১৯৯৭ সালের মার্চ মাসেরর কোন এক সন্ধ্যায় আমি স্কটল্যান্ডের ইনডারনেস শহরে রেস্তোরাঁর সন্ধান করছিলাম। ইংল্যান্ডের নর্থ বি এর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই শহরটি অতিক্রম করে আমরা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে অন্য একটি পল্লী এলাকায় যাবার কথা? আমি বৃটিশ কারিগরী সহায়তা বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম। এ প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে শিক্ষা সফরে আমার ইনভারনেস যাওয়া। ব্র্যাডফোর্ড থেকে এডিনবরা হয়ে এখানে আসতে সারা দিন লাগলো। যে হোটেলে উঠলাম সেখানে নিজস্ব রুচি অনুযায়ী খাবার পেলাম না। খোজাখুঁজি করচি, এমন সময় নেপালী বন্ধু হরকা বাহাদুর দৌড়ে এসে জানালো পেয়ে গেছি তোমার দেশী হোটেল’। ওর সাথে কিছু দূর এগিয়ে যেতেই দেখি বিশাল সাইন বোর্ড ‘রোজ অব বেঙ্গল’। রীতিমত বাংলাদেশী হোটেল। ভেতরে প্রবেশ করে কাউন্টারে এক যুবককে পেলাম। ইংরেজীতে নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই তিনি জবাব দিলেন ‘আমি বাংলাদেশী শুধু নয় একেবারে খাঁটি নোয়াখাইল্যা’। দাগনভূইয়া বাড়ি। চাচার হোটেল। চাচা এসে ছিলেন প্রায় চল্লিশ বছর আগে। চাচী ইংরেজ। অন্যান্য স্টাফ বাংলাদেশী। ঐ শহরে তিন দিন ছিলাম মন ভরে নোয়াখালীর কথা বললাম আর দেশী বিভিন্ন খাবার খেলাম। আমার সঙ্গে আমার প্রায় ৩০ জন সহপাঠিও উপভোগ করলেন নোয়াখালীর খাবার। সবাই তৃপ্ত। এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়েছে। এ রকম আর একটি মজার ঘটনা ঘটেছে আমি যখন মালদ্বীপে জাতিসংঘের একটি চাকরিতে ছিলাম। সম্ভবত: ১৯৯৫ সালে মালদ্বীপের একটি ঘটনা জনপ্রিয়তা লাভ করে। মালদ্বীপের পেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইউমের মেয়েকে বিয়ে করেছে বাংলাদেশের নয় শুধু নোয়াখালীর এক ছেলে। এ দিয়ে মালদ্বীপের বন্ধুদের সঙ্গে আমার প্রায় হাসি তামাশা হতো। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশ কোথায়? আমি বললাম, বাংলাদেশ নোয়াখালীতে। মজার ব্যাপার হলো নোয়াখালীর অনেক আঞ্চলিক শব্দ মালদ্বীপের ভাষায় (দিরেহী ভাষা) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন : সুরুয়া (ঝোল), দারুয়া (লাকড়ি) ফুকরা (মুরগী), মাছ/মাচ (মাছ) ইত্যাদি। জেনেছি শত বছর আগে মালদ্বীপের সঙ্গে সমুদ্র পথে নোয়াখালীর ব্যবসা বাণিজ্য চলতো। আমার সৌভাগ্য হয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশ সফরের। যেখানেই গিয়েছি সেখানেই নোয়াখালীর লোক রয়েছে বলে জেনেছি।
নোয়াখালীর ইতিহাস অনেক প্রাচীন, ঐতিহ্য মন্ডিত এবং বর্ণাঢ্য। সেই সমতট থেকে কুসুরা তারপর নোয়াখালী হাজার হাজার বছরে হয়েছে অনেক পরিবর্তন। ভৌগলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক দিক থেকে অন্যান্য স্খানের মতো নোয়াখালীরও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অনেক কিছুই রয়েছে এখনো অপরিবর্তিত। মানুষের আচার সৌজন্যবোধ, পরিশ্রম ও কষ্ট সহিষ্ণুতা, ধর্মানুরাগ, শিক্ষার প্রতি ‘আগ্রহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আগের মতই আছে। তবে নোয়াখালীর মানুষের মধ্যে যে প্রবণতাটি আবহমানকাল থেকে সক্রিয় থেকে সক্রিয়ভাবে হচ্ছে তা হলো বহি:মুখীতা। বিদেশে তো বটে দেশেও এমন কোন জেলা নেই যেখানে নোয়াখালীর অসংখ্য লোক সেটেল করেননি। সেখানে তারা সামাজিক ও রাজনৈতকি প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করে নিয়েছেন।
নোয়াখালীর মানুষ চাঁদেও আছে’এটি বহুল প্রচলিত একটি জাতীয় উদ্ধৃতি। এ কথাটি হাল্কা ভাবে বলা হলেও আসলে তাৎপর্যবহ। এতে নোয়াখালীর মানুষের সুদূর প্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, সংকীর্ণতার সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বজনীয়তা এবং উদার মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে। নোয়াখালীর মানুষ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। এবং সেই সুবাদে দেশের অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত সহায়তা দিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছাড়াও দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রে নোয়াখালীর মানুষ যথেষ্ট সচেতন। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নোয়াখালীর মানুষ মূলত: শান্তি ও সম্প্রীতিপ্রিয়। অন্য দিকে সময়ের প্রয়োজনে অন্যায়, অত্যাচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয়। যখনই জাতি স্বার্থে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রয়োজন হয় তখনই তারা উদ্যোগী হয়েছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে শপথে ও সংগ্রামে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যান্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিল নোয়াখালীর মানুষ।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তুলনামূলক অন্যান্য জেলার চাইতে তারা অনেক এগিয়ে। জনসংখ্যার তুলনায় ভূমির সীমাবদ্ধতার কারণে কেবলমাত্র কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল না থেকে চাকুরী ও বহি:গমন এবং ভেতরে ও বাইরে ব্যবসা পাণিজ্যে তাদের লিপ্ত হতে হয়। শিক্ষা দীক্ষায় অতি অগ্রসর বলে সরকারী ও বেসরকারী চাকরির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে তারা এগিয়ে ছিল। ‘তৎকালীন পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের প্রশাসনের শীর্ষ অনেক পদে নোয়াখালীর মানুষ যোগ্যতা বলে আসীন হয়েছিল। এখনো নোয়াখালীর অনেক কৃতি সন্তান সরকারী ও বেসরকারী পদে আসিন থাকলেও সংখ্যা ক্রমশ: হ্রাস পাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে প্রথমত: জেলাভিত্তিক কোটা সংরক্ষণ, দ্বিতীয়ত: নোয়াখালীর মানুষের প্রতি অন্যান্য জেলার লোকজনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তৃতীয়ত: অন্যান্য জেলার লোকজনও পড়াশুনায় অনেক এগিয়ে গেছে।
নোয়াখালীর মানুষ ব্যবসার চাইতে চাকরিকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। ঐতিহাসিক ভাবে রাজ-রাজরা ও জমিদার শোষিত মানুষের পুঁজি ধার করে ব্যবসা বাণিজ্যে এগিয়ে এসে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। বর্তমানে অবশ্য পরিস্খিতির ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে এবং বেশ কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষঠান ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে জাতীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা ও পরিচিতি পেয়েছে।
এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে ধর্মপ্রচার বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম শিক্ষার ক্ষেত্রে নোয়াখালীর মানুষের অবদান অপরিসীম। পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্ম প্রসার ও শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে নোয়াখালীর বিশিষ্ট আলেমদের (উল্লেখ্য আমার পিতা, বড় চাচা, দাদা, নানা এবং আরো অনেক আত্মীয়স্বজন ভারত পাকিস্তানে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন এবং অধ্যাপনা করেন। ভূমিকা উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ইসলামী শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে নোয়াখালীর অনেক ওলামাদের নিরলস সাধনা ও চেষ্টার ফলে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় চেতনা সম্পন্ন হতে পেরেছে। এ জন্য এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ কিছু আক্ষেপের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। আবহমানকাল ধরে নোয়াখালী সমগ্র দেশকে শিক্ষা দীক্ষা, অর্থনীতি-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দিয়েছে অনেক কিন্তু সে তুলনায় তেমন কিছু পায়নি। এখনো উন্নয়নের দিক থেকে নোয়াখালী অনগ্রসর। এখানে শিক্ষা ও বাণিজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজ বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্খাপন করা হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্খাও আগের মতই। নোয়াখালী শহর যেন একটি উপজেলা শহর। বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে একসময়, সারা দেশে চৌমুহনীর নাম ও ভূমিকা ছিল। বর্তমানে তা আর নেই। একমাত্র পাটকল ডেল্টা জুট মিল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। সবকিছু মিলিয়ে নেয়াখালী এবং নোয়াখালীবাসী ভাল নেই। তারপরও বলবো ভেতরে-বাইরে এবং দেশে বিদেশে নোয়াখাইল্যাদের সুনাম অনাগত ভবিষ্যতেও সমুন্নত থাকবে।
ড. মুহম্মদ মাহফুজুর রহমান মোরশেদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

