somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আঁধারের অরুন্ধতি-২ ( নীল বৃত্তান্ত )

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ দুপুর ২:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

- আপনি আমাকে কেন বিয়ে করেছেন ?
নববধুর মুখে এই প্রশ্ন শুনে উঠে বসেছিলাম আমি । অনুফার সাথে বিয়ে হয়েছে সবে । প্রথম রাতে নববধুর প্রশ্নে বিব্রত বোধ করেছিলাম । অকারণেই গলা খাঁকারি দিয়ে অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করতে লাগলাম তাই । পাশে হাঁটু মুড়ে বসে আছে অনুফা । ভাসা ভাসা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে অনুফা । বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না । চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম-
- বড় চাচার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা আমার নাই । আমি ছোটবেলা থেকে তার কাছে মানুষ । তার প্রতিটা কথা আমার কাছে আদেশের মতো ।
- আমার সব কথা শোনার পরও আপনার বড় চাচার কথা মেনে নিতে আপত্তি হয়নি ?
- শুয়ে পড়ো অনুফা । সারাদিনে ম্যালা ধকল গিয়েছে তোমার উপর দিয়ে । এসব নিয়ে পরে কথা বলব ।
বলেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম । খাটে নাড়াচাড়া অনুভব করলাম । বুঝলাম জবরজং বিয়ের পোষাকেই শুয়ে পড়েছে অনুফা । ঘুম আসে না আমার । ঘুমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম,অবশিষ্ট ঘুমটুকুও ফাঁকি দিয়ে চোখ থেকে বিদায় নিয়েছে । পুরো রাত অনুফার সাথে দেখা হওয়ার দিনটির কথা ভাবতে ভাবতে ভাবতে কেটে গেলো ।

কয়েকদিনের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলাম । রুপপূর কলেজে ডিগ্রীর ছাত্র ছিলাম তখন । অনেক লম্বা ছুটি পড়েছিলো কেন জানি । কলেজ বন্ধ পড়ে যাওয়ায় বেড়াতে যাই গ্রামের বাড়ি রাজাপুরে ।
সেদিন জুম্মাবার ছিলো । সৈয়্যদ আজহার মুন্সী,আমার বড়চাচা আমাকে বৈঠকে ডেকে নিয়ে গেলেন । আচমকা বলে উঠলেন, “তোকে বিয়েশাদী দিব ভাবছি । নবীজির সুন্নত,একসময় না একসময় পালন করতেই হতো । চাকরী-বাকরী যদিও কিছু করিস না,তাতে অসুবিধা হওয়ার কথা না । আমার কাছে থাকিস । যা আছে চাচা-ভাতিজার বেশ চলে যায় । আরো দুইতিনজন মানুষ অতিরিক্তও খাওয়ানো যাবে ।"

আমি চাচার দিকে অবাক হয়ে তাকাতেই,চাচা বলে উঠলেন, " তাই বলে আবার ভাবিস না দুই বিয়ে করার পারমিশন পেয়ে গেছিস । হা হা...”

মাথা নিচু করে শুনতে লাগলাম চাচার কথা । হঠাৎ বিয়ের প্রসঙ্গে চমকে উঠলেও ততক্ষণাৎ কিছু বলিনি আমি । চাচা পুরোনো আমলের বিএ পাশ মানুষ । এখনো তার সাথে কথা বলে পেরে ওঠে এমন মানুষ আশেপাশের দশগ্রামে নেই । তাছাড়া, চাচার জন্য সবসময় প্রচন্ড ভক্তি কাজ করত । বাবার মৃত্যুর পর, নিজের ছেলের মত মানুষ করেছেন আমাকে । চাচা কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না,এই বিশ্বাসটুকুন ছিলো । বড়চাচা বলে যেতে লাগলেন-

“মেয়ে আমি পছন্দ করে ফেলেছি । তোর থেকে বছরখানিকের ছোট কেবল । তোরও অবশ্য বয়স কম,পড়ালেখা শেষ করিসনি । এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে না করলে চলত । পুরুষ মানুষের জন্য বয়স ব্যাপার না । পুরুষ মানুষ ১৮ তে যা ৮৮ তেও তা । হা হা ...”

