দূর থেকে ভেসে আসা বৃষ্টির শোঁ শোঁ শব্দের বেগে চলছে বাস । ডানপাশে জানালা ঘেঁষে শ্রাবণ । জানালার কাঁচটা একটু পেছনে ঠেলে কনুইটা ঠেস দিয়ে বাইরে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সে । দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, ধানী জমি- দৌড়াচ্ছে পেছনে । বাতাস ছিদ্র করে এগিয়ে চলে যন্ত্রদানব । বাতাসের ক্ষিপ্রতা তার চুলগুলো অবিন্যস্ত করে দেয় । দিনের ক্লান্ত সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে । প্রকৃতিতে এখন পানসে রঙের দিন ।
একটু পরেই গোধূলি লগ্ন- বিষণ্ণ বিকেলের এ মুহূর্তে শ্রাবণের প্রিয়জনের কথা মনে পড়ে । মায়ের মুখটি ভেসে ওঠে প্রথমে- “বাজান, তুই আমারে ছাড়া থাকপার পারবি, বাজান?” তারপর বাবা, ছোট বোন, ছোট ভাই- সবার কথাই মনে ভাসে । মনের জানালায় উঁকি দেয় কলির মুখাবয়ব । দুষ্টু মেয়ে, ভীষণ জ্বালাতন করেছে দুষ্টুটা । আসার পথে কতগুলো ঢেঁপের মোয়া হাতে শ্রাবণের পথ রোধ করে দাঁড়ালো । হাতের ব্যাগটার চেইন খুলে ভেতরে পুরে দিয়ে বলল- আমারে ভুইলা যাবা নাতো? চোখদুটো জলে ভরে উঠেছিল ওর । তারপর পাঞ্জার পেছন দিয়ে মুছে সরে দাঁড়াল পথ থেকে । যতদূর দেখা যায়- উদাস মনে ততদূর দেখেছিল পিছন থেকে । ওর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতের থমথমে ভাব । যে মেয়ে ইয়ার্কি-ফাজলামোতে ছিল অদ্বিতীয়- দিনরাত অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকতো, খেত বকাঝকা- সে কিনা এমন নিস্তব্ধ পাথর হয়ে গেল?
মেয়েটি ওর কে? কেনই বা শ্রাবণের কাছে তার এতটা সমর্পণ? কী চায় শ্রাবণের কাছে সে? একই গ্রামের মেয়ে । পড়ত একই সাথে । বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোন যেমন হয় তেমনি ভেবেছে তাকে শ্রাবণ । মেয়েটি কি অন্যরকম কিছু আশা করে ওর কাছ থেকে? শ্রাবণও কি এমনভাবে ভেবেছে কোনোদিন? তবে সে যে ধোয়া তুলসির পাতা, তা-ও নয় ।
ফসলি জমির দিকে তাকায় শ্রাবণ । এই শস্য-ফসল কৃষকের কত না পরিশ্রমের! অথচ বাংলার কৃষক অবহেলিত । মৌসুম শেষে বাজারে নিলে নামমাত্র মূল্য । কৃষকের গোলা শূন্য করে যখন মজুদদার মুনাফাখোরদের হাতে পড়ে তখন এই ফসল চড়া দামে কৃষককে কিনতে হয় । বাঙ্গালি জাতটা আসলে হাল ছাড়া নৌকার মতো । আর হবেই বা- না কেন? যারা কিছু জানেনা, তারাই পলিটিক্স করে । আর তাদের হাতেই যায় ক্ষমতা । পলসি মেকারও (নীতিনির্ধারক) তারা । তাদের মেকার ওই কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ । ফিকির আর বিড়ি-চাতে যারা ভোট বিক্রি করে ।
-কি রে শ্রাবণ? কী ভাবছিস?
নয়নের কথায় মুখ ফেরায় শ্রাবণ- ভাবছি আমাদের দেশটার কথা । মনে হয় আমরা কত অসহায় । পরিচিত গণ্ডিতে থেকে যা ভাবতে পারিনি, এ মুহূর্তে অপরিচিত পরিবেশের কথা মনে পড়তেই নিজের গাঁয়ের মানুষের জন্য মনটা কেমন জানি করছে ।
-আমারও । মনে হয় ফিরে যাই । কিন্তু যখন ভাবি- প্রতিটি দিনেই মানুষ নবজন্ম লাভ করে, তখন নতুন অভিজ্ঞতার মোহে পড়ি ।
হ্যাঁ, প্রতিদিনই মানুষের পরীক্ষা । তারিখ থাকে না । নাম-ক্ষণ থাকে না । মাথার মধ্যে এবং তলপেটে একটু কেমন কেমন তো করবেই । আমরা গ্রাম ছেড়ে শহরে পড়তে যাচ্ছি । গ্রামে থাকে মোড়ল আর শহরে এলিটস্ । এলিটসরা মিথ্যেবাদী আর স্বার্থপর হয় । আর মোড়লরা তো আবহমান বাংলার নটরাজ । আমরাই শহর-গ্রামের সেতুবন্ধন । আমরাই ভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে চোখে আদর্শ আর দেশের জন্য কিছু করার সাথে- নিজের জন্য কিছু করার মানসিকতা নিয়ে চাকরীতে ঢুকি । দুবছর যেতে-না-যেতেই ঐ এলিটসদের খপ্পরে পড়ে গতানুগতিকতার স্রোতে গা ভাসাই । এভাবেই অথর্ব হয়ে যাচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম- অবহেলিত থাকছে আমাদের গ্রাম, আমাদের কৃষক ।
এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার । ঐসব চমৎকার বদমাশের পিঠ চাপড়ানো হাসিতে না ভুলে, স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা আজ দেশবাসীকে বোঝানো দরকার । গর্তে, ডোবা, নালা-নর্দমায় পড়ে হাবুডুবু খাওয়া মানুষগুলোকে ভাসিয়ে দিতে হবে । যাতে তারা একাত্তরের মতো আবার পুকুরের সাথে- নদীর সাথে মিশে, ভাসিয়ে দিতে পারে দেশ ।
-ভেসে যাওয়া পুকুরও একদিন গর্তে ফিরে যায় । আমাদের সমস্যাটা কী জানিস? আমাদের দেশের সবচেয়ে গরিবঘরের ছেলেরাই অবস্থার পরিবর্তন হলে সবচেয়ে বেশি ক্রূর, দুর্মর এবং নিষ্ঠুর বুর্জোয়া চরিত্রের হয় । নব্য এলিটসদের দেখছিস না? একাত্তরের আগে যাদের পিঠের নিচে ছারপোকাপোষা ভোটা কাঁথা থাকতো, এখন গুলশান-বনানীর মালিক তো তারাই!
(চলবে)
উপন্যাসঃ নির্জনতার সমুদ্রে অবগাহন
লেখকঃ কবি বাবু ফরিদী
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১০:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



