somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কিশোরে'র বস্ত্রহরণ ও হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালা

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



চারিদিকে পুলিশ আর সংবাদকর্মীদের ভিড়। সেই সাথে উৎসুক জনতা লোকটাকে ঘিরে রেখেছে। কেউ বলতে পারছেনা কিভাবে কি হল। দু'ঘন্টা আগেও লোকটাকে পার্কে'র ভেতরে অনেকেই দেখেছে। লোকটা'র নাম ডেভিড। বয়স চল্লিশোর্ধ হবে। ইটালিয়ান বংশোদ্ভূত ডেভিড বছর দশেক আগে জার্মানীর বার্লিনে এসে বাস করছে। পরিবার বলতে তার কেউ ছিল কিনা কে জানে তবে বেশ অমায়িক, আন্তরিক এবং প্রিয়ভাষী। কথার যাদুতে সহজেই বশ করে ফেলত মানুষকে। বিশেষ করে কিশোর'দের কাছে বেশ প্রিয় হয়ে উঠল ডেভিড । প্রতিদিন পার্কে ডেভিডের সাথে গল্পের আসর জমতো কিশোরদের । বিকেলের সময়টা কেটে যেতো মন্ত্রমুগ্ধের মত। এভাবে প্রতিদিনই বাড়তে লাগল কিশোরদের সংখ্যা। প্রথম প্রথম ওরা বাবা বা মা'র সাথে আসত ডেভিডের গল্প শুনতে।কিছুদিন পর একাই আসতে শুরু করলো ওরা।

কাইজার ষ্ট্রীটের ৮৭ নম্বর বাড়ীতে পাঁচ তলায় থাকে ডেভিড। পাশেই টেম্পেলহোফ পার্ক। তার ফ্লাট থেকে পুরো পার্কটাকে'ই দেখা যায়। ডেভিড তার নিজের ফ্ল্যাটে একাই থাকে। সে কখনও ধূমপায়ী বা মদ্যপায়ী ছিলনা বিধায় সব বাবা মা'রাও আশ্বস্ত ছিল যে ডেভিডের সংস্পর্শে ছেলেদে'র নষ্ট হবার সে রকম কোন সম্ভাবনা নাই। ওরা ওদের সকল সমস্যা অনায়াসে তার সাথে শেয়ার করতে পারত। ডেভিড কিভাবে জানি সব সমস্যার একটা সহজ সমাধান বের করে দিত। কিশোরদের মধ্যে যারা নিয়মিত ছিল তারা হলো মাইকেল, স্টিভ ,রোলান্ড, জন, মার্টিন ও পিটার। ওরা সবাই প্রায় সমবয়সী, আনুমানিক চৌদ্দ থেকে পনের হবে। সেন্ট জোসেফ স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন। হঠাৎই একদিন ডেভিড বলল ,
আমার বাসায় আমি তোমাদের দাওয়াত করতে চাই।
বালকরা বলল,
তাহলেতো খুব মজা হয়
ডেভিড বলল,
কিন্তু সমস্যা হলো আমার বাসায় জায়গা খুব কম। একজনে থাকার জন্য ঠিক আছে। মাত্র একটা রুম। তাই তোমাদের সবাইকে আমি একসাথে নিতে পারবোনা। একজন একজন করে নিয়ে যাবো। তোমরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নাও কার কার হাতে সময় আছে। তারপর আমাকে তালিকা দিও।
বালকরা বলল ,
ঠিক আছে ডেভিড। তবে আমরা যদি সবাই একসাথে যেতে পারতাম তাহলে কিন্তু বেশ হত।
ডেভিড বলল,
আমার জন্মদিনের পার্টিতে আমি একটা হলরুম ভাড়া নিবো। তখন তোমাদের সবাইকে একসাথে দাওয়াত করবো। তোমরা এনিয়ে মন খারাপ করোনা।
মাইকেল বলল,
ঠিক আছে। আগামী রোব বার আমি ফ্রি আছি। আমি তোমার বাসায় আগে যাব। ওরা সকলেই একমত যে মাইকেল'ই আগে যাবে। কারন মাইকেল একটু পাগলাটাটে। সব কিছুতেই তার তাড়াহুড়ো, কোন বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সেটা না পরিনতিতে না যাওয়া পর্যন্ত তার নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধুরা খুব ভাল করেই তাকে জানে, তাই কেউ আর আপত্তি করলো না যে কে আগে যাবে আর কে পড়ে যাবে।

