somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি নিখাঁদ অসাম্প্রদায়িক স্মৃতিচারণ

১২ ই জুন, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


খুব স্পষ্ট মনে আছে আমার। ছোটবেলায় একবার, শুক্রবার দুপুরে, টিভি দেখছিলাম আর পড়ছিলাম। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে, হঠাৎ আযান শুরু হলো। আমি পড়ায় মন দেবো ভেবে রিমোট হাতে নিয়ে সাউন্ড কমিয়ে দিতে উদ্যত হলে, বাবা বকা দিয়েছিলো। বলেছিলো, 'কমাবি কেনো? আযানের ধ্বনিটা কী সুন্দর, একবার মন দিয়ে শোন! অর্থটাও পরে জানিয়ে দেয়'।

সেদিন থেকে আযানের ধ্বনি আমার খুব ভালো লাগে। মফস্বলের সেই শহরটায়, মাঝে মাঝেই রাতে আমার ঘুম আসতো না। দেরীতে ঘুমানোর অভ্যাস আমার খুব পুরোনো। অনেক সময় দেখা যেতো, সারারাত পড়ে আযানের শব্দ শুনে ঘুমাতে যেতাম। দূর থেকে ভেসে আসা আযানের সুমধুর শব্দটা আমার খুব আপন লাগতো। বাবা বলতো, এই সময়টাকে বলে 'সুবাহ সাদিক'। এই আযানের ধ্বনিতে পৃথিবী থেকে সব অপশক্তি অতৃপ্ত আত্মা পালিয়ে যায়। অতঃপর সুন্দর এক ভোর আসে, নতুন দিন নতুন আশা নিয়ে।

এরপর সকাল হলেই ঠাকুর ঘরে মায়ের কণ্ঠে উলুধ্বনি শুনতাম। এই ধ্বনিটাও সমান ভালো লাগতো। আযানের ধ্বনি আর উলুধ্বনি-কীর্তন ঘন্টা খোল করতাল শাঁখের শব্দের মাঝে পার্থক্য খুঁজতে যাইনি কখনও। আমার সবই ভালো লাগতো। ঈদ-পূজার দিন একে অন্যের বাসায় যেতাম। নাড়ু-খই আর জর্দা-পায়েসের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজতে যেতাম না। আমাদের পরিবার আমাদেরকে সেভাবে গড়ে তোলেনি। আমরা একে অন্যের মতাদর্শকে শ্রদ্ধা করতাম। স্কুলে 'মালাউন' গালিটা যে একেবারে শুনিনি, তা নয়। একবারই শুনেছিলাম, সম্ভবত ক্লাস ফোরে। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। বাসায় এসে বাবাকে বললে, বাবা বলেছিলো-- এসব কিছুনা, এসব কথা যারা বলে তারা সংখ্যায় অল্প, এদেরকে এড়িয়ে চলবে।



এরপর আর কোনোদিন আমাকে এই শব্দটি শুনতে হয়নি মুখের ওপর। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, স্কুলে পড়ার সময় আমার বন্ধুদের আড্ডায় কখনোই ধর্ম নিয়ে আলাপ বা বিদ্বেষ বাসা বাঁধেনি। আমরা একসাথে খেলেছি, ক্লাস করেছি। ভালো ছাত্র ছিলাম বলে আমাকে দিয়ে স্যারেরা জঙ্গল থেকে ছোট গুল্মগাছ তুলে এনে বেত বানিয়ে আনার দায়িত্ব দিতো। পড়া না পারার কারণে আমার যেসব বন্ধুরা সেই বেতের কারণে ব্যাথা পেতো, তাদের জন্য আমারও খারাপ লাগতো। একদিন স্যারকে বললাম, আমি আর বেত আনতে পারবো না। আমার আনা বেত দিয়ে আমার বন্ধুদের মারা হয়, আমার খুব খারাপ লাগে। স্যার শুনে আমাকেও হাত পাততে বলেছিলেন। বলেছিলেন, 'বন্ধুদের কেমন লাগে একবার চেখে দ্যাখ!'

