সবাই কমবেশি টর্চ ব্যবহার করি। টর্চের আলো চারদিকে গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবেন ছড়িয়ে পড়া আলোর মাঝখানে স্বচ্ছ আলোর একটা বিন্দু। যা আলাদা করে বোঝা যায়। ওখানে আলো বেশি। এটাকে আমরা ফোকাস বলি।
অন্ধকারে কোন বস্তু দেখার জন্য এই ফোকাস ব্যবহার করা হয়। ফোকাস অন্যদিকে রাখলে বস্তু স্পষ্ট দেখা যায় না।
সমস্যা জর্জরিত এই মানব জীবনের প্রতিটি প্রতিকূল অবস্থায় ফোকাস ঠিক রাখাটা জরুরী। সঠিক জায়গায় ফোকাস ঠিক মত না রাখলে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবেনা। সবই অস্পষ্ট মনে হবে।
প্রতিটি সফল মানুষ প্রত্যেকটা সমস্যার মধ্যে সমাধান খুঁজে পায়; আর প্রতিটি ব্যর্থ মানুষ প্রত্যেকটা সমাধানের মাঝে একটা সমস্যা খুঁজে পায়। যার কারনে ঐ লোকটা ব্যর্থই থেকে যায়। কারন সে সঠিক জায়গায় ফোকাস রাখতে পারেনি।
ফোকাস বুঝতে নিচের গল্পটির বিকল্প কিছু হতে পারেনা-
হাঙ্গেরীয় আর্মি ফোর্সে ২৬ বছরের যুবক ক্যারোলী। সে ছিল ঐ দেশের বেস্ট পিস্তল শুটার। ঐ দেশের যতগুলো ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশীপ ছিল সবই তার জেতা। সালটা তখন ১৯৩৮। ক্যারোলী সহ সবারই স্বপ্ন ১৯৪০ সালের অলিম্পিক গোল্ড মেডেলটা হবে তারই।
সমস্ত প্রস্তুতি নেয়াই ছিল। যে কোন মূল্যে এই হাতটাকে পৃথিবীর এক নাম্বার শুটিং হ্যান্ড বানাতে হবে। লক্ষ্য একটাই; একটাই ফোকাস। ১৯৪০ এর অলিম্পিক।
কিন্তু বিধি বাম। একটা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গ্রেনেড বিষ্পোরনে উড়ে গেল তার ঐ হাত; যে হাতে ছিল অলিম্পিক জেতার স্বপ্ন। হাতের সাথে উড়ে গেল জীবনের সকল স্বপ্ন এবং ফোকাস সব কিছু।
আমরা হলে কি করতাম?
ভাগ্যকে দোষ দিয়ে সরে যেতাম? স্বপ্নগুলো চোখের পানিতে ভিজিয়ে সহানুভূতি আদায় করতাম? তাই নয় কি?
ক্যারোলী তার স্বপ্নে অটুট ছিল। ও সেটাতে ফোকাস করেনি যেটা ওর চলে গেছে। ও ফোকাস করেছে যেটা ওর এখনো আছে। তার বাম হাতটা। যে হাতে সে কোনদিন কলম পর্যন্ত ধরেনি।
হাসপাতাল থেকে ফিরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবার ট্রেনিং শুরু করে দিল।
একটা পঙ্গু হাতের যন্ত্রনা; একটা দুর্বল হাতে ট্রেনিং করার যন্ত্রনা; সব কিছু আবার শুন্য হাতে শুরু করার যন্ত্রনা। কোন কিছুই থামাতে পারেনি তাকে। মাথায় শুধু একটাই ফোকাস এই বাম হাতটাই এখন পৃথিবীর বেস্ট শুটিং হ্যান্ড বানাতে হবে।
ট্রেনিংয়ের এক বছর পর। ১৯৩৯ সাল। হাঙ্গেরীতে ন্যাশনাল পিস্তল শুটিং। বাম হাতে উপস্থিত ক্যারোলী। সবাই ভাবল অন্যদের অনুপ্রেরণা দিতে আসল সে। আসলে তা নয়। সে এসেছে প্রতিযোগীতা করতে।
শুটিং শুরু হল। পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে চ্যাম্পিয়ন হল দ্যা ম্যান অব অনলি হ্যান্ড ক্যারোলী।
কি মনে হয় গল্প শেষ? না! ক্যারোলীর ফোকাস শেষ হবার নয়। চাইলে সে এই এক ইভেন্ট নিয়ে সারা জীবন সেলিব্রেটি হয়ে থাকতে পারত। কিন্তু তার ফোকাস যে ছিল ১৯৪০ এর অলিম্পিক!
বিশ্ব যুদ্ধের কারনে ১৯৪০ এর অলিম্পিক বাদ! কিন্তু বাদ হয়নি ক্যারোলী। ফোকাস এবার ১৯৪৪। কিন্তু এবারও হবে না অলিম্পিক।
এদিকে বয়স বাড়ছে ক্যারোলীর। বয়সের সাথ সাথে এ্যাথলেটদের স্ট্রেন্থ কমতে থাকে। কিন্তু ক্যারোলীর কাছে কোন বাঁধাই বাঁধা নয়।
১৯৪৮ সাল। বিশ্ব অলিম্পিক শুটিং ইভেন্ট। ভাবতে পারেন কে জিতেছিল গোল্ড মেডেল? ইয়েস এন্ড ইয়েস! দ্যা ম্যান ইন অনলি হ্যান্ড ক্যারোলী।
এখানেই শেষ না। ১৯৫২ এর অলিম্পিক কে জিতেছে? সেই ক্যারোলী। সে শুধু গোল্ড মেডেলই জেতেনি। সেই সাথে ১৯৫২ এর অলিম্পিক জিতে কোন এক পার্টিকুলার ইভেন্টে পর পর দুবার গোল্ড মেডেল জেতার ইতিহাস গড়ে দিয়েছিল। যা তার আগে কেউ কখনো করেনি।
হ্যাঁ ! গল্প শেষ।
বলতে পারেন ক্যারোলীর ফোকাসটা কোথায় ছিল?
ক্যারোলীর ফোকাসটা ছিল যা তার আছে; তার যা নেই সেটা নিয়ে সে এক মূহুর্তও ভাবেনি।
আর আমরা যারা আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারিনা তারা ফোকাস কোথায় রাখি? যা আমাদের নেই।
যে কোন ব্যর্থ লোককে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কোন ব্যর্থ?
দেখবেন একটা বিশাল লম্বা ফর্দ আপনাকে ধরিয়ে দিয়ে বলবে আমার এটা ছিল না ওটা ছিল না। তাই আমি ব্যর্থ হয়েছি।
তাই দেখা যায়, ব্যর্থদের ফোকাস থাকে সমস্যার দিকে;
আর সফলদের ফোকাস থাকে সমাধানের দিকে।
এখন দ্রুত ঠিক করুন আপনার ফোকাস কোন দিকে?
পরিশেষে আপনার সন্তানের যত্ন নিন।।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ৯:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