যে কথা সেই কাজ। রোববার আসতে আরও তিন দিন বাকী। মাইকেল অস্থির, রোববার আসতে এত দেরী ক্যান নিজেরে নিজে বার বার প্রশ্ন করে। ডেভিড বলেছিল ইটালিয়ান পাস্তা আর পিজা নিজের হাতে করে খাওয়াবে,সে খাবারের লোভে উত্তেজনাটা যেন আরও একটু বেশী।

মাইকেল জার্মান ছেলে। সোনালী চুল আর নীল চোখের মাইকেল'কে পেয়ে ডেভিড যেমন কেমন আত্মহারা। মাইকেলও মহাখুশি ইটালিয়ান আর পাস্তা খেতে পেরে। আস্তে আস্তে ডেভিডের আচরন কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে যেতে লাগল। সফট ড্রিংস এলো , মাইকেল খুশি হয়েই চুমুক দিল এবং পুরো গ্লাস শেষ করে ফেলল। কেমন যেন একটু ঘোরের মত কাজ করছে কিন্তু বেশ ভালই লাগছে।তবে ভাবছে সফট ড্রিংকস এমন হবে কেন? এদিকে ডেভিড আস্তে আস্তে মাইকেলে'র পাশে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল,পাগলের মতো আদর করতে লাগল। প্রথমে মাইকেল কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলো কিন্তু যখনই নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল কিন্তু ততক্ষনে সফট ড্রিংসে'র সাথে মেশানো ঘুমের ঔষধের কল্যানে এতক্ষনে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে ঘুমের ঘোরে। তারপর কি হল মাইকেলে'র আর কিছু মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখল ডেভিড পাশে নেই কিন্তু নিজেকে সে কোনভাবেই বিছানা থেকে উঠাতে পারছেনা। তার নিজের শরীরে একটা কাপড়ও নাই। খুব ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি কাপড় পড়ে দ্রুত বাসা থেকে বেড়িয়ে এল। কিন্তু ডেভিডকে সে কোথাও দেখতে পেলোনা। কিন্তু মাইকেল অনুভব করতে পারছে তার শরীরে'র ওপর দিয়ে অনেক বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে। লজ্জায়, ভয়ে, সংকোচে সে বাসায় এসে বাবা মা'কেও কিছু বলতে পারলনা। বাবা মা জিজ্ঞাসা করেছিল ডেভিডের পার্টি কেমন হল ?
মাইকেল মাথা নেড়েই সম্মতি দিয়েছিল যে ভালই হয়েছে।

পরদিন সে আর স্কুলে যেতে পারলনা। রাত থেকেই তার প্রচণ্ড জ্বর। বন্ধুরাও ফোন করে জানতে চাইল ডেভিডের সাথে কেমন কেটেছে কিন্তু মাইকেল কাউকেই আসল ঘটনা কিছু বলতে পারেনি। শুধু বলেছে ভাল এবং জ্বরের কারনে কিছুদিন সে স্কুলে আসবেনা।

এক সপ্তাহ সে বাসা থেকে কোথাও বের হয়নি। কোথাও যেতে তার ভাল লাগছে না ,এমনকি বন্ধুদের সাথেওনা। আস্তে আস্তে আবার আরেক রবিবার ঘনিয়ে এল। শনিবারে ওর বন্ধুরা তাকে ফোন দিল এবং জানালো রবিবার স্টিভ যাবে ডেভিডের বাসায়। একথা শুনে মাইকেল আর থাকতে পারলোনা। সে বলল,
না একদম না, কেউ যাবেনা ডেভিডের বাসায়।
ওরা বলল,
কেন ? নিজেতো ভালই খেয়ে দেয়ে এলি আর আমাদের বেলায় যখন এলো তখন বাঁধা দিচ্ছিস! তুই বাঁধা দিলেই আমরা শুনব কেন ?
মাইকেল বলল,
তোরা অপেক্ষা কর, আমি আসছি।

মাইকেল সবাইকে একসাথেই পেয়ে গেলো। ওরা সবাই মাইকেলে'র বাসার নীচেই অপেক্ষা করছিল। মাইকেল গিয়ে ওদেরকে সব বলল। কিন্তু মাইকেলে'র কথা ওরা কেহই বিশ্বাস করতে পারছিলনা। কারন ওরা ডেভিডকে প্রায় এক বছর ধরে দেখছে কিন্তু কোনদিনও মনে হয়নি ডেভিড এতটুকু মন্দ হতে পারে। ডেভিডকে চিনতে এতজন লোকের ভুল হতে পারেনা!!