হাসতে হাসতেই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন । ভালো করে বড় চাচার দিকে তাকালাম । তার হঠাৎ এই পরিবর্তন লক্ষ্যনীয় । বুঝতে পারলাম,কোথাও কোন গড়মিল আছে ।

“মেয়ের একটা সমস্যা আছে । তার একটা বাচ্চা মারা গেছে মাসখানেক আগে । বিয়ে হয়নি এখনো । ভাইয়ের কাছে মানুষ । মেয়ে অসম্ভব সুন্দরী । ভুল করে ফেলেছে একটা । বয়সের দোষ আর কি । এখন ভাইয়েরা মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়ে গেছে । আমি অবশ্যি এদের খুব পছন্দ করি । এদের বাবা আমার সাথে যুদ্ধ করেছে । বাবা-মা ছাড়া মেয়েটাকে কেমনে এই দূর্দিনে একলা ছেড়ে দেই ? তুই মানা করিস না,বাবা । মেয়ে জাতি বড়ই আজব । এরা ভালোবাসার কাঙ্গাল । তা পেলেই পায়ের কাছে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে আপত্তি করে না । ”
এতো লম্বা কথার পর দম নিতে থামলেন মুন্সী সাহেব ।
আমার দিকে তাকাতেই, বললাম, “আপনি যা ভালো বোঝেন চাচাজান ।”
আসলে ওই মূহুর্তে আর কিছু বলতেও পারিনি । চাচার সামনে কোন কথা গুছিয়ে চিন্তা করতে পারতাম না ।
আমার কথা শুনে মুখের হাসি বিস্তৃত হয় তার । তৃপ্তির সাথে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ”

যোহরের নামাজের পর তিনি প্রায় বগলদাবা করে আমাকে নিয়ে মেয়ে দেখতে গেলেন ।

গ্রামের বাড়ির সাজসজ্জা বিহীন তবে পরিপাটি বৈঠক । ঘরের একদিকে চারটি কাঠের চেয়ারের বিপরীতে রাখা খাটের বসে আছে ছিলাম । মাথার উপর নড়বড়ে ভাবে আওয়াজ তুলে ফ্যান ঘুরছে । ফ্যানের নিচে বসেও শার্ট ভিজে জবজব । কেমন থমথমে পরিবেশ । চাচা একলাই কথা বলে যাচ্ছেন পরিবেশ হালকা করার জন্য । মেয়ের বড় ভাই বসে আছেন,পাশেই । দেখে মনে হলো খুব মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন । কথাবার্তার এক পর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন আরেকজন মহিলা,পরে জেনেছিলাম,তিনি মেয়ের ভাবী হন সম্পর্কে ।

আমি কিছুটা অবাক হয়েই তাকিয়ে ছিলাম । এতো সুন্দর মানুষ হয় ! আড়চোখে তাকাতেই দেখলাম,তিরতির করে মেয়ের আঙ্গুল কাঁপছে । এতো ভয় পাচ্ছে কেন মেয়েটা ?

আমার সামনেই বিয়ের দিন-তারিখ ধার্য হলো । কথার এক পর্যায়ে মেয়ের বড় ভাই,বড় চাচাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন । মেয়ের দিকে তাকালাম,দেখলাম দুফোটা মুক্তো গড়িয়ে পড়েছে তার চোখ দিয়েও ।

৯ জানুয়ারী বিয়ের দিন ধার্য হলো । তেমন কোন জাঁকজমক ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন হলো আমাদের ।

খুব অবাক লাগছিলো । কত দ্রুতই না মেয়েটিকে অধিকার করে নিলাম । অথচ গুছিয়ে রাখা প্রশ্ন গুলো কিছুই করা হলো না । নতুন জীবন টা শুরুর আগে ভেবেছিলাম,অনুফাকে তার মনের সব রাগ,ক্ষোভ,দুঃখ সব ঝেড়ে ফেলার সুযোগ দিব । কিন্তু,জীবনে মনে হয় এমন সময় বহুবার আসে যখন অনেক কিছু বলার থাকলেও বলা হয় না ঠিক ।

বিয়ে হয়ে গেলেও দূরত্বটা কেন জানি হাইফেন হয়ে ঝুলে রইলো,আমাদের মাঝে । খালি বাড়িতে অনুফার সঙ্গী হলো ১০ বছরের আফিফা । চাচা বয়সের ভারে ধীরে ধীরে কাবু হয়ে পড়ছিলেন । নামাজ আর বিশ্রাম ছাড়া অনুফার সাথে কোনরকম কথাবার্তায় অংশ নিতেন না তিনি । অনুফা ও ঘরের কাজ সেরে নিজের ঘরে এসে বসে থাকতো । প্রায় দিন রুমে আসলে দেখতাম অনুফা আর আফিফা লুডু খেলায় মেতে আছে । মেয়েটাকে পড়ালেখা শেখাতো অনুফা । আর বাকী সময়টুকু নীল রঙ্গের একটা ডায়েরীতে গুটুর গুটুর কি যেন লিখতো । খুব দেখতে ইচ্ছা হতো,এতো কি লেখে মেয়েটা ?

