somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্জনতার সমুদ্রে অবগাহন/ বাবু ফরিদী

১০ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১০:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দূর থেকে ভেসে আসা বৃষ্টির শোঁ শোঁ শব্দের বেগে চলছে বাস । ডানপাশে জানালা ঘেঁষে শ্রাবণ । জানালার কাঁচটা একটু পেছনে ঠেলে কনুইটা ঠেস দিয়ে বাইরে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সে । দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, ধানী জমি- দৌড়াচ্ছে পেছনে । বাতাস ছিদ্র করে এগিয়ে চলে যন্ত্রদানব । বাতাসের ক্ষিপ্রতা তার চুলগুলো অবিন্যস্ত করে দেয় । দিনের ক্লান্ত সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে । প্রকৃতিতে এখন পানসে রঙের দিন ।

একটু পরেই গোধূলি লগ্ন- বিষণ্ণ বিকেলের এ মুহূর্তে শ্রাবণের প্রিয়জনের কথা মনে পড়ে । মায়ের মুখটি ভেসে ওঠে প্রথমে- “বাজান, তুই আমারে ছাড়া থাকপার পারবি, বাজান?” তারপর বাবা, ছোট বোন, ছোট ভাই- সবার কথাই মনে ভাসে । মনের জানালায় উঁকি দেয় কলির মুখাবয়ব । দুষ্টু মেয়ে, ভীষণ জ্বালাতন করেছে দুষ্টুটা । আসার পথে কতগুলো ঢেঁপের মোয়া হাতে শ্রাবণের পথ রোধ করে দাঁড়ালো । হাতের ব্যাগটার চেইন খুলে ভেতরে পুরে দিয়ে বলল- আমারে ভুইলা যাবা নাতো? চোখদুটো জলে ভরে উঠেছিল ওর । তারপর পাঞ্জার পেছন দিয়ে মুছে সরে দাঁড়াল পথ থেকে । যতদূর দেখা যায়- উদাস মনে ততদূর দেখেছিল পিছন থেকে । ওর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতের থমথমে ভাব । যে মেয়ে ইয়ার্কি-ফাজলামোতে ছিল অদ্বিতীয়- দিনরাত অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকতো, খেত বকাঝকা- সে কিনা এমন নিস্তব্ধ পাথর হয়ে গেল?

মেয়েটি ওর কে? কেনই বা শ্রাবণের কাছে তার এতটা সমর্পণ? কী চায় শ্রাবণের কাছে সে? একই গ্রামের মেয়ে । পড়ত একই সাথে । বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোন যেমন হয় তেমনি ভেবেছে তাকে শ্রাবণ । মেয়েটি কি অন্যরকম কিছু আশা করে ওর কাছ থেকে? শ্রাবণও কি এমনভাবে ভেবেছে কোনোদিন? তবে সে যে ধোয়া তুলসির পাতা, তা-ও নয় ।

ফসলি জমির দিকে তাকায় শ্রাবণ । এই শস্য-ফসল কৃষকের কত না পরিশ্রমের! অথচ বাংলার কৃষক অবহেলিত । মৌসুম শেষে বাজারে নিলে নামমাত্র মূল্য । কৃষকের গোলা শূন্য করে যখন মজুদদার মুনাফাখোরদের হাতে পড়ে তখন এই ফসল চড়া দামে কৃষককে কিনতে হয় । বাঙ্গালি জাতটা আসলে হাল ছাড়া নৌকার মতো । আর হবেই বা- না কেন? যারা কিছু জানেনা, তারাই পলিটিক্স করে । আর তাদের হাতেই যায় ক্ষমতা । পলসি মেকারও (নীতিনির্ধারক) তারা । তাদের মেকার ওই কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ । ফিকির আর বিড়ি-চাতে যারা ভোট বিক্রি করে ।

-কি রে শ্রাবণ? কী ভাবছিস?

