স্বাধীন দেশে মানুষ তাকে `পাঞ্জাবীর বউ` বলে কটাক্ষ করে, ছেলেকে ডাকে জারজ সন্তান। পেটের দায়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে পণ্য সামগ্রী বিক্রি করে স্বাধীন দেশে প্রতিনিয়ত তিনি এই লাঞ্ছনার মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি প্রভা রাণী মালাকার। খুব বেশি কিছু আশা নেই তার। নিজের সর্বস্ব বিকিয়ে দিয়ে স্বাধীনতার পথে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখা অসাধারণ সাহসী নারী প্রভা রাণী।
তাই হয়তো এর বদলে সম্মান জোটেনি। জুটেছে লাঞ্ছনা আর টিটকারি। এজন্যই তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলে ওঠেন আমি বীরাঙ্গনা, চাই স্বীকৃতি, চাই সামাজিক মর্যাদা।
তিনি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের মির্জানগর গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ সম্বল জমির অধিকাংশ দখল করেছে। এখন অবশিষ্ট অংশটুকুও দখলের পাঁয়তারা করছে।
প্রভা রাণী মালাকার যুদ্ধকালীন নির্যাতনের স্মৃতি হাতড়ে বাংলানিউজকে জানান, সঠিক দিন তারিখ মনে নেই তবে বৈশাখ মাসে তার বিয়ে হয় আর শ্রাবণ মাসে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হলে স্বামী কামিনী রাম মালাকার তাকে রেখে চলে যান ভারতে। প্রভা নিরাপত্তার অভাবে চলে যান বাবার বাড়ি পাশ্ববর্তী গ্রাম বিক্রমকলসে।
তার দেড় মাস পর বিক্রমকলস গ্রামের রাজাকার নজির মিয়া ও জহুর মিয়া একদিন সন্ধ্যায় প্রভা রানীকে তার মায়ের কাছ থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় পার্শ্ববর্তী বাদল মাস্টারের বাড়ি।
ওই রাতে বাদল মাস্টারের বাড়িতে অবস্থান নেয়া সকল পাক সেনা কেড়ে নেয় তার সম্ভ্রম। পরদিন সকালে পাকিস্তানি আর্মিরা তাকে ছেড়ে দিলে তিনি আশ্রয় নেন তার বোনের বাড়ি জাঙ্গালহাটি গ্রামে।
কিন্তু সেখানে ২০/২৫ দিন পর রাজাকার কাদির, রইছ, ইন্তাজ, জহুর পুনরায় পেয়ে যায় প্রভার সন্ধান। একদিন রাজাকারেরা তার বোনের বাড়িতে হানা দেয়। নিজেকে রক্ষার জন্য প্রভা ধানের বীজতলার আলের নিচে আশ্রয় নেন। কিন্তু রাজাকাররা প্রভাকে টেনে-হিঁচড়ে বীজতলা থেকে সোনারার দিঘির পাড় পর্যন্ত নিয়ে যায়।
এক সময় রাজাকারেরা প্রভা রাণীকে শমশেরনগর ডাক বাংলোর সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে সারারাত পাকিস্তানি সেনারা পর্যায়ক্রমে পাশবিক নির্যাতন করে তাকে। ভোর রাতে পাক সেনাদের ক্যাম্প থেকে আবারও পালিয়ে বোনের বাড়ি ফিরে আসেন।
প্রভা রাণী জানান, যুদ্ধ শেষে তার স্বামী ভারত থেকে এসে তাকে গ্রহণ করেন। স্বামীর কাছে সবকিছু খুলে বলার পর স্বামী বলেন, তোমার মতো দুই লক্ষ নারী ইজ্জত দিয়েছে দেশের জন্য। তুমিও তাদের একজন। আমার কোন দুঃখ নেই।
১৯৭২ সালের শেষদিকে ছেলে কাজল মালাকারের জন্ম হয়। ছেলেটি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। সে রিক্সা চালায়। ছেলেকে মানুষ ডাকে `জারজ` আর প্রভাকে ডাকে `পাঞ্জাবির বউ` বলে। শুধু তাই নয়, বাড়ির আশেপাশের নিজ ধর্ম ও বর্ণের লোকজন অশ্লীল ভাষায় মা-ছেলেকে কটুক্তি করে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রভার উপর পাশবিক নির্যাতনকারী নজির, ইন্তাজ, ইদ্রিছ ও রইছ রাজাকার জেল খেটেছে। তবে কারাগার থেকে বের হয়ে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরের মৃত ইদ্রিছ রাজাকার প্রভার স্বামীর উপর মিথ্যা মামলা দিয়ে তার স্বামীকে কারাগারে পাঠিয়েছিল। তার কয়েক বছর পর প্রভার স্বামী মারা যায়।
স্বামী মারা যাওয়ার পর দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য প্রভা রাণী বেছে নেন ফেরি করার কাজ। নিজের মাথার উপর টুকরি (ঝাঁপি) রেখে গ্রামে গ্রামে তিনি বিক্রি করেন বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী।
বর্তমানে নয় সদস্য বিশিষ্ট পরিবারে একবার খেলে আরেকবার না খেয়ে থাকতে হয় তাদের। পাশাপাশি বসত বাড়ির জায়গা জমি নিয়ে মানিক মালাকার, করুন মালাকার, কৃপেশ মালাকার ও নিতাই মালাকারের সঙ্গে চলছে দ্বন্দ্ব। টাকা পয়সা না থাকায় ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে শংকা তার।
সাংবাদিকদের কাছে তিনি প্রশ্ন করেন, দেশের জন্য সম্ভ্রম দিলাম, রাজাকারদের মামলায় জড়িয়ে কারাভোগ করে স্বামী মারা গেলেন। তবে আমি কেন বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাবনা, পাব না সামাজিক মর্যাদা?
Click This Link
আলোচিত ব্লগ
মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন
ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন
কবিতাঃ পাখির জগত

টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।
টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।
বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মোহভঙ্গ!

পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।