ঘটনার পর সাভার থানায় ডাকাতির মামলা দায়ের করতে গিয়ে মামলার বাদী বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বলেছিলেন, ৬-৭টি মসজিদ থেকে ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু পুলিশ তথ্য পেয়েছে, ৬-৭টি নয় মাত্র একটি মসজিদ থেকেই এই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ওই মসজিদটি হচ্ছে বড়দেশী গ্রামের পূর্বপাড়া জামে মসজিদ। ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার পর মসজিদে ডাকাত পড়েছে বলে ঘোষণা দেয়াতে যান ডাকাতি মামলার বাদী আবদুল মালেকের ভাই আবদুর রশিদ। তিনি মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুল কাদেরকে জোর করে ঘোষণা দেয়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মুয়াজ্জিন এতে রাজি হননি। মুয়াজ্জিন বলেন, মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূর হাবিবের অনুমতি ছাড়া ঘোষণা দেয়া যাবে না। পরে নূর হাবিবের বাড়িতে গিয়ে ডাকাত পড়েছে মর্মে ঘোষণা দেয়ার জন্য বলেন রশিদ । কিন্তু তিনি অনুমতি দেননি। পরে রশিদ জোর করে মুয়াজ্জিনকে দিয়ে ডাকাত পড়েছে বলে ঘোষণা দেয়ান। গতকাল মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূর হাবিব পুলিশকে এসব তথ্য দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মসজিদে ঘোষণা দেয়ার পর কয়েক শ’ গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে কেবলার চরে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা আল-আমিন ছাড়া জীবিত কাউকে দেখতে পায়নি। সাভার থানার ওসি জানিয়েছেন, পূর্বপাড়া মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুল কাদেরকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মামলা দায়েরের পর থেকে ডাকাতি মামলার বাদী শাহাদাত এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুল মালেক পলাতক। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার থানার ওসি (তদন্ত) মতিয়ার রহমান মিয়া জানিয়েছেন, মালেককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। ওদিকে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা তদন্তে গঠিত ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি আজ থেকে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। কমিটির প্রধান পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) আমির উদ্দীন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, আজ ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আল আমিনের সঙ্গে তদন্ত কমিটির সদস্যরা কথা বলবে। এরপর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বড়দেশী গ্রামের বেশ কিছু লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে দু’জনকে গ্রেপ্তারের পর সাভার মডেল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, এখন মনে হচ্ছে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ডাকাতির নাটক সাজানো হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ৬ ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেই ঘাতকরা ক্ষান্ত হয়নি- মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও কয়েকজনের অঙ্গহানি ঘটানো হয়েছিল। কয়েকজনের পুরুষাঙ্গ কেটে দেয়া হয়েছিল। এদিকে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা। তারা ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে দোষীদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। এছাড়া পৈশাচিক এ ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে মানববন্ধন করেছে এ ঘটনায় নিহত তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী টিপু সুলতানের সহপাঠীরা। গতকাল ফার্মগেট থেকে ইন্দিরা রোড পর্যন্ত দীর্ঘ মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা হাতে হাত ধরে ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। এ সময় তারা বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুন বহন করে। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডে যারা নিহত হয়েছেন তারা হলেন- ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ও লেভেলের শিক্ষার্থী শামস রহিম ওরফে সাম্মাম (১৮), মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের হিসাব বিজ্ঞানের ছাত্র ইব্রাহিম খলিল (২১), পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী তৌহিদুর রহমান পলাশ (২০), তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী টিপু সুলতান (২০), তারবিয়াতুল মিল্লাত একাডেমীর দাখিল উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী কান্ত। এ ঘটনায় দু’টি মামলা হয়েছে। একটি ডাকাতি মামলা অন্যটি হত্যা মামলা।
গণপিটুনি: জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার ২, মামলা সিআইডিতে
সাভারের আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে ৬ কলেজ ছাত্রকে হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল ভোরে আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা আজ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাবেন। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে- বড়দেশী পশ্চিমপাড়া এলাকার ছানোয়ার হোসেন (২৯) ও মো. সেলিম (২৬)। রোববার রাতে আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকার কেবলার চরে কথিত ডাকাত সন্দেহে এলাকাবাসী ৭ ছাত্রকে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই ইব্রাহিম খলিল (২৪), শহিদুর রহমান পলাশ (২৬), কামরুজ্জামান কান্ত (২৪), টিপু সুলতান (২৩), শামস রহিম শাম্মাম (২২) ও মনির হোসেন (২৫) নিহত হয়। আহত হয় আল-আমিন নামের আরও এক যুবক। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে ৫০০-৬০০ এলাকাবাসীকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এছাড়া ডাকাতির ঘটনা উল্লেখ করে শাহাদাৎ এন্টারপ্রাইজের মালিক স্থানীয় আবদুল মালেক বাদী হয়ে আহত-নিহতসহ অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জনকে আসামি করে একটি ডাকাতির মামলা দায়ের করেছেন। দু’টি মামলারই তদন্তকারী কর্মকর্তা সাভার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মতিয়ার রহমান। তিনি গতকাল সকালে জানান, ভোর রাত ৪টা থেকে আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকায় চিরুনি অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য অংশ নেয়। তিনি জানান, অভিযানের সময় এলাকা ছিল পুরুষশূন্য। তিনি বলেন, তবে সবাইকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হচ্ছে না। বড়দেশী এলাকায় বেছে বেছে পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী অর্ধ শতাধিক অপরাধীর তালিকা করা হয়েছে। সে তালিকা অনুযায়ী ভোরে ওই দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। থানাহাজতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পুলিশের দায়েরকৃত ওই হত্যা মামলায় দু’জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মতিয়ার রহমান জানান, হত্যা মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করবেন এবং মামলার দায়িত্ব বুঝে নেবেন। তবে ডাকাতির মামলাটিও সিআইডিতে হস্তান্তর করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডাকাতি মামলার বিষয়ে এখন অর্ডার পাইনি। ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, সিআইডির তদন্ত দল আজ সকাল ১০টায় ঘটনাস্থল বড়দেশী কেবলারচর পরিদর্শন করবেন। এবং তদন্তের দায়িত্ব বুঝে নিবেন। এদিকে গ্রেপ্তারকৃত ছানোয়ার হোসেন জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকায় চা-পানের দোকান রয়েছে। সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে দোকান খুলতে এলে পুলিশ গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। সে জানায়, ঘটনার রাতে আমি বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলাম। মাইকে ডাকাতির ঘটনা শুনেছি। তবে আমি ঘর থেকে বের হইনি। মো. সেলিম জানায়, আমি সাটুরিয়া-বালিয়া রোডের জনসেবা বাসের চালক। হঠাৎ ভোর রাতে পুলিশ বড়দেশী এলাকার বাড়ি থেকে আমাকে গ্রেপ্তার করে। সে-ও ওই রাতে ঘটনাস্থলে যায়নি বলে জানায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