নয়নের কথায় মুখ ফেরায় শ্রাবণ- ভাবছি আমাদের দেশটার কথা । মনে হয় আমরা কত অসহায় । পরিচিত গণ্ডিতে থেকে যা ভাবতে পারিনি, এ মুহূর্তে অপরিচিত পরিবেশের কথা মনে পড়তেই নিজের গাঁয়ের মানুষের জন্য মনটা কেমন জানি করছে ।

-আমারও । মনে হয় ফিরে যাই । কিন্তু যখন ভাবি- প্রতিটি দিনেই মানুষ নবজন্ম লাভ করে, তখন নতুন অভিজ্ঞতার মোহে পড়ি ।

হ্যাঁ, প্রতিদিনই মানুষের পরীক্ষা । তারিখ থাকে না । নাম-ক্ষণ থাকে না । মাথার মধ্যে এবং তলপেটে একটু কেমন কেমন তো করবেই । আমরা গ্রাম ছেড়ে শহরে পড়তে যাচ্ছি । গ্রামে থাকে মোড়ল আর শহরে এলিটস্ । এলিটসরা মিথ্যেবাদী আর স্বার্থপর হয় । আর মোড়লরা তো আবহমান বাংলার নটরাজ । আমরাই শহর-গ্রামের সেতুবন্ধন । আমরাই ভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে চোখে আদর্শ আর দেশের জন্য কিছু করার সাথে- নিজের জন্য কিছু করার মানসিকতা নিয়ে চাকরীতে ঢুকি । দুবছর যেতে-না-যেতেই ঐ এলিটসদের খপ্পরে পড়ে গতানুগতিকতার স্রোতে গা ভাসাই । এভাবেই অথর্ব হয়ে যাচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম- অবহেলিত থাকছে আমাদের গ্রাম, আমাদের কৃষক ।

এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার । ঐসব চমৎকার বদমাশের পিঠ চাপড়ানো হাসিতে না ভুলে, স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা আজ দেশবাসীকে বোঝানো দরকার । গর্তে, ডোবা, নালা-নর্দমায় পড়ে হাবুডুবু খাওয়া মানুষগুলোকে ভাসিয়ে দিতে হবে । যাতে তারা একাত্তরের মতো আবার পুকুরের সাথে- নদীর সাথে মিশে, ভাসিয়ে দিতে পারে দেশ ।

-ভেসে যাওয়া পুকুরও একদিন গর্তে ফিরে যায় । আমাদের সমস্যাটা কী জানিস? আমাদের দেশের সবচেয়ে গরিবঘরের ছেলেরাই অবস্থার পরিবর্তন হলে সবচেয়ে বেশি ক্রূর, দুর্মর এবং নিষ্ঠুর বুর্জোয়া চরিত্রের হয় । নব্য এলিটসদের দেখছিস না? একাত্তরের আগে যাদের পিঠের নিচে ছারপোকাপোষা ভোটা কাঁথা থাকতো, এখন গুলশান-বনানীর মালিক তো তারাই!

(চলবে)

উপন্যাসঃ নির্জনতার সমুদ্রে অবগাহন
লেখকঃ কবি বাবু ফরিদী
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১০:১১
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস

লিখেছেন কলাবাগান১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭


ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি কে? রাজাকার!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:০১



ভারতে দেশপ্রেমের সজ্ঞা কী? ভারতে একজন কট্টরপন্থীর দেশপ্রেম হলো প্রথমত পাকিস্তান বিরোধী হতেই হবে। দ্বিতীয়ত মুসলিম বিরোধী হতেই হবে। এই দুই ছাড়া কোনভাবেই সে ভারতকে ধারণ করেনা এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে আগামীকাল ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আগামীকাল অপপ্রচারকারীদের খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে। গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারকে কাবু করার দিন ফুরিয়ে এসেছে। 'কাছিমের মতো গর্ত থেকে বের হয়ে' যারা এতদিন সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×