কিন্তু মাইকেল তাদের ছোট বেলার বন্ধু, মাইকেল'কে ওরা খুব ভাল ভাবেই জানে। ভুক্তভোগী হয়েও মাইকেল কারো কাছে মুখ খোলেনি কিন্তু যখন দেখল তার'ই প্রিয় আরেকজন বন্ধু একই ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে তখন সে চুপ করে থাকতে পারলনা।

সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল কি করা যায় !
উপায় বের করল রবিবার ওরা সবাই মিলে যাবে ডেভিডের বাসায় এবং জিজ্ঞাসা করবে ডেভিড'কে যে এসবের মানে কি ? যদি ডেভিড খারাপ কিছু করে বা করতে চায় ওরা পুলিশ ডাকবে। আগে ওরা ডেভিডে'র সামনা সামনি দাঁড়াবে, তারপর অন্য চিন্তা। কিন্তু মাইকেল এত ঘাবড়ে গেছে যে সে চায়না তার বাবা মা ব্যাপারটা জানুক আর পুলিশতো দূরের কথা। ওরা রওনা হল ডেভিডের বাসার উদ্দেশ্যে।

পাঁচতলা ফ্লাটের জানালা থেকে পড়ে ডেভিডের থেতলে যাওয়া মৃতদেহটা জাতীয় দৈনিকগুলোতে শিরোনাম হয়েছে। সকল কিশোদের বাবা মা'র চোখে পানি ,ওরা ভাবতেই পারেনি ডেভিডের মত ভাল একজন লোক এভাবে চলে যাবে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত। আর এদিকে কিশোর'রা বেশ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হলো গলা থেকে যন্ত্রনাময় কাঁটাটি নেমে গেলো।


( আমার জীবনে লেখা দ্বিতীয় গল্প। একটা পরামর্শ আমি দিতে চাই, সন্তান ছেলে হোক আর মেয়ে হোক এমন ঘটনার শিকার হতে পারে, সেটা পৃথিবীর সব দেশেই হতে পারে। ছেলে হলেই কিন্তু সে নিরাপদ, এমন ভাবাটা ভুল। তাই আপনার সন্তানকে খুব খুব খেয়াল রাখুন, তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন যাতে ওরা এমন কোন ঘটনা ঘটলেও শেয়ার করতে ভয় বা লজ্জা না পায়।আর এমন শত্রু আপনার আশে পাশের মানুষগুলোও হতে পারে তাই নিজের সন্তানকে চোখ বন্ধ করে কারো সাথে মিশতে দেয়া উচিত নয় )
১০টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:১৮


বাংলাদেশের সমাজে একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গিয়েছে। দুই বছর আগে ব্লগে অ্যাকাউন্ট খোলার পর থেকে এই পরিবর্তন নিয়ে কম করে হলেও বিশটির বেশি পোস্ট লিখেছি। এই বিপ্লবের সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকেলগুলো থমকে থাকে, আজও তোমার পাড়ায়

লিখেছেন চারাগাছ, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:০০






সেদিন বিকেলেও লোকটা জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।

পাড়ার মানুষজন তাকে চেনে। চেনার কথাও। গত বাইশ বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দিকে লোকটাকে এই গলিতে দেখা যায়। কখনো হেঁটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:৫৬

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত



সময় চলেছে তার আপন খেয়ালে,
নদীর স্রোতেরা হারায় কালের বুকে;
আমি শুধু এক অনন্তকাল ধরে,
ডুবে আছি প্রিয়, তোমার চাওয়া পাওয়ার ওই সুখে।

বাহিরের সব নিয়ম চলুক তার মতো,
মহাবিশ্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলার পথে ক্ষণিক দেখা – (১১)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০২

পূর্বের পোস্টঃ ক্ষণিকের দেখা, মায়াময় এ ভুবনে -১০


অবশেষে আমার কিছু কথা শুনে ওরা হাসিতে ফেটে পড়লো। সবার মুখে ছিল উজ্জ্বল হাসি।

আজ দুপুরে একটি এলাকার মাসজিদ সংলগ্ন পুকুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০২



আমাদের চারপাশে অনেক কিছু আছে।
যা আমরা দেখতে পাই না। ব্যাকটেরিযয়া, ভাইরাস, ডার্ক ম্যাটার, অণু ও পরমাণুর কথা বলছি না। আমি বলছি, মৃত মানুষের কথা। প্রতিদিন বিশ্বে গড়ে দেড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×