল, যেখানে মুক্ত মাছের দল লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। 'এবং তারপর'। ও আবার উত্তেজনায় খেই হারালো ট্যুরিস্ট।
জেলে আস্তে চাপড় দিল তার পিঠে, যেন দম আটকে যাওয়া শিশুর পিঠে চাপড় দিয়ে সুস্থ করছে তাকে। তারপর খুব আস্তে প্রশ্ন করলো,
'তারপর কি হতো'?
'তারপর'! উৎফুল্ল আওয়াজে উত্তর দিল ট্যুরিস্ট। 'তারপর আপনি শান্তিতে বন্দরে বসে সুবিশাল সমুদ্রের দিকে চোখ রেখে ঝিমোতে পারতেন'।
'কিন্তু আমি তো এখন তা ই করছি। আমি শান্তিতে বন্দরে বসে ঝিমুচ্ছিলাম, আপনার ক্যামেরার ক্লিকই আমার শান্তি নষ্ট করলো'।
আপন মনে ভাবতে ভাবতে এবার সত্যি সত্যিই সটকে পড়লো ট্যুরিস্ট। তার সমস্ত কর্মজীবন একসময়ের অবসরের সপ্নেই গাঁথা। এবার আর দরিদ্র পোষাকের জেলের জন্যে তার একটুও সমবেদনা হলোনা, বরং সামান্য হিংসা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়না, যুদ্ধ বন্ধ হলে মানবতার জয় হয়।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩

যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছে?

আমার উত্তর খুব সহজ- কেউ না।
যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী বলে কেউ থাকে না। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন শুধু সৈনিক নয়; মায়ের বুক খালি হয়, শিশুর ভবিষ্যৎ ভেঙে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কটা দুলাল

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১



বাল্য বন্ধু শফির ফোন পাইলেই টেনশনে থাকি। কোন একটা দুঃসংবাদ নিশ্চিত। আর সেটা যদি হয় সকাল বেলা তবে তো কথাই নেই। যদিও আমাদের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই মোটেও তবুও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফাউ টাকার গল্প

লিখেছেন এস আই জয়, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৫

সময় ২০১৪ সাল...

ভার্সিটিতে আজ ক্লাস শেষে আমি, মেহনাজ, তামিম আর শাওন গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ কোত্থেকে শেতু এসে হাজির। এসেই ডিরেক্ট ঘোষণা! আজ নাকি সে আমাদের সবাইকে স্টার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×