জজ মিয়ার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের বীরকট গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে গুলিস্তান ও মতিঝিলে ফলের দোকান করে আসছিলেন তিনি। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। কিন্তু নিজের দোষ কী সেটাই জানা ছিল না জজ মিয়ার। থানা পুলিশ তলব করেছে- গ্রাম পুলিশের এমন কথার প্রেক্ষিতেই সরল মনে থানায় যান তিনি। কিন্তু থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা পাঠিয়ে দেয়। সিআইডির হাতে আসার পরপরই শারীরিকভাবে নির্যাতন শুরু হয় তার ওপর। সিআইডির এসপি আবদুর রশিদ তাকে চোখ বেঁধে পিটিয়ে কাবু করে ফেলেন। এরপর কথামতো চলার জন্য আর যা যা করার সবই করেন। শিখিয়ে দেয়া কথা না বললে তাকে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে। এজন্য তার চোখ বেঁধে মাঝে মধ্যেই রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। কথামতো সব কাজে রাজি হন জজ মিয়া। তিনি ‘এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত’ মর্মে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেন। পুলিশ তার বক্তব্য রেকর্ড ও ভিডিও করে। আর তার মায়ের হাতে প্রতিমাসে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা সিআইডির তরফ থেকে দেয়া শুরু হয়। এরপর উভয় সঙ্কটে পড়েন তিনি। জজ মিয়া বলেন, সিআইডি থেকে তাকে কিছু লোকের ছবি ও শিখিয়ে দেয়া কিছু লোকের নাম বলতে বলা হয়। বলা হয়, এভাবে বললে তারা জড়িয়ে যাবে আর জামিনে মুক্ত হবেন তিনি। কিন্তু বাইরের অভিযুক্ত প্রভাবশালীরা তাকে মেরে ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা দেখিয়ে তাকে বিদেশ পাঠানোরও প্রলোভন দেখায় সিআইডি। তিনি বুঝতে পারেন- এ স্বীকারোক্তি কোর্টে দিলে নিশ্চিত ফাঁসি আর না দিলে ক্রসফায়ার। তাকে মাঝে মাঝে রাখা হয় কনডেম সেলে। প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর আতঙ্ক নিয়ে চলতে থাকে তার জেলজীবন।
ভাগ্যগুণে আসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নতুন করে শুরু হয় ওই মামলার তদন্ত। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। ধরা পড়েন সরকারের দায়িত্বে থাকা রুই-কাতলা আমলা-মন্ত্রীরা। কাশিমপুর কারাগারে থাকাকালে তাদের সঙ্গে জজ মিয়ার নিয়মিত দেখা-সাক্ষাতও হতো। কেবল সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ছাড়া আর সবাই কথা বলেছেন তার সঙ্গে। অনেকেই তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, জেল থেকে ছাড়া পেলে তারা তাকে দেখবেন। কিন্তু এখন আর জজ মিয়ার ব্যাপারে কোন আগ্রহই নেই তাদের।
জজ মিয়া জেল থেকে মুক্তি পেলেও আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাননি। তার ওপর জীবনযুদ্ধের জেলখানা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। তৎকালীন সরকার আর পুলিশ প্রশাসনের আষাঢ়ে গল্পের নায়ক হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তার সব স্বপ্ন। জেল থেকে বেরোনোর পর সহায়সম্বলহীন জজ মিয়া মা, ছোটভাই আর বোনকে নিয়ে গাজীপুরে ভাড়া থাকতে শুরু করেন। শুরু করেন মাছের ব্যবসা। লোকজন জেনে যায়, এ সেই কলঙ্কিত জজ মিয়া। অসহযোগিতা আর কটাক্ষদৃষ্টির বিষবাণে এলাকা ছাড়তে হয় তাকে। অনেক জায়গায় নিজের যোগ্যতায় কাজ পেয়েছেন। কিন্তু সবখানে নিজের পরিচয়টাই তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকরি আর থাকেনি। সন্ত্রাসী-জঙ্গি বলে বের করে দেয়া হয়েছে তাকে। উপায়ন্তর না দেখে নাম-পরিচয় গোপন করেন। অন্য পরিচয়ে শিখেন ড্রাইভিং। এ পরিচয়েই এখন নারায়ণগঞ্জে একটি কোম্পানিতে গাড়ি চালিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে দিন চলছে তার।
জজ মিয়া জানান, গ্রামে তাদের সাত কাঠা জমি ছিল। মামলার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে তাও পানির দামে বিক্রি করে দিতে হয়েছে। এখন ঢাকায় উদ্বাস্তুর মতো ভাড়া থাকেন। জজ মিয়া বলেন, বাড়ি নেই ঘর নেই। বোনটাকেও এ কারণে বিয়ে দিতে পারছি না। যে কারণে আজকের এ করুণদশা- সেটাও কাউকে বলতে পারি না। সেটা জানলে এ শহরে হয়তো তাদের থাকাই হবে না। পরিচয়টাই আমার বড় শত্রু। তাই আমি এ নামের আড়ালে থাকতে চাই। জজ মিয়ার বয়স এখন আটাশ ছাড়িয়েছে। কিন্তু সুখ স্বপ্নের সংসার বাঁধতে পারেননি এখনও। জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন কিনা সেটাও এখন অনিশ্চিত। তাকে যে কোন সময় মেরে ফেলাও হতে পারে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।
জজ মিয়ার মা জোবেদা বেগম বলেন, তার আসল নাম জালাল আহমেদ। এক কোম্পানির মালিকের ছেলে জজ ছিল। ওই ছেলেকে সবাই জজ সাহেব বলে ডাকত। ছেলে বড় হলে ‘জজ-ব্যারিস্টার’ হবে বুকভরা এমন আশা নিয়েই জালালকে আমরা জজ মিয়া বলে ডাকতাম। কিন্তু পড়ালেখা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন তার পূরণ হয়নি। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েই নেমে পড়েন কর্মের সন্ধানে। কিন্তু ভাগ্যদোষে দেখেন শত শত জজ-ব্যারিস্টার আর দেশের উচ্চ কর্মকর্তাদের। সে ভাগ্য তাকে আজ উদ্বাস্তু করেছে। সু-স্বপ্নের ঘরে দুঃস্বপ্নের বাসা বেঁধেছে। মানুষের কাছে তাকে আতঙ্ক করে তুলেছে। কিন্তু সমাজের মানুষ কি জজ মিয়াকে সত্যিকারের জজ মিয়া হয়ে বাঁচতে দিবে না? তার কি সংসার বাঁধা হবে না? তাকে কি সত্যি সত্যিই বাবা-মায়ের দেয়া নামটাকে ঘৃণাভরে পরিবর্তন করে বাকিটা জীবন চলতে হবে?
সোর্স ঃ Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


