somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুসলমানদের ভেতরের অনৈক্য

২৪ শে আগস্ট, ২০১৪ সকাল ৮:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হোয়াইট হাউস থেকে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট সর্বত্রই আরও একবার চালানো হচ্ছিল ইউটিউবে সদ্য আপলোড করা ভিডিয়োটা। কয়েক জন ইরাকি সেনার মুন্ডু কেটে নেওয়ার পর ক্যামেরার সামনে এলেন ইসলামিক স্টেটের এক মুখ ঢাকা মুখপাত্র। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল -মালিকিকে ‘অন্তর্বাস বিক্রেতা' বলে সম্বোধন করে হুমকি দিলেন, ‘বাগদাদ দখল করেই শেষ হবে না তাদের অভিযান, কারবালা ও নজফের শিয়া ধর্মীয় স্থানগুলিকে মাটিতে মেশাতে পারলে তবেই পূর্ণ হবে তাদের মহান ব্রত'।

সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ গত আট বছর এরই অপেক্ষায় ছিলেন৷ ইরাকি প্রধানমন্ত্রী তার কাছে শুরু থেকেই ‘ইরানের দালাল। আল -মালিকির জমানার ইরাকে সৌদি রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত পাঠাননি আবদুল্লাহ৷ গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিএসসি ) অর্থাৎ তার তাবেদার কুয়েত , বাহরাইন, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাত কর্তাকেও একই নির্দেশ দিয়েছিলেন৷

২০১১ -তে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে যখন সবার অলক্ষ্যে বাড়ছিল ইসলামিক স্টেট , তখন একবারও সৌদি কর্তাদের সদুপদেশ দেননি মার্কিন রাজনীতিবিদরা। আসলে, সদুপদেশ দেওয়া মার্কিনদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য এমন কথা তাদের ধামাধারী বৃটিশরাও হলফ করে বলতে পারবেন না। তাই সৌদি রাজপরিবার পশ্চিম এশিয়ায় ইরান তথা শিয়া প্রতিপত্তি খর্ব করার জন্য আল -কায়দা ও তালিবানের নলচে আড়াল দিয়ে সুন্নি কট্টরপন্থা ছড়াতে যা কিছু করেছে, তার সবটাই না দেখার ভান করেছিল আমেরিকা। এই তো বছর দশেক আগে , কান্দাহারে ‘বন্ধু’ মোল্লা মহম্মদ ওমরের কুশল সংবাদ নিতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন সৌদি রাজপরিবারের সদস্য তথা গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল -ফয়সল। তখন না মার্কিন সিআইএ, না বৃটিশ এমআই -৬ কেউ একবারও জানতে চায়নি ডনের মতো নিজেকে বেবাক লুকিয়ে ফেলা এই তালিবানকর্তার ঠিকানা সৌদি রাজকুমার কী ভাবে পান, আর তাদের ‘বন্ধুত্বের’ কারণটাই বা ঠিক কী ?

গোয়েন্দাদের সঙ্কোচের পেছনে অবশ্য মার্কিন বা বৃটিশ বিদেশনীতি জড়িত৷ কিন্ত্ত লজ্জা , ঘেন্না ও ভয় জয় করা সাংবাদিকরা, বিশেষ করে বিবিসি -র মতো সংস্থার সাংবাদিকরাও যে ক'বার আল -ফয়সলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তার কোনোবারই অস্বস্তিকর এই প্রশ্নের জবাব তারা জানতে চাননি।