একই ঘরে থেকেও আমাদের কথাবার্তা কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো । এক মাস কেটে গেলো চোখের পলকেই । আমাদের ভিতরকার দূরত্বও কেটে যাচ্ছিলো ক্রমশই । কিন্তু,শহরে ফিরে যেতে হতো,তাই অনুফাকে ফেলে এলাম । শেষ বর্ষ এর পরীক্ষাও এসে পড়েছে । পুরোদমে তারই প্রস্তুতি চলছিলো ।

শহরে পৌঁছানোর পাঁচদিনের মাথায় অনুফার চিঠি পেলাম । খুব অবাক হয়েছিলাম । চিঠি আদান-প্রদান করার মতো এতোটা হৃদ্যতা তখনও ছিলো না আমাদের মাঝে । আরো অবাক হলাম,যখন দেখলাম চিঠি তে কিছুই লেখা নেই । প্রথমে একে ঠাট্টার একটা অংশ বলে ধরে নিয়েছিলাম । কয়েকদিন যেতে না যেতেই আবার চিঠি পেলাম । আবার সেই খালি চিঠি । এবার খুব মজা পেয়ে গেলাম । আমি ও তাই খালি কাগজ খামে ভরে চিঠি দিতে থাকলাম অনুফাকে । অনুফার একটা খালি চিঠি পাওয়ার সাথে সাথেই আমি আরেকটা পাঠিয়ে দিতাম ।

বাড়িতে ফেরার দিন ঘনিয়ে এলো । আমি অনুফার কাছে ফিরে যাচ্ছি ভেবেই শিহরণ অনুভব করলাম । কিন্তু,ফিরে গিয়েই চমকে উঠলাম । একি ! আমি তো এই অনুফাকে রেখে যাই নি । মাসখানিকের ব্যাবধানে কি হয়ে গেলো ? শুকনো জিরিজিরে দেহ নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে অনুফা । চোখের নিচে কালো রেখা কেমন বিষাদের ছায়া ফেলে রেখেছে চেহারায় । বড় চাচা আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, “আরো আগেই তোকে জানাতে চেয়েছিলাম । বউমা জানাতে দেয়নি ।”
আমি নির্লিপ্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে অনুফার ?”
চাচা বললেন, “বিধান বাবু বলেছিলেন হাড়ের ব্যারাম হয়েছে । আমি উপসদরে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখালাম,তারাও একই কথা জানালেন । বউমা মনে হয় বেশিদিন বাঁচবে না রে ।”

আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম । চাচার চোখের পানি আমার উপর কোন প্রভাব ফেলল না । আমি গিয়ে অনুফার মাথার কাছে বসতেই অনুফা চোখ মেলে তাকিয়ে ছোট্ট করে একটু হাসলো । আমি মাথায় হাত রাখতেই,জমে থাকা জল বালিশে গড়ালো । ইশারায় কিছু যেন বলতে চাইলো । আমি মাথার কাছে মুখ নামাতেই ক্ষীন স্বরে বলে উঠল, “আমাকে মাফ করবেন তো?”
আমার মাথার ভিতর কি যেন ঝড় বয়ে গেলো । আমি হাহাকার করে বলে উঠলাম, “তুমি ভয় পেয়ো না । তোমার কিছু হবে না ।”
আমি ওর মুখে হাসির রেখা দেখতে পেলাম । কিছুটা ছোট বাচ্চার কথা শুনে বড়দের প্রশ্রয় মাখা হাসিটার মতো মনে হলো ।

আমি নাওয়া খাওয়া ছেড়ে সারাদিন অনুফার কাছে বসে থাকতে লাগলাম । মাঝে মাঝে প্রলাপ বকলে, “নীলন্তি” নাম টা শুনতে পেতাম । তখন এই “নীলন্তি”র খোঁজ বের করার মতো অবস্থা ছিলো না । কিছু সময় যখন ভালো থাকতো,সেই নীল ডায়েরীতে খুব কষ্টে কি যেন লিখার চেষ্টা করতো ।

নয়তো আফিফা পাশে বসে ছড়াগানের মতো কি যেন বলতো । অনুফা তা ই মনোযোগ দিয়ে শুনতো ।

এইভাবে আরো কয়েকটা দিন যেতেই সেই ভয়ানক মূহুর্ত টা সামনে দাঁড়িয়ে গেলো । আমি চোখের সামনে অনুফার মৃত্যু দেখলাম । এতো ভয়ঙ্কর মানুষের মৃত্যু !! এতো ভয়ঙ্কর !!

