২০০৯ সালে হলিউডে মুক্তি পায় র্যামপেজ নামের একটি চলচ্চিত্র। তাতে দেখা গেছেÑ বিল নামের নিঃসঙ্গ ও শান্তশিষ্ট এক যুবকের দিন কাটছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু বিশ্বের যাবতীয় অন্যায় অবিচার ও আশপাশের স্বার্থান্বেষী লোকগুলোকে দেখে ভেতরে ভেতরে রোষ জমে ওঠে তার। একদিন হুট করে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে শহরের বাসিন্দাদের ওপর হামলা করে বসে বিল। নির্বিচারে মারতে থাকে সবাইকে। শেষে আবার ইউটিউবে সরল স্বীকারোক্তি প্রকাশ করে। নরওয়েতে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির মূলহোতা অ্যান্ডার্স বেরিং ব্রেইভিকের সঙ্গে বিলের মিল যেন শতভাগ। সিনেমাটা দেখে ব্রেইভিক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কিনা তা জানা যায়নি, তবে বিকারগ্রস্ত বিলের মতো ব্রেইভিকও বললেন, তিনি যা করেছেন তার নাকি ‘দরকার’ ছিল। তবে ডানপন্থী উগ্রবাদী ব্রেইভিক স্বীকারও করেছেন যে তার কাজটা ছিল বর্বরোচিত। সোয়াট টিমের কাছে আত্মসমর্পণের আগে হাতের দুটো অস্ত্র দিয়ে টানা দেড় ঘণ্টা এলোপাতাড়ি গুলি চালান তিনি। মারা যায় ৮৬টি তরতাজা প্রাণ। বিবিসি, ডেইলি মেইল, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, টেলিগ্রাফ ও রয়টার্স
গ্রেপ্তারের পর আইনজীবীর মাধ্যমে দেয়া প্রথম বক্তব্যে ৩২ বছর বয়সী ব্রেইভিক এ প্রতিক্রিয়া জানান। এসময় তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করে। আজ তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে।
ব্রেইভিকের আইনজীবী গিয়ার লিপ্পেস্টাড স্বায়ত্বশাসিত টিভি টু-কে শনিবার বিকেলে বলেন, ব্রেইভিক বিপ্লব করার কথা জানিয়েছেন। আর সেই ‘বিপ্লব’-এর পরিণতি কী? রোববার সকালে মোমবাতি জ্বালিয়ে অসলোর প্রধান গির্জার কাছে জড়ো হওয়া শতাধিক মানুষের অশ্র“ই দেবে এর উত্তর। আর দেশটির পুলিশ প্রধান সেভেইয়াং স্পনহেইমের কাছ থেকে জানা গেল, নরওয়ের আইন অনুযায়ী ব্রেইভিকের শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ ২১ বছরের কারাদণ্ড।
গতকাল নিহতদের কথা স্মরণ করে পুরো নরওয়ে কাঁদল। কাঁদলেন রাজা, রানী আর প্রধানমন্ত্রীও। অসলোর একটি গির্জায় উপস্থিত হন তারা সবাই। প্রধানমন্ত্রী জেন্স স্টলটেনবার্গ বলেছেন, আক্রমণের পর থেকে দুটো দিন মনে হয়েছে অনন্তকাল। প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মিনিট ছিল শোকের। নিহতদের পরিবারের উদ্দেশে বললেন, আমরা সবাই আপনাদের পাশে আছি। এটা কারও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ট্রাজেডি।
ডেইলি মেইলের খবরে জানা গেল, যুক্তরাজ্যের ডানপন্থি কিছু গ্র“পের সঙ্গে বেশ ভালো যোগসাজস ছিল ব্রেইভিকের। ইংলিশ ডিফেন্স লিগের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। এছাড়া সানডে টেলিগ্রাফের মতে, স্টপ দ্য ইসলামিফিকেশন অব ইউরোপ নামের আরেকটি ডানপন্থি গ্র“পের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন ব্রেইভিক।
এখন ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট, ইউটিউব পোস্টিং ও ব্লগের লেখালেখি থেকে উগ্রবাদী ব্রেইভিকের মগজে কী খেলা করত সে সম্পর্কে ধারণা নেয়ার চেষ্টা করছে নরওয়ের গোয়েন্দা-পুলিশ ও মিডিয়া। ইন্টারনেটে পাওয়া গেছে ব্রেইভিকের লেখা ১৫শ পৃষ্ঠার একটি নথি। তাতে জানা গেল ২০০৯ সাল থেকেই নরওয়েতে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