এভাবেই বন্ধুদের ব্যাথা ভাগ করে নিতাম। সম্পর্কটা ছিলো বন্ধুত্বের, ধর্ম বা ধর্মীয় রীতিনীতি আমাদের মাঝে তখন বাধা হয়ে দাঁড়াত না। ইসলাম শিক্ষা ক্লাসের সময় আমরা আলাদা কক্ষে চলে যেতাম। কোনোদিন কোনো কারণে ক্লাস না হলে ইসলাম শিক্ষার ক্লাস শুনেছি। তবে আমাদের বাধ্য করা হতো না ক্লাসে বসে থাকতে। চাইলে বাইরেও যাওয়া যেতো। আমার এখনও মনে আছে, শচীন স্যার, গাইন স্যার, প্রীতিলতা দিদিমনি যেমন আপন ছিলেন, তেমনি ছিলেন ফজলে রাব্বি স্যার, মোফাজ্জল স্যারেরা। সবাই মেধাবিদের ভালোবাসতেন আর ফাঁকিবাজদের বকা দিতেন। সর্বোপরি নিজের সন্তানের মতো দেখতেন।



খুব বেশি আগের কথা নয়। ১০-১৫ বছর আগেও অবস্থাটা এমনই ছিলো। আমাদের ছেলেবেলায়, 'সম্প্রদায়' শব্দটার সঙ্গে আমরা পরিচিত ছিলাম না। হঠাৎ করে কেমন যেনো অনেক কিছুই বদলে গেলো। স্কুল-কলেজের পড়া শেষ করে একেকজন একেক জায়গায় গেলাম। নিজ নিজ জেলার সাম্প্রদায়িক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে অনেকেই পরিবর্তিত হয়ে গেলো। এখন অনেকের সাথেই আর আগের মতো মত মেলে না। সব বিষয়ে খোলামেলা কথাও বলা যায়না। আবার, আমার ভার্সিটি জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধুগুলোই অন্য ধর্মের। আমার কষ্টের দিনগুলোয়, যখন নিজের হল থেকে শুধুমাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে চাইনি বলে আমাকে বিতাড়িত করা হয়েছিলো, তখন আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলো যে বন্ধুরা, তারাও তো বিধর্মী। আমার সামনেই রুমে নামাজ পড়েছে। একবারও রুমের বাইরে যেতে তো বলেনি! ওরা আমার জন্য যা করেছে, আমি ওদের ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।



অনেক হতাশার মাঝেও, আমরা আশার আলো দেখার আশায় থাকি। সবাই মিলে রোজার মাসে ইফতার পার্টি আয়োজন করি। অফিসে নিজেরাই চাঁদা তুলে ইফতারের কেনাকাটা ও ইফতার তৈরি করে সবাই মিলে এক গামলা থেকে নিয়ে খাই। এখানে তো কখনও ধর্মের প্রশ্ন আসে না! কে হিন্দু আর কে মুসলিম, কে রোজা রেখেছে আর কে রাখেনি-- সে প্রশ্ন তো কেউ করেনা! তবু কোথায় যেন অজানা আতংকে মনটা ভরে ওঠে। ঘুম ভেঙেই গলাকাটা লাশ দেখে দিনটা শুরু করা আর ফেসবুকের মেসেজে শত শুভাকাঙ্খীর দেশ-বিদেশ থেকে সতর্কবাণী।

গতকালও সাবধানে থাকতে বললেন নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের এক বাংলাদেশী বড় ভাই। আমি বলি, আমিতো কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নই, বরং সকল ধর্মের সহাবস্থানে বিশ্বাসী। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ বলুন, ঈশ্বর কিংবা ভগবান বলুন-- তিনি একজনই। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, লালন-পালন করছেন। আমরা শুধু আলাদা আলাদা রীতিতে তাঁর আরাধনা করি মাত্র। এখানে বিদ্বেষের কী আছে?

তবুও তাঁদের শঙ্কা যায়না। কারণ, আজকাল নাকি কারো জীবনই নিরাপদ নয়!

(feel free to Share. But, please don't copy/paste)

- দেব দুলাল গুহ

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০১৬ দুপুর ১:০৬
৯টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের জন্মগ্রহণ কি আজন্ম পাপ?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬



রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আছে, জনগণের নিরাপত্তা কোথায়?

বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারটুকুও আমাদের নেই? সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকে। কিন্তু সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৫




১৯৯৭ সাল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।

সেই সময় অডিও ক্যাসেটের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×