দিশেহারা হয়ে গেলাম । অনুফার মৃত্যুর পর আফিফাও চলে যায় । রাতে আমার ঘুম আসতো না । প্রতিরাতেই লুডুর আওয়াজ শুনতে পেতাম । আতঙ্কে অস্থির হয়ে চিৎকার করে উঠতাম প্রতিবারই ।

একসময় স্বাভাবিক হয়ে এলাম,কিন্তু অনুফার মায়া তাড়িয়ে বেড়াতো । বড়চাচা মারা গেলেন অনুফার মৃত্যুরও প্রায় চারমাস পরে । খালি বাড়িটা ভুতুড়ে মনে হতে লাগলো একসময় । একসময় ভিটে-মাটি সব বেচে শহরে চলে এলাম । ছোট্ট একটা চাকরি করে দিন চলে যেতো বেশ । বিয়ে আর করিনি । মহৎ ছিলাম বলবো না ,ঠিক সাহসে কুলোয় নি । বলা হয়নি,শহরে আসার পরও প্রায় রাতে লুডুর গুটির আওয়াজ পেতাম । মাঝে মাঝে অনুফাকেও দেখতে পেতাম । ভয় হতো,বিয়ে করলে অনুফা যদি না আসে আর ?

অনুফার ডায়েরীর কথা ভুলে গিয়েছিলাম । অনেকদিন পর পুরোনো ট্রাঙ্কটা খুলে অনুফার ডায়েরীটা খুঁজে বের করলাম । অনুফার মৃত্যুর পর অনুফার বড়ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো বহুদিন । একসময় সে যোগাযোগ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো । সেদিন আমার অফিস শেষে বাসায় ফিরে দেখি বারান্দায় অনুফার বড় ভাই দাঁড়িয়ে । তার সাথে আলাপনের এক পর্যায়ে জানলাম, অনুফার মেয়ে বেঁচে ছিলো । জন্মের সাথে সাথে তাকে অনুফার থেকে সরিয়ে এক নিঃসন্তান দম্পতিকে দিয়ে দেন তার বড় ভাই ।

ডায়েরীটা খুঁজে বের করলাম । সেখানেই জানতে পারলাম “নীলন্তি” অনুফার মেয়েকে তার দেয়া নাম । সাথে সাথে মুখের মাংশপেশী শক্ত হয়ে গিয়েছিলো । মৃত্যুর আগে ও বারবার নামটি বলে গেছে,তখনও তারা অনুফাকে তার মেয়ের কথা জানায় নি । তাঁর কাছেই জানলাম,মায়ের ডায়েরীটা চাও তুমি । ঠিকানা পরিবর্তন করায় আমাকে খুঁজে বের করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো অনুফার ভাইয়ের । ঠিক করলাম আমি ই তোমার সাথে দেখা করবো । মায়ের লেখা ডায়েরীটা তোমার কাছে দিয়ে আসবো ।

অনুফার ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের ঠিকানা । তারপর নিজেই চলে এলাম ।


বলেই থামলাম । অরণীর চোখে পানি দেখতে পাচ্ছি । বুঝলাম এতো বছর পরেও অনুফার চোখের পানি অন্তর কাঁপিয়ে তোলে আমার । অরণী যখন ড্রয়িংরুমে এসেছিলো,তখন পানি খাচ্ছিলাম তখন । চোখের সামনে অনুফা দাঁড়িয়ে আছে ভেবে বিষম খেয়েছিলাম । অরণীর বাবা তখনও সামনে বসে । মেয়েকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন । ভদ্রলোক যথেষ্ট অমায়িক । তিনি বললেন,"মায়ের ব্যাপারে সবই জানিয়েছি অরণীকে । তারপর থেকেই তার মামাকে ফোন করে খবর দেয়া হতো,আপনার ঠিকানা টা দেয়ার জন্য । কথা বলুন আপনারা । কিছু দরকার হলে বলবেন ।"

অরণী চুপচাপ বসে আছে । এতোক্ষণে ভালোভাবে খেয়াল করলাম, শাড়ি পরেছিলো অরণী । অনেক সেজেছেও । কোথাও বেড়াতে যাচ্ছিলো বোধহয় । আমিও কি করব বুঝে পেলাম না । চলে এলাম । অরণী তখনও সোফায় মূর্তির মতো বসে ।