মধ্যযুগে ফিলিস্তিনের খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করতে গঠন করা হয় বিশেষ বাহিনী ‘নাইট টেম্পলার’। ব্রেইভিক নিজেকে ওই দলেরই সদস্য মনে করেন। আর তাই শনিবার ইউটিউবে ‘নাইট টেম্পলার ২০৮৩’ নামের একটি ভিডিও আপলোড করেন তিনি। ভিডিওর ছবিগুলোতে তাকে নেভি সিলদের মতো স্কুবা ডাইভিংয়ের পোশাক পরা অবস্থায় একটি স্বংয়ক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে থাকতে দেখা গেছে। ক্যাপশনে লেখা, ধর্মযুদ্ধ শুরুর আগে অবশ্যই মার্কসবাদীদের নির্মূল করতে হবে।
নথিতে ব্রেইভিক লেখেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচে বড় নাৎসি হিসেবে আমাকেই বিবেচনা করা হবে।’ তাতে পরিকল্পিত হত্যা অভিযানের সম্ভাব্য বর্ণনাও দিয়েছেন তিনি। নথিতে আরো দেখা গেছে ইসলাম ধর্মের প্রসার থামাতে ধর্মযুদ্ধ শুরু করতেও আগ্রহী ব্রেইভিক। নিজের সম্পর্কেও খুঁটিনাটি অনেক কিছু লিখেছেন। ছয় ফুট লম্বা ব্রেইভিং পছন্দ করেন আগ্নেয়াস্ত্র, ভারোত্তলন আর শিকার করতে। তবে এক সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির মিশে যাওয়া কিছুতেই সহ্য করেন না। মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন মার্কসবাদ ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে। নরওয়ের উদারমনা সংস্কৃতিরও কট্টরবিরোধী ব্রেইভিক। তবে ইন্টারনেটে লেখালেখি ও ভিডিও আপলোড করা ছিল পছন্দের কাজ। টুইটারে এক বার্তায় লিখেছিলেন, ‘একজন মানুষের বিশ্বাস এক লাখ মানুষের স্বার্থের সমান’। বাকি সব ওয়েব পোস্টিংগুলোতেও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও অভিবাসীদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণার প্রকাশ ঘটেছে। একটি ব্লগে লিখেছেন, সোমালিয়ার অভিবাসীরা নরওয়ের পাসপোর্ট ব্যবহার করছে। তারা এখান থেকে সুযোগসুবিধা নিচ্ছে, এমনকি তাদের মুসলমান আত্মীয়দের কাছে এ দেশের টাকাও পাঠাচ্ছে।
নথির শেষে অ্যান্ড্রু বারউইক নামে স্বাক্ষর করলেও নিজের পুরো নামটাও লিখেছেন। বলেছেন, ‘আমার নাম অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক। ভাইকিং যুগের আগে ব্রেইভিক শব্দের ব্যবহার ছিল। বেহরিং প্রাক-খ্রিস্টান যুগে ব্যবহƒত হত। এটা জার্মান শব্দ। বের থেকে বেহরিং-এর উৎপত্তি। আর জার্মানির বিয়ার থেকে বের শব্দটি এসেছে। অ্যান্ডার্স স্ক্যান্ডিনেভিয়ান শব্দ এবং তা অ্যান্ড্রুর সমার্থক।’
২০ পেরোতেই কট্টর ডানপন্থীদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন ব্রেইভিক। তবে নরওয়ের পরিচিত উগ্র ডানপন্থী কোনও সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। লেবার পার্টির এক পুলিশ কর্মকর্তা বার্তাসংস্থাকে বলেন, এই বন্দুকধারীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের তথ্যও নেই।
অন্যদিকে, শুক্রবার উটোইয়া দ্বীপের হত্যাকাণ্ড ও প্রধানমন্ত্রী ভবনে বোমাহামলায় ব্রেইভিকের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কিনা তা খুঁজে বের করতে রোববার অভিযান শুরু করেছে নরওয়ের পুলিশ। শনিবার পুলিশ প্রধান স্পনহেইম বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত নই যে ঘটনার জন্য দায়ী শুধু একজন। আমরা মনে করি তাদের সংখ্যা আরো বেশি।’ পুলিশ প্রধান আরো বললেন, ‘ব্রেইভিক একা এত বড় নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত, এটা এই মুহূর্তে বলা খুব কঠিন, তাকে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সব প্রশ্নেরই সোজাসাপ্টা উত্তর দিচ্ছে ব্রেইভিক।’
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


