'আজ নিশ্চয়ই অনেক মাছ ধরবেন আপনি'?
জেলে না সূচক উত্তরে মাথা নাড়লো।
'শুনেছি, আজকের আবহাওয়া বেশ অনুকুল'।
জেলে হ্যা সূচক উত্তরে মাথা নাড়লো।
'তার মানে, আজ আপনি মাছ ধরতে বেরুচ্ছেন না'!
উত্তরে জেলে আবার মাথা নাড়লো। ট্যুরিষ্টের উত্তেজনা বাড়লো আরো। জানা কথা, এই হতশ্রী পোষাক পড়া জেলের মঙ্গলই তার একান্ত কাম্য। এই প্রাপ্ত সুযোগের সদব্যাবহার না করা তার বুকে যেন পেরেক ঠুকলো।
'ও, আপনার শরীর খারাপ'?
অবশেষে জেলে ইশারাতেই কাজ না সেরে মুখ খুললো তার। 'আমি খুব ভাল আছি'। বললো সে। 'এর চেয়ে ভাল বোধ এর আগে কখনও করিনি'। বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। হয়তো দেখাতে চাইল, কতোটা সুঠাম তার শরীরের গড়ন। 'আমি অবিশ্বাস্যরকম ভাল বোধ করছি'।
ট্যুরিস্টের চেহারা আরো বেশী গোমড়া হলো প্রতিবারই এবং যে প্রশ্নটি কলজে ছিদ্র করে বেরিয়ে আসতে চাইছে, সেটি সামলাতে পারলো না।
'তাহলে আজ নৌকো নিয়ে বেরুচ্ছেন না কেন'?
উত্তটি খুব তড়িৎ ও সংক্ষিপ্ত। 'কারণ আজ সকালে ধরেছি একবার'।
'অনেক মাছ পেয়েছিলেন'?
'এতোটা ভাল যে, আজ আবার ধরতে যাবার কোন দরকার দেখছি না। চারটে গলদা চিংড়ি ও গোটা বারো ম্যাক্রেল ধরেছি আজ'।
জেলে এবার সত্যি সত্যিই ঘুম থেকে জেগেছে বলে মনে হলো। ট্যুরিস্টের অযাচিত চিন্তিত চেহারা যে তাকে ঘিরেই, তা টের পেলো। কাঁধে হালকা চাপড় দিয়ে বললো,
'আগামীকাল ও পরশুর জন্যেও যথেষ্ট মাছ ধরেছি'। তারপরও ট্যুরিষ্টকে আরেকটু শান্ত করার জন্যে বললো,
'আমার কাছ থেকে একটি সিগারেট নেবেন'?
'হ্যা, ধন্যবাদ'!
পাঁচ নম্বর ক্লিক! দুজনের মুখেই সিগারেট জললো। ট্যুরিস্ট মাথা নাড়তে নাড়তে বন্দরের বেদীতে বসলো। ক্যামেরাটা রেখে দিল পাশে, মনে হলো তার কথায় গুরুত্ব বাড়ানোর জন্যে তার দু'টো হাতই দরকার।
'আপনার ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না আমি। তারপরও, ধরুন আজ যদি আপনি দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার, এমনকি চতুর্থবারের জন্যে বেরুতেন, তাহলে দুই ডজন, তিন, চার বা পাঁচ, এমনকি দশ ডজনও ম্যাক্রেল ধরতে পারতেন। চিন্তা করে দেখুন তো একবার'!
মাথা নাড়লো জেলে।
ট্যুরিস্ট থামলো না। 'আপনি যদি, শুধুমাত্র আজই নয়, বরং আগামীকাল, আগামীপরশু, প্রতিটি সুবিধাজনক দিনেই দু'বার, তিনবার, এমনকি তারচেয়ে আরো বেশীবার বেরতেন, তাহলে কি হতো ভাবতে পারেন'?
জেলে আবারো ঝাঁকি দিলো মাথা।
'এক বছরের মাঝে একটি ইন্জিন কিনতে পারতেন। দুই বছরের মাঝে আরেকটি নৌকা। দুই অথবা চার বছরে একটি ছোটখাট ট্রলারও হয়ে যেতো আপনার। দুই নৌকা ও ট্রলারে আরো অনেক বেশী মাছ ধরতে পারতেন। একসময় দুটো ট্রলারের মালিক হয়ে যেতে পারতেন। তারপর আপনি ... '।
উত্তেজনায় কথাই বন্ধ হয়ে রইল কয়েকটি মূহুর্তের জন্যে।
'তারপর একটি হিমাগার তৈরী করাতে পারতেন, হয়তোবা ধোঁয়াতে মাছ শুকোনোর এক ফ্যাক্টরী, পরে আরেকটি মশলা সহ মাছ সংরক্ষনের বড় কারখানা। আপনার নিজস্ব একটি হেলিকপ্টার থাকতো, ওখান থেকে ওয়ারলেসে আপনার ট্রলারের কর্মীদের মাঝের ঝাঁকের গতিবিধি জানিয়ে দিতে পারতেন। আপনি সালমন মাছ ধরার লাইসেন্স করে নিতে পারতেন, একটি মাছের রেস্তেরা খুলতে পারতেন। গলদা চিংড়ি কোন দালাল ছাড়া সরাসরি প্যরিসে রপ্তানী করতে পারতেন। এবং তারপর ... '।
আবারো কথা আটকে গেল ট্যুরিস্টের। মাথা নাড়তে নাড়তে নিজের ভেতরের উত্তেজনায় অবশপ্রায়, তার ভ্রমনের আনন্দ পুরো নষ্ট হবার পথে। শান্ত গড়িয়ে পড়া ঢেউ এর দিকে তাকাল, যেখানে মুক্ত মাছের দল লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। 'এবং তারপর'। ও আবার উত্তেজনায় খেই হারালো ট্যুরিস্ট।
জেলে আস্তে চাপড় দিল তার পিঠে, যেন দম আটকে যাওয়া শিশুর পিঠে চাপড় দিয়ে সুস্থ করছে তাকে। তারপর খুব আস্তে প্রশ্ন করলো,
'তারপর কি হতো'?
'তারপর'! উৎফুল্ল আওয়াজে উত্তর দিল ট্যুরিস্ট। 'তারপর আপনি শান্তিতে বন্দরে বসে সুবিশাল সমুদ্রের দিকে চোখ রেখে ঝিমোতে পারতেন'।
'কিন্তু আমি তো এখন তা ই করছি। আমি শান্তিতে বন্দরে বসে ঝিমুচ্ছিলাম, আপনার ক্যামেরার ক্লিকই আমার শান্তি নষ্ট করলো'।
আপন মনে ভাবতে ভাবতে এবার সত্যি সত্যিই সটকে পড়লো ট্যুরিস্ট। তার সমস্ত কর্মজীবন একসময়ের অবসরের সপ্নেই গাঁথা। এবার আর দরিদ্র পোষাকের জেলের জন্যে তার একটুও সমবেদনা হলোনা, বরং সামান্য হিংসা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