আমি বাসায় ফিরে এলাম । কাল থেকে আবার সেই দশটা-পাঁচটা অফিস । বিকেলে গণ লাকড়ির চুলায় ধোঁয়া উঠিয়ে ভাত রান্না করা । চাকরি আর বেশি নেই । ইচ্ছা আছে,আবার রাজাপুরায় ফিরে যাওয়ার । অল্প কয়টা দিন অনুফার সাথেই কাটানো হোক । আজ ধোঁয়ায় চোখটা একটু বেশি ই জ্বলছে । ভাত রেঁধে আর কিছু করতে মন চাইলো না ।

অনুফার সাদা চিঠিগুলো বের করলাম । আজও দেখা হয়নি কি লেখা ওতে । আমি তো জেনেই গেছি ডায়েরী পড়ে । আর পানিতে ভিজিয়ে কি হবে । শুধু শুধু চিঠিগুলোই নষ্ট হবে ।

তাই আবার চিঠিগুলো যত্ন করে রেখে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম । আচ্ছা,অরণীর নামটা নীলন্তি থাকলেই বোধহয় বেশ হতো । মায়ের অংশটুকু মেয়ের মধ্যে পুরোপুরি বেঁচে থাকতো । এতোসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়েন হাসান সাহেব ।

সকালে তার ঘুম ভাঙ্গে কড়া নাড়ার আওয়াজে । দরজা খুলেই আবার হাসান সাহেব চমকে উঠেছিলেন অরণীকে অনুফা ভেবে । মেয়েটা মিষ্টি করে হাসছে । দরজা খুলতেই অরণী বললো, "আসবো? "
হাসান সাহেব দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াতেই অরণী এসে খাটের উপর বসে পড়লো । হাসান সাহেব একবার-দুবার দরজার ওপাশে উঁকি দিয়ে বললেন,"একলা এসেছো,মা ?"
অরণী হেসে বললো, "জ্বী । আজ কিন্তু আপনার ছুটি । আমি বাসায় বলে এসেছি সারাদিন আপনার সাথে থাকবো । আজ আপনি আপনার ইচ্ছা মত বাজার করবেন । আমি আপনাকে রান্না করে খাওয়াবো ।"
"এখানে এতো সুবিধা নেই তো । নিচে গিয়ে গণচুলায় রান্না করতে হয় । "
"হোক । সমস্যা নেই । আপনি বাজার করে আনুন । তারপর আমাকে দেখিয়ে দেবেন কোথায় রান্না করতে হবে ।"

হাসান সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়লেন । বাজার করে যখন ঘরে ফিরলেন,ততক্ষণে নিজের ঘরটাকে অরণী একেবারে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলেছে । নিজের রুম টা চিনতেই পারলেন না হাসান সাহেব । এখন তিনি মেয়েটার কাজ খুব মন দিয়ে দেখছেন । তিনি বাজার থেকে মুরগী কিনে এনেছেন । ভালো কিছু আনতে হবে ভাবলেই তার পোলাও-মুরগীর মাংসের কথা মনে হয় । কেনার পর মনে হয়েছে,মেয়েটা পারবে তো ? তাকে ভুল প্রমাণ করে অরণী খুব গুছিয়ে সব পরিষ্কার করে ফেললো । তারপর খুব যত্ন নিয়ে রেঁধেও ফেললো । অথচ, খেতে বসার সময় একটা প্লেটই বের করলো । হাসান সাহেব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,"তুমি খাবে না?"
অরণী বললো, "নাহ্‌ ,আজ আমি আপনাকে যত্ন করে পোলাও-মাংস বেড়ে খাওয়াবো ।"

অরণী দেখছে,হাসান সাহেব খাচ্ছেন । তার চোখের পানি প্লেটে পড়ছে টপটপ করে । অরণী বললো,"চাচা,মাকে যে সম্মান আপনি দিয়েছেন,তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ । মাকে আপনি বিয়ে না করলে মৃত্যুর আগে অসহ্য একটা যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো । আপনি তাকে সেই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিয়েছেন ।"

হাসান সাহেব কি বলবেন ভেবে পেলেন না ।

অরণী বললো,"সেদিন আমার নাম অরণী শুনে আপনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন । আপনাকে বলা হয়নি আমার নাম কিন্তু নীলন্তিও । আমার বর্তমান মা আমাকে আদর করে নীলন্তি ডাকেন । বড়মামা মার মৃত্যুর পরপরই বাসায় আসেন । মামী নাকি মাকে জ্বরের ঘোরে প্রায়ই এই নাম প্রলাপ বকতে শুনতেন । তিনি আন্দাজ করে নিয়েছিলেন,নামটা হয়তো বা আমার জন্যেই। "

হাসান সাহেব হেসে নীলন্তির দিকে তাকান । মেয়েটা হাসছে,অথচ চোখভর্তি পানি । পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কটা আছে ?
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×