পশ্চিম এশিয়া এবং ইরাকের রাজনীতিতে শিয়া -সুন্নি দ্বন্দ্ব বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ১৯২০ -র দশকের একেবারে শেষের দিকে বৃটিশরা জন্ম দিয়েছিল আজকের ইরাকের। এর জন্য মেসোপটেমিয়া ও বসরার সঙ্গে মেশানো হয়েছিল উত্তরের কুর্দি জনগোষ্ঠীর বাসভূমিও৷ বিদ্রোহী কুর্দিদের পৃথক 'হোমল্যান্ডের' দাবি নস্যাৎ করেই। সেই থেকে ইরাকের দখলদারি নিয়ে শিয়া -সুন্নির দ্বন্দ্বের সূত্রপাত৷ বাগদাদ ও সংলগ্ন অঞ্চলে সুন্নি অধ্যুষিত আরবরা সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ আর বসরা ও দক্ষিণ -পূর্বের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল শিয়া আরবদের প্রাধান্য। শিয়াদের চাপে রাখতে ও ইরাকের নতুন শাসক মক্কার শরিফ হুসেন বিন আলির তৃতীয় পুত্র এবং হাশেমি বংশীয় ফয়সলকে ভরসা দিতেই আরব না হওয়া সত্ত্বেও সুন্নি কুর্দিদের জোর করে ইরাকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

১৯৫৮ সালে ইরাকে বাথ পার্টির উত্থান ঘটল হাশেমিদের বংশ নাশ করে। শোনা গেল, তরুণ এক বাথ সদস্য সাদ্দাম হুসেনের নাম। ১৯৭৯ -তে এই সাদ্দামই ইরাকের মসনদে বসলেন। তিকরিত গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান সাদ্দাম সৌদি রাজপরিবারের পাত্তা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না, কিন্ত্ত বিধি বা।৷ ইরানে মার্কিনপন্থী রেজা শাহর শাসনের অবসান ঘটল আয়াতুল্লা খোমেনির নেতৃত্ব।

কিছুদিন পরই ইরানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের টানা ৪৪৪ দিন বন্দি রাখল খোমেনির অনুগতরা। ১৯৮৩ সালে ইরান প্রভাবিত শিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী হিজবুল্লার বৈরুত মার্কিন সেনাছাউনিতে হামলায় ২৪১ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু সৌদি রাজপরিবার ও তার ঘনিষ্ঠ সখা মার্কিন প্রশাসনের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছিল।

না -থাক পেডিগ্রি, শিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানকে থামাতে মরিয়া পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে তখন সাদ্দামই সম্বল। অন্য দিকে , পশ্চিম এশিয়ায় সৌদি রাজপরিবারের দাপট কমাতে উঠেপড়ে লেগেছিল তেহরানের ধর্মীয় নেতাদের প্রশাসনও। সিরিয়ায় আর এক শিয়াপন্থী হাফিজ আল -আসাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় একধাক্কায় ইরানের ক্ষমতা বেড়ে গেল অনেকটাই৷ ইরান -ইরাক যুদ্ধ শুরু হতেই সন্ত্রস্ত আমেরিকা সাদ্দামকে সমর্থন করতে একটুও দ্বিধা করেনি তাই।

১৯৯১ -এর উপসাগরীয় যুদ্ধ সাদ্দাম হুসেনের কোমর ভেঙে দিল। ২০০৩ সালে সাদ্দাম ক্ষমতাচ্যুত হলে পুরোনো ভয় ফের পেয়ে বসল সৌদি রাজ পরিবারকে। ময়দান সাফ দেখে ছক সাজাতে শুরু করল ইরানও। এমন পরিস্থিতিতে ইরাকের শাসনক্ষমতা শিয়াপন্থী নুরি আল -মালিকির হাতে আসায় পশ্চিম এশিয়ায় ফের অ্যাডভান্টেজ ইরান। ৯০ পার করা সৌদি বাদশাহ আবদ্ল্লুার স্মরণকালে এমন 'দুর্দিন' আর আসেনি। এতদিন ছিল ইরান আর সিরিয়া, এবার ইরাকও সেই শিবিরে! ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শাসনক্ষমতা ছিল সুন্নিদের হাতেই। কিন্ত্ত এখন আরব দুনিয়ার দু’টি দেশ তো বকলমে শিয়া ইরানেরই হাতে!

দুশ্চিন্তায় হিতাহিত জ্ঞান হারানো আবদুল্লাহ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিরোধীদের অর্থ ও অস্ত্র জোগাতে শুরু করলেন। জন্ম নিল কট্টরপন্থী সুন্নি সংগঠন ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইসিস)৷ উদ্দেশ্য , আরবভূমি থেকে শিয়াদের সমূলে বিনষ্ট করা।

অতীতে একাধিকবার এমন ধর্মীয় উস্কানির সাহায্য নিয়েছে সৌদি রাজপরিবার। ১৯২৫ -এ বর্তমান শাসক আবদুল্লার পিতা ইবনে সাউদ মিশরের আল-ইখওয়ান গোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে হাশেমিদের থেকে আরবকে নিজের অধিকারে এনেছিলেন। পরে, আল-ইখওয়ানের পিছু ছাড়াতে বৃটিশের সাহায্য নিয়েছিলেন সেবিল্লার যুদ্ধে। ইবনে সাউদের ইচ্ছায় আল -ইখওয়ানের উপর বিমান থেকে মেশিনগান চালিয়েছিল বৃটিশ সেনা। সে দিনের আল -ইখওয়ান আজ পরিচিত মুসলিম ব্রাদারহুড নামে।

৭০ বছর পর ফের এমন ধর্মীয় উস্কানির সাহায্য নিয়ে তালিবান ও আল -কায়দা নামে দুই গোষ্ঠীকে বিশ্বের দরবারে পেশ করে এই সৌদি রাজপরিবারই। এবার পশ্চিম এশিয়া দখলের লড়াইয়ে তাদের বাজি ইসলামিক স্টেট৷ একা সৌদি রাজপরিবারই নয়, আরব দুনিয়াকে কিছুটা নড়বড়ে দেখে ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে পশ্চিম এশিয়ার সুযোগসন্ধানী রাষ্ট্র কাতারও৷ গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় আমির তামিম বিন হামাদ আল-থানির কাতারের বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ক্রমশ বেড়েছে৷ ২০১১ থেকেই মাথাপিছু আয়ের নিরিখে কাতার বিশ্বের ধনীতম দেশ৷ এবার আরব বিশ্বের তিন হর্তা কর্তা বিধাতা সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ, মিশরের আবেদল ফাতা এল সিসি এবং আবু ধাবির মহম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল-নাইহানকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন তামিম।

গত দু’বছরে কাতারেই তৈরি হয়েছে আল -কায়দা ও তালিবানের দু’টি দপ্তর। ধনী কাতারি আরবরা প্রকাশ্যে একাধিক জঙ্গি সংগঠনকে অর্থসাহায্য করে ধর্মাচরণের সুখ পেতে শুরু করেছেন। তাদের আটকানোর উপায় এখনও অধরাই। ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুতে অবসান হয়নি জঙ্গিবাদের৷ সন্ত্রাসের সংস্কৃতির চরমতম উদ্বর্তন দেখছে আজকের দুনিয়া৷ পূর্বে পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে আফ্রিকা পর্যন্ত ছবিটা একেবারে এক৷ করাচির জিন্না আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তালিবান হামলা , আফগানিস্তানে ভোটদাতাদের আঙুল কেটে জঙ্গি আস্ফালন, আইএসের সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল, ইয়েমেনে হাসপাতালকর্মীদের বাসে আল -কায়দার গুলি, আল-শাবাবের হাতে কেনিয়ায় ৪৮ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু, নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম জঙ্গিদের হাতে অপহূত ৩৭৬ জন স্কুলছাত্রী। এই সব ঘটনাই মনে করায় এক আন্তবাক্যকে – বলশালীদের ক্লীবতাই সভ্যতার সবচেয়ে বড় সঙ্কট ডেকে আনে
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

গাধা উন্নয়ন প্রকল্প এবং একটি ভালো কলেজের গল্প

লিখেছেন মুনতাসির, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

নটর ডেম কলেজে আমাদের সময় একটা প্রকল্প ছিল। নাম ‘অ্যাস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’, সংক্ষেপে এডিপি। বাংলায় বললে ‘গাধা উন্নয়ন প্রকল্প’। নাম শুনে মনে হতে পারে, কোনো প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি। বাস্তবে এটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×